ইউনিভার্সেল মেডিকেলের গাইনি বিভাগে একটি সুসংগঠিত ইনফার্টিলিটি টিম রয়েছে। এখানে রেগুলার প্রাইমারি অ্যান্ড সেকেন্ডারি ইনফার্টিলিটি রোগীরা আসে চিকিৎসার জন্য। আমরা সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে রোগীদের পরামর্শ এবং চিকিৎসা দিয়ে আসছি। যেহেতু বন্ধ্যাত্ব রোগীর চিকিৎসায় অ্যান্ডোক্রাইনোলজি, মেডিসিনসহ বিভিন্ন বিভাগের প্রয়োজনীয়তা থাকে, সে ক্ষেত্রে আমরা একজন রোগীকে মাল্টিডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচে চিকিৎসা দিতে পারি। একই সঙ্গে ইউনিভার্সাল মেডিকেলের আইসিইউ এবং এনআইসিইউয়ের সুযোগ-সুবিধা ভালো হওয়ায় একজন রোগীর এবং তার নবাগত সন্তানের সব রকমের জটিলতা লাঘব সম্ভব হয়।

আগের তুলনায় বর্তমানে দেশে আইভিএফের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কারণ বিবেচনা করলে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে দেরিতে বিয়ে ও দেরিতে দম্পতিদের গর্ভধারণের পরিকল্পনা এগুলো অনেক বেশি দেখা যায়। আর সেক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ক্ষেত্রে বয়স বৃদ্ধিজনিত বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে শুধু মেডিসিনে গর্ভধারণ না হলে আইইউআই বা আইভিএফে যেতে হয়।

আইভিএফ কিংবা টেস্টটিউব বেবি নিয়ে এখনো অনেকের মাঝে অনেক কুসংস্কার বা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। যেমন—আইভিএফ মুসলমানের জন্য ধর্মীয় বাধার সৃষ্টি করে। আইভিএফ সন্তান দম্পতির নিজস্ব সন্তান নয়। আইভিএফ সন্তান টেস্টটিউবে জন্ম হয়। আইভিএফ অনেক কষ্টদায়ক একটি প্রক্রিয়া। আইভিএফে সন্তানের জন্মগত ত্রুটি হয় বেশি এবং তারা নিজেরাও ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্বজনিত সমস্যায় ভোগে। প্রথম আইভিএফে সফল না হলে পরবর্তী সময়ে সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা আর থাকে না। আইভিএফের মাধ্যমে সবসময় যমজ কিংবা ট্রিপল বেবি হয়। আইভিএফে শতভাগ গর্ভধারণের গ্যারান্টি রয়েছে। 

এ ধরনের কুসংস্কারের জন্য কিছু মানুষ এখনো এত উন্নত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আইভিএফ প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে বিভিন্ন অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে, যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। ওপরে আলোচনা করা ভ্রান্ত ধারণাগুলো দূর করার জন্য যে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তার মাঝে প্রথমত জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

বিভিন্ন ধরনের প্রচারমাধ্যম যেমন—পত্রিকা, ম্যাগাজিন, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টিভি প্রোগ্রামগুলোয় আইভিএফ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে সঠিক ধারণা দেয়া যেতে পারে।

প্রত্যেক রোগীকে আইভিএফ পদ্ধতির ধাপগুলো এবং এর মাধ্যমে গর্ভধারণের সম্ভাবনা ও জটিলতা নিয়ে কাউন্সেলিং করতে হবে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব হাসপাতালে বন্ধ্যাত্ব রোগীদের জন্য ইনফার্টিলিটি কর্নার থাকা প্রয়োজন। এতে করে সঠিক রোগী নির্বাচন করে চিকিৎসা দেয়া যায় এবং প্রয়োজনে সঠিক চিকিৎসকের কাছে রেফার করা যায়।

বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক আইভিএফ সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অনেক গাইনি বিশেষজ্ঞ বন্ধ্যাত্ব বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। অনেকে ভারত, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বন্ধ্যাত্ব রোগের ওপর ডিগ্রি এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে আসছেন নিজের দেশে উন্নত চিকিৎসা দেয়ার জন্য। এতে নিঃসন্দেহে বোঝা যাচ্ছে ভবিষ্যতে আমাদের দেশ আইভিএফ চিকিৎসায় কোনো অংশে অন্য দেশগুলো থেকে পিছিয়ে থাকবে না। 

আইভিএফ চিকিৎসায় প্রতিবন্ধকতা বলতে গেলে সবার প্রথমেই বলতে হয় এ পদ্ধতিটি অনেক বেশি ব্যয়বহুল। একটা আইভিএফ চিকিৎসার জন্য পুরুষ ও নারী উভয়েরই কিছু প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন হয়। এসব প্রাথমিক পরীক্ষার পর যদি নারীর কোনো জটিলতা ধরা পড়ে সেক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কোপি বা হিস্টেরোস্কোপিসহ কিছু ব্যয়বহুল চিকিৎসার শরণাপন্ন হতে হয়। এদিকে পুরুষের বীর্য পরীক্ষায় সমস্যা পেলে ভেসো গ্রাফি, টেস্টিকুলার বায়োপসিসহ অনেক পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। এরপর আইভিএফের প্রতিটি ধাপ যেমন ডিম্বাশয়ের উদ্দীপনা, ট্রিগার ইনজেকশন ডিম্বাণু সংগ্রহসহ শুক্রাণু সংগ্রহ, নিষেক, ভ্রূণের গঠন এবং ভ্রূণ স্থানান্তরসহ প্রতিটি প্রক্রিয়া অনেক ব্যয়বহুল। আইভিএফ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। দেখা যায় অনেকে এক্ষেত্রে মানসিক বিষণ্ণতায় ভোগেন এবং ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। এক্ষেত্রে চিকিৎসা চালাতে বিঘ্ন ঘটায় সময়মতো কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। 

বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের আইভিএফের পার্থক্য বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় সব উন্নত দেশগুলোয় সব ধরনের হেলথ সেক্টরে সব লেভেলে বন্ধ্যাত্ব রোগের সঠিক চিকিৎসাসহ আইভিএফের সুবিধা রয়েছে, যা আমাদের দেশে ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে। 

সারোগেসি, ডোনার ওভাম বা স্পাম ডোনার অন্যান্য দেশে দেয়ার জন্য অনুমোদন থাকলেও ইসলাম ধর্মে তা অনুমোদিত নয়। আর এই কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশে বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার সফলতার পরিমাণও তুলনামূলক বেশি।

বাইরের দেশগুলোয় বন্ধ্যাত্ব রোগের চিকিৎসায় আইভিএফসহ চিকিৎসার বেশির ভাগ ব্যয় ইন্স্যুরেন্সের মধ্যে কভারেজে থাকে, যা কিনা আমাদের দেশে এখনো চিন্তাই করা যায় না। দেশে আইভিএফ সেবা নিশ্চিত হলে অর্থনীতিতে বিশাল পরিবর্তন আসবে। দেশের মানুষের তখন আর দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমবে এবং দেশের টাকা দেশেই থাকবে। 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, স্ত্রী রোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগ
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা