মানুষ সৃষ্টির আগে মহান সৃষ্টিকর্তা মাটিকে সৃষ্টি করেছিলেন ১০৫টি উপাদানের সমন্বয়ে। তার ভেতর ১৬টি উপাদানকে উদ্ভিদের মূল খাদ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন মৃত্তিকা গবেষকরা। মাটি থেকে এ খাদ্য গ্রহণ করেই বেঁচে থাকে উদ্ভিদ। মাটির এ উপাদানের ভেতর রয়েছে উদ্ভিদের ফল-ফুল বৃদ্ধিসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উদ্ভিদের খাদ্য। এ উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য বিভিন্ন ধরনের ফসল। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের জীবন ধারণের জন্য শস্য ছাড়াও ফল ও মানব জীবন উপকরণের প্রয়োজনীয় সবকিছু উদ্ভিদ বুকে ধারণ করে চলেছে এ মাটি। বিশ্বে জনসংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বাড়ে খাদ্যচাহিদাও। প্রয়োজন পড়ে উৎপাদন বৃদ্ধির। আর সে সময় থেকে মাটির স্বাস্থ্যরক্ষায় গবেষণা চালান গবেষকরা। প্রতিটি সৃষ্টিরই ক্ষয় আছে। আছে মাটিরও। ফসল বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে মাটির সুস্বাস্থ্য রক্ষায় তাঁরা আত্মনিয়োগ করতে থাকেন। গবেষণায় তারা প্রমাণ পান মাটির মূল ১৬টি উপাদানের মধ্যে অক্সিজেন, কার্বন ও হাইড্রোজেন পেয়ে থাকে বাতাস এবং পানির মাধ্যমে। গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নাইট্রোজেন সিংহভাগ প্রাকৃতিকভাবে পেয়ে থাকে মেঘ চমকানো বিদ্যুৎ ও কুয়াশা থেকে। অন্য উপাদানগুলোও মাটি প্রাকৃতিকভাবে পেলেও তার খাদ্য চাহিদার তুলনায় কম। প্রাকৃতিকভাবে এগুলো পাওয়ার ফলে অতীতে গবেষণা ছাড়াই ফসল উৎপাদন সম্ভব হতো। কারণ তখন এক ফসলি বা দোফসলি উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ ছিল মাটি। বর্তমানে খাদ্য চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটিকেও ব্যবহার করা হচ্ছে তিন বা চার ফসলি উৎপাদনে। ফলে মাটিকে কোনো ধরনের বিশ্রাম দেয়া হচ্ছে না। এ কারণে মাটির স্বাস্থ্য ও সুরক্ষায় ব্যত্যয় ঘটছে। ফলে ব্যবহার করতে হচ্ছে রাসায়নিক সার।

অতিরিক্ত প্রতিটি জিনিসই অকল্যাণকর। আমাদের দেশের বেশির ভাগ কৃষকই অনভিজ্ঞ। ফলে এ রাসায়নিক সার তারা মনগড়াভাবে ব্যবহার করে জমির স্বাস্থ্য আরো নষ্ট করে তুলছে। তাদের ধারণা, সার বেশি দিলেই ফলন বেশি পাওয়া যায়। ভ্রান্ত ধারণাবশে ক্ষতি করছে মাটির সুস্বাস্থ্য, পাশাপাশি বিরূপ প্রভাব ফেলছে পরিবেশের ওপরও। এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আর সেজন্যই সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় আমাদের দেশে মৃত্তিকা সম্পদের উন্নয়ন ও গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। হাতে নিয়েছে মৃত্তিকা গবেষণা ও গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের মতো প্রকল্প। এ গবেষণায় মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে কৃষকদের দিচ্ছে সার সুপারিশমালা। এটা অত্যন্ত সীমিত আকারে হলেও এর পরিধি বৃদ্ধি করা দরকার।

বিশ্বায়নের এ যুগে বিশ্বের কৃষি যখন তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশও বসে নেই। পুষ্টিতে পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশকে পুষ্টিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্রকল্প। এর আগে খাদ্য ও পুষ্টি জাতীয় ফসলাদির বেশির ভাগ আমদানিনির্ভর ছিল এ দেশ। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে সেটার উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে আমদানিনির্ভরতা কমে এসেছে। এর মধ্যে দু-একটি ফসল অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রফতানি হচ্ছে দেশের বাইরে। কিন্তু মাঝপথে অথবা স্বল্পসময়ের জন্য এসব প্রকল্প হাতে নিলে তা প্রকৃত উদ্দেশ্য সফলের থেকে বিফলেই পর্যবসিত হবে।

এসব প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের কৃষিবিদরা প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। সেই কলাকৌশলগুলো তারা বাংলার কৃষকদের কাছে হস্তান্তর করে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির সহায়তা করছে। অনেকেই মনে করে, কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এ প্রশিক্ষণ নেয়ার প্রয়োজন কোথায়? আমি তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলতে চাই, তারা শুধু ব্যয় দেখেছে আয় দেখেনি। এ প্রশিক্ষণের ফলে যে ফসল বেশি উৎপাদিত হচ্ছে সেটা আমদানি করতে হতো। ফলে আপাতদৃষ্টিতে বিশাল ব্যয় দেখলেও আমদানিনির্ভরতার ব্যয় কমে আসছে।

বিশ্বায়নের এ যুগে বিশ্বের কৃষি যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের কৃষিও বসে নেই। তারাও বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সফল কৃষি ও কৃষক তৈরিতে আত্মনিয়োগ করছে। সফলতাও পেয়েছে বহুগুণে। পুষ্টিসহ মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে সরকার হাতে নিয়েছে কৃষক পর্যায়ে উন্নতমানের ডাল, তেল ও মসলাবীজ উপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রকল্প। এ প্রকল্প থেকে কৃষকরা দেশেই উন্নতমানের বীজ উৎপাদন করে বাজারজাতের মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধির চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে সফলতাও এসেছে। এ দেশের কৃষক ভারতের নিম্নমানের বীজ নিয়ে প্রতারণার কবল থেকে রক্ষা পাবেন এ প্রকল্প থেকে। তবে সেটা অপ্রতুল হলে কৃষকরা অতীতের পথেই হাঁটবেন। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটি ধরে রাখতে হবে। আঞ্চলিক ভিত্তিতে প্রকল্প হাতে নেয়া যেতে পাবে। এরই মধ্যে শস্যনিবিড়তা উন্নয়ন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, নিরাপদ উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করা হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকরা প্রশিক্ষিত হয়ে প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে। প্রথম পর্যায়ে এ এলাকার কৃষকরা সফলতাও পেতে শুরু করেছেন।

পেরু, ব্রাজিল, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন বৈদেশিক ফসল কাজুবাদাম ও কপি এ দেশের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য একশ্রেণীর মানুষ দামি এসব খাদ্য খেতে পারলেও সাধারণ মানুষ বঞ্চিত। দেশের নিম্নবিত্ত মানুষের কথা মাথায় রেখে কৃষি মন্ত্রণালয় কাজুবাদাম ও কপি গবেষণা উন্নয়ন এবং সম্প্রসারণ প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ প্রকল্পের সফলতা এলে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ যেমন পুষ্টির চাহিদা কিছুটা মেটাতে পারবে, তেমনি বৈদেশিক আমদানিও কমে আসবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণে কৃষি মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে হাতে নিয়েছে অনাবাদি পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙিনায় পুষ্টিকর বাগান স্থাপন প্রকল্প। এ প্রকল্পে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পে দরিদ্র বসতিদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

নিরাপদ উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল উৎপাদন ও সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তি সম্প্রসারণে আরেকটি প্রকল্পের মাধ্যমে নিরাপদ সবজি মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্ট চলছে। আমি আগেই বলেছি, আমাদের দেশের কৃষক অনভিজ্ঞ এবং বেশির ভাগই অশিক্ষিত। ফলে একবার তাদের মাথায় কোনো কিছু প্রবেশ করলে সেখান থেকে বের করে আনা অত্যন্ত কঠিন। কৃষি বিভাগ তাদের পরামর্শ দিলেও বাড়ি যেতে যেতে তারা ভুলে যায়। একসময় কৃষি বিভাগ পোকা দমনে কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিতো কৃষকদের। কীটনাশক ব্যবহার করে পোকার আক্রমণ থেকে বহুলাংশে রক্ষা পায় কৃষকের ফসল ও সবজি। ফলে তারা সব খাদ্যেই কীটনাশক ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এখান থেকে তাদের বের করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে কৃষি বিভাগের পক্ষে। এ কীটনাশক এতটাই খারাপ যা শুধু পোকার ওপরই কার্যকর নয়, সেটা মানবদেহ ছাড়াও জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নিরাপদ উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কৃষি বিভাগ। কিন্তু এ প্রকল্পের সফলতা খুবই কম। এ প্রকল্পের সফলতা আনতে হলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের কাজে লাগাতে হবে। নিরাপদ ফসল উৎপাদনকারী কৃষককে তাদের মাধ্যমে সনদ দিতে হবে। নিরাপদ ফসল বা কীটনাশকবিহীন ফসল পেলে ক্রেতাসাধারণ দাম বেশি দিয়ে কিনতে আগ্রহী হবেন। ফলে বিষমুক্ত ফসলের চেয়ে বিষযুক্ত ফসলের বাজারমূল্য কম হবে। এ কারণে বিষযুক্ত ফসল বিক্রি কম হবে। ফলে সনদবিহীন কৃষক কৃষি সনদ ও বাজারমূল্য বেশি পাওয়ার জন্য বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে পড়বেন। এ জন্য প্রতিটি বাজারে একটি করে বিষমুক্ত ফসল বাজারজাতের জন্য দোকান থাকতে হবে। এত কিছুর পরও প্রতিটি প্রকল্পের একটি খারাপ দিক রয়েছে তাদের প্রচারণার অভাবে। মাঠপর্যায়ে এসব কার্যক্রম প্রকাশিত হলে প্রকল্প সম্পর্কে অন্য কৃষক সম্যক অবগত হতেন। সব কৃষককে প্রশিক্ষণ ও প্রকল্পভুক্ত করা সম্ভব নয়। তাই যারা প্রকল্পভুক্ত কৃষক নন, তারা এ প্রচার থেকে উপকৃত হতে পারবেন।

কৃষিকে আরো ত্বরান্বিত করতে হলে মৃত্তিকা সম্পদ ও সম্প্রসারণে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গবেষণার মাধ্যমে সার সুপারিশমালার ভিত্তিতে আবাদ করতে হবে। তাহলে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার হ্রাস পাবে। মাটিও থাকবে নিরাপদ। উৎপাদনও কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাবে।

 

শফিউল আলম দুলাল: সাংবাদিক