বন্ধ্যাত্ব নিরসনে বেশ সুনামের সঙ্গে চিকিৎসা দিচ্ছে এনাম আইভিএফ অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি সেন্টার। বর্তমানে যথাযথ মানের সেবা বজায় রেখে ভবিষ্যতে নিজেদের আরো দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। সেসব নিয়েই বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. আনোয়ারুল কাদের নাজিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শর্মিলা সিনড্রেলা
আইভিএফ সেবা এখন দেশেই সহজলভ্য। আগে যেখানে দেশের বাইরে গিয়ে এ সেবা নিতে হতো, এখন আর তা করতে হচ্ছে না। তার পরও দেশের বাইরে আর দেশের ভেতরেই চিকিৎসার মধ্যে কী ধরনের পার্থক্য রয়েছে?
আগে আমাদের দেশে বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু এখন আমাদের দেশে এ বিষয়ক অনেক সেন্টার হয়ে গেছে। এখন অনেক বেশি কনসালট্যান্ট আছেন, যারা ইনফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করেন। তারা অনেক ভালো চিকিৎসা দিচ্ছেন আমাদের দেশে। আমার দৃষ্টিতে এখন আমাদের দেশ থেকে কোনো রোগীর আর বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ আপনি জানেন, ইনফার্টিলিটি চিকিৎসা একটা লম্বা পদ্ধতি। এখানে স্বামীর অসুবিধা থাকতে পারে, স্ত্রীর অসুবিধা থাকতে পারে অথবা স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই অসুবিধা হতে পারে। সেক্ষেত্রে লম্বা প্রসিডিউর মানতে হয় এবং অনেক দিন চিকিৎসকের অধীনে থাকতে হয়। চিকিৎসা নিতে বিদেশে যাওয়ার জন্য তখন অনেক কিছু স্যাক্রিফাইস করতে হয়। যারা ব্যবসা করে তাদের ব্যবসা রেখে যেতে হয়। চাকরি করলে চাকরি থেকে লম্বা ছুটি নিতে হয়। অথবা কর্মস্থল থেকে অনেক দূরে থাকতে হয়। এতে করে ব্যক্তির কর্মজীবনের ক্ষতি হয়। পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেলে সেখানে হোটেলে থাকা, প্লেন ভাড়া এবং চিকিৎসার ব্যয়ও অনেক বেশি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তার থেকে অন্তত ১০ গুণ কম খরচে সঠিক চিকিৎসা নিতে পারে। তাছাড়া সঠিক মানের চিকিৎসা দিতে দেশী ইনফার্টিলিটি সেন্টারগুলো সক্ষম। তাই এখন আর এ সমস্যার জন্য বিদেশে যাওয়ার দরকার নেই বরং বিদেশে গিয়ে আমরা সময় ও অর্থ, দুটিরই অপচয় করছি। এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমরা ২০২২ সালে ফেব্রুয়ারিতে ইনফার্টিলিটি সেন্টারের কার্যক্রম শুরু করেছি। সেই হিসেবে আমরা এখন পর্যন্ত কয়েকশ রোগীকে বহির্বিভাগে চিকিৎসা দিয়েছি। এছাড়া বহু রোগীর আমরা টেস্টটিউব বেবি পদ্ধতি, যেটাকে আমরা আইভিএফ বলি, এ চিকিৎসা দিয়েছি। আমাদের সফলতার হারও অনেক ভালো, প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ। এর মধ্যে আমরা অনেকের ডেলিভারি সম্পন্ন করেছি। যেমন এখনো সালমা নামের এক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। যিনি আমাদের এখানে আইভিএফের মাধ্যমে গর্ভধারণ করেছেন এবং তার ডেলিভারির জন্য আমরা পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে আছি। আমাদের কনসালট্যান্টরা তাকে অবজারভেশনে রেখেছেন। এর আগেও আমরা বেশ কয়েকটি ডেলিভারি করেছি। যার সম্পূর্ণ ভিডিও, রেকর্ড, ছবি, সবকিছুই আমাদের কাছে আছে। আমরা মনে করি, অন্যান্য সেন্টার যেগুলো আছে তারাও ভালো কাজ করছে। তবে এনাম মেডিকেল কলেজ যখনই কোনো কাজ করে বা কোনো ডিপার্টমেন্ট চালু করে সেটা যেন আন্তর্জাতিক মানের হয় সে রকম পরিকল্পনা মাথায় নিয়েই করে। আমাদের সব ধরনের ইকুইপমেন্ট, লোকবল, আমাদের সেফটি লেভেল এবং আমাদের ইনফার্টিলিটি ল্যাব আমরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডে মেনটেইন করি। যার কারণে গত এক বছর চার মাসের মধ্যেই আমাদের এনাম মেডিকেলের আইভিএফ সেন্টারের অত্যন্ত সুনাম হয়েছে। আমি মনে করি, এটা এখন ওয়ান অব দ্য বেস্ট সেন্টার ইন বাংলাদেশ।
দেশেই আইভিএফ সেবা নিশ্চিত হলে তা দেশের অর্থনীতিতে কতটা ভূমিকা রাখবে?
একটু আগে আমি বলেছি, আমরা যদি দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করি তাহলে প্রথম দিন থেকেই আমাদের ডলার খরচ করতে হচ্ছে। ডাক্তারের ভিজিট ফি, প্লেনের টিকিট, হোটেল ভাড়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফি সবকিছুর জন্যই আমাদের ডলারে কনভার্ট করে ব্যয় মেটাতে হয়। সরকার চেষ্টা করছে দেশে ডলার কীভাবে আর্ন করা যায় বা কীভাবে রেমিট্যান্স নিয়ে আসা যায়। অপ্রয়োজনে যাতে ডলার খরচ না করি সেই উৎসাহ দিচ্ছে। যদি এই চিকিৎসা দেশে হয় তাহলে মূল্যবান ডলার বেঁচে যাবে। দেশে যে চিকিৎসা ব্যয় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা হবে সেটা বিদেশে করতে গেলে ২৫-৩০ লাখ টাকা চলে যাবে। আমি জানি, ভারত, সিঙ্গাপুর, ব্যাংককে অনেকে যাচ্ছেন। তারা এসে আমাদের সঙ্গে আলাপ করেন, কত গুণ টাকা খরচ হচ্ছে। এ টাকাটা পুরোপুরি ডলারে খরচ করতে হচ্ছে, যা আমাদের দেশের জিডিপিতে কোনো সুফল বয়ে আনছে না বরং আমাদের রিজার্ভের জন্য ক্ষতি। তাই আমরা যদি চিকিৎসাটা আমাদের দেশেই করে থাকি তাহলে ডলার খরচ হবে না। আমরা আমাদের বাংলা টাকায় চিকিৎসা ব্যয় বহন করব এবং টাকাটা শুধু হাতবদল হবে। আমার কাছ থেকে বাংলাদেশী ভাই বা ডাক্তার বা প্রতিষ্ঠানে যাবে। সেটা আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।
এক বছর আগে যাত্রা করে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইভিএফ অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি সেন্টার। এ এক বছরে আপনাদের আইভিএফ সেবার অগ্রগতি কতটা হয়েছে?
আমাদের এখানে এনাম নিউরো সেন্টার, এনাম কার্ডিয়াক সেন্টার, এনাম ক্যান্সার সেন্টার এবং এনাম আইভিএফ সেন্টারসহ বহু সেন্টার আছে। প্রতিটি সেন্টারে আপনি গিয়ে দেখবেন, পৃথিবীর সেরা মেশিন, সেরা ইকুইপমেন্ট, সেরা টেকনলজি ব্যবহার করে আমরা সেন্টার পরিচালনা করি। দেশের দক্ষ ম্যানপাওয়ার যেমন—ফিজিশিয়ান, সার্জন, টেকনোলজিস্ট, নার্স এবং অন্য ওয়ার্কাররা আছেন। এরা প্রত্যেকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এখানে কাজ করেন। যার কারণে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সবসময়ই একটা স্ট্যান্ডার্ড মেনটেইন করে এবং সে কারণেই আজকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এনাম মেডিকেল কলেজের এত সুনাম। এত অল্প টাকায় মানুষকে অনেক ভালো চিকিৎসা দিচ্ছি। অনেক ভালো চিকিৎসকরা এখানে কাজ করছেন। পৃথিবীর সেরা ইকুইপমেন্ট এবং টেকনোলজি ব্যবহার করে আমরা এখানে সেবা দিয়ে যাচ্ছি।
যেকোনো প্রযুক্তির আধুনিকায়নে গবেষণার বিকল্প নেই। দেশে বর্তমানে যে ধরনের আইভিএফ সেবা প্রচলিত আছে তা উন্নীতকরণে কি আপনারা বৈজ্ঞানিক গবেষণার পরিকল্পনা করছেন?
পৃথিবীর অন্য উন্নত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আমরা কোলাবরেশন করে থাকি। আমাদের চেয়ারম্যান ডা. মো. এনামুর রহমান এমপি এবং আমি, আমরা সবসময় চেষ্টা করি বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশগুলোয় গিয়ে গিয়ে তাদের সেরা সেন্টারগুলোয় কী আছে এবং সেখান থেকে ম্যানপাওয়ারের সঙ্গে একটা কোলাবরেশন করা, ইনস্টিটিটিউট কোলাবরেশন এবং সবসময়ই আমরা গবেষণার ওপর নজর রাখি। বৈজ্ঞানিক রিসার্চ আমরা করতে থাকি, যাতে এখানে যারা কাজ করেন তাদের দক্ষতার উন্নয়ন হয়। সেই সঙ্গে আমরা নজর রাখি পৃথিবীর সেরা সেরা টেকনোলজি কোথায় কোথায় বের হয়েছে, কোথায় কাদের সঙ্গে কোলাবরেশন করলে আমাদের দেশ উপকৃত হবে, মানুষ উপকৃত হবে, রোগী উপকৃত হবে। আমরা সবসময় এটা করে থাকি। এ ধরনের কোলাবরেশন আমাদের সঙ্গে ভারতে আছে, সিঙ্গাপুর, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় আছে। যুক্তরাষ্ট্রেও আমরা একটি কোলাবরেশন করতে যাচ্ছি। এসব মিলিয়েই এনাম মেডিকেল আজ এ জায়গায় পৌঁছেছে।
শ্রুতলিখন: এমএসআই খান





