২০২৪ সালে আধিপত্য বিস্তার করবে এমন একটি ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে আমি চোখ বন্ধ করে বলব মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কথা। অপ্রত্যাশিত কিছু না ঘটলে আমরা সম্ভবত জো বাইডেন বনাম ডোনাল্ড ট্রাম্পের লড়াইটা পুনরায় দেখতে পাব। যার ফলাফল একেবারে অনিশ্চিত। দোদুল্যমান ভোট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।

এ নির্বাচন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, পুরো পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের ফলাফল ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। আর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা কতটা ছড়াবে, তার ওপর নির্ভর করছে।

আমার অনুমান (দুঃস্বপ্নও বলা যায়) হলো গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আবেদনকে উপেক্ষা করতে থাকবে ইসরায়েল। যেখানে ২৩ লাখ ফিলিস্তিনি কয়েক দশক ধরে নিঃস্ব অবস্থায় বসবাস করছে। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসাবে ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে একটি সফরের সময় আমি হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখেছি। হামাসের গাজা দখলের প্রতিক্রিয়ায় ১৬ বছর আগে ইসরায়েল ও মিসর অবরোধ দিয়েছিল। এরপর থেকে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে।

গত ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে নৃশংসতা চালিয়েছে। এরপর থেকে গাজায় যে বর্বরতা তা সহ্য করার মতো না। ১৯৭৩ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটে কিনা তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। ওই সময় ইয়ম কিপুর যুদ্ধে ইসরায়েলের মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ওপেকের আরব সদস্যরা। এতে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেল উৎপাদকারী দেশগুলোর কোনো কিছু যায় আসে না। কারণ সরবরাহ কমলে দাম বাড়ে।

বিশ্বব্যাংক এরই মধ্যে সতর্ক করেছে যে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার বা তার বেশি বাড়তে পারে। এ সরবরাহ জটিলতা মূল্যস্ফীতিকে আরেক দফা বাড়াতে পারে। ঠিক যেমন মহামারী-পরবর্তী মূল্যস্ফীতি এখন নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে জো বাইডেনকে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের জন্য দায়ী এবং মধ্যপ্রাচ্যে অব্যবস্থাপনার জন্য অভিযুক্ত করা হবে। ট্রাম্প আমলে স্বাক্ষরিত আব্রাহাম চুক্তি ও ইসরায়েলের এক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। ন্যায়সংগত হোক বা না হোক আঞ্চলিক অশান্তি ট্রাম্পের পক্ষে জনমত তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচকমণ্ডলী এবং ভুল তথ্য আবারো একজন অযোগ্য মিথ্যাবাদীকে ক্ষমতায় বসাতে পারে। যিনি মার্কিন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্মূল করতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের মতো স্বৈরাচারী নেতাদের সঙ্গী হতে চান।

ট্রাম্প ফিরে এলে মন্দের ভালো হবে যদি কংগ্রেসে ডেমোক্রেটিকরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্য রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরির ঝুঁকি থেকে যায়। আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং আইনের প্রতি নমনীয় মার্কিন নীতি অতীতের বিষয় হয়ে যেতে পারে। কারণ ট্রাম্প এসব চুক্তি ও আইন পছন্দ করেন না।

ট্র্যাজেডি হলো বাইডেন একজন অসাধারণ সফল রাষ্ট্রপতি। তিনি ইউক্রেনের পরিস্থিতি অন্য কারো চেয়ে ভালোভাবে পরিচালনা করছেন। তার আমলে অবকাঠামো বিল, চিপ (সেমিকন্ডাটর) এবং বিজ্ঞান আইন, মূল্যস্ফীতি হ্রাস আইন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এর মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নতুন অর্থনৈতিক রূপ দিয়েছেন। ২০২৩ সালের শুরু থেকে তাকে রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের সঙ্গে মোকাবেলা করতে হয়েছে। যারা নিজেদের অনুপযুক্ত শাসক হিসেবে প্রমাণ করেছে। আর তারা নতুন কিছু করতে আগ্রহীও নয়।

রিপাবলিকান পার্টির একটি নীতি হচ্ছে আমেরিকানরা যা চায় তার বিপরীত কিছু করা। বেশির ভাগ ভোটার প্রত্যাবর্তনমূলক (রিগ্রেসিভ) কর এবং শ্রমবিরোধী নীতির বিরোধিতা করেছে। ট্রাম্প ক্রমাগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিজ্ঞানের ওপর আক্রমণ চালিয়েছেন। তার কথাবার্তা নারী অধিকারের বিপরীত। তবু রিপাবলিকানরা নির্বাচনী যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে থাকতে এবং বাইডেনকে বুড়ো হিসেবে দেখাতে সফল হয়েছেন।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে আমেরিকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে দুর্বলতা চোখে পড়ে। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য ভোক্তাদের পকেট কেটে উৎপাদকদের পকেটে জমা হবে। সীমিত করারোপের (উইন্ডফল ট্যাক্স) ফলাফল হিতে বিপরীত হতে পারে। এমনকি যদি বাইডেন কংগ্রেসে এ বিল পাস নাও করাতে পারেন, তবু এর পক্ষে শক্ত অবস্থান নিলে তিনি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবেন। ভোক্তারা জানবে যে বাইডেন তাদের জন্য লড়াই করছেন। একই সঙ্গে তিনি জ্বালানি তেল কোম্পানি ও রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। কে না জানে, রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারণায় জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলো অর্থায়ন করে। তবে আমি আশঙ্কা করি মহামারী চলাকালীন সীমিত করারোপের বিকল্প থেকে বাইডেন সরে আসবেন।

বাকি পৃথিবী এতটা ভাগ্যবান নয়। ইউরোপের দুর্বল আর্থিক নীতিমালা সংকুচিত অর্থনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে ব্যর্থ হয়েছে। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। চীনের রিয়েল এস্টেট খাতের সমস্যা এবং রফতানিতে শীতল যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে ওঠা প্রায় অনিশ্চিত। যদিও দেশটি সরকারি-বেসরকারি খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরো জোরালো করেছে।

দক্ষিণের দেশগুলোর (গ্লোবাল সাউথ) অত্যধিক ঋণ রয়েছে, যা বৈশ্বিক মন্দা ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে যদি সুদহার, জ্বালানি তেল ও খাদ্যের দাম খুব বেড়ে যায়।

গাজায় সহিংসতার আগে আমি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবর্তন আশা করেছিলাম। যদিও বাকি বিশ্বের জন্য তা আরো কঠিন ছিল। এখন ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে ফিরে আসার প্রবল সম্ভাবনাসহ আমি চারদিকে সীমাহীন দুর্দশার আশঙ্কা করছি। ১৯৩০-এর দশকের পর বিশ্ব সম্ভবত তার সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়ে প্রবেশ করছে।

জোসেফ ই স্টিগলিৎজ: অর্থনীতির অধ্যাপক, কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি। ২০০১ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী।

লা মঁদ থেকে ভাষান্তর: হানযালা হান