ইউরোপে দক্ষিণপন্থার সাম্প্রতিক জোয়ার নিয়ে নানা আলাপ উঠছে। বিশেষত আগামী জুনে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নির্বাচন হচ্ছে। দক্ষিণপন্থা ও অন্যান্য কারণে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে এ পরিবর্তন বিশ্বে কী প্রভাব ফেলবে?

বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের ভীতি কাজ করে এবং তা ছড়িয়েও পড়েছে। এ যাত্রা প্রথম শুরু হয় যখন জর্জিয়া মেলোনির ব্রাদার্স অব ইতালি গত নির্বাচনে জয়ী হয়। এছাড়া উগ্র দক্ষিণপন্থী সুইডেন ডেমোক্র্যাটরা তাদের শাসন পদ্ধতিতে দক্ষিণপন্থী নীতি প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী মাসগুলোয় ফিনল্যান্ড ও গ্রিসেও দক্ষিণপন্থীদের বিজয় দেখা গেছে। এদিকে আবার গত জুলাইয়ে ঘটেছিল আরেকটি ঘটনা। স্পেনের উগ্র দক্ষিণপন্থী ভক্স ও রক্ষণশীল পপুলার পার্টি যৌথভাবে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এরপর আসে পেদ্রো সানচেজের প্রগতিশীল কোয়ালিশন। তিন মাস পর ভোটের মাধ্যমে পপুলিস্ট দক্ষিণপন্থী ‘‌ল অ্যান্ড জাস্টিস’ পার্টিকে বহিষ্কার করা হয় এবং এর মাধ্যমে ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্কের সরকারকে আসার সুযোগ করে দেয়া হয়।

এদিকে ২৩ শতাংশ ভোট নিয়ে ডাচ পার্লামেন্টে বৃহত্তম দলে পরিণত হয়েছে গির্ট ওয়াইল্ডার্সের ফ্রিডম পার্টি। একে অনেকেই বলছেন উগ্র দক্ষিণপন্থার কঠিনভাবে ফিরে আসা।

এর মাধ্যমে দুটি রাজনৈতিক ও তিনটি নীতির প্রভাব ইউরোপে আগামী মাসগুলোয় পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক অবস্থার ক্ষেত্রে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন, যা কিনা এখন আরো বেশি প্রতিভাত হচ্ছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টসহ আগামী নির্বাচনগুলোর প্রতিটির ক্ষেত্রেই জাতীয় বিষয় ও প্রভাব আছে। ইউরোপের প্রতিটি দেশের মানুষেরই এতে প্রভাব আছে এবং তারা রাজনীতির চালিকাশক্তি। 

গত বছরগুলোর নির্বাচন থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। আগামী বছরের ইউরোপীয় নির্বাচনে কী হবে তার কোনো নিশ্চয়তা এখনই দেয়া যায় না। তবে বোঝা যাচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের প্রতি সামনের নির্বাচনে প্রো-ইউরোপিয়ান সেন্টার-রাইট, সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাট, উদারপন্থীদের সমর্থন প্রতিফলিত হবে।

এছাড়া ইউরোপীয় কাউন্সিলের ২৭ জন সরকারপ্রধান আগামী গ্রীষ্মে নানা রাজনৈতিক পটভূমি থেকে আসা প্রতিনিধিদের সঙ্গে চূড়ান্ত বৈঠক করবেন। এর মধ্যে পাঁচটি দেশ বৃহত্তম—জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও পোল্যান্ড। জার্মানি ও স্পেন সোশ্যালিস্ট নেতৃত্বে, ফ্রান্স ও পোল্যান্ড উদারপন্থীদের নেতৃত্বে আছে। কেবল ইতালিই উগ্র দক্ষিণপন্থী নেতৃত্বের অধীন। মেলোনি যদি আগামী গ্রীষ্মে ওয়াইল্ডার্সের সঙ্গে যোগ দেন, ইউরোপে রাজনীতির একটি বিচিত্র পরিস্থিতি তৈরি হবে।

তবে রাজনীতির হাওয়া নিশ্চিতভাবেই দক্ষিণপন্থার দিকেই যাচ্ছে। এক্ষেত্রে জার্মানি ও ফ্রান্স মূল চিন্তার জায়গা। এটি মূলত নানা কারণে ঘটছে। এর মধ্যে মধ্যমপন্থী দলগুলোর উগ্রপন্থীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের ইচ্ছা দেখা যায়। এটিকে মধ্যমপন্থীদের রাজনৈতিক আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করেন অনেকে। এর মাধ্যমে মধ্যমপন্থী দলগুলোর গতি ও জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে।

বাস্তব উদাহরণ হিসেবে স্পেনের পিপল পার্টির দিকে তাকানো যায়। তারা জনসমর্থন হারিয়েছিল। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডস ও ইতালিতে উগ্র দক্ষিণপন্থীদের কাছে তারা নির্বাচনে হেরেছে। এতে অবাক হওয়ারও কিছু নেই। মধ্যমপন্থীরা যখন উগ্রপন্থীদের সমর্থন করে, তখন জনগণের মনে হয় মধ্যমপন্থীকে ভোট দিলে সেটি নষ্টই হবে। বস্তুত মধ্যমপন্থীদের করণীয় ছিল উগ্রপন্থার বিরোধ।

এর মধ্যে আরো কিছু সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কেন্দ্রীয় দক্ষিণপন্থীরা যদি অভিবাসনের মতো বিষয়কে নীতিগত প্রশ্নে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই এদিকে বেশি মনোযোগ দেবে। মধ্যমপন্থীদের দিকে তারা তাকাবেও না। ইউরোপে একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একই কাজ বারবার করা হচ্ছে, কিন্তু আশা করা হচ্ছে ভিন্ন ফল। অসম্ভব এ চাওয়াকে পাগলামিই বলা চলে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ডানপন্থী দলগুলো একত্রিত হচ্ছে—এর মধ্যে আছে ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ম্যানফ্রেড ওয়েবার। তিনি দক্ষিণপন্থী ইউরোপীয় রক্ষণশীল ও সংস্কারবাদীদের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছেন। 

আমরা যদি ইউরোপকে আরো দক্ষিণপন্থী রাজনীতির মধ্যে কল্পনা করি, তাহলে নীতিগত কী কী বিষয় আসতে পারে? প্রথমেই আসে ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপীয় সমর্থন হ্রাস। আমার এখনই দেখতে পাচ্ছি কীভাবে ভিক্টর অরবানের মতো দক্ষিণপন্থী পপুলিস্ট নেতারা কিয়েভের সঙ্গে সহযোগিতার বিরোধিতা করছে। এর মধ্যে আছে ৫০ বিলিয়ন ইউরোর আর্থিক সহযোগিতা ও ২০ বিলিয়ন ইউরোর সামরিক সহায়তার কথা। এসবের বিরুদ্ধেই দাঁড়াচ্ছেন তারা।

রাশিয়ার প্রতি অর্বানের সমর্থন নতুন কিছু না। কিন্তু যেভাবে তিনি খোলাখুলি তাদের সমর্থন দেন তা এখন মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে। তিনি নিজেও হিসাব করে দেখেছেন রাজনীতির হাওয়া এখন তার পক্ষেই বইছে। মেলোনি ইউক্রেনের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন। তার মধ্যেই দুশ্চিন্তা করার মতো নানা বিষয় সামনে আসছে। সম্প্রতি তাকে নিয়ে রাশিয়ান দুই কমেডিয়ান একটি হাস্যরসাত্মক অভিনয় করেছিলেন। এরপর ইতালিয়ান প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমা ক্লান্তি নিয়ে কথা বলেন এবং আশা প্রকাশ করেন রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে একটি সমঝোতায় আসা যাবে। আর এর মাধ্যমেই ইউক্রেনের প্রতি তার সমর্থন নিয়ে এখন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এর সঙ্গে আরো আছে জলবায়ু পরিস্থিতি। এ নিয়ে এরই মধ্যে ইউরোপের সবুজায়ন চুক্তি, বৃক্ষ নিধন ও কৃষি নিয়ে একটি সমঝোতা এবং পরিকল্পনার দিকে এগোচ্ছে দক্ষিণপন্থীরা। এ বিষয়গুলোও আগামী কয়েক মাসে নতুন মোড় নেবে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে নেয়া পরিকল্পনাগুলো এগিয়ে নেয়ার কাজ চলবে। এক্ষেত্রে শিল্পকারখানা ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে সে অনুসারে সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে।

কিন্তু এমন হলেও তহবিল বা অর্থ সাহায্য প্রয়োজন, এমন কোনো ইউরোপীয় শিল্পনীতিতে দক্ষিণপন্থীদের সমর্থন দেখা যাচ্ছে না। সে কারণেই মনে হচ্ছে দক্ষিণপন্থী ইউরোপ যেভাবে প্রতিরক্ষার পেছনে খরচ করবে সেভাবে খরচ করবে না জলবায়ু বা পরিবেশ বিষয়ে।

তৃতীয় প্রশ্ন অভিবাসীদের নিয়ে। কয়েক বছরে ইউরোপে অভিবাসী সমস্যা ও অভিবাসন নিয়ে পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত ঘোলাটে হয়েছে। সমস্যা হলো জনপ্রিয় ধারার দক্ষিণপন্থী আলাপের মাধ্যমে যারা অভিবাসন বিষয়টিকে অন্যতম চিন্তার বিষয় হিসেবে দেখেছেন তারা কোনো নীতিগত সমাধান দিতে পারছেন না। সমাধান তো দূর, বিষয়টিকে ঠিকমতো চিহ্নিত করতেও ব্যর্থ হতে দেখা যায়। ইউরোপের দক্ষিণপন্থী দলগুলো বলে থাকে তারা অনিয়মিত অভিবাসী ও আশ্রয় প্রত্যাশীদের নিজেদের ভূমিতে চান না কিন্তু তারা নিজেদের মধ্যে এ বিষয়ের দায়িত্বও কোনোভাবে বণ্টন করে নিতেও আগ্রহী না। তারা বরং ট্রানজিটে থাকা দেশগুলোর ওপর এ বিষয়কে চাপিয়ে দিতে চান। এক্ষেত্রেও ২০১৬ সালে হওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন-তুরস্ক চুক্তি ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপ কাজে দেয়নি। সাম্প্রতিক ব্যর্থ পদক্ষেপ হিসেবে নাম করা যায় তিউনিশিয়ার সমস্যা বোঝা সম্পর্কে ইউরোপের স্বারকলিপি। পদক্ষেপ নিয়েও তার কোনো ফল আসেনি।

প্রত্যেকটি ঘটনাই বোঝাচ্ছে পরিস্থিতি ইতিবাচক না। ইউরোপীয় উপমহাদেশে উদারপন্থী গণতন্ত্রের মধ্যে দক্ষিণপন্থী জোয়ারের একটা প্রবল সম্ভাবনা দেখাই যাচ্ছে। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট রেফারেন্ডামের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে কিছু সদস্য হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। রাজনীতির সে পরিস্থিতি এখন আর নেই। এমন কোনো ঘটনা আবার ঘটতে পারে যদি কখনো ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো কেউ হোয়াইট হাউজে ফেরেন। সে রকম পরিস্থিতি তৈরি হলে এখনকার চলমান সব ঘটনাই উল্টে যাবে। অনেকের মুখোশ খুলে যাবে। সেক্ষেত্রে আরো উগ্র দক্ষিণপন্থা ইউরোপে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এমন পরিস্থিতি যা আগে বিশ্ব কখনো দেখেনি।

নাতালি তোচ্চি: রোমের ইনস্টিটিউটো অ্যাফারি ইন্টারনাজিওনালির পরিচালক ও দ্য গার্ডিয়ানের ইউরোপ বিষয়ক কলামিস্ট

দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর: মাহমুদুর রহমান