১৯৭১ সালে যুদ্ধে সৃষ্ট ভৌত (বস্তুগত) ক্ষতি হিসাব করা হয়েছিল আনুমানিক ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার। স্পষ্টত এ পরিসংখ্যানকে সম্পূর্ণ নির্ভুল হিসাব মনে করার কারণ নেই, উপরন্তু এতে অবস্তুগত ক্ষতি কিংবা যুদ্ধের ফলে উৎপাদনের রিকভারি স্বাভাবিক পর্যায়ে আসতে দেরি হওয়ার প্রভাবজনিত ক্ষতি প্রাক্কলন করা হয়নি। আলোচ্য হিসাবের মধ্যে অবশ্য যুদ্ধে সৃষ্ট কৃষি উৎপাদনের ক্ষতিও ছিল। এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। খাদ্য বাদে কৃষি সম্ভাবনার (এগ্রিকালচারাল পটেনশিয়াল) ক্ষতি ছিল খুব সামান্য; প্রধান প্রভাব ছিল প্রাণিসম্পদ ও মাছ ধরা সরঞ্জামের ক্ষতিতে। পোস্টাল সেবা ও টেলিকমিউনিকেশন অবকাঠামো বিপর্যয়ের ক্ষতি শিল্পের ক্ষতি থেকে তুলনামূলকভাবে কম ছিল। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিরূপ প্রভাব রাখা সবচেয়ে ভয়াবহ ধরনের ছিল পরিবহন অবকাঠামোর ক্ষতি। যদিও এ ধরনের ক্ষতি ১৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ছিল না এবং সেনা প্রকৌশলীদের দ্বারা এর বড় অংশই সংস্কার করা হয়েছিল। অবশ্য ১৯৭৩ সালের শেষ পর্যন্ত বলা যাবে না যে একটি পুরোপুরি কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা গেছে এবং এমনকি ওই সময়েও পরিবহন ব্যবস্থায় যথেষ্ট ঘাটতি ছিল।

এদিকে গৃহায়ণ বা আবাসনে ক্ষতি প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। এক্ষেত্রে প্রধানত ছিল বাঁশের বেড়ার ঘরের ক্ষতি, যেগুলো প্রায় ক্ষেত্রে ঘন ঘন মেরামতের প্রয়োজন হয়। তবে উৎপাদন সক্ষমতার (প্রডাক্টিভ ক্যাপাসিটি) ওপর প্রভাব সম্ভবত ছিল সামান্য। কিন্তু সংস্কারের ব্যয় ছিল সত্যিই বিপুল। আরেকটি প্রধান আইটেম ছিল, শিক্ষার ওপর যুদ্ধের প্রভাব। এর মধ্যে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পুনর্বাসনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটিও যুক্ত। আবার দেশের উৎপাদন সামর্থ্যে যুদ্ধের তাত্ক্ষণিক প্রভাব ছিল সম্ভবত স্বল্প।

সার্বিক ক্ষতির হিসাব নির্ণয়ে একটি জরিপ করা হয়েছিল। ওই জরিপভিত্তিক একটি সাধারণ ধারণা হলো, এর মধ্যে অর্ধেক ক্ষতি হলো, স্থির ভৌত বিনিয়োগ সম্পর্কিত। যেমন— উৎপাদিকতা সক্ষমতার ক্ষতি। আলোচ্য জরিপের বাকি অর্ধেক ক্ষতিতে আমলে নেয়া হয়েছিল খাদ্য উৎপাদনের বিপর্যয় ধরন, গৃহায়ণ ও পুনর্বাসন রিকোয়ারমেন্টের ক্ষতি, যেটি তাত্ক্ষণিকভাবে খুব সঠিকভাবেই সামাল দেয়া হয়েছিল।

পরিস্থিতি দ্রুততার সঙ্গে আদৌ সঠিক পথে বা উন্নতির দিকে এগোত না, যদি জাতিসংঘের প্রচেষ্টা অব্যাহত না থাকত। কারণ সুশৃঙ্খল উপায়ে খাদ্য বিতরণ ও বিভিন্ন উৎস থেকে সাহায্য-সহযোগিতা সংহত করার উদ্যোগ নিয়েছিল সংস্থাটি।  বিশুদ্ধ সাংগঠনিক সামর্থ্য বা সক্ষমতা ছিল এ সহযোগিতার খুব গুরুত্বপূর্ণ ও দামি অনুঘটক এবং সমস্যা বিস্তারের সমান্তরালে আলোচ্য সাংগঠনিক সাহায্য আর্থিক সহযোগিতার সঙ্গে সমন্বিত হয়েছিল। অনুমিত ক্ষতির হিসাবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিভিন্ন দাতা সংস্থা ১৯৭২ সালের আগস্টের শেষের দিকে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার অর্থসহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং উল্লিখিত বছর শেষে প্রতিশ্রুত অর্থসহায়তার পরিমাণ উন্নীত হয়েছিল ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ডলারে। এভাবে পুরোপুরি যুদ্ধকালীন ক্ষতি পোষাতে যথেষ্ট উপায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অর্থসহায়তা (বেশির ভাগই ভারত থেকে আসা) দ্রুততার সঙ্গে বিতরণ করে অবনতিশীল খাদ্য পরিস্থিতি সামাল দেয়া হয় এবং অর্থনীতির অন্য বিষয়গুলোও ১৯৭২ সালের মাঝামাঝিতে মোটামুটি স্বাভাবিক হয়ে আসে। যদিও জাতিসংঘের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পরিবহন সুবিধা তখনো অপ্রতুল ছিল। পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বড় বাধা ছিল আমদানিকৃত পণ্যপ্রবাহের ধীরগতি। পাইপলাইনে এসব পণ্য ছাড়ে দেরি হওয়ায় অর্থনীতিতে গভীরতর সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল। পর্যালোচনায় মনে হয়, চলতি আমদানি তাত্ক্ষণিকভাবে জরুরি ভিত্তিতে প্রদানের ক্ষেত্রে সেখানে হয় উপলব্ধিগত ব্যর্থতা ছিল, নতুবা আমদানিকৃত পণ্য কেনা এবং সেগুলো ডেলিভারির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দিক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনে জটিলতা ছিল। এ দুই কারণে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম হয়তো কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়।

১৯৭৩ সালের শেষ নাগাদ বলা যেতে পারে, সংস্কার, পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের সমস্যা লক্ষণীয়ভাবে দূরীভূত হয়েছে। তখন সমস্যা ছিল কেবল যুদ্ধের তাত্ক্ষণিক পরের বাধা অতিক্রম করে অর্থনীতিকে সঠিক পথে পরিচালনার শিক্ষায়।

[বাংলাদেশ: দ্য টেস্ট কেস অব ডেভেলপমেন্ট বইয়ের নির্বাচিত অংশ থেকে ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির]

 

লেখকদ্বয় অর্থনীতিবিদ