প্রাচীনকাল থেকেই কৃষি বাঙালির জীবিকার উৎস। এ উপমহাদেশের অন্যান্য অংশের অবস্থাও প্রায় অভিন্ন। গোটা বাংলায় পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতসহ তিনটি প্রধান নদ-নদী পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা এবং তাদের অসংখ্য শাখা-প্রশাখা প্রসারিত পলি গঠিত সমভূমি হওয়ার কারণে প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে কৃষিকাজ অপেক্ষাকৃত সহজ ও তুলনামূলক কম খরচের ছিল। ফলে এখানকার কৃষি ব্যবস্থাপনায় কখনো রাষ্ট্রীয় মালিকানা কখনো ব্যক্তিমালিকানার উদ্ভব হয়েছে। মধ্যযুগ কিংবা তার পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলের কৃষি কখনো রাষ্ট্রীয় কখনো ব্যক্তি কিংবা দুটোর সংমিশ্রণ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়েছে। ফরিদপুরে প্রাপ্ত তিনটি তাম্রশাসনে এবং অধিকাংশ পাল ও সেন শিলালিপির তথ্য অনুসারে রাষ্ট্র ভূমির মালিক হলেও গ্রামে বসবাসরত কৃষকদের দ্বারাই কৃষি ব্যবস্থা পরিচালিত হতো এবং চাষাবাদ ছিল ব্যক্তিগত খামারভিত্তিক। কৃষিদ্রব্যে রাজার অংশ ছিল রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রধান উৎস। রাজস্ব ও অন্যান্য কর হিসেবে উত্পন্ন দ্রব্যের কতটা রাষ্ট্র আদায় করত, সে বিষয়ে জানা না গেলেও কৃষির একটি নতুন ধারা উন্মোচন হয়।

আবার সুলতানি ও মোগল আমলে বাংলার কৃষির যথেষ্ট বিকাশ ঘটেছিল। অনেক স্থানের নামের সঙ্গে ‘আবাদ’ সংযুক্তি (যেমন ফতেহাবাদ ও খালিফাবাদ) সেসব জায়গা চাষাধীনে আসার সাক্ষ্যবহ হতে পারে। তত্কালীন সরকার ভূমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে কৃষি সম্প্রসারণে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। উদাহরণস্বরূপ বীজ ও বলদ বা কৃষি যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ার ক্রয়ে সহায়তার জন্য সরকার কৃষকদের তাকাবি ঋণ দিত। ১৯২১ সালের মধ্যে বাংলার মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় চার-পঞ্চমাংশ প্রায় ৭৭.৩ শতাংশ কৃষিনির্ভর হয়ে পড়ে, যা সমগ্র ভারতে ছিল ৬৯.৮ শতাংশ। তবে সে হার বাংলাদেশে এখন ৪০ শতাংশের ঘরে ওঠানামা করছে। তাহলে কি কৃষির গুরুত্ব কমছে? নাকি অকৃষি খাত এগিয়ে চলছে। গত কয়েক দশকের বিবর্তনে অকৃষি খাতের উন্মেষ সেই বিশ্লেষণের দাবি রাখছে। কেনই বা বাংলায় অকৃষি খাতের বিকাশ হলো, কীভাবে হলো। তার মূলে রয়েছে কৃষি খাতই। মূলত কৃষিকেন্দ্রিক বা কৃষি উৎপাদনকে ঘিরেই অকৃষি খাতের সম্প্রসারণটা বেশি হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ কিছু সেবা খাত ও পরিবহন খাতের অবদান রয়েছে। তবে এ অকৃষি খাতের উন্মেষের ইতিহাসটাও কিন্তু কম সময়ের নয়।

১৭৫৬ সাল পর্যন্ত বাংলার চিনির একটি উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য চালু ছিল মাদ্রাজ, বোম্বে, মালাবার উপকূল, সুরাট, সিন্ধু, মাসকাট, মক্কা ও জেদ্দার সঙ্গে। এমনকি সতেরো শতকের মাঝামাঝিও বিপুল পরিমাণ চিনি রফতানি বাণিজ্যসহ বাংলা ছিল এ শিল্পের প্রধান কেন্দ্র। বারবোসা, বারথেমা ও বার্নিয়ার বিবরণী এবং ইংরেজ ও ওলন্দাজ নথিপত্রে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এতে বোঝা যায়, ইক্ষু মধ্যযুগের বাংলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল ছিল। আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে রফতানি বাণিজ্য হ্রাস পায় এবং উত্পন্ন চিনি তখন কেবল প্রদেশের নিজস্ব চাহিদা মেটাতে পারত। চিনি উৎপাদন এবং এর বিপণন প্রক্রিয়ায় কৃষি ও অকৃষি খাতের একটি বিকাশমান ধারা চলে আসে। ফলে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে চিনি ও পাটকে ঘিরেই মূলত কিছু যন্ত্রের বিকাশ হয়। এছাড়া স্বল্প পরিসরে সেচ ও শস্য কাটাকে ঘিরে স্বল্প কিছু যন্ত্রের প্রচলন হয়।

তবে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ ১৯৭০-এর দশকে শুরু হয়। প্রধানত সেচপাম্প দিয়ে যাত্রাটা হলেও পরবর্তী সময়ে কৃষির নানা ক্ষেত্রেই যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। যদিও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর পরই সরকার একটি ভালো উদ্যোগ নিয়েছিল যে আড়াই হাজার টাকা জমা দিলে একটি পাম্প দেয়া হতো। সেচের পানির জন্য ব্যাপক চাহিদা ছিল। অনেক ক্ষেত্রে পানির অভাবে ভরা ফসলও মারা যেত। সেই সেচপাম্প আসার মাধ্যমে কৃষির প্রায় ৮৫ শতাংশ জমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছে গেছে। ম্যানুয়ালি যে গভীরতা থেকে পানি আনা সম্ভব নয়, পাম্প দিয়ে সেখান থেকে পানি আনা সম্ভব। বাংলাদেশে পাম্পের ব্যবহার নিয়ে নেতিবাচক অনেক প্রচারণা হয়েছে। ডিজেল যাচ্ছে, দূষণ হচ্ছে। বিদ্যুতে যথেষ্ট ছাড় দিয়ে পাম্পকে জনপ্রিয় করা হচ্ছে। অনেকে বলে যে ভূগর্ভস্থ পানি কমে যাচ্ছে। তবে শুধু পাম্প দিয়ে পানি তোলার কারণে পানির তলদেশ খালি হচ্ছে বিষয়টি এমন নয়। বিভিন্ন সেডিমেন্ট দিয়ে নদীর তলদেশ ভরে যাওয়ার কারণেও খালি হচ্ছে নদীর তলদেশ। কারণ দক্ষিণে সমুদ্র হওয়ার কারণে এবং উত্তরাঞ্চলের ভূপৃষ্ঠ উঁচু হওয়ার কারণে সব পানি নেমে যায়। নদী পানি ধারণ করতে না পারলে কীভাবে ভূগর্ভস্থ পানি ভরবে? সেখানে পানি নেমে যাওয়াটা স্বাভাবিক।

পরবর্তী সময়ে পাওয়ার টিলারের প্রবর্তন ঘটেছে। যদিও ষাটের দশকে এটি দেশে আসে, তবে গরু-মহিষ দিয়ে হাল চাষের অভ্যাস ছিল এবং কিছুটা সুবিধাজনক থাকার কারণে কৃষক সেই অভ্যাস ছাড়তে পারেনি। কিন্তু ব্যাপক আকারে পাওয়ার টিলারের ব্যবহার শুরু হয় আশির দশকে। গত ১০ বছরে ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করা ব্যবাপক হারে বেড়েছে। ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার মিলে আমাদের দেশের আবাদযোগ্য জমির প্রায় ৯৫ শতাংশ যন্ত্রের ব্যবহার হয়ে গেছে। এ অর্জন নেপাল ও ভারতের তুলনায় অনেক বেশি। ওইসব দেশে গরুর লাঙল আছে। প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যায়ে আছে। এক্ষেত্রে আমাদের দেশে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এখানে সরকার যথেষ্ট সাপোর্ট দিয়েছে। ব্যক্তিখাতের কোম্পানিগুলো চাষে ট্রাক্টর প্রচলনের জন্য আগ্রাসীভাবে যথেষ্ট কাজ করেছে। এতে দ্রুত চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় কমে এসেছে। পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর মিলে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে একটি চমত্কার সাফল্য এসেছে।

বাংলাদেশের কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের বিকাশ মূলত ধানকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। তবে ধান ছাড়াও অনান্য শস্যকেন্দ্রিক যন্ত্রের বিকাশ দ্রুত ঘটাতে হবে। আবার কৃষির অনান্য উপখাত বিশেষ করে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে নতুন যন্ত্রের বিকাশ ঘটানোর বেশ সুযোগ রয়েছে। দেশে এখন প্রায় ৭৫ শতাংশ জমিতে ধানের আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে বোরো ধানের আবাদ সবচেয়ে বেশি হয়। বোরোর আবাদ প্রায় ৫৪-৫৬ লাখ হেক্টর। অন্যদিকে আমন ধানের আবাদ ৪৪-৪৫ লাখ হেক্টর এবং আউশের আবাদ হচ্ছে ৯-১০ লাখ হেক্টর। সব মিলিয়ে চাল উৎপাদন ছাড়িয়েছে প্রায় পৌনে চার কোটি টন। আউশ, আমন ও বোরো ধান মিলে এখন ১ কোটি ১৫ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে ধানের আবাদ হচ্ছে। আর তিন ধরনের ধান উৎপাদনে নিয়োজিত রয়েছেন এক কোটির বেশি কৃষক। তাই নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, ধানকেন্দ্রিক যন্ত্রের বিকাশ ঘটানো গেলে অনান্য খাতে সেটি সম্প্রসারণ করা সহজ হবে। তবে ধানকেন্দ্রিক কৃষিযন্ত্র সম্প্রসারণে আরো বেশকিছু নতুন পদক্ষেপ প্রয়োজন।

কয়েক দশকের ব্যবধানে কৃষি বিশেষ করে শস্য, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের নানা ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণের ছোঁয়া লেগেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি প্রায় শতভাগ আবার কিছু ক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে রয়েছি। জমি চাষ ও ধানকেন্দ্রিক যান্ত্রিকীকরণের অগ্রগতি বেশ আশা জাগাচ্ছে। জমি চাষে ৯৫ শতাংশ জমি এখন পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর ও কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে আবাদ করা যাচ্ছে। সেচের ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশের বেশি সেচ এখন যন্ত্রের মাধ্যমে হচ্ছে। কিন্তু ধান লাগানোর ক্ষেত্রে ১-২ শতাংশ হয়েছে। এছাড়া ধান ছাড়া অনান্য শস্যের ক্ষেত্রে এখনো সেভাবে যন্ত্রের ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। পিছিয়ে থাকা মত্স্য খাতে ও প্রাণিসম্পদ খাতের নানা ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার করা সম্ভব। কিছু ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার এসেছে। তবে সেটা এখনো পর্যাপ্ত নয়। ফলে কৃষি বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির বিরাট পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ। কেননা এখন পর্যন্ত কৃষির যেসব ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণের ছোঁয়া লেগেছে সেটি গ্রামীণ অর্থনীতির গতিপরিবর্তনে বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। সামনের দিনে যন্ত্র ও প্রযুক্তির ছোঁয়াই হবে গ্রামীণ অর্থনীতির গতিপরিবর্তনে অন্যতম হাতিয়ার। আর কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার হবে কৃষিযন্ত্র।

কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ এখন শুধুই উৎপাদনকেন্দ্রিক আলোচনার বিষয় বস্তু নয়। কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার এখন বহুমুখী বিষয়কে কেন্দ্র করে এগিয়ে নিতে হবে। বিশেষ করে এ যন্ত্রের মাধ্যমে কীভাবে তরুণ কর্মসংস্থানকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব, শস্যের নিবিড়তা বাড়ানোর মধ্যেমে কৃষকের আয় বাড়তে পারে বা শস্যের মধ্যে ইন্টারক্রপিং গ্যাপ কমিয়ে এনে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ফসলের নীবিড়তা ও ফলন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়সহ ফসল কর্তনজনিত ক্ষতি অনেকাংশে কম হয়। প্রত্যেকটি যন্ত্রেরই স্বতন্ত্র সুবিধা রয়েছে, যার ব্যবহার কৃষকের বর্তমান প্রচলিত সনাতন পদ্ধতির চেয়ে অধিক লাভজনক। সে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এরই মধ্যে খামার যান্ত্রিকীকরণের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের মাধ্যমে ছোটবড় প্রায় ৬০ হাজার কৃষিযন্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে। সম্প্রতি একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার মাধ্যমে প্রায় ৫৫ হাজার ছোট, মাঝারি ও ভারী মানের কৃষিযন্ত্র সরবরাহ করা হবে। এর মাধ্যমে হাওরাঞ্চলের কৃষকরা প্রায় ৭০ শতাংশ হারে ভর্তুকি পাবেন। তবে এ সুবিধা শুধু বিশেষ কিছু অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা দেশেই ৮০ শতাংশ ভর্তুকিতে চালু করতে হবে। তা না হলে সারা দেশের কৃষক তার প্রয়োজনীয় কৃষিযন্ত্রের চাহিদা মেটাতে পারবেন না। কেননা কৃষকের আর্থিক অসংগতি এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ধান দেশের প্রধান শস্য। আবার ধানের দামের ক্ষেত্রে ওঠানামা সবেচেয়ে বেশি থাকে। এতে কৃষক বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফলে ধানের উৎপাদন খরচ কমানোর বিকল্প নেই। সেটি করতে হলে ধান আবাদ থেকে শুরু করে চাল পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে। আবার কৃষিযন্ত্রের জন্য যেসব ভর্তুকি সুবিধা চালু করা হয়েছে সেটি যৌক্তিকভাবে দেশের সব অঞ্চলের জন্য চালু করতে হবে। কোন এলাকায় কত শতাংশ ভর্তুকিতে কৃষিযন্ত্র দেয়া হবে সেটি সেই অঞ্চলের উৎপাদন খরচ বিশেষ করে জমির ভাড়া, শ্রমিক খরচ, সেচের খরচ ও ইন্টারক্রপিং গ্যাপ—এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই করা প্রয়োজন। তা না হলে কৃষকদের প্রতি ন্যায্য সিদ্ধান্ত হবে না।

ফসলের মৌসুমে এখন ৩৫-৪০ শতাংশ শ্রমিকের সংকট থাকে। সামনের দিনে আরো সংকট ঘনীভূত হবে। কেননা দেশে আরো শিল্পায়ন হবে সেক্ষেত্রে এসব শিল্পে শ্রমিক কৃষি খাত থেকে স্থানান্তরিত হবে। সম্ভাবনা রয়েছে প্রচুর। কৃষি যন্ত্রপাতি দিয়ে যদি ধান আবাদ করা যায়, তাহলে ৩০ শতাংশ খরচ কমানো সম্ভব। সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। এসডিজি বলছে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ও মানুষের আয় বাড়াতে। যন্ত্রের ব্যবহার ছাড়া সেটি মোটেও সম্ভব নয়। যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধি পেলে কম মূল্যে কৃষক ধান বিক্রি করে লাভবান হতে পারবেন। যদি যন্ত্রপাতি দিয়ে ধান চাষ করা যায় বিশেষ করে চাষ করা, পানি দেয়া, ধান লাগানো, হারভেস্ট করা যায় তাহলে মোট উৎপাদন খরচ ৩০ শতাংশ কম হয়। তাই কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কৃষিজমিতে যান্ত্রিক শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা দরকার। বাংলাদেশে চাষের কাজে প্রায় শতভাগ ও সেচের ক্ষেত্রে ৮৫ ভাগ যান্ত্রিকীকরণ অর্জন হয়েছে। তবে বীজ বপন/চারা রোপণ ও ফসল সংগ্রহের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করা যায়নি।

গ্রামীণ অর্থনীতি বেগবান হয় যদি কৃষক ধানের দাম ভালো পান। অথবা ধানে যদি মুনাফা করতে পারেন। কাজেই লাভজনকভাবে ধান উৎপাদন করতে হলে যান্ত্রিকীকরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে হারভেস্টারের বিস্তার ঘটাতে হবে। এ যন্ত্রে ধানের অপচয় কমে যাবে, ঝরে পড়ার হার ১৫ থেকে ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। এতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হলো, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা থাকল এবং নিম্নব্যয়ে ধান উৎপাদন করা গেল, ধান চাষে মানুষের আগ্রহও ধরে রাখা গেল। তরুণদের কৃষিতে নিয়োজিত করতে হলে যন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। কারণ এখনকার গ্রামের তরুণ বা কৃষকের সন্তানরা অনেকটাই শিক্ষিত ও বেশ পরিপাটি থাকতে পছন্দ করে। তাই তাদের কাদামাটি কিংবা প্রচণ্ড রোদের মধ্যে কাজে নিয়োজিত করা সম্ভব নয়। এজন্য তাদের কাছে উন্নত যন্ত্র পৌঁছাতে না পারলে কৃষিতে তরুণদের আগ্রহী করা সম্ভব হবে না। কৃষিযন্ত্রের মাধ্যমে গ্রামীণ অঞ্চলে সার্ভিস প্রভাইডার হয়ে তরুণরা বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারে। শস্যের নিবিড়তা বাড়াতে কার্যকর হবে যন্ত্রের ব্যবহার। সেহেতু ইন্টারক্রপিং গ্যাপটা আমাদের দেশে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ সমস্যার সমাধানে আমাদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে ধান লাগানোর যন্ত্রটি প্রবর্তন করতে হবে। যন্ত্র দিয়ে ধান লাগালে ব্যয় অনেক কম। একদিকে ব্যয় সাশ্রয় হলো, অন্যদিকে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ধান লাগানো গেল। অতএব লাভজনকভাবে, উৎপাদনশীলভাবে ধান উৎপাদন করতে হলে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। সেচের জন্য যন্ত্র ব্যবহার শতভাগ অর্জনের পথে বাংলাদেশ। তবে এটিতে দক্ষতা আনতে হবে, একটু পরিবেশবান্ধব করতে হবে। সেটি ধীরে ধীরে শুরু হচ্ছে এবং হয়ে যাবে। জমি চাষের পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর দিয়ে যথেষ্ট পেনিট্রেশন হয়েছে। এখন সারা পৃথিবীতে ট্রিলেজের একটি বিষয় আলোচনা হচ্ছে। অতিরিক্ত ট্রিলেজ করলে ভূমি ক্ষয় হয়, মাটি দেবে যায়। সেটিতেও ধীরে ধীরে প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটছে। প্রসেসিংয়ে কিন্তু যান্ত্রিকীকরণ এগিয়ে নিতে হবে। ধান শুকানো, সেদ্ধ করা, ধান থেকে চাল ছাড়ানো ও প্যাকেজিং করা পর্যন্ত যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে। চালের রিকভারি রেট বাড়েতে হবে। আলুতে যান্ত্রিকীকরণ খুব দরকার। কারণ আলু হলো ইন্টারক্রপ। আমন ও বোরোর মাঝখানে।

পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরভিত্তিক ডিভাইস বা অ্যাপ্লায়ান্সগুলো সংযোজন করা গেলে অনেক সফলভাবে আলু লাগানো ও কাটা যাবে। ইদানীং আমাদের দেশে বাণিজ্যিকভাবে সবজি উৎপাদন হচ্ছে। এখানে যান্ত্রিকীকরণের প্রচলন করা গেলে অনেক কম খরচে উৎপাদন করার সুবিধা হবে। ভুট্টায় যান্ত্রিকীকরণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভুট্টা এমন এক ফসল যেখানে খোসা ছাড়ানো থেকে শুরু করে ভুট্টা তুলে আনা খুবই ব্যয়বহুল কাজ। এখানেও কিছু করার আছে। কারণ আমাদের দেশে ভুট্টার উৎপাদন যথেষ্ট ভালো হচ্ছে ভারতের তুলনায়। সেক্ষেত্রে সেচ ও লাগানো থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াকরণ পর্যন্ত যদি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ব্যয় কমাতে পারি, তাহলে অনেক ভালো কিছু করা সম্ভব। একইভাবে গমের ক্ষেত্রেও সমস্যা বিদ্যমান। এর হারভেস্টিং কস্ট অনেক বেশি। এক্ষেত্রে শ্রমিক পাওয়া কঠিন। কারণ গমের কাঁটা মানুষের গায়ে লাগলে চুলকায় বা ঘা হয়। সেক্ষেত্রে গম লাগানো ও তোলার ক্ষেত্রেও যান্ত্রিকীকরণের যথেষ্ট প্রয়োজন আছে।

মাছ প্রক্রিয়াকরণে যান্ত্রিকীকরণের সুযোগ আছে। এক্ষেত্রে যদি যান্ত্রিকীকরণ করতে পারি, তাহলে মাছের আঁশ বা নাড়িভুঁড়ি ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা যায় এবং রফতানি করতে পারব। মুরগি পালনে যথেষ্ট যান্ত্রিকীকরণ প্রবর্তিত হয়ে গেছে। বিশেষ করে ব্রিডিং হাউজগুলোয় নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ব্রিডিং করা হচ্ছে। লেয়ার হাউজগুলোয় সুন্দর সুন্দর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে খাবার দেয়া হচ্ছে। রোবটের ব্যবহার করা হচ্ছে। সেগুলোর ব্যবহার যত বাড়বে তত দূষণ কমাতে পারব। হ্যাচারিগুলোও এখন অনেকটাই ম্যাকানাইজড। মুরগির খামারে রোবট প্রবর্তন করার চেষ্টা করছে। সেক্ষেত্রে যথেষ্ট সুযোগ আছে। গবাদিপশুতে যান্ত্রিকীকরণ খুব প্রাথমিক ধাপে আছে। বিশেষ করে এক্ষেত্রে মিল্কিংয়ের জন্য যান্ত্রিকীকরণ খুবই দরকার। দুধ পরিবহনেও যান্ত্রিকীকরণের সুযোগ আছে।

দেশের কৃষিকে এগিয়ে নিতে যান্ত্রিকীকরণে অর্থায়ন বাধা দূর করা প্রয়োজন। ব্যাংকগুলো সরাসরি কৃষককে ঋণ দিচ্ছে না বিধায় কোম্পানিগুলো ঋণ প্রদান করতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ব্যাংকগুলো কৃষককে ঋণ দেয় এবং তারাই সেটি রিকভারি করে। তাই কার্যকর ও সমন্বিত একটি নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। যান্ত্রিকীকরণের কার্যক্রমকে আরো এগিয়ে নিতে হলে ভর্তুকি কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। নীতিমালায় কৃষিযন্ত্র কেনায় কৃষকদের উৎসাহিত করতে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, এনজিও ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সহজে কৃষিঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে। বছরে স্বল্প সময়ে ব্যবহার্য বপন, রোপণ, কর্তন, শুকানো, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ-বিষয়ক কৃষিযন্ত্র কেনার ক্ষেত্রে ন্যূনতম সুদ কিংবা বিশেষ ক্ষেত্রে সুদবিহীন ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে। আর যান্ত্রিকীকরণে তরুণদের উৎসাহিত করতে সহজ পদক্ষেপ থাকতে হবে। পাশাপাশি কৃষিযন্ত্র সেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তা, কৃষক, মেকানিক, মেরামতকারী কারখানা শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। গ্রামের যুবশক্তিকে উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরির মাধ্যম হবে কৃষিযন্ত্র। ফলে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে যুবসম্প্রদায়কে অধিক অংশগ্রহণের নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট করতে হবে। সঠিক ও কার্যকর পরিকল্পনা ও নীতির মাধ্যমে কৃষিতে শতভাগ যান্ত্রিকীকরণ করতে পারলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। এতে কৃষকের লাভ বা মুনাফা বৃদ্ধি পাবে। গ্রামীণ অর্থনীতি আরো বেগবান হবে। জাতীয় অর্থনীতি হবে টেকসই ও সমৃদ্ধিশালী।

 

ড. এফএইচ আনসারী: ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এসিআই এগ্রিবিজনেসেস ও সিন্ডিকেট সদস্য, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়