একটা সময় ছিল যখন সন্তান জন্মদানে অক্ষম দম্পতিদের সমাজে নানাভাবে হেনস্তার শিকার হতে হতো। এখনো সেসব দিন খুব একটা বদলায়নি। আগে কুসংস্কারের শিকার সন্তান ধারণে অক্ষম দম্পতিরা ঝাড়ফুঁকের দ্বারস্থ হতেন। আর এখন সত্যিকার অর্থেই সমাধান নিয়ে এসেছে বিজ্ঞান। এ অগ্রগতির আরো একটি বড় সুবিধা হচ্ছে আগে সন্তান ধারণ করতে চাইলে যেতে হতো দেশের বাইরে। এখন দেশেই মিলছে সব ধরনের সেবা।   

আইভিএফ বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে নারীর জরায়ুর বাইরে শুক্রাণু দিয়ে একটি ডিম্বাণু নিষিক্ত করা হয়। এরপর সেই নিষিক্ত হওয়া ভ্রূণ আবার জরায়ুতে ইমপ্ল্যান্ট করা হয়। সাধারণত যেসব দম্পতি ইনফার্টিলিটি বা বন্ধ্যাত্ব সমস্যায় ভুগছেন অথবা যাদের একাধিকবার গর্ভপাত হয়েছে তাদের এ পদ্ধতিতে সন্তান ধারণে সাহায্য করা হয়। 

আইভিএফ পদ্ধতিতে শরীরের বাইরে একটি কাচের জারের ভেতর নারীর শরীরের ডিম্বাণু আর পুরুষের শুক্রাণুর মিশ্রণ ঘটানো হয়। আইভিএফ বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনকে বলা যায় মানুষের সফল সহায়ক পুনরুৎপাদন পদ্ধতি। কাচের ভেতরে ডিম্বাণু নিষিক্ত করার এ পদ্ধতিতে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো ধরনের যৌন সম্পর্ক ছাড়াই জন্মদানের প্রক্রিয়া শুরু হয়। অনেকে আইভিএফকে টেস্টটিউব পদ্ধতি নামেও জানেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আইভিএফ পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেক নিঃসন্তান নারী সন্তান ধারণ করার সুযোগ পান, একইভাবে সারোগেসি বা গর্ভ ভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।

যেসব নারী ফাইব্রয়েড, এন্ডোমেট্রিয়োসিস বা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমে ভুগছেন তাদের মধ্যে বন্ধ্যাত্ব সমস্যা বেশি দেখা দেয়। শুক্রাণুর অস্বাভাবিকতা, ডিম্বাশয়, ডিম্বনালি বা জরায়ুর সমস্যা, ডিম্বাণু নিঃসরণে অসুবিধা, এক্টোপিক প্রেগন্যান্সির ক্ষেত্রেও গর্ভধারণে সমস্যা হয়। নিঃসন্তান দম্পতিদের ক্ষেত্রে প্রথমে ট্যাবলেট বা ইনজেকশন দিয়ে স্ত্রীর ডিম তৈরির চেষ্টা করা হয়। স্বামীর সমস্যা থাকলে তাকে ওষুধ দিয়েও অনেক সময় ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়। ওভারিতে সিস্ট, ফেলোপিয়ান টিউবে ব্লক, এন্ডোমেট্রিয়োসিস বা পলিসিস্টিক ওভারি থাকলে অনেক সময় ল্যাপারোস্কোপি-হিস্টিরিয়োস্কোপি করা হয়। এ পদ্ধতিগুলোয় সন্তান আসার সম্ভাবনা বাড়ে। এগুলোয় কাজ না হলে আইইউআই (ইন্ট্রাইউটেরাইন ইনসেমিনেশন—ডিম্বাণু ও শুক্রাণুকে কাছাকাছি আনা হয়) অথবা আইভিএফের পরামর্শ দেয়া হয়।

আইভিএফকে সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তির (এআরটি) সর্বাধিক পরিচিত ধরন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আইভিএফে ওষুধ ও অস্ত্রোপচার পদ্ধতির মাধ্যমে শুক্রাণু দিয়ে ডিম্বাণু নিষিক্ত করা হয়, পরে সেই নিষিক্ত হওয়া ডিম্বাণু আবার নারীর জরায়ুর ভেতরে স্থাপন করতে সাহায্য করা হয়।

সাধারণভাবে এ পদ্ধতিতে শুরুতে কিছু ওষুধ দিয়ে বেশকিছু ডিম্বাণুকে উপযুক্ত ও নিষিক্ত হওয়ার জন্য তৈরি করা হয়। এরপর ডাক্তাররা সেই ডিম্বাণুকে শরীরের বাইরে বের করে আনেন এবং ল্যাবে সেটার সঙ্গে শুক্রাণুর মিশ্রণ ঘটানো হয়, তারপর যখন ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়ে যায়, তখন সেটা আবার নারীর জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। জরায়ুর আস্তরণে ভ্রূণ স্থাপন করলেই কেবল গর্ভধারণ হয়।

আইভিএফের অনেক পর্ব থাকে। আর সেগুলো পূরণ করতে কয়েক মাস পর্যন্ত লেগে যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে প্রথম চেষ্টাতেই বাবা-মা হওয়ার সুযোগ মিললেও অনেককে একাধিকবার চেষ্টা করতে হয়। আইভিএফ গর্ভধারণের সম্ভাবনা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। তার পরও শতভাগ নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব নয় বলেই মন্তব্য চিকিৎসকদের। কারণ প্রতিটি মানব শরীর আলাদা এবং আইভিএফ সবার ক্ষেত্রে একই রকম কাজ করে না। 

বর্তমানে বাংলাদেশে বন্ধ্যাত্বের হার ২০ শতাংশ। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো জরিপ নেই। দেখা যায়, এসব নিঃসন্তান দম্পতির মধ্যে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে স্ত্রী এবং একই সংখ্যক স্বামীদের শারীরিক সমস্যা থাকে। ১০ ভাগ ক্ষেত্রে দুজনেরই সমস্যা থাকে। বাকি ১০ ভাগ ক্ষেত্রে সমস্যা অজানা থেকে যায়। নারীর কর্মজীবন, দেরিতে সন্তান গ্রহণ, খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ দূষণও বর্তমানে সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে বেশ প্রভাব তৈরি করছে। বাংলাদেশে আইভিএফ সেবা প্রদান শুরু হয়েছে অনেকদিন আগে, সেই ১৯৯৮ বা ২০০০ সাল থেকে। কিন্তু সে সময় থেকেই সবার কাছে সেভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি এ সেবা। সম্প্রতি বাংলাদেশের বেশকিছু হাসপাতাল এ সেবা প্রদান শুরু করেছে।

অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে, ইনফার্টিলিটি সেন্টার মানেই আইভিএফ কিন্তু আইভিএফ সেন্টারে নিঃসন্তান দম্পতিদের অনেক চিকিৎসা দেয়া হয়। বন্ধ্যাত্বের কারণ বুঝে সেখানে এসব চিকিৎসা দেয়া হয়। বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় সর্বোচ্চ ধাপটি আইভিএফ। অনেক নিঃসন্তান দম্পতির এ সেবা পর্যন্ত যাওয়ারই প্রয়োজন পড়ে না। তার আগেই অন্যান্য সেবায় তারা সন্তান ধারণে সক্ষম হন। বর্তমানে দেশে ১০০ জনকে আইভিএফ চিকিৎসা দেয়া হলে ৩৫-৪০ শতাংশ সফল গর্ভধারণের চিত্র দেখা যাচ্ছে। 

আইভিএফ চিকিৎসা এখনো বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। প্রায় ১৫-২০ দিনের একটা ট্রিটমেন্ট থাকে। সেক্ষেত্রে খরচটা লাখের ওপর চলে যায়। তবে আশার কথা হচ্ছে এখন দেশের সরকারও এ বিষয়ে মনোযোগ দিচ্ছে। আইভিএফ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় অথবা ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন জায়গায় ইনফার্টিলিটি সেন্টার চালু হয়েছে। সরকার তাদের বেশ ভালো ফান্ড দিচ্ছে, যেখানে চেষ্টা করা হচ্ছে কীভাবে রোগীদের খরচ কমিয়ে এনে তাদের এ সেবা দেয়া যায়। 

যদিও মানুষ সচেতন হচ্ছে এখন, তবে অনেক ক্ষেত্রে এটার গ্রহণযোগ্যতা সবার কাছে সমান না। তাই সেই জায়গায় আরো কাজ করার দরকার রয়েছে। দেশে আইভিএফ সেন্টারের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক হাসপাতালেই এখনো এ চিকিৎসার সুবিধা নেই। শুধু ইনফার্টিলিটি সেন্টারগুলোয়ই এ সেবা পাচ্ছেন রোগীরা।