কাঠ-কয়লার সনাতনী চুলা ব্যবহারে বাড়ছে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা। বাড়ছে গ্রামীণ নারী ও শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি। তাই রান্নার সময়, স্বাস্থ্যঝুঁকি, জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উন্নত চুলা বা ইমপ্রুভড কুক স্টোভস (আইসিএস) নিয়ে এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)। এ বিষয়ে ‘শতভাগ ক্লিন কুকিং লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ: ইডকল উন্নত চুলা কর্মসূচি’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক ১২ ডিসেম্বর ২০২৩ যৌথভাবে আয়োজন করে ইডকল ও বণিক বার্তা। আলোচকদের সে বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে এ ক্রোড়পত্রে তুলে ধরা হলো
আলমগীর মোরসেদ
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
ইডকল
আইসিএস (উন্নত চুলা কর্মসূচি) প্রোগ্রামে রান্নার চুলায় বিনিয়োগ মাত্র ২-৩ ডলার। এই ২-৩ ডলারের ভূমিকা কী? দেখা গেল, এই ২-৩ ডলারের বিনিয়োগে সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ছোট জিনিস দিয়ে অনেক বড় কিছু অর্জন করা যায়। সারা দেশের গ্রাহকদের কাছে আমরা প্রায় ৪০ লাখ চুলা পৌঁছে দিতে পেরেছি। এর জন্য বিশ্বব্যাংকসহ আমাদের অংশীদারদের ধন্যবাদ জানাই। বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ ক্লিন কুকিং। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত আরো প্রায় আড়াই কোটি গ্রাহকের কাছে ক্লিন কুকিং পৌঁছাতে হবে। আমরা শিগগিরই মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার প্রত্যাশা করি। আমরা এখন উন্নত চুলার পাশাপাশি ই-কুকিং (ইলেকট্রনিক চুলা) নিয়েও কাজ করব। অনেকগুলো অংশীদারের সঙ্গে আমাদের কাজটি করতে হবে। আমাদের পরিবর্তনের এ যাত্রা চমৎকারভাবে শুরু হয়েছে। ই-কুকিং প্রযুক্তি যাতে অর্থনৈতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তার জন্য আমাদের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করব।
মো. আব্দুল্লাহ হেল বাকী
প্রধান, উন্নত চুলা কর্মসূচি (আইসিএস), ইডকল
সারা দেশে ইডকল উন্নত চুলা কর্মসূচির আওতায় ৪০ লাখ আইসিএস প্রতিস্থাপন করেছে। ৭৬টি পার্টনার অর্গানাইজেশনের (পিও) মাধ্যমে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত এ উন্নত চুলা সারা দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এসব চুলা ব্যবহারে বছরে জ্বালানি সাশ্রয় হয়েছে ৬ দশমিক ১ মিলিয়ন টন, আর কার্বন নিঃসরণ হয়েছে ৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন। এ খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে তিন হাজার মানুষের। ক্লিন কুকিংয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটা দেখলে জানা যায়, ৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন গৃহস্থালিতে প্রাকৃতিক গ্যাস, এলপিজি ও ই-কুকার রয়েছে। ৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন গৃহস্থালিতে ইমপ্রুভ কুক স্টোভস রয়েছে। যেখানে জ্বালানি হিসেবে লাকড়ি ব্যবহার করা হয়। ৮৩ হাজার গৃহস্থালিতে বায়োগ্যাস প্লান্ট রয়েছে। এছাড়া বাকি ২৪ মিলিয়ন গৃহস্থালিতে এখনো ট্র্যাডিশনাল কুক স্টোভস ব্যবহার করা হচ্ছে। এটা মোট জনসংখ্যার ৫৯ শতাংশ। বাংলাদেশের কান্ট্রি অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ ক্লিন কুকিং লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। ফলে ২৪ মিলিয়ন গৃহস্থালিতে ক্লিন কুকিং পৌঁছাতে হবে এ সময়ের মধ্যে।
ড. মো. রিজওয়ান খান
ইমেরিটাস অধ্যাপক ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ)
স্থানীয় ও বৈশ্বিক দূষণকে আলাদাভাবে দেখা উচিত না। স্থানীয় দূষণের কথা বলতে গিয়ে আমরা কাঠ-কয়লার কথা বলছি। অর্থাৎ, আমরা শতভাগ কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপাদন করছি। আমরা যদি বৈশ্বিক দূষণের প্রেক্ষিতকে একই রেখে স্থানীয় দূষণকে কমিয়ে আনতে পারি, তাহলে স্বাস্থ্যের ব্যয় সংকোচন করা সম্ভব হবে। কেউ ইনহেলার নেয়, কারো চোখের ওষুধ নিতে হয়, নানা সমস্যা। সেজন্য স্বাস্থ্যগত সুবিধা পাওয়ার জন্য স্থানীয় দূষণকে কমাতে পারলে তার সুবিধা অনেক। আমি হিসাব করে দেখেছি, জ্বালানির জন্য যা ব্যয় হয়, ইনহেলার ও অন্যান্য ওষুধ খরচ মিলিয়ে ব্যয় তার কাছাকাছি চলে আসে। ইলেকট্রিক কুকিং অ্যাডপ্ট করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো আমাদের বিকল্প রয়েছে। আমি আমার ছাদে সোলার পিভি স্থাপন করতে পারি। এ সোলার পিভি তার পুরো জীবনচক্রে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, তার উৎপাদনে দূষণের পরিমাণ ৫-৭ শতাংশের বেশি নয়। সেজন্য ইলেকট্রিক কুকিংয়ে যাওয়া স্থানীয় ও বৈশ্বিকভাবে লাভজনক। আমরা পরীক্ষামূলকভাবে যেখানে ইলেকট্রিক কুকিং দিয়েছি, তারা জানিয়েছে, ইলেকট্রিক চুলা দেয়ার পর আমি আর রান্নাঘরে যাই না। রান্নাঘর সাধারণত ঘরের বাইরে থাকে। সেজন্য ঘরের কোনায় এটি স্থাপন করেছি।
আমরা পুরোপুরি ইলেকট্রিক কুকিংয়ে যেতে পারব না। যে গাছটা আমরা লাগিয়েছি, একসময় তার জীবন আয়ু শেষ হবে, তখন আপনি না পোড়ালেও সেটি মিথেন উৎপাদন করবে। সেজন্য পুরোপুরি ইলেকট্রিক কুকিংয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এটা বিকল্প হতে পারে। স্থানীয় ও বৈশ্বিক দুই ধরনের দূষণকে বিবেচনা করলে এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিলে স্থানীয় দূষণ কমানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
দেওয়ান হানিফ মাহমুদ
সম্পাদক ও প্রকাশক
বণিক বার্তা
জাতীয় পর্যায়ের রূপান্তরে ছোট বিনিয়োগে বড় অর্জন সম্ভব তার বাস্তব উদাহরণ হলো ইডকলের উন্নত চুলা। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে মায়েরা আবদ্ধ, অপরিচ্ছন্ন রান্নাঘরের পরিবেশে থাকেন। আমাদের প্রথাগত রান্নার পদ্ধতিতে শিশুরা ও মায়েরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন। এটি ছোট উদ্যোগে বড় অর্জনের ভিন্নধর্মী উদ্যোগ।
আমরা বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প যেমন রাস্তাঘাট তৈরি, সেতু নির্মাণ, রেলে বড় বিনিয়োগ করি। অনেক সময় সেগুলোর বিনিয়োগের ফলাফল সন্তোষজনক হয় না। অথচ এ ধরনের ছোট উদ্যোগের প্রকল্পে প্রতিটা পরিবার উপকৃত হয়, জ্বালানির সুরক্ষা তৈরি হয়, স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা নিশ্চিত হয়। বিশেষ করে মায়েরা, যারা রান্নাঘরে থাকেন, তাদের জন্য এটা খুবই ইতিবাচক।
সাজিয়া ইসলাম
সহকারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আইসিডিডিআর,বি
গৃহস্থালির বায়ুদূষণ বৈশ্বিক রোগহার ও মৃত্যুহার বাড়ার অন্যতম কারণ। এ দূষণের অন্যতম কারণ রান্নার কাজে জৈব ও শক্ত ধরনের জ্বালানির ব্যবহার। দেশের ৮৯ শতাংশ গৃহস্থালি এখনো জৈব ও শক্ত জ্বালানি যেমন কাঠ-কয়লার ওপর নির্ভরশীল। এসব প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে ইডকল আইসিএস প্রোগ্রাম শুরু করে। গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত সনাতন পদ্ধতির চুলা এবং ইডকলের উদ্ভাবিত চুলার মধ্যে সম্ভাব্য পার্থক্য, তথা কার্বন মনোক্সাইড ও পিএম ২.৫ কী পরিমাণ উৎপাদন হয় তা পরিমাপ করতে আমরা গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করি। ফলাফলে আমরা দেখতে পাই, উন্নত চুলা ব্যবহারকারীরা সনাতনী চুলা ব্যবহারকারীদের থেকে অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকে। ডাবল চিমনির গ্রাহকরা যেখানে ২৫০ মাত্রার পিএম ২.৫ ফুসফুসের মাধ্যমে নিয়ে থাকে, সনাতনী চুলায় ৫০০ মাত্রার বেশি পিএম ২.৫ গ্রহণ করে। সনাতনী চুলা ব্যবহারকারীরা কার্বন মনোক্সাইডের দ্বারা আক্রান্ত হলেও আইসিএস ব্যবহারকারীরা তুলনামূলক বেশি সুরক্ষিত থাকেন। দীর্ঘদিন এ ধরনের পরিবেশে থাকার কারণ সিওপিডি, স্ট্রোকের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের সম্মুখীন হন ব্যবহারকারীরা। এসব সমস্যা সমাধানে আগামীতে ক্লিন কুকিংয়ের ব্যবহার বাড়ানোসহ এর প্রভাব নিয়ে বৃহৎ পরিসরে গবেষণা করতে হবে।
ড. মো. আহসান আলী
নির্বাহী পরিচালক, আশ্রয়
জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর আমরা একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। ওই প্রকল্পে উন্নত চুলা রাখা হয়েছে। প্রচারের বিষয়ে আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব এলাকায় চুলা দিতে পেরেছি সেসব এলাকায় তো প্রচার চলবেই, তার পাশাপাশি যেসব এলাকায় চুলা সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি সে এলাকায়ও প্রচার চালাতে হবে। আমরা একটি জরিপে দেখেছি, মেয়েরা, মায়েরা এ চুলা বেশি পছন্দ করে। কারণ এ চুলায় ধোঁয়া কম হয়, ভাপটা বেশ জোরে হয়। গ্রামে যারা সনাতনী পদ্ধতির চুলা ব্যবহার করেন তাদের একটি বয়সের পর শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা হয়। এটাতে তার প্রভাব কম। যত তাড়াতাড়ি এটা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারি, তত দ্রুত ভালো হবে এবং বাচ্চাদের জন্যও ভালো হবে।
চিরঞ্জিত পাল
ডেপুটি অপারেটিভ ডিরেক্টর
ওয়ালটন
বর্তমানে বাজারে ইলেকট্রনিক চুলা পাওয়া যাচ্ছে ১৫০০-১৮০০ ওয়াটের ওপরে। ফলে এগুলো শহরে বা মফস্বল জেলা শহরে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু পল্লী এলাকায় ব্যবহার করা যায় না। সেখানে ব্যবহারের জন্য এক হাজার ওয়াটের নিচে ইলেকট্রিক কুক স্টোভ তৈরি করতে হবে। এ ধরনের চুলা ব্যবহারে যেন এনার্জি সাশ্রয় হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। বর্তমানে ওয়ালটন সোলারচালিত রাইসকুকার নিয়ে কাজ করছে। ইডকল, আইসিডিডিআর,বি ও আমাদের ম্যানেজমেন্টের সহায়তা প্রয়োজন।
ড. মো. মমিনুর রহমান
অধ্যাপক, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বুয়েট
ইডকলের কুকিং স্টোভগুলোর সর্বোচ্চ ইফিশিয়েন্সি ছিল ২২ শতাংশ। এগুলো এখন ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। আমরা যেটাই করি না কেন, সেটা গ্রাহকবান্ধব হতে হবে। এ চুলা কেন মানুষ ব্যবহার করবে, স্বাস্থ্যগত, অর্থগত বিষয়গুলো আরো পরিষ্কার হতে হবে। তাহলেই মানুষ আগ্রহী হবে। ইলেকট্রিসিটি জেনারেশনের ইফিশিয়েন্সি সর্বোচ্চ ৫০% আবার ই-কুকিংয়ের ইফিশিয়েন্সি সর্বোচ্চ ৭০%। তাই আমরা ই-কুকিং ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ ইফিশিয়েন্সি ৩৫% পাব। ইডকলের বর্তমান উন্নত চুলাগুলো থেকে একই ইফিশিয়েন্সি পাওয়া যায়। তাই গ্লোবাল এমিশন কিন্তু কমছে না। অথচ ইডকলের চুলার খরচ ই-কুকিংয়ের চেয়ে কয়েক গুণ কম।
মো. তাইবুর রহমান বিশ্বাস
সহকারী জেনারেল ম্যানেজার
আরএফএল
আরএফএল শুরু থেকেই ইডকলের পাশে আছে। ইডকলের এক্সিস্টিং কুকিং স্টোভ আরএফএল প্রায় ২০ লাখের বেশি সরবরাহ করেছে। ইডকলের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর দোরগোড়ায় তা পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছি। এ উদ্যোগকে আমরা জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে নিচ্ছি। সেজন্য লাভের কথা চিন্তায় না রেখে সমাজসেবা হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ে আমরা পৌঁছে দিচ্ছি।
মো. আক্তার হামিদ
ডেপুটি ডিরেক্টর, ওয়ালটন
আমাদের সোলার ইকুইপমেন্ট নিয়ে কাজ চলমান আছে। গ্রাম পর্যায়ে ব্যাটারি কিংবা ইনভার্টার ছাড়া সোলার কুকার সরাসরি ব্যবহারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা আশাবাদী, এ প্রকল্পের উন্নয়ন করে ফিল্ড পর্যায়ে দিতে পারব। পাশাপাশি বাজারে যেসব ইনডাকশন কুকার পাওয়া যায় তার চেয়ে কম ওয়াটের কুকার ডেভেলপের চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে আমরা এক হাজার ওয়াটের নিচে একটি কুকার ডেভেলপ করছি। এ প্রডাক্ট বাজারে আনার মাধ্যমে আমরা বাজারের চাহিদা পূরণ করতে পারব বলে আশা করছি।
তনুজা ভট্টাচার্য্য
সিনিয়র এনার্জি স্পেশালিস্ট
বিশ্বব্যাংক
দূষণমুক্ত রান্নার কোনো স্বতঃসিদ্ধ সমাধান নেই, যেকোনো দেশ বা সমাজের বাস্তবতার নিরিখেই পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও যথাযথ প্রযুক্তি নির্বাচন করতে হয়। তবে গৃহস্থালী কাজের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি সীমিত বলেই দূষণমুক্ত রান্নার এজেন্ডাকে এগিয়ে নেয়া কঠিন। দূষণ হ্রাস, জ্বালানি দক্ষতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতার বাইরেও যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল দূষণমুক্ত রান্নার বিষয়ে সার্বিক সচেতনতা এবং সংবেদনশীলতা তৈরি করা। নারী ও শিশু স্বাস্থ্যের দিকটি বিবেচনা করলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব বোঝা যায়। বিশ্বে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মানুষ কুকিং পোভার্টির নীচে এবং এর ভূক্তভোগী মূলত নারীরা। রান্নার ধোঁয়াজনিত বাৎসরিক ক্ষতির আর্থিক মূল্য ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। এ বিষয়ক তথ্য-উপাত্ত-সাফল্য-সমস্যা নীতিনির্ধারনী পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য কাঠামোগত উদ্যোগ প্রয়োজন। তৃণমূল স্বাস্থ্য পরিসেবা থেকে শ্বাসকষ্ট ও বায়দূষণজনিত রোগের তথ্য সংগ্রহ ও তা বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টা দৃশ্যমান হবে।
তৃণমূল পর্যায়ে উন্নত চুলা ব্যবহারকারী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক প্রত্যেকের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এ ধরণের একটি এজেন্ডাকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সকলকে সম্পৃক্ত করার পদ্ধতি ও ভাষা এক নয়। তাই কারিগরী বিষয়গুলোর মতই তথ্যনির্ভর প্রচার প্রচারণার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ।
ড. এসএম আছাদুজ্জামান সুজন
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
বিসিএসআইআর
আইসিএস চুলা উন্নয়নে আমাদের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৮৭ সালে হাসান রশিদ খান থেকে আইসিএস উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। সাম্প্রতিক আমাদের উন্নয়নকৃত মডেলের ইফিশিয়েন্সি প্রায় ৪০ শতাংশ। সেটা পেটেন্টের জন্য দাখিল করা হয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে এখনো আসেনি। আমরা আইসিএসের ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করি। দেশে বাইরের দূষণের চেয়ে ঘরের অভ্যন্তরের দূষণের প্রভাব বেশি। ঘরের অভ্যন্তরে দূষণের শিকার হয় যারা রান্না কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকে। সেক্ষেত্রে আমাদের সহধর্মিণী ও শিশুরা এর দ্বারা বেশি আক্রান্ত। যদি স্থানীয় প্রথা, সংস্কৃতি, নৃতাত্ত্বিক প্রযুক্তিগুলোকে চিহ্নিত করে মডেলকে ডেসিমিনেশনের জন্য প্রস্তাব দিই তাহলে সেটাই সফল প্রকল্প হবে।
রোকসানা পারভীন
ইডকলের আইসিএস ব্যবহারকারী
ইডকলের উন্নত চুলা আমি অনেক দিন ধরে ব্যবহার করছি। এ চুলা ব্যবহার করে আমি অনেক উপকার পেয়েছি। এটাতে ছড়ি কম পোড়ে, সময় কম লাগে, রান্না তাড়াতাড়ি হয়, রান্নাঘরে কালি হয় না। আগে আমি যখন মাটির চুলা ব্যবহার করতাম, তখন রান্নাঘরে অনেক কালি হতো, অন্ধকার হয়ে যেত। আমি চাইব এ চুলার ব্যবহার যাতে অনেক বেশি বেশি হয়। এ চুলা অনেক দিন ধরে চলে। যে পরিবারগুলো এখনো এ চুলা ব্যবহার করছে না তারা সবাই যেন এ চুলা ব্যবহার করতে পারে।
মো. শহিদুল হক
প্রধান নির্বাহী, এসএআরপিভি
শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধিতার কারণ খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখলাম, ক্যালসিয়ামের অভাবে শরীরে ভিটামিন ডি থাকলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। ক্যালসিয়ামের অভাবের বিভিন্ন কারণের মধ্যে একটি স্মোকিং। গর্ভবতী মায়েরা দীর্ঘ সময় রান্নাঘরে থাকেন। এ সময় তারা শ্বাস নেন, তার মাধ্যমে তারা ধোঁয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি তারা বাচ্চাদের নিয়ে সেখানে অবস্থান করেন। ফলে বাচ্চারাও ধোঁয়ায় আক্রান্ত হয়। এখনো আমাদের ৪০ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ সম্পর্কে জানেই না। এ চুলা ব্যবহার করলে মায়েরা কী কী সুবিধা পাবেন, এখনো এ তথ্য তাদের কাছে পৌঁছাতে পারিনি। এটা কীভাবে মানুষ জানতে পারে তার উদ্যোগ নিতে হবে। মানুষ যখন স্বাস্থ্য সুবিধা সম্পর্কে জানবে তখন তারা আগ্রহী হয়ে উঠবে।
মো. আব্দুল্লাহ আব্রাহাম হোসেন
উপপ্রকল্প পরিচালক, ‘সুফল’ প্রকল্প, বন অধিদপ্তর
বননির্ভর জনগোষ্ঠীকে কীভাবে আমরা উন্নত চুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করব, কীভাবে তাদের ব্যবহারকারী হিসেবে গড়ে তুলব এ নিয়ে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ছিল। ইডকলের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি করা আছে। সে চুক্তি প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমাদের সুফল প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র, অতিদরিদ্র ৪০ হাজার পরিবারকে এ সেবার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষদের যদি অন্তর্ভুক্ত করা যায় তাহলে পরিবেশগত প্রভাব অনেক বেশি নিশ্চিত করা যাবে।
মো. এনামুল করিম পাভেল
বিভাগীয় প্রধান, রিনিউয়েবল এনার্জি, ইডকল
আমরা আইসিএস, ই-কুকিংয়ের নানা পর্যায়ের গবেষণা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছি। বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে মতবিনিময় করে এ কাজ আরো এগিয়ে নিচ্ছি। গ্রাহক যাতে সহজে ক্লিন কুকিং ব্যবহারে আগ্রহী হয়, তা নিয়ে আরো বড় পরিসরে কাজ করবে ইডকল। আরঅ্যান্ডডির (গবেষণা ও উন্নয়ন) মাধ্যমে উন্নত চুলা তৈরি করে ইডকল এই কর্মসূচিকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতে আমরা ই-কুকিং, এলপিজি ও সোলার কুকিং নিয়ে কাজ করব, যাতে ক্রেতারা পছন্দ অনুযায়ী চুলা বেছে নিতে পারে। বছরে এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্মূল করতে উন্নত চুলার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হয় মাত্র দুই ডলার। অন্যদিকে সোলার রুপটপ অথবা সোলার সেচে বিনিয়োগ করে এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড কমাতে ১০ গুণের বেশি বিনিয়োগ করতে হয়। তাই উন্নত চুলার মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে এনডিসি (ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন) লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন
মো. আব্দুল্লাহ হেল বাকী
প্রকল্প প্রধান, উন্নত চুলা কর্মসূচি (আইসিএস)
ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)
সাজিয়া ইসলাম
সহকারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)
ইডকল উন্নত চুলা কর্মসূচি
ইডকল উন্নত চুলা কর্মসূচি
উন্নত চুলা কর্মসূচিটি শুরু হয় ২০১৩ সালে। এ পর্যন্ত ৪০ লাখ চুলা স্থাপন করা হয়েছে। ৭৬টি পার্টনার অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে এসব চুলা ইডকল প্রতিস্থাপন করে থাকে। ৩০৭টি উপজেলায় এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এছাড়া যেসব কুক স্টোভস রয়েছে সেগুলোর ইফিশিয়েন্সি থার্মাল ৩৫ শতাংশের কাছাকাছি। এ চুলা স্থাপনের মাধ্যমে প্রতি বছর ৬ দশমিক ১ মিলিয়ন টন জ্বালানি সাশ্রয় হচ্ছে আর কার্বন নিঃসরণ হয় ৪ দশমিক ১ মিলিয়ন টন। ইডকলের এ প্রকল্পে সহায়তা করছে বাংলাদেশ সরকার, বিশ্বব্যাংক ও গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড।
ইডকলের আইসিএস প্রোগ্রামটি শুরু হয় চারটি বিষয়বস্তুর ওপর। প্রথমত, সারা দেশে ক্লিন কুকিং নিয়ে গণসচেতনতা তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, কুক স্টোভস প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ দূষণ ও পরিবেশ দূষণ কমানো এবং রান্নার ক্ষেত্রে লাকড়ির ব্যবহার কমানো। তৃতীয়ত, ২০২৩ সালের মধ্যে সারা দেশে ক্লিন কুকিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য একটা শক্ত ভিত্তি তৈরি। সর্বশেষ, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি দিয়ে পার্টনার অর্গানাইজেশন নির্বাচনের মাধ্যমে কুক স্টোভস কার্যক্রমকে এগিয়ে নেয়া।
কংক্রিটের উন্নত চুলা দামে সাশ্রয়ী, ৫-১০ ডলারের মধ্যে এটি তৈরি করা যায়। এগুলো স্থানীয়ভাবেও তৈরি করা যায়, চুলাটি ব্যবহারে ব্যবহারকারীর রান্নার অভ্যাসগত দিকও খুব বেশি পরিবর্তন করতে হয় না। এ ধরনের চুলা ব্যবহারে যে পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় হয় তাতে ২-৭ মাসেই খরচের টাকা উঠে আসে। এর মধ্যে পোর্টেবল, চিমনি সিঙ্গেল ও ডাবল মুখের থার্মাল ইফিশিয়েন্সি বিভিন্ন চুলা রয়েছে। আর এসব চুলা বিক্রি এবং গ্রাহকের তথ্য একটি একক সিরিয়াল নম্বরের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করে ইডকল। এছাড়া ইডকলের রয়েছে একটি কল সেন্টার, যার মাধ্যমে গ্রাহকের চুলা প্রয়োজন হলে তা পিওদের দিয়ে সরবরাহ করা হয়।
সঞ্চালনা
বদরুল আলম
প্রধান প্রতিবেদক, বণিক বার্তা
অনুলিখন
আবু তাহের
নিজস্ব প্রতিবেদক, বণিক বার্তা
আরফিন শরিয়ত
নিজস্ব প্রতিবেদক, বণিক বার্তা
স্থিরচিত্র
কাজী সালাহউদ্দীন রাজু
ফটো সাংবাদিক, বণিক বার্তা






