রফতানিতে ৫০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করায় দেশের রফতানিকারকদের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের অভিনন্দন। এ অর্জন উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী সমিতি ও নীতিনির্ধারকদের আন্তরিক প্রচেষ্টার সর্বোচ্চ ফলাফল এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের প্রতি তাদের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
এ মাইলফলক অর্জনে প্রমাণিত হয় যে আমাদের পণ্যগুলো বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম। এ প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে আংশিক ভূমিকা রেখেছে উৎপাদন ও পরিবহনের ঊর্ধ্বমুখী ব্যয়। ভবিষ্যতে পণ্যের দাম স্বাভাবিক হলে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে রফতানি আরো বাড়াতে হবে। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখিতার প্রভাবে এরই মধ্যে ক্রয়াদেশের পরিমাণ কমে গেছে। ফলে আগামী ছয় মাস চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হবে সংশ্লিষ্টদের। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পাশাপাশি ক্রয়াদেশ পাওয়া এবং তা বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা রয়েছে রফতানিকারকদের, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতারই প্রমাণ দেয়।
সামগ্রিক দিক বিবেচনায় কভিড-১৯ সৃষ্ট নতুন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এ সত্ত্বেও উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী চেতনা ও এগিয়ে যাওয়ার একাগ্রতাকে স্বাগত জানাই। ২০২৪ সালের মধ্যে ৮০ বিলিয়ন ডলার রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্যটি উচ্চাভিলাষী হলেও স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য রফতানিবান্ধব আর্থিক নীতি ও বিনিয়োগবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে তা অর্জন সম্ভব। লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া পণ্যের বহুমুখীকরণ, মূল্য সংযোজন ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের দিকেও বিশেষ মনোনিবেশ করা উচিত।
রফতানি বৈচিত্র্যকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পের মতো সব রফতানিমুখী কারখানার জন্য ১২ শতাংশ অভিন্ন করপোরেট করহার বাস্তবায়ন একটি সঠিক পদক্ষেপ হতে পারে। আরো ব্যাপকভাবে বলতে গেলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনায় বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন স্থিতিশীল আর্থিক নীতি। এসব বিনিয়োগের ফলে কেবল কর্মসংস্থান ও রফতানির সম্ভাবনাই সৃষ্টি হবে না, সেই সঙ্গে জ্ঞান ও দক্ষতা স্থানান্তরের সুযোগও সৃষ্টি হবে, যা মূলত ভবিষ্যতের রফতানি সক্ষমতারই সহায়ক।
রফতানি খাতের অন্যতম চালকের আসন ধরে রাখবে আরএমজি। এরই মধ্যে আইসিটি, হালকা প্রকৌশল, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার, চামড়া ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশের রফতানি খাত এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করেছে, এখন সময় এসেছে বিশ্বদরবারে নিজেদের সক্ষমতার কথা জানান দেয়ার। রফতানি পণ্যের সমাহার ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্যকে আরো উৎসাহিত করতে অপ্রথাগত বাজারের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা দেয়া যেতে পারে, যা আরএমজি ও নন-আরএমজি রফতানিকারকদের পথ আরো প্রশস্ত করবে। সব বিমানবন্দরে আধুনিক ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত কোল্ড স্টোরেজ সুবিধাসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাদ্য ও কৃষিপণ্যের রফতানি সক্ষমতার উল্লেখযোগ্য বিস্তার ঘটাতে পারে।
অনেক দেশ টার্ন-অ্যারাউন্ড-টাইম কমাতে উন্নত লজিস্টিক ব্যবহার করে। আর বর্তমানে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের মধ্যে আমাদের টার্ন-অ্যারাউন্ড-টাইম সবচেয়ে বেশি, যা আমাদের রফতানির উচ্চাকাঙ্ক্ষা অর্জনে একটি বাধা। পাশাপাশি আমাদের বন্দর ব্যবস্থার উন্নতির জন্য বন্দরের ধারণক্ষমতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বন্দরের ভেতরে ও বাইরে দক্ষতার সঙ্গে পণ্য স্থানান্তর করার জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটালাইজড কাস্টমস ক্লিয়ারিং পোর্ট চার্জ দক্ষতাকে ত্বরান্বিত করবে এবং লজিস্টিক সেক্টরে স্বচ্ছতা আনবে। বন্দর সক্ষমতা বাড়ানো বিশেষভাবে প্রয়োজন। কারণ নিকট বন্দর ব্যবহার এখন গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিযোগিতায় থাকতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
আরএমজি খাতের টেকসইযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং এ ব্যবসায়িক মানসিকতা অন্যান্য খাতে ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে টেকসই অনুশীলন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের অংশীদার গ্লোবাল ব্র্যান্ড ও বিনিয়োগকারীদের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি বাড়ানোর জন্যও এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এক্ষেত্রে কঠোরভাবে বৈশ্বিক মানদণ্ড মেনে চলতে হয়। সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (সিইটিপি) উন্নত করার জন্য বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত, যাতে উৎপাদনকারীরা বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক চামড়া রফতানিকারক হয়ে উঠতে পারেন।
বাংলাদেশের ৫০ বিলিয়ন ডলারের রফতানির এ যাত্রা অবিস্মরণীয়। এটি অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে কৌশলগত উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেবে। ২০২৪ সালের মধ্যে ৮০ বিলিয়ন ডলারের রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই পণ্যের বৈচিত্র্য, মূল্য সংযোজন ও নতুন বৈচিত্র্যের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।





