২০২৪ সালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা কী হতে যাচ্ছে? এমন প্রশ্নের শুধু একটি উত্তর দেয়া অন্য বছরগুলোয় কঠিন কাজ। কিন্তু এবার বিশ্বজুড়ে একটি ঘটনা নির্দ্বিধায় অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে যাবে। আর তা হলো নির্বাচন। সহজ ভাষায় বললে এটি ‘একটি নির্বাচনের বছর’ নয়, বরং ‘নির্বাচনেরই বছর’। আধুনিক নির্বাচনের ইতিহাসে কখনো একটি বছরে এতগুলো দেশে সরকার পরিবর্তনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এখনো জানা তথ্যমতে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬৪টি দেশে (সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন) নতুন সরকার নির্ধারণ করতে নির্বাচন হবে। এ নির্বাচনী দেশগুলোয় দুনিয়ার মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশ বাস করে। ব্লুমবার্গের মতে, বিশ্বের ৪২ শতাংশের বেশি জিডিপি নতুন নেতা নির্বাচনের সুযোগ নিতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এ দশকের বাকি বছরগুলোয় বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতি কোন দিকে বাঁক নেবে তার ফয়সালা হয়ে যাবে এ বছরেই। অনেকে বলছেন এ শতকে বিশ্বরাজনীতির গতিপথের ফয়সালা হয়ে যাবে এ বছরই। এ ধারণা অতিরঞ্জিত কিংবা অমূলক নয়। একটু নজর দিলেই তা স্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতের মতো বড় এবং সম্পদশালী দেশে নির্বাচন হবে। এসব দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা বেশ শক্তিশালী। আবার দক্ষিণ সুদানের মতো নড়বড়ে দেশেও হবে নির্বাচন। নির্বাচন হবে রাশিয়া, ইরানে যেখানে ভোট সরকার বদলে তেমন বড় ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাইওয়ান ও ইউক্রেনের মতো বিশ্বরাজনীতির ঘোলা হ্রদেও হবে নির্বাচন। এত দেশে নির্বাচনের কথা শুনে মনে হতে পারে এ তো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জয়জয়কার! অবশ্য দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষক সাইমন টিসডাল তেমনটা মনে করেন না। তার কথায়, ‘অদ্ভুতভাবে ভোটের এ অভূতপূর্ব উৎসব এমন সময়ে এসেছে যখন লিবারেল ডেমোক্রেসির ক্ল্যাসিক্যাল রূপ একনায়ক চীনের শি জিনপিং ও রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন, হাঙ্গেরির চরম দক্ষিণপন্থী-জাতীয়তাবাদী-জনতুষ্টিবাদী ফিডেসজ, কিংবা ভেনিজুয়েলা ও শাদের সামরিক শাসনের সমর্থক এবং ইসলামী চরমপন্থীদের হাতে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে গেছে।’
পরপর ১৭তম বছরে বৈশ্বিক স্বাধীনতার পরিমাণ কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাধীন ওয়াচডগ ফ্রিডম হাউজ তাদের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে। ৩৫টি দেশে রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা কমেছে, তবে ৩৪টি দেশে এ দুই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে অধিকারকর্মী জ্যাকব ম্যাকানগামা লিখেছেন পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আক্রমণের মুখে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে হেট স্পিচ, গুজব, চরমপন্থী প্রচারণা ঠেকাতে এসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যামি জেগার্ট মনে করেন এটা ‘খুবই প্রভাবসঞ্চারী’ একটি বছর হতে যাচ্ছে। তিনি একই সঙ্গে বছরটিকে অনিশ্চয়তার বছরও বলতে চান। তার কথায় প্রায় সব বিষয়েই বছরটিতে অনিশ্চয়তা দেখা যাবে—সুদহার, বাজার পরিস্থিতি, সরকারি বিধি-নীতি বিশেষত ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতি কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের প্রধান ভূ-অর্থনীতি বিশ্লেষক জেনিফার ওয়েলচ বলেছেন, ভূরাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে কয়েক দশকের মধ্যে এটাই খুব সম্ভবত টালমাটাল বছর হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফল কিংবা প্রতিশ্রুতি নতুন নতুন কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে এ বছরের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ভোটে জিততে চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন প্রার্থীরা। সেক্ষেত্রে নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে নতুন নতুন পরিবর্তন আসবে। এতে বিশ্বের অন্য অনেক দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানির জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
ভৌগোলিক আকারে বৃহৎ, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এমন কয়েকটি দেশে এ বছর নির্বাচন হবে। প্রাকৃতিক সম্পদে পূর্ণ ইন্দোনেশিয়া ও ভেনিজুয়েলা আছে তালিকায়। আছে রাজনৈতিকভাবে অস্থির দক্ষিণ সুদান; বিশ্ব রাজনীতির দুই হট স্পট পাকিস্তান ও তাইওয়ান। ২০১১ সালে আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিল যে দেশে সে তিউনিসিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে অক্টোবরে। ইউরোপে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম ও যুক্তরাজ্যে নেতৃত্ব পরিবর্তনের নির্বাচন হবে।
অনেকের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে তাইওয়ানের দিকে। ১৩ জানুয়ারি এখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের রেষারেষির বড় ময়দান ভূখণ্ড। বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেমোক্রেটিক প্রোগ্রেসিভ পার্টির লাই চিং-তে জিতে গেলে উত্তেজনা বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ এ প্রার্থীকে ঠেকাতে চীন তাদের পছন্দের প্রার্থী হৌ ইউ-ইহকে বিজয়ী দেখতে চাইবে।
ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ সারাহ ড্যাঞ্জম্যান ব্লুমবার্গকে বলেছেন, আগের থিতিয়ে থাকা সংঘাতগুলো মাথাচাড়া দেয়ায় আমরা অধিকতর সহিংসতা দেখতে পাচ্ছি। এখান থেকেই বড় বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি জন্ম নিচ্ছে। এ মুহূর্তে বিভিন্ন সংঘাত-সহিংসতায় চাপে আছে করপোরেট দুনিয়া। ইসরায়েল-হামাস লড়াই, চীন-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব অনেক মেরুকরণের সৃষ্টি করেছে, বড় কোম্পানিগুলোকে এসব মাথায় রেখে পথ চলতে হচ্ছে। চীপের বড় উৎপাদক তাইওয়ান, কিন্তু এখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের আধিপত্যের দৌড় বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকতে বাধ্য করছে।
ইউরোপের কয়েকটি দেশের ভোটে দক্ষিণপন্থীদের উত্থানের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে নতুন পরিস্থিতি হাজির হতে পারে। যুক্তরাজ্যে ২০২৪-এ ঋষি সুনাক লেবার পার্টির কেইর স্ট্র্যামারের কাছে পরাজিত হবেন, এমন ভবিষ্যদ্বাণী করছে বিভিন্ন জরিপ। কিন্তু ব্রিটেনের অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে স্ট্র্যামারকে বড় মেজরিটি নিয়ে জিততে হবে। রাশিয়ায় পুতিনের জন্য একরকম নিশ্চিত বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব ঘটনা ২০২৪-এ বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও বাজারে নতুন ট্রেন্ড তৈরি করতে পারে। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব ট্রেজারি ও হোয়াইট হাউজের সাবেক কর্মকর্তা ক্রিস্টোফার স্মার্ট মনে করেন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে নির্বাচন এখন অনেক বেশি প্রভাবসঞ্চারী ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সরকার বদল হলেই তাৎক্ষণিক নীতি বদলে যাবে তেমনটা সবসময় হয় না, কিন্তু ধীরে ধীরে রাষ্ট্র নতুন পথে চলতে শুরু করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গত বছর একটি জরিপ চালানো হয়, যারা প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক। এদের মধ্যে ৯০ শতাংশ মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের প্রতি হুমকি বাড়ছে। আর ৩০ শতাংশের কিছু কম আত্মবিশ্বাসী যে পাবলিক কোম্পানিগুলো এমন ঝুঁকি সামলে নিতে পারবে। জরিপটি ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সহযোগিতায় চালিয়েছে ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি সেন্টার।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ঈশ্বর প্রসাদ মনে করেন, এতগুলো নির্বাচন বিশ্ব অর্থনীতিতে যে টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি করবে, তাতে আরো অনিশ্চিত ও ঘোলাটে করে তুলতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ সংকুচিত হতে পারে।
বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা দেশগুলোয় বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। ইপসোসের একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, পশ্চিমা দেশগুলোয় অনেক মানুষ এখন বিশ্বাস করে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধনী ও ক্ষমতাবানদের পক্ষে থাকে আর বাকি সবাইকে উপেক্ষা করে।
আমেরিকায় প্রতি ১০ জনে সাতজন মনে করেন গণতন্ত্রের হাল বেহাল হয়ে যাচ্ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোয়। ফ্রান্সের ৭৩ শতাংশও এ বিষয়ে একমত। যুক্তরাজ্যে ১০ জনের ছয়জন মনে করেন পাঁচ বছর আগের চেয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখন কম কাজ করছে। ইউরোপের আরো অনেক দেশের মানুষ বলছে পরিবর্তন প্রয়োজন। যুক্তরাজ্য তাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে গর্ব করলেও গত এক বছরের কম সময়ে সেখানে দুজন অনির্বাচিত কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী চেয়ারে বসেছেন।
[দ্য গার্ডিয়ান ও ব্লুমবার্গ অবলম্বনে]





