১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের অর্থনীতি বিনির্মাণে তত্কালীন সরকারকে বেশকিছু সংরক্ষণমূলক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম সরকার পাকিস্তানের অংশ থাকাকালীন থাকার মতোই ব্যাপক সংরক্ষণমূলক বাণিজ্য ও বিনিময় হার নীতি অব্যাহত রাখে। নতুন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোয় অনিশ্চয়তা এবং কিছুটা উদারীকৃত পরিবেশ সামলানোয় সক্ষমতার অভাবের কারণে এ ধরনের ব্যাপক সংরক্ষণমূলক বাণিজ্য ও বিনিময় হার নীতি গ্রহণ করেছিল। আমদানি মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, স্বল্প পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখা এবং অভ্যন্তরীণ বা স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা প্রদানে উচ্চ শুল্কহার ও অতিমূল্যায়িত স্থির বিনিময় হার তত্কালীন সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপগুলোর অন্যতম। সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য ব্যবস্থা অব্যাহত থাকে মোটামুটিভাবে সত্তরের দশকজুড়ে।

বাণিজ্য ব্যবস্থা

এই সংরক্ষণবাদী ব্যবস্থায় আমদানি ও রফতানি লাইসেন্সিংয়ে বিধি আরোপ করা হয়। সব বৈদেশিক মুদ্রা আয় সরকারের কাছে জমা রাখা হয় এবং আমদানি লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবহারের জন্য বণ্টন করা হয়। একই সময়ে এক্সপোর্ট পারফরম্যান্স লাইসেন্সের অধীনে নির্দিষ্ট রফতানিকারকদের একটি ইম্পোর্ট এনটাইটেলমেন্ট সার্টিফিকেট দেয়া হতো, যাতে করে তাদের রফতানি আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরির পণ্যের আমদানি অথবা এসব পণ্য প্রিমিয়ামে অন্য ব্যবসায়ীদের বেচার ক্ষেত্রে ব্যবহূত হতে পারে। এভাবে কার্যত সেখানে দ্বৈত বিনিময় হার বজায় ছিল।

সংরক্ষণমূলক বাণিজ্যনীতির প্রাথমিক বছরগুলোয় অধিকাংশ কৃষিপণ্যই সংরক্ষিত বা আমদানি-নিষিদ্ধ তালিকায় ছিল। বহিঃস্থ প্রতিযোগিতা থেকে উৎপাদনকারীদের সুরক্ষার মাধ্যমে উৎপাদনকারীদের লাভজনক দাম নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে এ নীতি নেয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। কিছু কৃষিপণ্য রফতানি শুল্কের আওতায়ও আনা হয়েছিল। এক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ছিল, স্থানীয় বা অভ্যন্তরীণ বাজারে কৃষিপণ্যের পর্যাপ্ত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। অবশ্য অগতানুগতিক পণ্য রফতানি উন্নয়নে কিছু রাজস্ব বা আর্থিক প্রণোদনাও দেয়া হয়েছিল। ১৯৭৬ সালের রফতানি নীতি আদেশে অগতানুগতিক পণ্যের রফতানি আয় দ্বিগুণ করে ১৫-২০ থেকে ৩০-৪০ শতাংশ করা হয়েছিল। আমদানিকৃত কাঁচামাল দিয়ে তৈরি বস্ত্রপণ্যের রফতানি উন্নয়নে ডিউটি ড্রব্যাক স্কিম নেয়া হয়েছিল। এ ধরনের বাণিজ্য ও বিনিময় হার নীতি অবশ্য রফতানি উন্নয়ন, লেনদেন ভারসাম্য ও সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পারেনি। সত্তরের শেষ দিকে আমদানি বিকল্প কৌশলে সরকারের মোহমুক্তি ঘটে কিছুটা দাতাদের শর্তাবলি দ্বারা উৎসাহিত হয়ে। বাংলাদেশ ও অন্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সরকার ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে অধিকতর উন্মুক্ত অর্থনীতির দিকে ধাবিত হওয়া শুরু করে। সত্তরের শেষ দিকে মিশ্র অর্থনীতি ও অধিকতর উন্মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা উন্নয়নে অধিকতর অনুকূল দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়। তবে ১৯৭০-এর শেষ দিকে ধীরে ধীরে প্রবর্তন করা রফতানি উন্নয়ন পদক্ষেপগুলো পরিধির দিক থেকে খুবই সীমিত ছিল এরং এর বাস্তবায়নও হচ্ছিল ধীরগতিতে। সার্বিক বাণিজ্যনীতিগুলো ছিল অভ্যন্তরদর্শী। তখনো সাধারণভাবে অর্থনীতি এবং বিশেষভাবে বহিঃস্থ খাত রয়ে যায় অতিনিয়ন্ত্রিত।

কৃষি বাণিজ্য

উল্লিখিত সময়ে অধিকাংশ কৃষিপণ্য ছিল আমদানির তালিকায় নিষিদ্ধ কিংবা সংরক্ষিত। একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের রফতানিতেও বাধানিষেধ ছিল। আবার কিছু কৃষি রফতানি পণ্যও রফতানি শুল্কের আওতায় আনা হয়েছিল। দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কিছুটা বাড়িয়ে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে অবশ্য সংরক্ষিত বাণিজ্য ও বিনিময় হার নীতি উদারীকরণ শুরু হয়।

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ থেকে কৃষিপণ্য রফতানি মোট রফতানির ৮০ শতাংশের ওপর উন্নীত হয়েছিল। মূলত পাট ও পাটজাত পণ্যই প্রধান রফতানি পণ্য ছিল, যা মোট রফতানির প্রায় ৭৭ শতাংশ ছিল। সে সময়ে অধিকাংশ প্রবৃদ্ধিই হয়েছিল পাট ও চিংড়ি রফতানি থেকে। ১৯৭০-এর দশকে মোট কৃষি রফতানিতে কাঁচা পাটের অংশ ছিল ৭০ শতাংশ, যেখানে চা ও চিংড়ির অংশ ছিল যথাক্রমে ১৭ ও ৯ শতাংশ। অবশ্য কাঁচা পাট রফতানি-পরবর্তীতে সিনথেটিক পণ্য দ্বারা কঠিন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়।

২০০৪ সালে রফতানি আয়ে পাটের অংশ ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ (এবং চায়ের অংশ ছিল ৩ শতাংশেরও কম), যেখানে চিংড়ির অংশ ৬৫ শতাংশ ও সবজির অংশ ৬ শতাংশ (১৯৭০-এর দশকে শূন্য থেকে) ছিল। প্রবাসী বাংলাদেশীদের দিক থেকে সবজির চাহিদা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন নীতি পদক্ষেপ— বিশেষ করে নগদ প্রণোদনা ও স্বল্প ফ্রেইট ফি নির্ধারণের বিধি সংযোজন— সবজি রফতানির এই দ্রুত বৃদ্ধি সহজতর করেছে। ১৯৭০-এর দশকে গম, কাঁচা তুলা, ভোজ্যতেল, চাল, চিনি, দুধ ও ক্রিম, ডাল, মসলা, তৈলবীজ ও তামাক আমদানি করা হতো। এসব পণ্য আমদানির অংশ ১৯৭০-এর দশকে গড়ে ৩৩ শতাংশ থেকে ১৯৮০-এর দশকে ২৪ শতাংশ এবং ২০০০-০৪ সালে ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে খাদ্যসহায়তায় মোট গম আমদানির পরিমাণ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (প্রতি বছর মোট ১ দশমিক ৫ মিলিয়নের মধ্যে প্রায় ১ মিলিয়ন টন), বাকিটা সরকারের বাণিজ্যিক আমদানি। ভোজ্যতেল আমদানির প্রকৃত মূল্য ১৯৭০-এর দশকে প্রতি বছর ৩ দশমিক ২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রেকর্ডকৃত চিনি আমদানি (ভারত থেকে চোরাকৃত চিনি নয়) দ্রুতগতিতে বেড়েছে। ১৯৭০-এর দশকে কৃষি আমদানি ১ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল। চিনির চাহিদা ১৯৭২ সালে প্রায় ১২ কিলোটন ছিল, যা পরবর্তীতে অনেক গুণ বেড়েছে।

বিনিময় হার নীতি

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ভয়াবহ লেনদেন ভারসাম্য সংকটে পড়ে। আমদানি মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, স্বল্প পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ধরে রাখা এবং অভ্যন্তরীণ/স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা প্রদানে আমদানির ওপর পরিমাণগত বাধানিষেধ, উচ্চ শুল্কহার ও অতিমূল্যায়িত এবং স্থির বিনিময় হার ব্যবহার করা হয়। লেনদেন ভারসাম্য সংকট মোকাবেলায় মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৭০ শতাংশ অবমূল্যায়ন করা হয় ১৯৭০-এর দশকে মাঝামাঝি সময়ে। ১৯৭৫ সালে ডলারের তুলনায় টাকার মান কমানোর নীতি নেয়া হয় রফতানি আয় পুনরুদ্ধার, বৈদেশিক সাহায্য বৃদ্ধি এবং শস্য ও অন্য পণ্যের বিশ্বদামে পতন ঠেকাতে। ১৯৭৫-৭৬ সালে REER প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়। তবে দশকজুড়ে সামান্য ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থেকেছিল। প্রাথমিকভাবে স্থির বিনিময় হার ব্যবস্থার অধীনে সব বৈদেশিক মুদ্রা সরকারের কাছে জমা রাখা হয় এবং তারপর একটি ডিসক্রিশনারি ও আমদানি লাইসেন্সিংয়ের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলকভাবে ব্যবহারের জন্য বণ্টন করা হয়। তবে ১৯৭০-এর দশকের প্রথম দিকে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে সাড়া দিতে সরকার সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরির পণ্য আমদানিতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ব্যবহারের অনুমতি দেয়; যে ব্যবস্থাকে পরে নাম দেয়া হয় ওয়েজ আর্নার্স স্কিম (WES)। একই সঙ্গে এক্সপোর্ট পারফরম্যান্স লাইসেন্সের (এক্সপিএল) অধীনে একটি ইম্পোর্ট এনলাইটেনমেন্ট সার্টিফিকেট। এভাবে কার্যত সে সময় দ্বৈত বিনিময় হার ছিল, যেখানে এক্সপোর্ট পারফরম্যান্স লাইসেন্স প্রিমিয়াম কিছু ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার দামে প্রতিফলিত হয়। ১৯৭৭ সালে WES থেকে বৈদেশিক বিনিময় হারের ভিত্তিতে সেকেন্ডারি এক্সচেঞ্জ মার্কেট (এসইএম) হিসেবে পরিচিত বাজারে প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা সরাসরি বিক্রির অনুমতি দেয়া হয়।

১৯৭২-৭৫ সময়ে উৎপাদন ও দাম প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণে কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। উৎপাদন খাতের প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা খাত ও কৃষি উপকরণ বণ্টনে জাতীয়করণসহ এ নিয়ন্ত্রণ ছিল বেশ সর্বব্যাপী। বাণিজ্য করপোরেশনগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পণ্যের অভ্যন্তরীণ বণ্টনের বিপুলাংশ হ্যান্ডেল করেছিল। শিল্পপণ্য, বিনিময় হার, সুদহার, কৃষি উপকরণ ও উৎপাদন, সেবা ফি/ইউটিলিটি হার এবং বাড়ি ভাড়াসহ দাম নিয়ন্ত্রণ ছিল সর্বব্যাপক।

১৯৭৬ সালে এই নিয়ন্ত্রণমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হওয়া শুরু হয়। দাম নিয়ন্ত্রণ বাদ দেয়া, বিরাষ্ট্রীয়করণ ও ব্যক্তি বিনিয়োগে নিয়ন্ত্রণমূলক বাধা হ্রাসের মাধ্যমে এই দ্বিতীয় ধাপে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাজারভিত্তিক অর্থনীতির দিকে যাওয়া। অভ্যন্তরীণ বিনিয়ন্ত্রণের অনেকটা মনোযোগ ছিল কৃষি, অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও সেবা মুক্ত করে দেয়া। তবে প্রাইভেটাইজেশন ও উৎপাদন খাতে অগ্রগতি ছিল সীমিত। ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকিং খাতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও ব্যাংকিং ও সরকারি পরিষেবা খাতের অনেকটাই ওই সময়ে সরকারি ব্যবস্থাপনার আওতায় রয়ে যায়।

ব্যক্তিমালিকানায় আরো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিসহ তৃতীয় ধাপে ১৯৮০-এর দশকে উৎপাদন খাতে বিনিয়ন্ত্রণের অধিক দ্রুত ধারা দেখা যায়। বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থাকলেও ব্যক্তিখাতের ব্যাংকিংও তাত্পর্যপূর্ণভাবে বিকাশ লাভ করে। অবকাঠামো খাতে ব্যক্তিগত টেলিকমিউনিকেশন সেবার (তারবিহীন সেবা) আবির্ভাব ঘটল, একই সঙ্গে ব্যক্তিমালিকানাধীন কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও যাত্রা শুরু হলো। তবে ব্যাংকিং, পরিষেবা ও বন্দর সংস্কার সাধারণভাবে পিছিয়ে পড়েছিল।

আর্থিক খাত— স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বাংলাদেশে শাখা ব্যাংকিং ব্যবস্থার (ব্রাঞ্চ ব্যাংকিং সিস্টেম) উত্তরাধিকার বহন করে আসছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে তত্কালীন পাকিস্তানে ৪৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যরত ছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের আবির্ভাবের পর ১৯৪৮ সালের জুলাইয়ে স্টেট ব্যাংক পাকিস্তান (কেন্দ্রীয় ব্যাংক) জন্মলাভ করল। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর (১৯৭১ সাল পর্যন্ত ৩৬টি ব্যাংক চালু ছিল) মালিকানা ধরন দেখায় যে, অধিকাংশ ব্যাংকেরই মালিক পশ্চিম পাকিস্তানি। যদিও ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, হাবিব ব্যাংক লি. ও অস্ট্রেলেশিয়া ব্যাংক নামে তিনটি ব্যাংকের শাখা ছিল, তবু কোনো বাংলাদেশীই ওইসব ব্যাংকের মালিকানায় ছিল না। ১৯৫০-৫৮ সময় পর্বে পাকিস্তানি-মালিকানাধীন অন্য তিনটি ব্যাংক প্রিমিয়ার ব্যাংক, ব্যাংক অব বাওয়ালপুর ও মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড পূর্ব পাকিস্তানে তাদের শাখা খোলে। পরবর্তীতে ১৯৫৯-১৯৬৫ সময় পর্বে অন্য চারটি ব্যাংক ইউনাইটেড ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও দ্য কমার্স ব্যাংকও এ প্রদেশে তাদের শাখা খোলে।

অবশ্য এসব ব্যাংকের সদর দপ্তর ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানের কেবল দুটি ব্যাংক ছিল। এর মধ্যে একটি হলো ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড (বর্তমানে পূবালী ব্যাংক) আর অন্যটি ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন লিমিটেড (বর্তমানে উত্তরা ব্যাংক)। শেষোক্ত দুটি ব্যাংক স্থানীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করে এবং তাদের প্রধান কার্যালয় ছিল ঢাকায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পর সরকার বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা জাতীয়করণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশের (পি.ও.১২৬ অব ১৯৭২) অধীনে স্টেট ব্যাংকের পূর্ব পাকিস্তান শাখাকে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রূপান্তর করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক তৈরির উদ্দেশ্য ছিল মুদ্রা ছাপানোয় একক নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, সঞ্চিতি সংরক্ষণ ও আর্থিক মূল্য সামলানো, বাংলাদেশের টাকার মূল্যমান ধরে রাখা, বাংলাদেশে উচ্চমাত্রার উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও প্রকৃত আয় বজায় রাখা এবং দেশের সর্বোত্তম স্বার্থে উৎপাদনী সম্পদ প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে তা লালন বা ব্যবহার। বাংলাদেশ ব্যাংকস ন্যাশনালাইজেশন আদেশ, ১৯৭২-এর অধীনে ১২টি ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সম্পদ নিয়ে ছয়টি জাতীয় ব্যাংক চালু করা হয়। অধিকন্তু তত্কালীন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অব পাকিস্তান ও এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব পাকিস্তানের সম্পদ নিয়ে যথাক্রমে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক আদেশ, ১৯৭২ এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক আদেশ, ১৯৭৩-এর আওতায় বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (বিএসবি) ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক নামে দুটি বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়।

যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের অর্থনীতি বিনির্মাণে পর্যাপ্ত পরিমাণে সক্ষমতার অভাব, পাকিস্তান কর্তৃক সম্পদ ধ্বংস ও বিনষ্টকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সঠিকভাবে না গড়ে ওঠায় তত্কালীন সরকারগুলো অনেকটা বাধ্য হয়েই সংরক্ষণমূলক বাণিজ্যনীতি গ্রহণ করেছিল। তবে প্রথম ১০ বছরের মাথায়ই অর্থনীতির উদরীকরণের পদক্ষেপ নেয়া শুরু হয়, যা পরবর্তীতে বেগবান হয়। পূর্ব পাকিস্তান থাকাকালীন অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং কিছুটা সমাজতান্ত্রিক ধারণা থেকে ব্যাপক সংরক্ষণমূলক নীতি গৃহীত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। যদিও সংরক্ষণমূলক বাণিজ্য ও আর্থিক নীতি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বেগবান করতে পারেনি, তার পরও ওই সময়কার নীতি মূল্যায়ন করতে হলে ওই সময়ের আর্থসামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার মূল্যায়নও পাশাপাশি করতে হবে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অনিশ্চয়তা ওই সময়কার অর্থনৈতিক শ্লথগতিতে ভূমিকা রেখেছিল।

[ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির]

 

লেখক: বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো