আমি যেখানে
অধ্যাপনা করি,
সেই নুফিল্ড
ডিপার্টমেন্ট অব
প্রাইমারি কেয়ার
হেলথ সায়েন্সেস
চলতি বছরের
৩১ জুলাই
জুম ভিডিও
কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে
একটি সেমিনারের
আয়োজন করে।
এ ধরনের
সেমিনারে সাধারণত
কলেজের অনুষদ
সদস্যরাই অংশ
নেন। কিন্তু
এবার প্রেক্ষাপটটা
ভিন্ন। অতিমারীর
এ সময়ে
বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ
ফলাফলগুলো যতটা
বিস্তৃত পরিসরে
সম্ভব ছড়িয়ে
দেয়ার একটা
চর্চা শুরু
হয়েছে। এ
লক্ষ্য থেকেই
আমাদের সেমিনারে
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের
গবেষক ও
আগ্রহী জনসাধারণকেও
অংশগ্রহণের জন্য
আমন্ত্রণ জানানো
হয়েছিল, যার
সুবাদে আন্তর্জাতিক
পর্যায়ে খ্যাতনামা
বেশ কয়েকজন
গবেষক যুক্ত
ছিলেন এতে।
সেমিনারে আমার
প্রবন্ধের বিষয়বস্তু
ছিল ‘এক্সপ্লেইনিং
ইন্টারন্যাশনাল ডিফারেন্সেস
ইন মাস্কিং
পলিসিজ ইন
দ্য কভিড-১৯
প্যানডেমিক’।
অর্থাৎ নভেল
করোনাভাইরাস সৃষ্ট
মহামারী প্রতিরোধে
বিশ্বের বিভিন্ন
প্রান্তে মাস্ক
ব্যবহার নিয়ে
যে ভিন্ন
ভিন্ন নীতি
গ্রহণ করা
হয়েছে, তা
তুলে ধরার
প্রয়াস ছিল
আমার সেই
প্রেজেন্টেশনে। সত্যি
বলতে কী,
করোনা প্রতিরোধে
মাস্ক ব্যবহারের
অপরিহার্যতা নিয়ে
মহামারীর শুরুর
দিকে বেশ
মতভেদ দেখা
গেছে। অবশ্য
মাস্কের পাশাপাশি
লকডাউন, করোনা
পরীক্ষা ও
শনাক্তকরণ, জৈব
সুরক্ষাবলয়সহ আরো
অন্তত ডজন
খানেক বিষয়
নিয়ে আলোচনার
সুযোগ ছিল
আমার। করোনাকালে
এসব বিষয়
খুবই প্রাসঙ্গিক।
কারণ প্রতিটি
ক্ষেত্রেই নীতিনির্ধারকরা
আমাদের আশ্বস্ত
করেছেন যে
মহামারীর শুরু
থেকেই এসব
ইস্যুতে সিদ্ধান্ত
গ্রহণের ক্ষেত্রে
তারা ‘বিজ্ঞানসম্মত
পন্থা’ অনুসরণ
করেছেন। কিন্তু
সমস্যা হলো
উল্লিখিত বিষয়গুলোর
ব্যাপারে ‘বিজ্ঞান’
নিজেই যে
শতভাগ সিদ্ধ
নয়।
করোনাকালে প্রাণঘাতী
ভাইরাসটি সম্পর্কিত
যত নতুন
গবেষণা প্রতিবেদন
প্রকাশ হয়েছে,
তার প্রায়
সবই পরবর্তী
সময়ে সমালোচনার
মুখে পড়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে
স্বগোত্রীয় গবেষকদের
পক্ষ থেকে
বিরোধিতা করা
হয়েছে, কিছু
সময়ে সমালোচনায়
মুখর হয়েছেন
সাধারণ মানুষ।
আর দ্বিতীয়
শ্রেণীটির তরফ
থেকে যেসব
প্রতিক্রিয়া এসেছে,
সেগুলো বেশির
ভাগ সময়েই
অত্যন্ত আক্রমণাত্মক
ও ক্রোধপূর্ণ
হতে দেখা
গেছে।
সেমিনারে প্রবন্ধ
উপস্থাপনের সময়
আমাকেও এ
ধরনের অপ্রীতিকর
পরিস্থিতির মুখোমুখি
হতে হয়েছিল।
পাওয়ারপয়েন্ট চালু
করতে না
করতেই আমার
কম্পিউটারের চ্যাট
উইন্ডোতে কিছু
মেসেজ ভেসে
ওঠে। বলা
বাহুল্য, সেগুলো
ছিল আক্রমণাত্মক
ও আপত্তিকর
ভাষায় লেখা।
আমার কলেজটি
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির
অন্তর্গত। সে
হিসেবে আমি
অক্সফোর্ডের একজন
অধ্যাপক। পাশপাশি
একজন মেডিক্যাল
ডক্টরও আমি।
তবু আমার
প্রতি সাধারণ
মানুষের কেন
এত ক্ষোভ,
তা বোধগম্য
নয়। অবশ্য
একাডেমিক সেমিনারে
বক্তব্য রাখার
মুহূর্তে এসব
গালাগালির প্রতি
মনোযোগ দিয়ে
সময় ও
শক্তির অপচয়
করার সুযোগ
সে সময়
আমার ছিল
না।
কিন্তু প্রশ্ন
হলো, সাধারণ
মানুষ কেন
এত আক্রমণাত্মক
হয়ে উঠল?
আমার ইনবক্স
এমন গালাগালি
ও হুমকিপূর্ণ
বার্তা দিয়ে
ভরিয়ে দিতে
এত আগ্রহ
কেন তাদের?
এর উত্তর
খুঁজতে হলে
একটু পেছনে
ফিরে যেতে
হবে। গত
বসন্তে মহামারী
ছড়িয়ে পড়া
শুরু হতে
না হতেই
বিজ্ঞানীরা অভূতপূর্ব
গতিতে ও
মাত্রায় গবেষণা
শুরু করেন।
খুব দ্রুতই
বিজ্ঞান সম্পর্কিত
তথ্যভাণ্ডারগুলো এমন
কিছু গবেষণা
প্রতিবেদনে ভরে
উঠতে থাকে,
যেগুলোকে কেবল
‘প্রিপ্রিন্ট’
বলা চলে।
অর্থাৎ এসব
গবেষণার ফলাফল
স্বতঃসিদ্ধ কিনা
প্রাথমিকভাবে তা
প্রমাণ হয়নি
এবং সেগুলোর
গুণগত মান
যাচাই করাও
দুরূহ।
সত্যি বলতে
কী, নভেল
করোনাভাইরাস সম্পর্কিত
কিছু প্রশ্নের
জবাব বিজ্ঞানীরা
বেশ দ্রুতই
দিতে পেরেছেন।
তবে বেশির
ভাগই এখনো
অমীমাংসিত থেকে
গেছে। অনেক
গবেষণা প্রতিবেদনই
অস্পষ্ট, অসম্পূর্ণ
ও অপ্রাসঙ্গিক।
তবে এ
কথা অনস্বীকার্য
যে বিশ্বজুড়ে
শত শত
কোটি মানুষের
জীবন ও
জীবিকার ওপর
এসব গবেষণার
প্রত্যেকটির দীর্ঘমেয়াদি
প্রভাব রয়েছে।
আমরা যারা
বৈজ্ঞানিক গবেষণায়
নিয়োজিত, তাদের
প্রায়ই আক্ষেপের
সুরে বলতে
শোনা যায়,
আমাদের গবেষণা
কর্মগুলো সমগোত্রীয়
কিছু গবেষক
ও শিক্ষাবিদ
ছাড়া অন্যদের
কাছে তেমন
সমাদৃত হয়
না। বলা
হয়, বিশ্বজুড়ে
যত বৈজ্ঞানিক
গবেষণাপত্র প্রকাশ
করা হয়,
তার প্রায়
অর্ধেকই কখনো
পড়া হয়
না। এছাড়া
একেকটি গবেষণা
ফলাফলের বাস্তব
প্রতিফলন দেখতে
গড়ে প্রায়
দেড় দশক
সময় লেগে
যায় বলেও
দাবি করা
হয়। এসব
দাবি কতটুকু
সত্যি, তা
নিয়ে সন্দেহের
অবকাশ রয়েছে।
তবে এ
কথা অনস্বীকার্য
যে এর
কিছুটাও সত্যি
হলে তা
অবশ্যই উদ্বেগের
বিষয়।
বর্তমান যুগে
বিজ্ঞানের যেকোনো
বিষয়ে জনসাধারণের
প্রতিক্রিয়ার প্রভাব
অনেক বেশি।
শেষ পর্যন্ত
তা বহুগুণ
বিবর্ধিত আকার
ধারণ করতে
পারে। ধরুন
কোনো গবেষণা
থেকে একটি
ফলাফল পাওয়া
গেল এবং
তা সরল
বিশ্বাসে প্রকাশও
করা হলো।
কিন্তু এরপর
দ্রুতই এ
ফলাফলকে নানামুখী
জ্ঞানতত্ত্বের জাঁতাকলে
পিষ্ট হতে
হবে এবং
এর ওপর
রাজনৈতিক রঙচঙ
মাখানো হবে।
অনেক ক্ষেত্রে
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা
বৈজ্ঞানিক অনিশ্চয়তাকে
হাতিয়ার হিসেবে
ব্যবহার করতেও
দ্বিধা করেন
না।
এ অবস্থায়
স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক
গবেষণা চালিয়ে
যাওয়াটাই বিপজ্জনক
একটি কাজ
হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আপনি যখনই
কোনো গবেষণা
প্রতিবেদন কোনো
পাবলিক ডোমেইনে
প্রকাশ করবেন,
তখন সেটি
সেখানেই থেকে
যাবে। এটি
ফিরিয়ে নেয়ার
কোনো পথ
নেই। এ
অবস্থায় আপনার
গবেষণা প্রতিবেদনটি
যদি চূড়ান্ত
না হয়,
তবে ধরে
নিন আপনি
চরম বিপদের
মধ্যে রয়েছেন।
কারণ যতক্ষণ
না কোনো
গবেষণাকর্ম আমাদের
প্রশ্নগুলোর সঠিক
জবাব দিতে
পারছে, ততক্ষণ
ত্রুটিপূর্ণ ধারণা,
অসম্পূর্ণ উপসংহার,
প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব
অথবা রাজনৈতিক
বশ্যতার মতো
অভিযোগের তীর
গবেষককে বিদ্ধ
করতে থাকবে।
গবেষণা প্রতিবেদনের
ক্ষেত্রে ভুল,
মিথ্যা অথবা
অতিরঞ্জিত অর্ধসত্য
তথ্য প্রকাশের
প্রবণতা নতুন
কোনো ঘটনা
নয়। তবে
দার্শনিক জেসন
হারসিনের মতে,
কভিড-১৯-সংক্রান্ত
‘পোস্ট-ট্রুথ
ইনফোডেমিক’ যতটা
ব্যাপক ও
বিদ্বেষপূর্ণ প্রভাব
ফেলেছে, তা
আগের কোনো
জনস্বাস্থ্য সংকটের
সময় দেখা
যায়নি। যারা
নিজেদের স্বার্থে
তথ্যকে হাতিয়ার
হিসেবে ব্যবহার
করতে চান,
তাদের জন্য
করোনাকালের এসব
বৈজ্ঞানিক ‘প্রিপ্রিন্ট’
যেন আকাশের
চাঁদ হাতে
পাওয়া।
কভিড-১৯
বিজ্ঞানের অনেক
কিছুই স্থায়ীভাবে
বদলে দিয়েছে।
মহামারীটি আমাদের
গবেষণা প্রক্রিয়ার
ভিত্তিটাকেই নাড়িয়ে
দিয়েছে। এখন
কেবল অনুসন্ধান
চালিয়ে যাওয়াটাই
গবেষণার মৌলিক
উদ্দেশ্য নয়।
এখন আমাদের
বারবার বিবেচনা
করে দেখতে
হয়, একটি
প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা
প্রতিবেদন কীভাবে
প্রকাশ হলো,
অথবা এর
ব্যাখ্যা কেমন
দেয়া হলো,
অথবা এটি
জনসাধারণের কতটা
কাছে পৌঁছতে
পারল। বলা
যায়, অদূরভবিষ্যতে
বিজ্ঞান অনেকটাই
জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া
দ্বারা প্রভাবিত
হবে।
তাহলে এ
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে
বিজ্ঞানচর্চার স্বরূপ
কেমন হবে?
সবার আগে
আমাদের আত্মপ্রতিক্রিয়াশীল
হতে হবে।
অর্থাৎ একজন
বিজ্ঞানী হিসেবে
আমার যে
পরিচিতি, সেই
অবস্থান থেকে
আমার দায়িত্ববোধ
সম্পর্কে সম্যক
ধারণা থাকতে
হবে। এছাড়া
জনস্বার্থের জন্য
কাজের ব্রত
নেয়া একজন
গবেষককে নৈতিকতা
ও মূল্যবোধ
সম্পর্কেও সচেতন
হতে হবে।
কারো সমালোচনা
ও ব্যক্তিগত
আক্রমণ থেকে
আমরা চলমান
রাজনৈতিক পরিবেশ
থেকে ধারণা
নিতে পারি
এবং সেই
ধারণা কাজে
লাগিয়ে গবেষণামূলক
জ্ঞান অর্জন
প্রক্রিয়াকে এসব
প্রভাব থেকে
মুক্ত রাখার
চেষ্টা করতে
পারি। আসলে
যেকোনো বিষয়ে
গবেষণা করতে
গেলে দুটি
বিষয় মাথায়
রাখতে হবে।
গবেষণায় সাফল্য
অর্জনের মূল
চাবিকাঠি দুটি
বিষয়—ভবিষ্যতে
বাস্তবতা কেমন
হতে পারে,
তার গতিপথ
নিরূপণ করা
এবং সেই
বাস্তবতা সম্পর্কে
কীভাবে জানা
যাবে, তার
উপায় খুঁজে
বের করা।
প্রকৃত অর্থে
বিজ্ঞানীদের ‘ডিকনস্ট্রাকশন’
বিষয়টির সঙ্গে
আত্মিক যোগাযোগ
তৈরি করতে
হবে। অর্থাৎ
সমালোচনাকে এড়িয়ে
নয়, বরং
সেগুলোকে বিবেচনায়
নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ
বিশ্লেষণ করতে
পারলে তবেই
সফল গবেষক
হিসেবে নিজেকে
তৈরি করা
সম্ভব।
কোনো গবেষণাকর্ম
প্রকাশ হলে
তার সমালোচনা
হবেই। সাম্প্রতিক
সময়ের গ্রেট
বেরিংটন ডিক্লারেশনই
তার প্রমাণ।
ম্যাসাচুসেটসের গ্রেট
বেরিংটনে অবস্থিত
আমেরিকান ইনস্টিটিউট
অব ইকোনমিক
রিসার্চের একদল
গবেষক এ
প্রস্তাবের নেপথ্য
কারিগর। করোনা
মহামারীর প্রভাব
সামাল দিতে
তারা গোষ্ঠীভিত্তিক
সুরক্ষাতত্ত্ব সামনে
আনেন। তারা
প্রস্তাব করেন,
যেসব জনগোষ্ঠী
মহামারীর কারণে
অতিমাত্রায় ভঙ্গুর
অবস্থায় রয়েছে,
কেবল তাদেরই
সুরক্ষাবলয়ের আওতায়
আনা হোক।
আর যারা
মহামারীর কারণে
ততটা সংবেদনশীল
অবস্থায় নেই,
তাদের কোনো
প্রকারের বিধিনিষেধ
ছাড়াই স্বাভাবিক
জীবনযাপন করতে
দেয়া হোক।
কিন্তু বাস্তবে
দেখা গেল
জনগণ এ
তত্ত্বের ভুল
ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
এমনকি মূলধারার
কিছু গবেষকও
তাত্ক্ষণিকভাবে এর
বিরোধিতা শুরু
করেন। অথচ
তত্ত্বটির কিন্তু
উদ্ভব হয়েছিল
বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার
মাধ্যমেই।
ট্রিশ গ্রিনহাল্জ: অক্সফোর্ড
ইউনিভার্সিটির নুফিল্ড
ডিপার্টমেন্ট অব
প্রাইমারি কেয়ার
হেলথ সায়েন্সেসের
অধ্যাপক
ভাষান্তর: মো. শরিফুল আলম





