আইভিএফ সেবা সবার প্রয়োজন হয় না। তার পরও যাদের প্রয়োজন হয় তাদের সঠিক সেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন নীতিমালা। এসব নিয়েই বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ইনফার্টিলিটি কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তোফাজ্জল হোসেন

আইভিএফ চিকিৎসা পদ্ধতি কী এবং বাংলাদেশে এ চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রচলন কখন শুরু হয়?

আইভিএফ মানে হচ্ছে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন। ভিট্রো মানে বাইরে। বাইরে ডিম্বাণু ফার্টিলাইজ করে মানুষের যে জন্মপদ্ধতি, স্পাম এবং ওহাম এ দুইটার ফার্টিলাইজেশনে যে এমব্রায়ো হয় সেটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়। এ পদ্ধতিতে ফার্টিলাইজেশনটা বাইরে করা হয়। বাইরে করে এমব্রায়োটা তৈরি করা হয়। এরপর ইউট্রাসের ভেতরে এটিকে প্রতিস্থাপন করা হয়। তারপর ইউট্রাস ইমপ্লান্টেশন হয়ে ধীরে ধীরে বড় হয়। বাইরে ফার্টিলাইজেশনের চিন্তা মানুষের মাথায় কেন এল? কখনো কখনো বাইলেটারাল টিউবাল ব্লক থাকে। এখন দুইটা টিউবই যদি কারো বন্ধ থাকে, কাটা যায় বা কোনো রকম সংক্রমণ থাকে তাহলে গর্ভধারণ করা যাবে না। যেহেতু টিউব বন্ধ তাহলে ফার্টিলাইজেশন হবে না। সেখান থেকে এ চিন্তাটা এসেছে যে বাইরে ফার্টিলাইজেশনটা কীভাবে করা যায়? প্রাণীদের নিয়ে এ পদ্ধতিটি আরো আগেই ছিল। একসময় মানুষের ক্ষেত্রে এটি করার জন্য চিন্তা শুরু হয়। প্রথমে একজন গাইনিকোলজিস্ট এবং একজন ফিজিওলজিস্ট এটা নিয়ে কাজ শুরু করলেন। অনেকগুলো সাইকেল তারা করেছেন। একশটিতে কোনো ফল আসেনি। ১০১তম সাইকেলে সফলতা আসে। গাইনিকোলজিস্ট যিনি ছিলেন, কোনো একটি প্রোগ্রাম উনার মনে হলো ল্যাপারোস্কোপির মাধ্যমে এগ কালেকশন করতে পারি। যেহেতু ল্যাপারোস্কোপি দিয়ে অনেক কিছুই দেখা যাচ্ছে। এরপর এ পদ্ধতির অনেক মডিফিকেশন হয়েছে। এখন তো আমরা আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে করে থাকি। ১৯৭৮ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম টেস্টটিউব বেবি জন্ম নেয়। তার নাম লুইস ব্রাউন। ইংল্যান্ডের একশতম শিশু জন্মগ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়। বাংলাদেশে প্রথম ২০০১ সালে টেস্টটিউব বেবি জন্ম নেয়।

বন্ধ্যাত্বের বিষয়ে আমাদের দেশে স্বামী বা স্ত্রীর সমস্যা নির্ণয় না করে ধরে নেয়া হয়, সমস্যা স্ত্রীর। এছাড়া অনেক কুসংস্কার রয়েছে। এ জায়গায় আমাদের দেশ কতটুকু এগিয়েছে?

আমি যখন এ চিকিৎসায় যুক্ত হই তখন দেখা যেত স্বামীরা পরীক্ষাই করতে চাইতেন না। শাশুড়িরা সঙ্গে থাকলে আরো আপত্তি করতেন। বলতেন আমার ছেলেকে কেন পরীক্ষা করা হবে? ছেলেদের মধ্যে একটা ধারণা আছে যে তার যৌন স্বাস্থ্য স্বাভাবিক থাকা মানে সন্তান জন্ম দিতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু বিষয়টা সে রকম নয়। দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। স্পাম সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস, এ ধারণাই আগে ছিল না। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। সমাজ অনেক দূর এগিয়েছে। এখন ৯৯ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বামী-স্ত্রী রাজি হয়ে যান যে দুজনেরই পরীক্ষা করা দরকার। এটা অনেকটা ডাক্তারদের বলার ওপরও নির্ভর করে। যখন বলা হবে সন্তান হতে গেলে দুজনেরই পরীক্ষা করা দরকার, একজনের করে লাভ নেই। তখন তারা আর আপত্তি করেন না। কারণ সন্তান জন্ম হতে যেমন দুজন লাগবে, তেমন না হওয়ার পেছনেও দুজনেরই কোনো না কোনো দায় থাকে। এ চিকিৎসার ক্ষেত্রে দম্পতির গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। বর্তমানে চিকিৎসা না করার পেছনে বড় কারণ আর্থিক অসচ্ছলতা। এছাড়া আর কোনো কারণ আমি দেখি না।

বাংলাদেশে আইভিএফ চিকিৎসা পদ্ধতি কীভাবে শুরু হলো?

বাংলাদেশে প্রথম ২০০১ সালে এ পদ্ধতি নিয়ে কাজ শুরু করেন প্রফেসর ডা. পারভিন ফাতেমা। এরপর আমরা ধীরে ধীরে শুরু করি। তারপর আইভিএফ চিকিৎসার জন্য সেন্টার হতে থাকে। বর্তমানে প্রায় ১২টির মতো রয়েছে। আমি মনে করি আরো সেন্টার প্রয়োজন, অনেক এক্সপার্টও প্রয়োজন। ভালো খবর হচ্ছে এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজে এটার ওপর কোর্স আছে। ফলে দক্ষ চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে।

বন্ধ্যাত্বজনিত সমস্যা বাংলাদেশে দিন দিন বাড়ছে। এর কারণগুলো কী?

শুধু বাংলাদেশে না, বিশ্বব্যাপীই এ সমস্যা বাড়ছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি আইভিএফ হচ্ছে। যদিও আমাদের ততটা বেশি হচ্ছে না অর্থনৈতিক কারণে। বন্ধ্যাত্বের সমস্যার অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে পরিবেশগত পরিবর্তন। কৃষকদের মধ্যে প্রচুর পাওয়া যাচ্ছে যে তাদের শুক্রাণু নেই এবং নারায়ণগঞ্জ থেকে আসে বেশিসংখ্যক রোগী যারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় থাকেন। এটা নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সঠিক যে দূষণ শুক্রাণু-ডিম্বাণুগুলো নষ্ট করে দেয়। দিন দিন আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ডিম্বাণুর সংখ্যা অনেক কম। আগে দেখা যেত বয়সের সঙ্গে একটা সম্পর্ক ছিল। বয়স যত বাড়তে থাকে ডিম্বাণুর মান তত কমতে থাকে। একটা সময় নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এখন তরুণীদেরও দেখা যাচ্ছে এ সমস্যা হচ্ছে। এটা এমনিতে নানা সমস্যার কারণে হতে পারে, তবে আমরা দেখছি যে অন্য কোনো সমস্যা নেই। তার পরও তরুণীদের ডিম্বাণু অনেক কম। এটি পরিবেশ দূষণের কারণে হতে পারে বলেই ধারণা করি। দূষণের মধ্যে বাতাস, পানি, খাদ্যদ্রব্য সবকিছুই চলে আসে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কভিড মহামারীর পরও এ প্রবণতা বেশি দেখতে পাচ্ছি। কভিডের আগে এমন ছিল না। এখন দেখা যাচ্ছে কিছু কিছু মেয়ের ক্ষেত্রে সমস্যাটি পাওয়া যাচ্ছে। যাদের কভিড হয়েছে তাদের মধ্যে এর কোনো প্রভাব আছে কিনা সেটিও ভেবে দেখার বিষয়। ছেলেদের ক্ষেত্রে স্পামে কভিডের ভাইরাস পাওয়া গেছে।

থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে বিয়ের আগে পরীক্ষা করে নেয়ার কথা বলা হয়। বন্ধ্যাত্বের বিষয়ে বিয়ের আগে তরুণ-তরুণীরা কি পরীক্ষা করে দুজনই নিশ্চিত হয়ে নেয়ার প্রয়োজন আছে? 

থ্যালাসেমিয়া তো জীবন-মরণ প্রশ্ন। কাজেই দুজনের যদি থ্যালাসেমিয়া থাকে তাহলে তাদের মধ্যে বিয়ে যাতে না হয় সেজন্য পরীক্ষা করা হয়। কারণ তাহলে সন্তানেরও একই সমস্যা হবে। এখানে কিন্তু সে রকম বিষয় নেই। এখন বিয়ের আগে কারো যদি ইনফার্টিলিটি সমস্যা থাকে সে কি বিয়ে করবে না? বিয়ে তো করতে হবে। ফলে বিয়ের পর অন্তত এক বছর পরও কেউ যদি সুস্থভাবে থাকে এবং সন্তান ধারণের সব প্রক্রিয়া মানার পরও যদি সন্তান না হয় তখন তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসা দেয়া হবে। আর নারীর বয়স যদি ৩৫ বা তার বেশি হয় তাহলে ছয় মাস সন্তান ধারণে অক্ষম হলেই দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। তখন যদি দেখা যায় যে কারো কোনো সমস্যা নেই, তখন আমি পরামর্শ দিই যে তোমরা আরো এক বছর বিনা চিকিৎসায় চেষ্টা করো। তখন দেখা যায় ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রে গর্ভে সন্তান চলে আসে। আরো ১০ শতাংশ আর এক বছর চেষ্টা করলে সন্তান ধারণে সক্ষম হয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে মূলত ১০ শতাংশ আইভিএফ পদ্ধতি নেয়া বা বন্ধ্যাত্বজনিত চিকিৎসার উপযুক্ত। অর্থাৎ টেস্টটিউব বেবি গ্রহণের পদ্ধতি মাত্র ১০ শাতংশ রোগীর জন্য প্রযোজ্য। ফলে বিয়ের আগে এটা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই।

বাংলাদেশে আইভিএফ পদ্ধতির বিষয়ে কোনো নীতিমালা বা আইনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন?

অনেক সেন্টারে দেখা যায়, যিনি আইভিএফ পদ্ধতির কাজটি করছেন তিনি মূলত গাইনি রোগ বিশেষজ্ঞ নন। তিনি শুধু কোনো একটি কোর্স করে টেস্টটিউব বেবি জন্মানোর পদ্ধতিটি শিখেছেন। সে সব ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের কাছে রোগীরা গেলেই তারা টেস্টটিউব বেবি নেয়ার জন্য পরামর্শ দেন। বিষয়টি মোটেও ঠিক নয়। কারণ এ চিকিৎসার অনেকগুলো ধাপ রয়েছে। যখন কোনো চেষ্টা বা চিকিৎসায়ই আর সম্ভাবনা থাকে না তখন টেস্টটিউব বেবি নিতে হয়। অনেক জায়গায় এআরটির একটি নীতিমালা রয়েছে। আমাদের এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্টিলিটি সোসাইটি আছে। তারা স্বল্প খরচে আইভিএফ সেন্টার তৈরির জন্য একটি গাইডলাইন তৈরি করছে। আমরা সেখানে অংশগ্রহণ করেছি। সেটি চলে এলে সেটার আদলে আমাদের দেশে একটি গাইডলাইন আমরা করব। একই সঙ্গে আইনকানুনও তৈরি করা হবে।