আবারো আমরা
ফলাফলের জন্য
অপেক্ষমাণ। ভয়
হচ্ছে এটা
ভেবে যে
আমাদের প্রিয়জন
বা আদরের
সন্তানটি হয়তো
স্কুলে গিয়ে
আক্রান্ত হলো।
কভিড টেস্টের
ফলটি আজ
রাতের মধ্যেই
আসার কথা।
কিন্তু কে
জানে এতক্ষণে
তা প্রস্তুত
হয়েছে কিনা?
হতে পারে
এরই মধ্যে
অনলাইনে তুলেও
দেয়া হয়েছে।
কিন্তু স্ক্রিন
রিফ্রেশ হতে
এতটা সময়
লাগছে কেন?
দেরি হচ্ছে!
তার মানে
কি আমাদেরর
জন্য কোনো
অশুভ সংবাদ
অপেক্ষা করছে?
কিংবা বিষয়টি
কি এমন
যে খবরটি
দেয়ার আগে
তারা আমাদের
প্রস্তুত হওয়ার
জন্য খানিকটা
সময় দিচ্ছে?
না, এখনো
কোনো উন্নতি
নেই। আচ্ছা,
স্ক্রিন কীভাবে
রিফ্রেশ করতে
হয়?
চার্লি চ্যাপলিনের
বিখ্যাত ‘মডার্ন
টাইমস’ ছবিতে
আধুনিকতাকে সংজ্ঞায়িত
করা হয়েছে
গতিশীলতার মাধ্যমে।
যন্ত্র মানুষের
জীবনকে গতিময়
করে তোলে,
দ্রুত কাজ
চালানো যায়।
কিন্তু যন্ত্রের
গতিময়তা একই
সঙ্গে মানুষের
স্বাভাবিকতা বিষয়গুলোকেও
কেড়ে নেয়।
তবে যন্ত্র
নয়, মূলত
আমরা মানুষেরাই
নিজেদের জীবনকে
রূপ দিয়েছি
যান্ত্রিকতায়। আমরা
নিজেদের সময়গুলো
নিয়মে বেঁধে
ফেলেছি। যেমন
সাড়ে ১২টার
মধ্যে মধ্যাহ্নের
খাবার শেষ
করতে হবে,
৩টায় কফি
আর ৫টার
মধ্যে ঘরে
ফেরা। ছুটির
দিনগুলোয় নির্দিষ্ট
কেনাকাটা, বিকালে
খেলতে যাওয়া,
আগামী স্কুল
ছুটিতে কিংবা
বার্ষিক ছুটিতে
পরিবারের সঙ্গে
সময় কাটানো।
এমন সব
ছকে বাঁধা
জীবন আমাদের।
কিন্তু আমরা
যদি অতীতের
দিকে তাকাই
তখন দেখতে
পাই যে
আগের সময়গুলোয়
এত গতিময়তা,
তাড়াহুড়ো ছিল
না। সময়গুলো
ধীরগতিতে প্রবাহিত
হতো। কারণ
সেখানে সবসময়
অপেক্ষা থাকত;
ফসল বাঁচাতে
বৃষ্টির অপেক্ষা,
যুদ্ধ শেষ
হওয়ার অপেক্ষা,
বীজ বপনের
পর তা
অঙ্কুরোদ্গমের অপেক্ষা,
কীট-পতঙ্গ
হ্রাসের অপেক্ষা।
অপেক্ষা প্রায়ই
কোনো না
কোনো সুযোগ
নিয়ে আসে,
কখনো তা
ভালো হয়,
কখনোবা নেতিবাচক।
ফোনকলটি সম্ভবত
আসবে, কিংবা
চিঠিটি আসতে
হয়তো দেরি
হবে, কিংবা
ঝড়টি হয়তো
ঠিক এমন
সময় উঠবে
যে পরীক্ষা
বাতিল করতে
হবে। রিপোর্টে
হয়তো ভালো
সংবাদই আসছে।
কিন্তু যতক্ষণ
পর্যন্ত না
আমরা তা
জানছি, আমাদের
হূত্স্পন্দন বাড়তেই
থাকে, আমরা
দ্রুত নিঃশ্বাস
নিতে থাকি
আর আমাদের
মনটা উদ্বিগ্ন
হয়ে একের
পর এক
এটা-ওটা
ভাবতে থাকে।
অপেক্ষা মানে
তীব্র উদ্বিগ্নতা।
সর্বোপরি ২০২১
ছিল ফলাফলের
জন্য অপেক্ষার
একটি বছর।
যার জন্য
আমরা মোটেও
প্রস্তুত ছিলাম
না, কভিড
এসেছে অপ্রত্যাশিতভাবে
এবং আমাদের
একটি ঘোরের
মধ্যে রেখেছে।
দুপুরে আমরা
যাকে নিয়ে
একসঙ্গে খাবার
খেয়েছি, পরদিন
আমাদের সে
বন্ধুটির কভিড
ধরা পড়েছে।
যদিও আমাদের
সে বন্ধুটি
অনেক বেশি
সতর্ক ছিল,
সবসময় বাড়তি
সুরক্ষা মেনে
চলেছে। খবরটি
শোনার পর
আমরাও নিজেদের
নিয়ে উদ্বিগ্ন
হয়ে পড়েছি।
কারণ আমরা
তার সংস্পর্শে
এসেছিলাম। যদিও
আমরা সবসময়
কেএন৯৫ মাস্ক
পরে ছিলাম
এবং করোনার
টিকাও নিয়েছি।
তবু আমাদের
পিসিআর টেস্টের
মধ্য দিয়ে
যেতে হয়েছে।
বারবার পরীক্ষা
করে আমরা
নিশ্চিত হতে
চেয়েছি। কখনো
শুভ সংবাদ
পেয়েছি, কখনো
দুঃসংবাদ। আবার
কখনো আমরা
বুঝে উঠতে
পারিনি যে
আমাদের আসলে
কী করা
উচিত। যেমন
কিছুদিন পরপর
করোনা টেস্ট
করে দেখা
যে আমরা
বর্তমানে সুস্থ
আছি, কিংবা
এটা জানা
যে আমাদের
শরীরে ভাইরাসটি
প্রবেশ করেছে,
কিন্তু আমরা
তা টের
পাইনি। কারণ
ভাইরাসটি আমাদের
খুব বেশি
আক্রান্ত করতে
পারেনি।
ভারতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে মুহূর্তে শ্বাসরুদ্ধকর পর্যায়ে পৌঁছে। পরিস্থিতি সামলাতে হাসপাতালগুলো হিমশিম খেতে শুরু করে। হাজারো পরিবার তাদের আক্রান্ত সদস্যের জন্য হাসপাতালের একটি শয্যার ব্যবস্থা করা ও অক্সিজেন সিলিন্ডারের জন্য অপেক্ষা করেছে। অপেক্ষা করতে করতেই অনেকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। অপেক্ষার শেষ তবু হয়নি। এরপর তাদের কবরস্থ করা কিংবা শ্মশানের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে।
বছরজুড়ে অন্য
অনেক অপেক্ষার
মধ্য দিয়ে
সময় কেটেছে
সবার। প্রেসিডেন্ট
ডোনাল্ড ট্রাম্প
যেদিন হোয়াইট
হাউজে বসলেন
তখন আমাদের
মতো বিশ্বের
অনেক মানুষেরও
নতুন একটি
অপেক্ষা শুরু
হয়। সে
অপেক্ষা চলতে
থাকে। বাইডেন
যখন প্রেসিডেন্ট
নির্বাচনের জন্য
কংগ্রেসের মনোনয়ন
পান তারপর
শুরু হয়
নির্বাচনের ফলাফলের
জন্য অপেক্ষা।
কিছুক্ষণ পরপর
তাকে ঘিরে
নতুন নতুন
খবর আসতে
থাকে। উইন্সকনসিনে
কি ডেমোক্র্যাটরা
সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে?
জর্জিয়ায় কি
রিপাবলিকানরা জিতে
যাবে? সিনেট
কোন দলের
নিয়ন্ত্রণে থাকছে?
নর্থ ক্যারোলাইনার
ফল আসতে
এত দেরি
হচ্ছে কেন?
সব মিলিয়ে
অতীতের যেকোনো
সময়ের তুলনায়
মিডিয়ার অনেক
বেশি পাগলামো
প্রত্যক্ষ করেছি
আমরা। তবু
অপেক্ষার শেষ
হয় না
যেন। জর্জিয়া
ঘিরে শুরু
হয় নতুন
অপেক্ষা। ১
শতাংশেরও কম
ভোটের ব্যবধানে
ট্রাম্পকে টপকে
বাইডেন জয়ী
হন জর্জিয়ায়।
ট্রাম্প ও
তার সমর্থকরা
নির্বাচনের এ
ফল মেনে
নেয় না।
আমেরিকার কংগ্রেসের
ক্যাপিটাল বিল্ডিংয়ে
হামলা চালায়
ট্রাম্প সমর্থকরা।
অপেক্ষা শেষ
হয় জো
বাইডেনের শপথ
গ্রহণের মাধ্যমে।
কভিড-১৯-এর
শুরুতে ট্রাম্প
যখন ওয়াইট
হাউজের বাসিন্দা
ছিলেন তখন
ভাইরাসটিকে তিনি
খুব একটা
গুরুত্ব দেননি।
কভিডের শুরুতে
আমরা সবাই
বিষয়টি ঘিরে
হতবুদ্ধ ছিলাম।
একটা পর্যায়ে
আমাদের মনে
হয়েছিল, সবকিছু
ঠিক হয়ে
যাবে। কিন্তু
তেমনটা হয়নি।
বরং দিনকে
দিন পরিস্থিতি
ভয়াবহ আকার
ধারণ করেছে।
এরপর আমরা
নতুন নতুন
উপসর্গ সম্পর্কে
জেনেছি—শরীরে
অক্সিজেনের মাত্রা
কমে যাওয়া,
জ্বর, কাশি।
প্রতিদিন নতুন
নতুন খবর।
আমরা তখনো
বুঝে উঠতে
পারিনি যে
আমাদের প্রতিক্রিয়া
কী হওয়া
উচিত কিংবা
আমাদের ঠিক
কী করা
উচিত। আমরা
শুধু হতবুদ্ধি
হয়ে ভেবেছি
যে রোগীর
অবস্থা খারাপ
হচ্ছে না।
তার মানে
তিনি সুস্থ
হতে চলেছেন?
নাকি বিষয়টি
খারাপ যে
তিনি সুস্থ
হয়ে উঠছেন
না। এভাবে
আমরা আমাদের
প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত
করতে গিয়ে
বারবার দ্বিধান্বিত
হয়ে পড়েছি।
গত শিক্ষাবর্ষে
আমরা ফ্রান্সে
ছিলাম। ফরাসি
সরকারের অ্যান্টি-কভিড
অ্যাপের মাধ্যমে
প্রতিদিন সকালে
নতুন আক্রান্তের
সংখ্যাটা আমাদের
মুঠোফোনে ভেসে
উঠত, যা
দেখে আমরা
দ্বিধান্বিত হয়ে
পড়তাম। আমরা
বুঝে উঠতে
পারতাম না
যে ২০
হাজার সংখ্যাটা
কম, নাকি
বেশি? এটা
কি স্বস্তিকর,
নাকি না?
কিংবা সরকার
সংখ্যাটি দেখে
বিভিন্ন পদক্ষেপ
নিতে তোড়জোড়
শুরু করবে,
নাকি ২০
হাজার সংখ্যাটি
তাদের কাছে
তেমন গুরুত্ব
পাবে না?
অপ্রত্যাশিতভাবে অন্যান্য
ফল অবশ্য
খানিকটা দ্রুত
এসেছে। টিকার
প্রথম ট্রায়ালের
চমত্কার খবরটি
যেমন দ্রুত
পেয়েছি আমরা।
করোনার বিরুদ্ধে
টিকাগুলো কতটা
কার্যকর ও
প্রতিরোধ গড়ে
তুলতে সমর্থ—
তা নিয়ে
আমাদের আলাপচারিতা
শেষ হতে
না হতেই
ইতিবাচক ফলগুলো
আমাদের সামনে
হাজির, যা
সুখবর হয়ে
এসেছে। আমরা
যতটা না
আশা করেছি,
টিকাগুলো ভাইরাসটির
বিরুদ্ধে তার
চেয়ে অনেক
বেশি কার্যকর
হয়েছে। যদিও
ভাইরাসটি মিউটেশনের
মাধ্যমে এর
ধরন বদলে
ফেলায় ভ্যাকসিনের
কার্যকারিতা কমার
শঙ্কা রয়েছে।
তবে এখনো
নতুন অনেক
কিছু জানার
অপেক্ষা জারি
রয়েছে আমাদের।
কভিড-১৯-এর
টিকা আমাদের
আশার জোগান
দেয়, অপেক্ষা
করতে উৎসাহিত
করে। যদিও
বিশ্বের বেশির
ভাগ মানুষ
এখনো ভাবছে
যে ঠিক
কবে নাগাদ
তারা টিকা
পেতে সমর্থ
হবে। কেননা
বিশ্বনেতারা এখনো
সর্বজনীন টিকা
প্রদান কর্মসূচির
গুরুত্ব উপলব্ধি
করা নিয়ে
বাকবিতণ্ডায় মত্ত।
এরই মধ্যে
যারা টিকা
পেয়েছে তারা
সৌভাগ্যবান। তবে
কভিডের নতুন
ধরন থেকে
তারা কতটা
সুরক্ষিত তা
নিয়ে তৈরি
হয়েছে নতুন
প্রশ্ন। ভবিষ্যতে
আমরা যখন
মহামারীর ফেলে
যাওয়া ক্ষতগুলোর
দিকে ফিরে
তাকাব তখন
আমরা কী
দেখব। একা
থাকার যন্ত্রণা,
নাকি প্রতিদিন
সবার সঙ্গে
যোগাযোগের আনন্দ?
তাই আমাদের
সম্ভবত ফিকে
হয়ে যাওয়া
স্মৃতিগুলোকে সতেজ
করার জন্য
নতুন সংহতির
দিকে পা
বাড়ানোর সময়
এসেছে। যার
লক্ষ্য অদ্ভুত
একাকিত্ববরণের বিপরীতে
সর্বজনীনতাকে উপভোগ
করা, পৃথিবীর
প্রতিটি কোনায়
একত্রিত হয়ে
বাঁচার আনন্দকে
ফিরিয়ে আনা।
এ উদ্যোগের
মাধ্যমে আমরা
সম্ভবত আমাদের
সময়ের সবচেয়ে
বড় উদ্বেগকে
কাটিয়ে উঠতে
সমর্থ হব।
এছাড়া আরো
কিছু বিষয়
রয়েছে। গত
গ্রীষ্মে পৃথিবী
নামক আমাদের
এ গ্রহটি
আক্ষরিক অর্থেই
উত্তপ্ত হয়ে
উঠেছিল। ফলে
আগেভাগেই সাইক্লোন
শুরু হয়।
পৃথিবী উত্তপ্ত
হচ্ছে এবং
ক্রমেই আরো
বেশি উত্তপ্ত
হতে থাকবে।
পৃথিবীর উষ্ণ
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোয়
জীবনধারণ ক্রমেই
কঠিন হয়ে
উঠেছে। আমরা
এখন বিশ্বকে
সমন্বিত উদ্যোগ
গ্রহণ করতে
দেখার অপেক্ষায়
রয়েছি। জলবায়ু
পরিবর্তনের বিষয়টিকে
গুরুত্ব দিয়ে
কার্যকর পদক্ষেপ
নেয়া হচ্ছে—আমরা
এটি শোনার
জন্য অপেক্ষা
করছি। যথেষ্ট
সময় চলে
গেছে। ‘আর
না’ কথাটি
বলা এখন
সবচেয়ে জরুরি।
আমাদের উপলব্ধি
করতে হবে
যে অপচয়
করার মতো
বিন্দুমাত্র সময়
আর কারো
হাতে নেই।
আমাদের নেতাদের
তাই কথা
নয়, কাজে
নামতে হবে।
অভিজিৎ ব্যানার্জি: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ
অর্থনীতির
অধ্যাপক, ম্যাসাচুসেটস
ইনস্টিটিউট অব
টেকনোলজি (এমআইটি)
শাইয়ান অলিভিয়ার: শিল্পী
ও চিত্রকর
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস





