এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রায় সকল স্পেশালিটির সেবা প্রদান করে আসছে। চিকিৎসকের আন্তরিক সেবা আর ম্যানেজমেন্টের দক্ষতার কারণে এ অঞ্চলের আপামর জনগোষ্ঠীকে আর টারসিয়ারি চিকিৎসা সেবার জন্য রাজধানী মুখে দৌড়াতে হয় না। পাশাপাশি আমাদের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সর্বশেষ যে চিকিৎসা ব্যবস্থার সংযোগ করেছেন তা হলো ‘এনাম ইনফার্টিলিটি সেন্টার’। যত দিন গড়াচ্ছে মানুষ তত ব্যস্ত হচ্ছে। মানুষের মধ্যে সন্তান ধারণের অক্ষমতাও বাড়ছে। তবে উন্নত বিশ্বের মতো এ ব্যাপারে আমাদের দেশেও ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ এলাকার নিঃসন্তান দম্পতিদের মাতৃত্বের স্বাদ ফিরিয়ে দিতেই আমাদের এ প্রয়াস। বর্তমানে এ পদ্ধতি নিয়ে বেশ সফলতার সঙ্গে কাজ চলছে। বেসরকারিভাবে দেশে বেশ কয়েকটি আইভিএফ সেন্টার রয়েছে। সঠিক পরিচর্যা ও প্রক্রিয়ায় চিকিৎসকের ব্যবস্থাপনায় থাকলে এ পদ্ধতির সাফল্যের হার ৯০ শতাংশ। এটি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও সহজ পদ্ধতি। বর্তমানে মানুষের মধ্যে প্রচলিত কুসংস্কার ও কু-ধারণার অবসান ঘটছে বা কমছে বলে মানুষ এ পদ্ধতিতে আকৃষ্ট হচ্ছে।

তারপরও এখনও কেউ কেউ মনে করেন, টেস্টটিউব বেবি মানে কৃত্রিম উপায়ে জন্ম দেয়া কোনো শিশু। কাজেই আইভিএফ পদ্ধতিতে কৃত্রিম উপায়ে এভাবে সন্তান লাভে ধর্মীয় বাধা থাকতে পারে। কিন্তু কৃত্রিম উপায়ে টেস্টটিউব বেবির বিষয়টি মোটেই তা নয়। বিভিন্ন রোগের যেমন বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে, তেমনি এটিও একটি বন্ধ্যাত্ব রোগের আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। এ পদ্ধতিরও বিভিন্ন কৌশল রয়েছে।

নির্দিষ্ট কিছু কারণে বন্ধ্যাত্ব হলে সেক্ষেত্রে আইভিএফ পদ্ধতির সাহায্য নিতে হয়। নিঃসন্তান দম্পতি এই চিকিৎসা গ্রহণ করে সুস্থ সন্তানের বাবা-মা হতে পারেন। একজন স্বাভাবিক গর্ভধারিণীর জরায়ুতে বেড়ে ওঠা শিশুর জীবন প্রণালির সঙ্গে আইভিএফ শিশুর জীবন প্রণালির কোনো পার্থক্য নেই। তাছাড়া এ পদ্ধতিতে সন্তানের জন্মদানের প্রক্রিয়াটি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। 

তারপরও দেশের যেসব মানুষের মধ্যে কুসংস্কার রয়েছে সেগুলো দূরীকরণে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। ১. সরকারি-বেসরকারিভাবে আইভিএফ নিয়ে গবেষণা কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে হবে। এতে আইভিএফকে সহজ ও সময়োপযোগী চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে কীভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে আনা যায় তা জানা যাবে। কেননা এটি ব্যয়বহুল পদ্ধতি হওয়ায় মানুষের কুসংস্কার দূর হলেও চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হবে না। ২. আইভিএফ সম্পর্কে সঠিক ধর্মীয় বিধান মানুষকে জানাতে হবে। কেননা, এ পদ্ধতিতে ইসলামের বা অন্য ধর্মের কোনো বিধি নিষেধ না থাকলেও মানুষ এটাকে অনৈতিক মনে করে। ৩. আইভিএফ পদ্ধতি সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

আমাদের কাছে যখন কোনো বন্ধ্যাত্বের শিকার রোগী আসেন তখন আমরা যথেষ্ট সময় নিয়ে তাদের কাউন্সেলিং করি। তাদের দুজনকে আলাদা আলাদা এবং একসঙ্গে নিয়ে পুরো সমস্যা বোঝার চেষ্টা করি, সমস্যা বের করার চেষ্টা করি। মানসিক সমর্থন দিই। সমস্যা যারই হোক সর্বোচ্চ চেষ্টা এবং চিকিৎসার সুলভ্যতা তাদেরকে জানাই। সর্বোপরি ফেসবুক, ইউটিউব এবং অন্যান্য মিডিয়ার ইতিবাচক মোটিভেশনগুলোও এক্ষেত্রে কাজ করে। এছাড়াও জনসাধারণের মধ্যে থেকে কুসংস্কার দূর করার জন্য বিভিন্ন লিফলেট, ব্যানারে গুচ্ছ গুচ্ছ তথ্য দেয়ার অনেক ভূমিকা রয়েছে।

সন্তান ধারণে অক্ষমতা দেখা দিলে আগের তুলনায় এখন আইভিএফের প্রবণতা অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। কারণ মিডিয়া বা ফেসবুকের কল্যাণে মানুষ এখন অনেক সচেতন। আগে থেকে সময় নষ্ট না করে তারা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন এবং চিকিৎসার সকল পদ্ধতি সহজলভ্য হওয়ার কারণে সেগুলো গ্রহণ করেছেন। সর্বোপরি আগের তুলনায় এখন মানুষের মধ্যে কুসংস্কার অনেক কম। 

বাংলাদেশে আইভিএফ ভবিষ্যৎ ভালো। বর্তমানে বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় বাংলাদেশে নতুন নতুন বিভিন্ন সেন্টার হচ্ছে, বিশেষজ্ঞ এফসিপিএস ডাক্তার তৈরি হচ্ছে প্রতি বছর, আমাদের দেশে বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টার আছে, দেশে এবং দেশের বাইরে থেকে বিভিন্ন উন্নত পদ্ধতির ট্রেনিং নেয়া সুলভ/সহজ হয়েছে, এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি/বেসরকারি হাসপাতালে আইভিএফ ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

আমরাও আইভিএফ সেন্টারের মান বজায় রাখতে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছি। যেমন: প্রবেশাধিকার সীমিত করা, কঠোরভাবে হাইজিন মেইনটেইন করা, ইএসএইচইই গাইডলাইন অনুসরণ করা, ইনকিউবেটর ক্যালিব্রেশন করা, দরকার পড়লেই যেকোনো যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা, নিয়মিত চরপাশ পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা, সবসময় যন্ত্রপাতি পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন করা ইত্যাদি করে থাকি আমরা।

লেখক: কনসালট্যান্ট, এনাম আইভিএফ অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি সেন্টার