ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একমাত্র নিশ্চিত বিষয় হলো অনিশ্চয়তা। কথাটি বাণিজ্যের ভবিষ্যতের ক্ষেত্রেও সত্য।

বারবার আগাম সতর্কতা জারি করার পরও কভিড-১৯ বিশ্বকে বিস্মিত করেছে। বাণিজ্যের ওপর এটি খুব দ্রুত ও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। ২০২০ সালের দ্বিতীয় চতুর্ভাগে (এপ্রিল-জুন) যখন বিশ্বের বেশির ভাগ অঞ্চল লকডাউনে ছিল তখন বিশ্বের পণ্য বাণিজ্যের হার ১৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল। যুদ্ধ ব্যতীত এ ধরনের পতন লক্ষিত হয় না।

সে সময় খুব কম মানুষই হয়তো ধারণা করেছিল যে এক বছর পর ২০২১ সালের প্রথম তিন মাসে বাণিজ্যের পরিমাণ মহামারী-পূর্ববর্তী সময়কে ছাড়িয়ে নতুন সাধারণত লক্ষ্য করা যায় না। সরকারগুলো সুরক্ষাবাদী বাণিজ্য নীতি গ্রহণ না করে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বৃহৎ পরিসরে বিনিয়োগ করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। ২০২১ সালের অক্টোবরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ধারণা দিয়েছে, বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য পূর্ববর্তী ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৮ শতাংশে ঠেকবে এবং ২০২২ সালে তা ৪ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়বে।

পরবর্তী বৈশ্বিক সংকট আসলে কী হবে, নীতিনির্ধারকদের পক্ষে তা জানা সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক, জলবায়ু সম্পর্কিত কিংবা সাইবার আক্রমণ, আরেকটি মহামারী বা অন্য কিছুর মাধ্যমে তা হতে পারে। কিন্তু অতীত যদি পথপ্রদর্শক হয়, আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা যেকোনো সংকট মোকাবেলায় সহায়তা করবে।

উদাহরণস্বরূপ মহামারীর সময়ে বাণিজ্য এক ধরনের ইতিবাচক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। প্রাথমিক বাধা, চলমান কিছু কিছু রফতানি নিষেধাজ্ঞা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা বাদ দিলে খাদ্য এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাণিজ্য এক ধরনের সুযোগ তৈরি করেছে। ২০২০ সালে যদিও সার্বিকভাবে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য ৭ দশমিক ৪ শতাংশ হারে কমেছে, চিকিৎসা পণ্যের ক্ষেত্রে বাণিজ্য বেড়েছে ১৬ শতাংশ—ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবসা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে—যেখানে কৃষি বাণিজ্য স্থিতিশীল ছিল। সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত প্রয়োজনীয় পণ্যগুলো প্রেরণ করা সহজ হয়েছিল। এর মাধ্যমে আগের দুর্মূল্য ফেস মাস্কগুলো সহজলভ্য হয় এবং তা প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। খুব সহজ উপায়ে বাণিজ্য জীবন বাঁচিয়েছে।

যেহেতু বিজ্ঞানীরা রেকর্ড পরিমাণ স্বল্প সময়ে কার্যকর কভিড-১৯ ভ্যাকসিন তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন, সে কারণে বহুদেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থাগুলোকে একত্রে এগিয়ে এসে বৃহদাকার উৎপাদনে বিশেষায়িত পণ্যের জোগান ও কাঁচামাল নিশ্চিত করতে হবে। ফাইজার বায়োএনটেক ও মডার্নার কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে ১৯টি দেশ যুক্ত। অন্যদিকে অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও জনসন অ্যান্ড জনসনের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি যথাক্রমে ১৫ ও ১২। প্রয়োজনের চেয়ে ভ্যাকসিন উৎপাদনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কম, বিশেষত নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে। মুক্ত বাণিজ্য ছাড়া এই কোটি কোটি ডোজ টিকা বিতরণ কী করে সম্ভব হতো তা কল্পনা করাও কঠিন।

মহামারীর মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পক্ষ থেকে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এনজিও, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রেখে ভ্যাকসিন উৎপাদন ঠিক রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অবশেষে বৈশ্বিক ভ্যাকসিন উৎপাদন ও সরবরাহে বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে ভ্যাকসিন উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে স্থিতিস্থাপক ও ন্যায়সংগত করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে মহামারী মোকাবেলা পর্যন্ত নানা ধরনের বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় বাণিজ্য বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পক্ষ থেকে তাদের উদ্দেশ্য—জীবনমানের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও স্থিতিশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করা—বাস্তবায়ন করতে হলে এর নীতি পরিবর্তন করতে হবে। বর্তমান সময়ের সঙ্গে মিল রেখে বাস্তবতা ও সমাজের প্রয়োজন অনুসারে নীতি হালনাগাদ করতে হবে।

বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ

তিনটি বিষয় বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে বলে প্রতীয়মান হয়। প্রথমত, মহামারী আমাদের বুঝিয়েছে, সেবা ও ডিজিটাল অর্থনীতি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এমনকি কভিড-১৯ সংকটের আগেই সেবাবিষয়ক বাণিজ্য—অনেকটাই ডিজিটাল মাধ্যমে—পণ্য বাণিজ্যের তুলনায় দ্রুত বিকাশমান ছিল। ২০১০-১৯ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক সেবা রফতানির পরিমাণ ৫৭ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে পণ্য রফতানির পরিমাণ বেড়েছে ২৫ শতাংশ।

মহামারীর শুরু থেকে ক্ষুদ্র, ছোট এমনকি অনেক মধ্যম মানের প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার ক্ষেত্রেও ই-কমার্স সঞ্জীবনী হয়ে এসেছে। সবাই জানে, অ্যামাজন ও চীনের আলিবাবা কীভাবে এ সময়ে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। কিন্তু আফ্রিকার জুমিয়ার মতো ই-কমার্স প্লাটফর্মও বিকশিত হয়েছে। ২০১৯ ও ২০২০ সালের প্রথমার্ধে মহাদেশভিত্তিক পারিশ্রমিক প্রদানের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে।

কিন্তু বাণিজ্য ও উদ্ভাবনকে পরবর্তী ধাপে নেয়ার জন্য আরো অনেক কিছু করা সম্ভব এবং করা উচিত। ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার মাধ্যমে সব ধরনের মানুষকে ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় আনা যায়। সেবা ও ডিজিটাল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন ধারার ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা ও নিয়ন্ত্রণ খরচ কমানো সম্ভব। এর মাধ্যমে সব ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। বহুপক্ষীয় আলোচনা ও দরকষাকষির মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ই-কমার্স ও ঘরোয়া নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে চলার পাশাপাশি সম্ভাব্য ধারায় নতুন কার্যক্রম শুরু করবে।

দ্বিতীয়ত, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে সমুদ্র ও জলবায়ু পরিবর্তনের স্থিতিস্থাপকতার মতো বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবেলা করতে বাণিজ্য ভালোভাবে চলতে হবে। আগামী দিনের উৎপাদনকারী ও ক্রেতা—তরুণ প্রজন্ম এ বিষয়ে জোর দেয়।

অনেক সরকারের তরফ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিজ্ঞা করা হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বাণিজ্যের সুযোগ বাড়িয়ে এ লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি ও ইউরোপিয়ান কমিশন মনে করে, এ শতাব্দীর মধ্যভাগে নিট শূন্য কার্বন নিঃসরণ নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক জিডিপির ৪ দশমিক ৫ শতাংশ খরচ হবে। গ্রিন টেকনোলজিতে বিনিয়োগ দ্রুত বৃদ্ধির মাধ্যমে সরবরাহস্বল্পতা ও বাধা দূর করা যাবে। কিন্তু মুক্ত ও সম্ভাব্য বাণিজ্যের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ রোধকল্পে হওয়া খরচ কমিয়ে দিতে সাহায্য করবে।

বিশেষত পরিবেশগত পণ্য ও সেবাবিষয়ক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কার্বন নিরপেক্ষতার খরচ কমানো যেতে পারে। বৈশ্বিক রাজনীতির নীতিগত কারণে ২০১৬ সালে এ রকম একটি পরিকল্পনা সরিয়ে রাখা হয়। এখন আমাদের পুনরায় চেষ্টা করা প্রয়োজন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো কার্বনের মূল্য নির্ধারণে খণ্ডিত চেষ্টার বিষয়টি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। জাতীয়, উপজাতীয় ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে কার্বনের মূল্য নির্ধারণে বিশ্বব্যাংক ৬৪টি উপাদান খুঁজে পেয়েছে এবং আরো তিনটি তালিকায় আছে। টনপ্রতি ৬ ডলার থেকে ৯১৮ ডলার পর্যন্ত ব্যয় হয়। এক্ষত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্দিষ্ট কিছু সাধারণ নিয়মের অধীন বাণিজ্যে ব্যবহূত পণ্যে থাকা কার্বন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

পরিশেষে সব দেশের ক্ষেত্রেই অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্য আরো অনেক কিছু অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর মানে বাণিজ্যের সুবিধায় তুলনামূলক পিছিয়ে পড়া অর্থনীতিকে যুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে ধনী দেশগুলোর দরিদ্র মানুষকে এগিয়ে রাখতে হবে, যারা কিনা মহামারীর ৩০ বছর আগে থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিল। উৎপাদন খরচ, ঝুঁকি কমানো ও ক্রেতাদের আরো কাছে পৌঁছার উদ্দেশ্যে ফার্মগুলো বর্তমানে ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, তুরস্ক, বাংলাদেশ ও ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলোয় কাজ করছে। এ ‘পুনর্বিশ্বায়ন’ প্রক্রিয়া বিস্তৃত করে আমাদের আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় নিয়ে যেতে হবে।

সব দেশের মানুষ ও ফার্মের জন্য সুযোগ বাড়িয়ে—বিশেষত নারী ও ছোট ব্যবসায়ীদের বৈশ্বিক সরবরাহ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বাণিজ্য কিংবা প্রযুক্তি যে মাধ্যমেই হোক না কেন, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের লাভবান হওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক ব্যবস্থা, শিক্ষা ও গৃহীত অভ্যন্তরীণ নীতির বিশেষ ভূমিকা থাকে।

ভবিষ্যতের গর্ভে যা-ই থাকুক না কেন তা মোকাবেলার ক্ষেত্রে বাণিজ্য আমাদের সহায়তা করতে পারে। কিন্তু এজন্য আমাদের এমন বাণিজ্য নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা মানুষকে সহায়তা করে। অন্যথায় আরো অনেক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে, যা কিনা অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে কোনো সুযোগই তৈরি করে না। মানুষকেন্দ্রিক বাণিজ্য তৈরির ক্ষেত্রে পুনর্গঠিত ও নতুন উদ্যমে শুরু হওয়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা সর্বাধিক ভূমিকা রাখতে পারে।

এনগোজি ওকোনজো-আইওয়েলা: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালক, নাইজেরিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির