পরিবর্তনহীন রাজনৈতিক উত্তরণ
দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশে ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন। তার মধ্য দিয়ে খুব সম্ভবত সরকারে থাকা দলগুলোই ফের আসবে ক্ষমতায়। যদিও ভুটানের কথা আলাদা। গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটে দেশটির ক্ষমতাসীন দল ছিটকে পড়েছে। ৯ জানুয়ারি অন্য দুটি দল অংশগ্রহণ করবে পরবর্তী ধাপের নির্বাচনে। তাদের মধ্যে একটা দল ভুটানের সরকার চালিয়েছে ২০১৩-১৮ পর্যন্ত।
শ্রীলংকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা সেপ্টেম্বরের আগেই, যদিও সে ব্যাপারে হুট করে বলার সুযোগ নেই। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে আশা করছেন এ বছরে দেশে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে, যা তাকে আগামী নির্বাচনে জয়লাভে সহযোগিতা করবে। কিন্তু শ্রীলংকার অনেকেই এখনো তার ওপর অসন্তুষ্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের সঙ্গে থাকা তার সম্পর্ক নিয়ে। গোতাবায়া রাজাপাকসে ২০২২ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন। দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ বাংলাদেশের জন্যও চিত্রটা বেশ নির্ধারিত বলা যায়। দেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী দল ভোট কারচুপিকে কারণ দেখিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করতে যাচ্ছে। তার মানে খুব সম্ভবত টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। পাকিস্তানের চিত্রও নজরে রাখার মতো। দেশটিতে ইমরান খানকে কারাগারে পাঠানোসহ বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন নির্যাতন এখনো চলমান। বিদ্যমান পরিস্থিতি মুসলিম লিগ-নওয়াজ দলের জন্য বিশেষ সুবিধা করে দিয়েছে। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার আগে রাষ্ট্রপরিচালনায় ছিল দলটি। দেশটিতে নির্বাচন হওয়ার কথা ৮ ফেব্রুয়ারি।
এদিকে আগামী এপ্রিলে হতে যাওয়া নির্বাচনে ভারতে টানা তৃতীয়বারের মতো জিততে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি। দেশটিতে একদিকে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা আর অন্যদিকে দুর্বল ও বিভক্ত বিরোধী দল। ভারতে বেশির ভাগ ভোটার ক্ষমতাসীন দলের বিজয়কে সহজভাবেই নেবে। কিন্তু বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে বিরোধী দলকে দুর্বল করে রাখা হয়েছে দমনের মাধ্যমে। ক্ষমতায় থাকা দলের বিজয় দেশ দুটির জন্য তৈরি করবে রাজনৈতিক টানপড়েন।
বৃহত্তর সংযোগের পদক্ষেপ
দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সংযোগহীনতার কারণে কুখ্যাতি কুড়িয়েছে। তবে ২০২৪ সালে গোটা চিত্র বিপরীত দিকে বাঁক নিতে পারে। ভুটান এ বছর ভারতের সঙ্গে নতুন আন্তঃসীমান্ত রেল প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প। গত সেপ্টেম্বরে ভারত ট্রান্সন্যাশনাল যোগাযোগ প্রকল্পের চুক্তি সই করেছে, যা পরিচিত ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে। বাংলাদেশ সমুদ্রের তলদেশে বড় টানেল খোলার মধ্য দিয়ে এবং পাকিস্তান চীনের অর্থায়নে রেলপথ চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ এগিয়ে গেছে। এমনকি তালেবান নেতৃত্বাধীন আফগানিস্তানও যুক্ত হতে যাচ্ছে এ প্রবণতায়। তাদের সরকার চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যোগ দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছে।
২০২৪ সালের বড় পরকিল্পনাগুলো কী হবে, সেটা কয়েকটি নিয়ামকের ওপর নির্ভর করে। তাদের মধ্যে একটি নিরাপত্তা। চীন আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি নিয়ে চিন্তিত। যদি এ সন্ত্রাসবাদ আরো বাড়ে, তাহলে বিনিয়োগ পরকিল্পনা গতি হারাতে পারে। অন্যদিকে গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিতে পারে। পরিকল্পনার পেছনে আরেকটি জরুরি বিষয় হলো প্রয়োজনীয় অর্থায়নের সামর্থ্য। সেটা বিশেষ করে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভারত-ভুটান রেলপথ পরিকল্পনার জন্য। পরিকল্পনার ভেতরে নতুন রাস্তা ও একটি বিমানবন্দর রয়ছে। সবিশেষ, ভারতের প্রকল্পগুলোর মধ্যে আমলাতান্ত্রিক ঝুঁকিও রয়েছে। এটি আন্তঃসীমান্ত অবকাঠামো উদ্যোগের ক্ষেত্রে বড় বাধা।
উন্নয়নশীল দেশ নিয়ে পরীক্ষায় ভারত
২০২২ সালে ভারত পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৩ সাল হবে ভারতের জন্য সুযোগের বছর। ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি ও জি ২০ দেশের নেতৃত্ব নিয়ে দেশটি বৈশ্বিকভাবে ভাবমূর্তি বাড়াতে প্রস্তুতি নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভারত তা করতে সক্ষমও হয়েছে। এর বাইরে রয়েছে চাঁদে অবতরণ ও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের আয়োজন করার মতো প্রাপ্তিগুলো। ক্রিকেট বিশ্বকাপ ও সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনও হয়েছে দেশটিতে। ২০২৪ সালে ভারত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে। তখন দেশটির হাতে জি ২০ দেশগুলোর নেতৃত্ব থাকবে না। অথচ এ ফোরামের মধ্য দিয়েই নয়াদিল্লির পররাষ্ট্রনীতির বড় একটা দিক অনুমোদিত হয়েছে। সে পররাষ্ট্রনীতি হলো উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশের মধ্যকার সেতুবন্ধন। নয়াদিল্লি এদিকে অগ্রাধিকার দেবে। তবে এগিয়ে যেতে হবে জি ২০-এর নেতৃত্ব দেয়ার সুবিধাটা ব্যতিরেকেই।
নয়াদিল্লির সাফল্য পরিমাপের একটা মানদণ্ড হলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে তার উচ্চ পর্যায়ের কূটনীতি। সে তালিকায় ছোট ও কৌশলগত কম গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোও রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ভারত রীতিমতো চীনের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে। চীন নিজেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোড়ল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। দেশগুলোর ওপর নয়াদিল্লির চেয়ে বেইজিংয়ের প্রভাব এখনো বেশি। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায় প্রভাব বিস্তারে অনেক এগিয়ে চীন।
পশ্চিমা দুনিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক শক্তিশালী না। ভারতের সঙ্গে সে তুলনায় ভালো। এ সুবিধা নিয়ে নয়াদিল্লি উন্নয়নশীল দেশ ও উন্নত দেশের মধ্যকার সেতুবন্ধনকারী হিসেবে নিজের অবস্থান পোক্ত করার সুযোগ নিতে পারে। কিন্তু তার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করতে হবে নানা রকমের প্রতিবন্ধকতা নিরসনে। আর সেটা ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র আর কানাডার পক্ষ থেকে আসা বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগকে মাথায় নিয়েই।
রুশ অনুঘটক
দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে আলোচনার টেবিলে বাইরের প্রভাব হিসেবে সবার আগেই আসে চীনের নাম। কিন্তু ২০২৪-এ অঞ্চলটির জন্য রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে। বছরের বেশির ভাগ সময়ই রাশিয়া ছিল ভারতের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের শীর্ষ সরবরাহকারী। এ বছরেই প্রথমবারের মতো চালান পাঠায় পাকিস্তানে। সেপ্টেম্বরে প্রথম রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সের্গেই ল্যাভরভ বাংলাদেশ সফর করেন। নভেম্বরে তিনটি রাশিয়ান নৌজাহাজ বাংলাদেশের বন্দরে ডক করে। রুশ নৌকর্মকর্তারা বাংলাদেশী নৌকর্মকর্তাদের সঙ্গে যৌথ মহড়ায় অংশ নেন।
রাশিয়া তার সীমানা ছাড়িয়ে প্রভাব বিস্তার করতে আগ্রহী। দেশটি দেখাতে চায় ইউক্রেন যুদ্ধে দুর্বল বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি। দক্ষিণ এশিয়াকে লক্ষ্যমাত্রায় রাখাটা কেবল এজন্য নয় যে এটি বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। এর কারণে এটাও যে রাশিয়া এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততার বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। আগে থেকেই থাকা চীনের উপস্থিতির সঙ্গে মিলে এ প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হবে। এ পটভূমিতে ২০২৪ সালে নজর রাখার মতো একটি দেশ হতে পারে নেপাল। এ বছর সরকার মস্কোর সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক দৃঢ় করার পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেছে। বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার বিনিয়োগ খোঁজ করছে দেশটি। আফগানিস্তানে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী চীন। খুব সম্ভবত কাবুলও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় রুশ পদচিহ্ন এ অঞ্চলে আগে থেকে বিদ্যমান পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতাকে আরো তীব্র করতে পারে। পাশাপাশি বাড়তে পারে দক্ষিণ এশিয়ার জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর ওপর প্রতিবন্ধকতাপূর্ব কূটনৈতিক প্রভাব।
মাইকেল কুগেলম্যান: ফরেন পলিসির লেখক ও পরিচালক, সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউট, উইলসন সেন্টার
ফরেন পলিসি থেকে ভাষান্তর: আহমেদ দীন রুমি





