সবাই একরকম প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, ৪ নভেম্বর রাশিয়ার সরকারি ছুটির দিন থেকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তোড়জোড় শুরু হবে। যেহেতু মার্চেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নির্বাচন। কিন্তু তখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিকতা দেখা যায়নি নির্বাচন-সংক্রান্ত। কেউ ধরে নিয়েছে ক্রেমলিন নির্বাচনী সময়কে সংক্ষিপ্ত রাখতে চায়। কেউবা অনুমান করছেন, পুতিন সবকিছু এভাবেই চলে যেতে দিতে চাইছেন। যেটাই হোক, নির্বাচন নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ নেই মানুষের মধ্যে। ২০২৪ সালের জন্য খুব বড় একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হবে বলেও মনে করা হচ্ছে না। কারণ আগের নির্বাচনগুলোর মতো এবারো থাকবে কোনো প্রকার কৌতূহলবিহীন। নির্বাচনের ফলাফলও আগের থেকে আন্দাজ করে নেয়া যায় সহজেই। ভালো নির্বাচনের জন্য শক্তিমান প্রার্থী, চমকপ্রদ ইশতেহার ও নাগরিকদের রাজনৈতিক সংযুক্তি প্রয়োজন। তিনটি উপাদানই অনুপস্থিত এখানে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রার্থীরাও খুব বেশি প্রচেষ্টা চালান না। তার কারণ ভোটাভুটি তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বড় কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসে না। ভোটের শেষে প্রার্থী তার আগের দলীয় অবস্থানেই ফিরে যান; যেমনটা হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির নেতা গেনেডি জিউগানভ অথবা সের্গেই মিরোনভের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে কেউ পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক জীবন থেকেই উধাও হয়ে গেছেন। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা পাভেল গ্রুদিনিন, সের্গেই গ্লাজিয়েভ ও বিলিয়নেয়ার মিখাইল প্রোখোরভ। নির্বাচনী ইশতেহারও সেখানে আহামরি কোনো ভূমিকা পালন করে না। তার বড় উদাহরণ খুব সম্ভবত দীর্ঘদিন ধরে থাকা নজির। ২০১৮ সালে তেমন কোনো আয়োজনই করেননি প্রেসিডেন্ট পুতিন। ২০১২ সালে তার নাম পাওয়া যায় কেবল সংবাদপত্রের কতিপয় আর্টিকেলে। ইশতেহারের মানে হলো পরিবর্তনের প্রত্যাশা। বর্তমান রাশিয়ায় সংস্কার সম্পর্কিত সে সব পরিভাষা অনেকটাই অনুপস্থিত। তাছাড়া খোদ নির্বাচন নিয়েই আগ্রহে ঘাটতি রয়েছে জনগণের মধ্যে। ‘দেশের ভবিষ্যৎ আপনাদের ভোটের ওপর নির্ভর করছে’—এ ধরনের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল থাকে বেশ কম। নব্বইয়ের দশকের পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সত্যিকার অর্থে সেভাবে প্রতিযোগিতা হয়নি। বরং কেবল জোর দেয়া হয়েছে উৎসবপূর্ণ পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে। এ বছরে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আদর্শিক আলোচনা অগ্রাধিকার পাচ্ছে। রাশিয়ার রাজনৈতিক জীবন নির্বাচনের সময় আরো বেশি বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে।
সাধারণত প্রেসিডেন্সিয়াল মেয়াদ শুরু হয় রাজনৈতিক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে। বড় ধরনের পরিবর্তন আসে নীতিগত পর্যায়ে। প্রেসিডেন্টের প্রশাসনে এ ধরনের কাজের জন্য সরকারের নানা অফিস জড়িয়ে থাকে। যুক্তি বলছে এবারের নির্বাচনের পরে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসবে না। তার কারণ ইউক্রেনের সামরিক লক্ষ্যমাত্রা বিঘ্নিত হতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক টানাপড়েন বাড়বে না। রাশিয়ার ব্যবস্থার জন্য স্থিতিশীলতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সব জায়গায়ই একটা সীমারেখা থাকে। দেশটির ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি) এবং সিকিউরিটি কাউন্সিলের নেতৃত্ব ২০০৮ সালের পর থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমান প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্বে রয়েছেন ২০১২ সালের পর থেকে। প্রেসিডেন্টের প্রশাসনে নিযুক্ত জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে ২০১৬ সালে। মিখাইল মিশুস্তিন শিগগিরই দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন। এদিক থেকে তিনি পুতিনকেও অতিক্রম করে যাবেন। সংস্কারের অনেক জায়গা আছে। কিন্তু ক্রেমলিনের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়াটা বেশ কঠিন। কোনো কিছুর বদল হচ্ছে না, এর মানে হলো বিদ্যমান ব্যবস্থাকেই জারি রাখা। পাশাপাশি কার্যকর কর্মকর্তাদের পদোন্নতি স্থগিত রাখা। তরুণ আঞ্চলিক প্রশাসকদের কাছে মস্কোয় প্রবেশ অধরা হিসেবেই রাখা। অন্যদিকে পরিবর্তনকে বেছে নেয়ার মানে বাড়তি একটা চাপ তৈরি করা ব্যবস্থাপনায়। বর্তমানে এমনিতেই হরেক কিসিমের চাপ রয়েছে সরকারে। পাশাপাশি রয়েছে পরিবর্তন-পরবর্তী নানামুখী প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা। ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে তিনটি বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল দেশটিতে। প্রথমত, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ইউক্রেনের খারকিভ থেকে রাশিয়ার পিছিয়ে আসা। দ্বিতীয়ত, ২০২৩ সালের জুনে ভাগনার সৈন্যদের বিদ্রোহ এবং তৃতীয়ত, অক্টোবরে নর্থ ককেশাস অঞ্চলে অ্যান্টি-সেমেটিক কার্যক্রম। প্রথম সংকটের জবাবে রাশিয়া নতুন করে অভিযান সাজিয়েছে। পরিকল্পনা গুছিয়েছে, যা অনেকটাই সফল প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী দুটি সংকটের জবাব ছিল অনেকটাই নিরুত্তাপ থাকা। যেন কর্তৃপক্ষ বলতে চাইছে, চুপ থাকলে এমনিতেই কিছুদিন পর সবকিছু আড়ালে চলে যাবে। আর সত্যিকার অর্থেই সেটা হয়েছে।
তার পরও ক্রেমলিনের বারবার বহিঃশত্রুকে অভিযুক্ত করার প্রবণতা মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। অন্তত এটা প্রমাণ করে যে তাদের মধ্যে বিদেশী শত্রু সম্পর্কে একটা আতঙ্ক রয়েছে। নির্বাচনের আগে তারা কোনো প্রভাব ফেলতে পারে, এমন ভীতি থাকাও অমূলক না। সে অস্বস্তির মধ্যেই যদি ক্রেমলিন কোনো ভুল করে ফেলে, তবে তার ফলাফল নিশ্চয়ই অনুকূলে থাকবে না। কেউ অবশ্য আরো এক ধাপ এগিয়ে গেছেন এক্ষেত্রে। তারা মনে করেন, ইউক্রেনে অভিযানটি ছিল মূলত রাশিয়ার ভীতি থেকেই, যেন ২০২৪ সালের নির্বাচন পশ্চিমা দুনিয়া হস্তক্ষেপ করতে পারে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সে উৎকণ্ঠার সমাপ্তি ঘটবে। তবে এ বিষয়ে রাশিয়ার নেতাদের বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি।
প্রথম প্রশ্ন হলো তারা কি আরো কঠোর অভ্যন্তরীণ নীতি গ্রহণ করবে? সে ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেবে বলে নিশ্চয়তা নেই। অন্তত দেশের অভিজাতদের জন্য একটা মনোযোগের বিষয়। দ্বিতীয় প্রশ্ন, তারা কি রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও অভিজাতদের উত্থানকে দমিয়ে রাখবে? স্থিতাবস্থায় ব্যাঘাত ঘটায় এমন যেকোনো পরিবর্তন সত্যিকার অর্থেই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কারণ প্রবীণ প্রজন্মের মধ্যে তরুণ কর্মীদের সক্ষমতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তরুণরা পরিস্থিতিকে সামাল দিতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ। তৃতীয় প্রশ্ন, রাশিয়া কি যুদ্ধের দিকে আরো বেশি মনোযোগী হবে? এ প্রশ্নের জবাব দেয়া যথেষ্ট কঠিন। বিশেষ করে সামরিক প্রাপ্তি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনার জায়গা রয়েছে। তাছাড়া জনগণের কাছে রাশিয়া কীভাবে তার জনগণের কাছে যুদ্ধের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে, সেটাও বিবেচ্য। আর শেষ প্রশ্ন, রাশিয়ায় আধুনিকায়নের উপাদানগুলোর কীভাবে শুরুয়াত ঘটছে? বিশেষ করে কয়েকটি খাতে যখন সার্বভৌমকরণের প্রবণতা বাড়ছে। এ প্রশ্নগুলোর কোনোটিরই কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ক্রেমলিনের হাতে সুযোগ করে দেবে কিছু জবাব দেয়ার জন্য। তবে ক্রেমলিন এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে কিনা, সেটা নিয়েই নিশ্চয়তা নেই।
মিখাইল ভিনোগ্রাডব: প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট, সেন্ট পিটার্সবার্গ পলিটিক্স ফাউন্ডেশন
কার্নেগি পলিটিকা থেকে ভাষান্তর: মুহম্মদ আল মুখতাফি





