৫০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অর্জন নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য একটা ভালো খবর। এর মূল কৃতিত্ব পোশাক খাতকেই দিতে হয়। তাছাড়া আরো যেসব পণ্য আছে তার মধ্যে আসবাবপত্রও একটা। এখন আসবাবপত্র খাতের উন্নয়ন হচ্ছে। খুব দ্রুত হচ্ছে তা না, মন্থরগতিতে ধারাবাহিকভাবে এগোচ্ছে। তবে এটার খুব বড় একটি সম্ভাবনা রয়েছে। এখন আমরা এ খাত নিয়ে সরকার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে কিছু ইস্যু নিয়ে কথা বলেছি। সেগুলো যদি সমাধান হয় তাহলে আমাদের রফতানি অনেক বাড়বে।
পোশাক খাতের কারখানাগুলো পুরোপুরি রফতানিমুখী। কিন্তু আসবাবপত্র পুরোপুরি রফতানিমুখী নয়। দেশেও আমাদের বাজার আছে। আমাদের অনেক কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এখন কাঁচামাল আমদানির যে খরচ, ভ্যাট, ট্যাক্স, কাস্টমস ডিউটি দিয়ে রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতা করা যায় না। দীর্ঘদিন আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছি। এখন যে টাকাটা আমরা কাস্টমস ডিউটি বাবদ দিয়ে আসি, তার ১৫ শতাংশ আমাদের ফেরত দেয় একটা প্রণোদনার মাধ্যমে। কিন্তু আমরা সরকারকে বিভিন্নভাবে হিসাব করে দেখিয়েছি। আমরা কাঁচামালের ওপর যে ডিউটিটা দিয়ে আসি, সেটা রফতানিতে যে প্রণোদনা পাচ্ছি তাতে পুরোপুরি উঠে আসে না। সেজন্য আমরা রফতানি বাজারে দামে অনেকভাবে বাধাগ্রস্ত হই। সরকারের একটা সিদ্ধান্ত আসছে, যারা স্থানীয় বাজার এবং রফতানি বাজারে পণ্য বিক্রি করে তাদের জন্য একটা বন্ড নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটা প্রক্রিয়াধীন।
এখন একজন ব্যবসায়ী দেখা গেল এক কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন করে। তিনি ২০ শতাংশ রফতানি করেন, বাকি ৮০ শতাংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। তিনি যখন কাঁচামাল আমদানি করেন, তখন মাস শেষে কত টাকা রফতানি হলো তার হিসাব দেবেন। যে টাকাটা রফতানি হলো তার কাস্টমস ডিউটিটা দিতে হবে না। স্থানীয় বাজারে যেটা বিক্রি হলো সেটার ডিউটিটা দিতে হবে। এমন হলে রফতানি বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতার জায়গাটা অনেক বাড়বে। এটা এখনো কার্যকর হয়নি, এটা নিয়ে হিসাবনিকাশ চলছে। সামনের দিকে আসবাবপত্র রফতানির অনেক বেশি সম্ভাবনা রয়েছে। পোশাক খাতে যেটা হয়, আমাদের অনেক দক্ষ শ্রমশক্তি আছে। আসবাবপত্রের ক্ষেত্রেও সেটি দরকার। এখন যদি কাঁচামাল আমদানির বিপরীতে কাস্টমস ডিউটিটা সমন্বয় করা যায় তাহলে আমরা অনেক দূর যেতে পারব।
এছাড়া আমাদের বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, লজিস্টিক খরচ কমাতে হবে। তেলের দাম বাড়ার কারণে গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলও বাড়বে, সেটি একটা বিষয়। এখন আমাদের অনেক কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। যখন পোশাক খাত শুরু হয়, তখন বোতামটাও আমদানি করতে হয়েছে। এখন কিন্তু অনেক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হয়েছে। আসবাবপত্র শিল্পও সেভাবেই এগিয়ে যাবে।
দেশের মোট রফতানি বৃদ্ধির জন্য আমাদের এখন আইটি পণ্য অনেক সম্ভাবনাময়। এ খাত অনেক এগোচ্ছে। এখন সুবিধা হচ্ছে শুধু পোশাক খাত নয়, যে যাই রফতানি করুক করহারটা একই। আসবাবপত্রের সম্ভাবনাও অনেক বেড়েছে। তাই অনেক বড় বড় কোম্পানি এ খাতে বিনিয়োগ নিয়ে আসছে।
এরই মধ্যে আসবাবপত্র রফতানিতে হাতিল শীর্ষস্থান অর্জন করেছে। দেখা যাচ্ছে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান আসবাবপত্র রফতানি করে। কিন্তু তাদের বেশির ভাগই নিজস্ব ব্র্যান্ডিংয়ে নয়, বিদেশী কোম্পানির জন্য তাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করে। সে জায়গা থেকে হাতিল পুরোপুরি নিজস্বতা ধরে রেখে ব্যবসা করছে। মানে বিদেশীরা বাংলাদেশী ব্র্যান্ড হাতিলের পণ্য কিনছে। এভাবেই আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করতে পারছি।
আমরা আট বছর আগে প্রথম আসবাবপত্র রফতানি করি। অস্ট্রেলিয়ায় এক প্রবাসী বাংলাদেশীর হাত ধরে বিক্রয়কেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয়। সে বছরই যুক্তরাষ্ট্রের আসবাবপত্রের একটি ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করে রফতানি শুরু হয়। পরের বছরই কানাডায় হয় বিক্রয়কেন্দ্র। ২০১৬ সালে ভুটান এবং ২০১৭ সালে নেপালে রফতানি শুরু হয়। ২০১৭ সালেই ফ্র্যাঞ্জাইজি মডেলে ব্র্যান্ড হিসেবে যাত্রা শুরু হয় হাতিলের। বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে রয়েছে ১৮টি বিক্রয়কেন্দ্র।
আমরা মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করি। আমাদের মার্কিন ক্রেতার পণ্যগুলো একটু দামি পণ্য। সেখানে উনি সোফা নেন আমাদের কাছ থেকে। সোফার কাপড়টা উনি আমাদের দেন। সেটি কাস্টমস ডিউটি দিয়ে আবার রফতানি করতে গেলে খরচে পোষায় না। তাই করোনার পর থেকে এটা বন্ধ হয়ে আছে। আমাদের এই বাধাগুলো দূর হয়ে গেলে রফতানির পরিমাণ আরো বাড়বে।
এ ধরনের পণ্যগুলো অনেকটা শ্রমিকনির্ভর। চীনে শ্রমিকের ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ায় তারা হাইটেকের দিকে চলে যাচ্ছে। তাই এসব খাতে সম্ভাবনাটা আমাদের মতো দেশগুলোরই। এখন এসব পণ্যের জন্য বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাছাড়া মার্কিন-চীন স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে একটা পরিবর্তন এসেছে। তারাও দ্বিতীয়, তৃতীয় গন্তব্য খুঁজছে। আমাদের জন্য এটা একটা ভালো সুযোগ, যদি আমরা সেভাবে কাজে লাগাতে পারি।
হাতিলের বার্ষিক আড়াই বিলিয়ন ডলারের মতো রফতানি হয়। এখন আমরা আরো সাহসী হচ্ছি। বর্তমান সরকার পদ্মা সেতু করল। এটা আমাদের পক্ষে যে সম্ভব সেটা আমরা দেখলাম। আমাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিলে আর নীতিটা যদি ঠিক থাকে, আমরা পারব, সেই সক্ষমতা আমরা রাখি।





