গত ১ এপ্রিল জন স্টিনহুইসেন জোহানেসবার্গে একটি ত্রিদেশীয় কংগ্রেসে দক্ষিণ আফ্রিকার বৃহত্তম বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (ডিএ) নেতা নির্বাচিত হন। দলের দুই হাজার সদস্যের সামনে দেয়া বক্তৃতায় তিনি ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আফ্রিকার ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) হাত থেকে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং পুনরায় নির্বাচিত হওয়া ঠেকানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। পাশাপাশি স্পষ্ট করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী দল ইকোনমিক ফ্রিডম ফাইটার্সের (ইএফএফ) সঙ্গে কোনো প্রকার জোট গঠন ঠেকানোর কথা। স্টিনহুইসেন তার বক্তব্যে বলেন, ‘‌নির্বাচনের আগে যে মাসগুলো আছে, এর মধ্যেই ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স নিজেদের এক নম্বরে নিয়ে যাবে। ঠেকানো হবে এএনসি ও ইএফএফকে।’

গণতান্ত্রিক সূচনা ও ১৯৯৪ সালের বর্ণবাদ অবসানের পর আগামী বছরের নির্বাচনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে এএনসিকে নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকার পরও ৫০ শতাংশ ভোট পাবে কিনা, যা ক্ষমতায় থাকার জন্য প্রয়োজন। আফ্রিকার সবচেয়ে শিল্পোন্নত এলাকাগুলো কভিড-১৯ ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে পুনরুদ্ধারে লড়াই করছে। দেশের এক-তৃতীয়াংশ এখনো বেকার। তার ওপরে বেড়েছে অপরাধের হার। দেশে অভিবাসী বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে অপরাধ প্রবণতা। লোডশেডিং এখন প্রতিদিন ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত হয়।

দেশটিতে সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ২০২৩ সালের শুরুতে রাষ্ট্রপতি সিরিল রামাফোসা তার পূর্বসূরি জ্যাকব জুমাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, যিনি দুর্নীতি ও ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের দায়ে জেলে গিয়েছিলেন। সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করার ফলে তিনি রাষ্ট্রীয় আইনে কারাবন্দি হন। এদিকে এএনসিও সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার প্রধান কারণ পরিবর্তনশীল জনগণের কারণে তাদের সমর্থন কমছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুসারে, ২ কোটি ৭০ লাখ নিবন্ধিত ভোটার এবার। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে এক কোটি ভোটারই ১৮-২৯ ও ৩০-৩৯ বয়সী। এ বয়সী ভোটাদের কাছে নেলসন ম্যান্ডেলা একজন ঐক্যের প্রতীক। দেশটির বর্ণবাদ-পরবর্তী প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি আলোচিত হলেও তার অবস্থান দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতি ন্যায়বিচারের নয়, ঐক্যতেই সীমাবদ্ধ। এসবই ডেমোক্রেটিক পার্টিকে সরকারি দলকে পরাজিত করতে সহায়তা করবে। ডিএ ক্ষমতায় আসার আগেই দেশকে গুছিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছে। তবু এএনসির সমর্থনের কারণে দলটিকে পরাজিত করাকে কঠিন হতে পারে। এমনকি কোনো একত্রীকরণ ছাড়াই রামাফোসা ও ইএফএফের নেতা জুলিয়াস মালেমা আলাদাভাবে গ্রামীণ ও শহুরে এলাকায় ডিএর জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছেন।

জাতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক

২০০০ সালে শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু শাসনের অংশ ছিল এমন দলগুলো একীভূত হওয়ার পর জন্ম হয়েছে ডিএ দলটির। নিজেদের তারা বিস্তৃতভাবে কেন্দ্রবাদী বলে দাবি করে। এটি পশ্চিম কেপকে শাসন করে, যা দেশের তৃতীয় বৃহত্তম প্রদেশ। ২০২২ সালের প্রথম তিন মাসে দেশের জিডিপি ১৪ শতাংশ অবদান রেখেছে। এই কেপ টাউনেই অবস্থিত সবচেয়ে বড় আইন সভা। দলটি নির্বাচনে নিজেদের শক্তিশালী ভিত জাতীয় স্তরে গড়ে তোলার আশা করছে। সংসদে ৪০০টি আসনের মধ্যে এএনসি দল ২৩০টি আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেছে। সেখানে ডিএ ৮৪টি, এএফএফ ৪৪টি ও ১১টিতে রয়েছে অন্যান্য দল।

স্টিনহুইসেন শুরু থেকেই ডিএতে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি ২০১১ সাল থেকে সংসদ সদস্য ছিলেন ও ২০১৯ থেকে দলের নীতিনির্ধারক। সেদিক থেকে পাঁচ বছর ধরে সংসদে তিনি ডিএর চিফ হুইপের দায়িত্ব পালন করছেন। তার সমর্থকরা বলছেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৪৭ বছর বয়সী এ ব্যক্তি দলকে বিজয়ের দিকে নিয়ে যাবে। দলের গৌতেং প্রদেশের নেতা সলি মসিমাঙ্গা আল জাজিরাকে জানান, স্টিনহুইসেন ২০২৪ সালের নির্বাচনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করার পাশাপাশি দলের গতিশীলতাকে বাড়াবে। স্টিনহুইসেন ডিএর আগামী দিনের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন কিনা এ নিয়ে বিশ্লেষকরা দুই ভাগে বিভক্ত। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড্যানিয়েল সিল্ক বলেন, ‘আমি মনে করি ডিএ সবচেয়ে বড় একটি রাজনৈতিক বিরোধী দল হিসেবে আছে। তার পদচিহ্ন রয়েছে দেশজুড়ে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও টেকনোলজি ইউনিভার্সিটির রাজনীতিবিষয়ক প্রভাষক লেভি এনডো বলেছেন, ‘‌দলটি আসলেই এনএনসিকে পরাজিত করতে পারে কিনা তা এখনই বলা খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।’ ঐতিহাসিকভাবে ডিএ দলটিতে শ্বেতাঙ্গদের সংখ্যাই বেশি। কয়েক দশক ধরে দল থেকে উচ্চপদের কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদেরও বহিষ্কার করা হয়েছে, যা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বহু সাংস্কৃতিক দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দলের সাবেক নেতা এমমুসি মাইমনে ২০১৯ সালে দল থেকে চলে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দলের পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনার সঙ্গে মতবিরোধ আছে। বর্তমান পর্যটনমন্ত্রী প্যাটিসিয়া ডি লিলি আগে কেপ টাউনের মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘‌যখন লোকেরা আপনার অপব্যবহার করবে, তখন আপনাকে অবশ্যই চলে যেতে হবে।’

যদিও ডিএ নেতা গৌতেং সোলি মসিমাঙ্গার  এ দাবিকে ‘‌আবেগি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘যখন লোকেরা ডিএ ছেড়ে চলে যায়, তখন এটি একটি বড় ইস্যু। আমাদের পরিকল্পনাটি স্পষ্ট। আমরা নিজেদের দল তৈরি করতে চাই। জনগণের কাছে পরিষ্কার করতে চাই আমাদের অবস্থান। তুলে ধরতে চাই মূল্যবান প্রস্তাবগুলো। এটিই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’ তার পরও দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘জাতিসত্তা’ এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে এবং অধিকাংশ সম্পদ সংখ্যালঘুদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

অনুঘটক হিসেবে সংখ্যা

দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে অন্যান্য দেশের মতো নির্বাচনে জয়লাভ সংখ্যার বিষয়।

আইসি পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৯ সালে ডিএ ভোটের ২০ দশমিক ৭৭ শতাংশ পেয়েছে। ২০১৪ সালে এটি ছিল ২২ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০১৪ সালের তুলনায় কমলেও ২০০৯ সাল থেকে বেড়েছিল ১৬ শতাংশ। কিন্তু সরকার দলের সমথর্নও ২০১৪ সালে ৬২ দশমিক ১৫ থেকে কমে ২০১৯ সালে ৫৭ দশমিক ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল।

বেশকিছু ভবিষ্যদ্বাণীও করা হয়েছে দলগুলোর জয়-পরাজয় নিয়ে। থিংক ট্যাংক ‘‌সোশ্যাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ অনুসারে, ৪৫ শতাংশ ভোট পাবে এএনসি দলটি এবং ডিএ পাবে ৩১ শতাংশ। স্টিনহুইসেনের জন্য পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করাটা এখন বিশ্বাসের বিষয়। তাই ২০২৪ সালের নির্বাচনের দিকে তিনি তাকিয়ে আছেন।

ডিএ নিজেই ছোট দলগুলোর সঙ্গে একটি জোট চাইছে। কিন্তু এর ব্যর্থ ইতিহাস দলগুলোর অংশীদারত্বে প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠতে পারে। ২০১৬ সালে জোহানেসবার্গের প্রধান শহরগুলোয় জোট সরকার পরিচালনা করেছিল। তিন বছরের মধ্যে এ দল ভেঙে যায় এবং পুরো ডিএ জোটের মেয়রকে অফিস থেকে বের করে দেয়। ২০২১ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরে ডিএ আবার ছোট দলগুলোর সঙ্গে জোটে গিয়েছিল। তাই অতীত পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষকদের মতে, ডিএর ক্ষমতায় যাওয়ার পথটি এখনো জটিল।

এখন প্রশ্ন কতজন ভোটার নতুন রাজনৈতিক দলকে ভোট দেয়ার জন্য প্রস্তুত। ২০ বছর বয়সী একজন ছাত্র ডিএকে নিয়ে আল জাজিরাকে বলেন, ‘‌আমি মনে করি তাদের জন্য দিকনির্দেশনা আছে, কিন্তু একই সময়ে তারা পরস্পরবিরোধী এবং তাদের কথা ও কাজের মিল নেই। তারা কেপটাউন শহরের জন্য দক্ষ কিন্তু আমি তাদের ভোট দিতে পারছি না। কারণ তারা ফিলিস্তিনের নির্দোষ শিশুদের হত্যা করা ইসরায়েলকে সমর্থন দিচ্ছে।’

ক্রিস্টাল অর্ডারসন: ম্যান্ডেলা স্কলার। দক্ষিণ আফ্রিকা ভিত্তিক সাংবাদিক

আল জাজিরা থেকে ভাষান্তর: ফারিহা আজমিন