বাংলাদেশও গত ৫০ বছরে ফসিল শক্তিনির্ভর কৃষি অনুসরণ করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কৃষিজমিতে ফসলের বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন ১৭টি খাদ্য উপাদান। এর মধ্যে তিনটি উপাদানসমৃদ্ধ ফসিল শক্তিনির্ভর কৃত্রিম রাসায়নিক সার তৈরির কারখানা স্থাপন করা হয়েছে বা যেসব দেশে ফসিল শক্তি দিয়ে সার উৎপাদন হয়, সেখান থেকে উচ্চমূল্যে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আমদানি করা হচ্ছে। আবার যেহেতু এসব রাসায়নিক সারের উৎপাদন খরচ বেশি, পুঁজিবিহীন গরিব কৃষকদের পক্ষে উচ্চমূল্যে তা কিনে জমিতে প্রয়োগ সম্ভব নয়, সেজন্য জনগণের করের টাকায় ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের জন্য সার কেনা সহজ করা হয়েছে। কৃষকরাও তা ইচ্ছামতো জমিতে প্রযোগ করে চলেছেন। কারণ প্রশিক্ষণ দিয়ে ও প্রদর্শনী স্থাপন করে শেখানো হচ্ছে, জমিতে যত বেশি রাসায়নিক সার দেয়া হবে তত বেশি ফলন। ফলন বেশি পাওয়ার জন্য গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান সরবরাহের জন্য দেশে মাত্র তিন ধরনের পুষ্টি উপাদানকেন্দ্রিক রাসায়নিক সার ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ফসলে রাসায়নিক সার ব্যবহার এমন মাত্রায় বেড়েছে, ষাটের দশকে রাসায়নিক সারের ব্যবহারের সূচনালগ্নে প্রতি হেক্টরে ৮ দশমিক ৮ কেজি সার ব্যবহার হতো, সেখানে বর্তমানে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৭০০ কেজি রাসায়নিক সার ব্যবহার হচ্ছে, অর্থাৎ রাসায়নিক সারের ব্যবহার গত ৫০ বছরে ৭৫ গুণ বেড়েছে। সার ব্যবহার নির্দেশিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সময়ে সময়ে জৈব সারের ব্যবহার কমিয়ে ফসলের জাতভেদে রাসায়নিক সার বেশি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে, কৃষকদের রাসায়নিক সার ব্যবহারে ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এতে আশাতীত খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। আবার দেশে খাদ্যনিরাপত্তা মানে দানাদার ফসল কী পরিমাণ উৎপাদন হলো তা দিয়ে পরিমাপ করা হয়, সেখানে অন্য ফসলের গুরুত্ব একেবারে কম থাকে। সেজন্য দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান দানাদার ফসল বিশেষ করে ধানের শত শত আধুনিক জাত আবিষ্কার করে যাচ্ছে এবং এগুলো মাঠে নেয়ার সহজ উপায়ও সৃষ্টি করা হয়েছে। জাতগুলো এমনভাবে প্রজনন করা হয়েছে, যাতে জমিতে যত বেশি সার বা কৃত্রিম উপকরণ প্রয়োগ করা হবে তত বেশি ফলন পাওয়া যাবে। এতে অন্য দানাদার খাদ্যে সরবরাহ করে এমন প্রজাত আর চাষই হচ্ছে না। আবার ধানের মাত্র কয়েকটি জাত চাষ হচ্ছে। ফলে দেশ একক ফসল চাষের চূড়ান্ত ধাপে অবস্থান করছে। বিজ্ঞানীরা ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের সহজ পন্থা আবিষ্কার করেছেন, এতে শীত মৌসুমে সেচনির্ভর ধান চাষ বেশি হচ্ছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, সবুজ বিপ্লব বাস্তবায়নে শক্তি আশ্রয়ী রাসায়নিক সার ও পানিকে সহজলভ্য করা হয়েছে। কারণ নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলো উৎপাদনে আগের সনাতন জাতগুলোর তুলনায় যথেষ্ট বেশি পরিমাণে খাদ্যোৎপাদান ও পানির প্রয়োজন হয়, আবার মুষ্টিমেয় কয়েকটি জাত জনপ্রিয় করা হচ্ছে।

মাটি, খাদ্য ও প্রকৃতিতে সবুজ বিপ্লবের প্রভাব: ভালো মাটিকে তিনটি যথা ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয় এবং এ তিনটি বৈশিষ্ট্যের উপযুক্ত সমন্বয়ই মাটির স্বাস্থ্য, গত পাঁচ দশকে মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যকে বেশি দেয়া হয়েছে, অন্য দুটিকে এক ধরনের অবজ্ঞা করা হয়েছে। দুঃখজনক, কৃষিজমির ওপর এমন আচরণে জমির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা বহুগুণ হ্রাস পেয়েছে। বিবিএসে প্রকাশিত বাংলাদেশের ফসলি জমির উর্বরতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশে ৩০টি এইজেডের জৈব পদার্থের পরিমাণ প্রভূত হ্রাস পেয়েছে। কৃষিজমি হলো গ্রহের বৃহত্তম কার্বনের জলাধারগুলোর মধ্যে একটি এবং বর্ধিত কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশনের (সিএস) সম্ভাবনা রাখে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের বর্তমান বায়ুমণ্ডলীয় ঘনত্বকে প্রশমিত করার একটি সম্ভাব্য উপায় সরবরাহ করে। অথচ স্বাধীনতা-পরবর্তী কৃষি ব্যবস্থা বাংলাদেশে কৃষিজমি কার্বন-সংবন্ধন করেনি, অধিকন্তু কার্বন ঋণাত্মক পর্যায়ে আছে। এতে মাটির অবনয়ন হয়েছে ও মাটির স্বাস্থ্য আজ বিপন্ন। বর্তমান ব্যবস্থার অবিবেচক প্রয়োগ মাটি ও মানুষের স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, দেশের সত্তর ভাগ কৃষিজমির জৈব পদার্থ শতকরা ১ ভাগের নিচে। আবার খাদ্যগ্রহণের মূল উদ্দেশ্য পুষ্টি গ্রহণ কিন্তু খাদ্য ব্যবস্থাও শক্তি গ্রহণনির্ভর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে এবং খাদ্যের মাধ্যমে প্রাপ্ত শক্তির প্রায় ৮৫ ভাগ আসে দানাদার খাদ্য থেকে এবং তা পূরণ করতে গিয়ে দেশব্যাপী গুটি কয়েক ধানের চাষ প্রবর্তন হয়েছে। আবার গবেষকরা ফলাও করে প্রচার করছেন ভাতের মাধ্যমে সব পুষ্টির জোগান দেবেন, সেজন্য ভিটামিন এ সরবরাহের নিমিত্ত গোল্ডেন রাইচ নামে জিএমও ফসল চালু করতে যাচ্ছেন, এমন বাস্তবতায় হাজার ধরনের ধানের জাত (যেগুলোর নানাবিধ প্রতিকূল পরিবেশে চাষোপযোগিতা ও পুষ্টিগুণ ছিল)। তেমনি দেশে দুই শতাধিক সবজি ফল (প্রতিটি ফসলের রয়েছে নানাবিধ জাত) পাওয়া যেত, কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে হাতেগোনা ১২-১৪টি সবজি ও ছয়-সাতটি ফল চাষ হয়। অন্যান্য ফসলের বেলায়ও একই পরিস্থিতি। আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা কয়েকটি ফসলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে ফসলের (আন্তঃ ও অন্তঃপ্রজাতি) বৈচিত্র্য কমে গেছে এবং মানুয়ের পুষ্টি উপাদান গ্রহণের বৈচিত্র্যও কমেছে। আবার অতি উৎপাদনের নেশায় কৃষকরা মাটিতে ও ফসলে অনির্বিচারে শিল্পজাত কৃত্রিম রাসায়নিক উপকরণের ব্যবহার করছে। এতে একদিকে যেমন মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে, ফসল তথা খাদ্যকে বিষাক্ত করছে, অন্যদিকে এদের অবশিষ্টাংশ বৃষ্টির পানি বা সেচের পানির সঙ্গে জলাশয়ে গিয়ে মত্স্যসম্পদের বিলুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অপ্রতিরোধ্য ব্যবস্থা দেশের সামগ্রিক ইকোসিস্টেমকে হুমকির মুখে ফেলেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে খাদ্য গ্রহণজনিত রোগ যেমন—হূদরোগ, ক্যান্সার, ডায়বেটিস, পুষ্টিহীনতাসহ নানাবিধ রোগীর সংখ্যা অনিবার্যভাবে বেড়ে চলেছে। খাদ্য ও কৃষি ব্যবস্থা প্রায় শতকরা ৩৫ ভাগ বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ করে সবুজ বিপ্লবের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনে কৃষির অবদান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাড়াচ্ছে। আবার IUCN-এর মতে, দেশ থেকে ৩৯টি প্রজাতি বিলুপ্ত ও ২৪৭টি প্রজাতি সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। এ বিধ্বংসী অবস্থা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বে বিরাজমান। ফলে সবুজ বিপ্লবের যে অনুমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা অসাড়তা প্রকাশ পাচ্ছে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে। গবেষকরা দেখছেন, ফলন বৃদ্ধির যে উল্লম্ফন প্রথম দেখা গেছে তা এখন ঋণাত্মক। এমনকি বিজ্ঞানীরাও প্রমাণ করেছেন, ছয় দশক আগে প্রজনন প্রক্রিয়ায় যে নতুন নতুন জাত তৈরি করা হয়েছে, সে তুলনায় বর্তমান জাতগুলোর পুষ্টিগুণ অনেক কম। তার কারণ হিসেবে প্রজননে অতিনির্বাচনকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এর নাম দেয়া হয়েছে পুষ্টি-তারন বা nutrition dilution। আবার এরই মধ্যে পৃথিবীব্যাপী প্রযুক্তি দানবরা বংশগতি সম্পাদনা করে ফসলের নতুন জাত আবিষ্কার, কৃত্রিম জীববিজ্ঞান, কৃষিযন্ত্র ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রিসিশন এগ্রিকালচার বা হিসাবি কৃষি প্রথা চালুর মহাযজ্ঞ চলছে এবং এ প্রবণতা নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, তার প্রভাব ক্ষুদ্র খামারিসমৃদ্ধ দেশ কীভাবে মোকাবেলা করবে, তা বর্তমান সময়ের আলোচিত বিষয়।

খাদ্য ও কৃষি ব্যবস্থা কেমন হওয়া চাই: দেশের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো, ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমিতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে খাদ্য হবে নিরাপদ ও পুষ্টিকর এবং কৃষির উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষক তার পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করবেন। টেকসই কৃষি হলো এমন একটি চর্চা অনুসরণ করা বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা পূরণ করার সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিজস্ব চাহিদার বিষয়টি নিশ্চিত করে। টেকসই কৃষির পরিমাপকের সূচক হলো ভূমির উৎপাদনশীলতা, লাভ, সহনশীলতা, মাটির স্বাস্থ্য, পানির ব্যবহার, সার ও কীটনাশক দূষণের ঝুঁকি, জীববৈচিত্র্য, কর্মপরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা ও ভূমির অধিকার। জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার অঞ্চলভিত্তিক ফসল বিন্যাস প্রবর্তন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সর্বোপরি উৎপাদনশীলতা সচল রাখা। টেকসই কৃষি বাস্তবায়নে বাস্তুসংস্থানিক কৃষি বা পরিবেশগত চাষবাস গ্রহণের পথে হাঁটতে হবে, বিশ্বব্যাপী এ বার্তাই গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা দিচ্ছেন।

বাস্তুসংস্থানিক কৃষি বা পরিবেশগত চাষবাস কীভাবে অর্জন সম্ভব: পারিবারিক কৃষির পৃষ্ঠপোষকতাই সংকট সমাধানের প্রথম ধাপ। পরিবার হলো সবচেয়ে প্রাচীনতম বা আদিতম সংগঠন। আর এ সংগঠনের সদস্যদের মাধ্যমে কৃষির যাত্রা। কৃষিই মানুষের সংস্কৃতি। গত ১২ হাজার বছরে কৃষি সংস্কৃতির বিকাশ করেছে পরিবার তথা এর সদস্যরা। কৃষিকে কেন্দ্র করে শিল্প ও নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছে। তেমনিভাবে বাংলাদেশের খাদ্য ও কৃষি ব্যবস্থা ফসল, প্রাণিসম্পদ ও মত্স্যসম্পদ সমন্বয়ে হাজার বছরে গড়ে উঠেছে, আর পরিবারের সদস্যরা এ তিনটি উপাদানকে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা করে কৃষির ব্যাপক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেছেন গত কয়েক দশকে, তার সিংহভাগ কৃতিত্ব কৃষি পরিবারের সদস্যদের।

বাংলাদেশে পারিবারিক কৃষির সাফল্য: দেশে এখনো এটি একটি সাধারণ চিত্র যে কৃষক পরিবারের, প্রতিটি সদস্য পরিবারের আওতাধীন জমিতে কাজ করছেন, নারীরা এককভাবে বীজ, ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থা পশুপালনে যুক্ত থাকছেন, এমনকি যে সন্তানটি পড়ালেখা করছে সে তার পড়ালেখার পাশাপাশি তার বাবা বা ভাইকে উপযুক্ত সময়ে সাহায্য করছেন, এতে উৎপাদন খরচ কমছে এভাবে ক্ষুদ্র চাষীর পারিবারিক অর্থনীতি সচল রাখছেন। দেশের কৃষির প্রাথমিক অবস্থা ছিল খোরপোষ বা আধা-খোরপোষ প্রকৃতির, তবে কৃষি পরিবারগুলোর নিরন্তর চেষ্টায় এ খাতের ব্যাপক রূপান্তর হয়েছে খোরপোষ কৃষি এখন বাণিজ্যিক বা লাভজনক কৃষির পথপরিক্রমা অতিক্রম করছে। কৃষি সাফল্যে নতুন নতুন উদ্যোক্তা আসছেন, বিনিয়োগ করছেন, মুনাফাও করছেন, দেশে এখন বড় খামারির সংখ্যা বাড়ছে, দেশের সামগ্রিক বাজার অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক। উন্নত দেশে কৃষি এখন শিল্প। কৃষিতে এখন সর্বাধুনিক প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধির ব্যবহার শুরু হয়েছে, যাকে নতুন নামে ডাকা হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। কৃষির এ সর্বাধুনিক রূপান্তরে পারিবারিক অবদানই সর্বাধিক। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ক্ষুদ্র খামারি (দুই হেক্টরের চেয়ে কম জমির মালিক) সংখ্যা ৯৫ ভাগেরও বেশি এবং ক্ষুদ্র চাষীদের সিংহভাগ বসবাস অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এবং তাদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা এমন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার সক্ষমতা নেই বললেই চলে। ফলে তাদের উৎপাদন উপকরণ উন্নত বিশ্বের তুলনায় খুবই আদিম। ক্ষুদ্র মালিকানার পারিবারিক কৃষি এমন আদিম থাকার ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক কারণও রয়েছে। যেমন বাংলাদেশসহ এ উপমহাদেশে কৃষি হলো তৃতীয় শ্রেণীর পেশা, আমাদের আদি সমাজ চারটি প্রধান শ্রেণী ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রীয়, বৈশ্য ও শূদ্র। এ বিভক্ত ৩ ও ৪ নং প্রান্তজনের কাজ কৃষি। ফলে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে কৃষি কখনই সম্মানজনক পেশা ছিল না। শুনতে খারাপ লাগলেও আজও তাচ্ছিল্য করে এ পেশার মানুষকে চাষা হিসেবে গাল দেয়া হয়। তবে শত বৈরী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ অতিক্রম করে এ দেশের কৃষকরা গত ৫০ বছরে দেশের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা অর্জনে অকল্পনীয় ও অভাবনীয় অবদান রেখেছেন তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনায়। গবেষণা সম্প্রসারণ, বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় খাদ্যোৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন অদম্য গতিতে। ফলে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, কভিড-১৯-এ বিশ্ব যখন স্তব্ধ তখন এ ক্ষুদ্র কৃষকরাই মানুষের খাবার জুটিয়ে যাচ্ছেন কোনো প্রণোদনার মুখাপেক্ষী না থেকে। এমন বাস্তবতায় দেশের কৃষি ও কৃষি পেশা আজ মর্যাদার শীর্ষে।

আবার এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই, এত কিছু করেও কৃষি হতে যে আয় হয় তা দিয়ে সে পরিবারের খরচ চলে না। তাদের বিকল্প পেশায় যেতে হয় অথবা অন্যের জমি বর্গা নিতে হয়। আবহাওয়া, জলবায়ু ও বাজার অনুকূলে থাকলে তাতে হয়তো পরিবারিক উন্নতি হয়। তবে যে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, কৃষিবাজার ব্যবস্থা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সে উন্নতি স্থায়ী হয় না। ফলে পারিবারিক ব্যয় মেটানোর এমন কঠিন বাস্তবতায় তাকে বা তার পরিবারের অন্য সদস্যকে কৃষি পেশার পাশাপাশি বা কখনো কখনো অন্য পেশায় সম্পৃক্ত হতে হয়। আবার কৃষি ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত ও পণ্যগত যে আমূল ঐতিহাসিক পরিবর্তন হয়েছে, সেখানে আমাদের ক্ষুদ্র কৃষকদের অংশগ্রহণ বা গ্রহণ করার সীমাবদ্ধতা আছে। ক্ষুদ্র চাষীরা দেশের কৃষির প্রাণ। তারা পুঁজি ও জ্ঞানের অভাবে আধুনিক উপকরণ ব্যবহারে পিছিয়ে গেলে ভূমির উৎপাদন দক্ষতা কমবে। অন্যদিকে একক ফসল/প্রাণী/মাছের আধিক্য হওয়ায় জীববৈচিত্র্য সংকুচিত হবে, কৃষি বাস্তুসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে জনস্বাস্থ্যও হুমকির মুখে পড়বে।

টেকসই কৃষি বাস্তবায়নে করণীয়: আগেই উল্লেখ করেছি, আমাদের কৃষি শুধু ফসলনির্ভর নয়। কৃষিতে স্থায়িত্বশীলতা আনতে প্রাণিসম্পদ, মত্স্যসম্পদকে একত্রে বিবেচনায় আনতে হবে। দেশের বদ্বীপ পরিকল্পনা বা ডেল্টা প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে, সে আলোকে এখনই একটি সমন্বিত নীতি প্রণয়ন করতে হবে। তার সঙ্গে একটি কম্প্রিহেন্সিভ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের এখনই সময়। যুদ্ধোত্তর দেশে বাজেটের ১৩ ভাগ রাখা হয়েছিল এখন তা নেমে শতকরা ৩ ভাগের মতো, ফলে কৃষির উত্কর্ষের জন্য কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং বর্ধিত বিনিয়োগ ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার হবে। সরকারের কৃষিনীতির অন্যতম লক্ষ্য কৃষি বাস্তুসংস্থানকে রক্ষা করা। বাস্তুসংস্থান রক্ষার অন্যতম উপায় হলো মাটির ওপর ও নিচের জীববৈচিত্র্য বাড়ানো। সেজন্য বর্তমান একক ফসল উৎপাদনচর্চা আইন করে বন্ধ করে একই সাথে একই জমি একাধিক ফসলের চাষ করার চর্চা প্রবর্তন করা, আবার দেশে এখন শুধু তিনটি উপাদানের জন্য রাসায়নিক সারে ভর্তুকির সিংহভাগ খরচ করা হয়, মাটিতে ১৭টি উপাদান ও অণুজীবীয় কার্যাবলি সচল রাখার জন্য জৈব সারসহ পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে ভর্তুকির ব্যবস্থা করা দরকার। এতে মাটি ও মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা পাবে। ফসলের বৈচিত্র্য ও উৎপাদন বাড়বে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। সরকার পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যেমন সারা দেশে পাঁচ লাখ পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এতে প্রতিটি ইউনিয়নে ১০০ পুষ্টি বাগান স্থাপিত হবে। যেহেতু কৃষি বাস্তুসংস্থান রক্ষা করা জরুরি সেজন্য এসব বাগান যাতে জৈব উপায়ে অর্থাৎ কোনো কৃত্রিম উপকরণ প্রয়োগ না করে গড়ে তোলা হয়, তেমন নির্দেশনা থাকা দরকার। গতানুগতিক কৃষি সম্প্রসারণ কৌশল তথা প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী পরিহার করে চাহিদাভিত্তিক ও লাভজনক কৃষির অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণ করা, সেজন্য কৃষকদের শ্রেণীভিত্তিক ব্লক অনুযায়ী তালিকা প্রণয়ন করা দরকার এবং সে অনুযায়ী সব কৃষককে প্রয়োজনীয় সেবা দেয়া এবং তাতে সহজে অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব। দেশে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যন্ত্রপাতি ক্রয় বা এর সাহায্য নেয়ার সক্ষমতা আমাদের ক্ষুদ্র চাষীদের নেই। সেজন্য প্রতি ব্লকে সম্প্রসারণকেন্দ্র বা সেবাকেন্দ্র স্থাপন করা, সে কেন্দ্রে অবশ্যই চাহিদামাফিক জমি চাষ থেকে ফসল প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা থাকবে। ক্ষুদ্র চাষীদের সংগঠিত করে ব্লকভিত্তিক বা সমাজভিত্তিক যৌথ চাষ জোরদার করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ব্লক সম্প্রসারণ কেন্দ্র কৃষিসেবা হাব হিসেবে কাজ করবে। দেখা যায় প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এর ধারাবাহিকতা থাকে না, সেজন্য পরিবেশগত কৃষির একটি জাতীয় কর্মসূচি থাকা দরকার। এখানে সিভিল সোসাইটি কাজ করতে পারে। যারা মাঠ পর্যায়ে গ্রামীণ পুঁজির তৈরি, পরিবেশগত চাষ, বাজার উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছে তাদের উৎসাহিত করা ও তাদের মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করা গেলে ক্ষুদ্র চাষীরা লাভবান হবেন। কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি শিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণকে পরিবেশগত কৃষির আদলে গড়ে তুলে তাদের কার্যক্রমকে আরো গতিশীল ও সক্ষম হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি।

এটা সবাই অনুধাবন করছেন, সবুজ বিপ্লব আমাদের সাময়িক খাদ্যচাহিদা মিটিয়েছে বটে, কিন্তু ক্ষতি করেছে মানুষের দেহের প্রাথমিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাসহ আমাদের জল-স্থল-অন্তরীক্ষ। এ বিধ্বংসী ব্যবস্থার পরিবর্তন রাতারাতি হবে না, তবে শুরু করা এখনই দরকার। তা না হলে মানবসভ্যতা চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়বে, কভিড-১৯ অতিমারী তার প্রাথমিক বার্তা।

 

ড. মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন: জৈব কৃষি গবেষক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট