কৃষিপ্রধান এ দেশের মোট জনশক্তির প্রায় ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ সরাসরি কৃষিকাজে এবং ৭৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষিতে নিয়োজিত। দেশের মোট জিডিপির ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষি খাত হতে আসে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জনে যান্ত্রিক চাষ ও সেচের অবদান অপরিসীম। পাক-ভারত স্বাধীনতার পর তত্কালীন সরকার দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ হতে মুক্তির লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি অধিদপ্তর ১৯৫১-৫২ অর্থবছরে মাত্র তিনটি শক্তিচালিত পাম্পের (এলএলপি) সাহায্যে সেচ কর পদ্ধতিতে সেচ কার্যক্রম শুরু করে। শক্তিচালিত পাম্পের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিতরণ, পরিচালনা, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণের নিমিত্ত ১৯৬১ সালের ১৬ অক্টোবর ৩৭ নম্বর অধ্যাদেশ বলে ‘ইস্ট পাকিস্তান এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন’ (ইপিএডিসি) প্রতিষ্ঠা হয়, যা বর্তমান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কাছে হস্তান্তর করে। তত্কালে সেচ সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৃষকের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিএডিসির মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে জমি কর্ষণের ক্ষেত্রে পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর প্রকল্প চালু করে, যা কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে। অন্যদিকে স্বাধীনতাপূর্ব কৃষি মন্ত্রণালয়, যেসব এলাকায় ভূ-উপরিস্থ পানির সহজলভ্যতা কম, সেসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি প্রাপ্যতা ও সেচযন্ত্রের কমান্ড এরিয়ার ওপরভিত্তি করে ১৯৬৭-৬৮ অর্থবছর হতে প্রতিটি ২৪ দশমিক শূন্য হেক্টর কমান্ড এরিয়ায় ৯০৬টি গভীর নলকূপ এবং তাকাবি ঋণের আওতায় ভর্তুকি মূল্যে প্রতিটি ৬ দশমিক শূন্য হেক্টর কমান্ড এরিয়ায় ৭৯৩টি অগভীর নলকূপ খনন, স্থাপনের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির সেচ কার্যক্রম শুরু করে। শুরুতেই সেচ সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে সেচযন্ত্রগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার নিমিত্ত পিওএল (পেট্রোলিয়াম, অয়েলস অ্যান্ড লুব্রিক্যান্টস) কর্মসূচির আওতায় তেল-জ্বালানির সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে একরপ্রতি নির্দিষ্ট হারে ‘সেচ চার্জ’ ভিত্তিতে কৃষককে সেচযন্ত্রের তেল-জ্বালানি বিনা মূল্যে সরবরাহ করে। আশির দশকের শেষ ভাগে একরপ্রতি সেচ চার্জ নীতিমালা বাতিল হলে তেল-জ্বালানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

স্বাধীনতার পর খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, ত্বরান্বিত ও সহজলভ্য ও ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ ও দ্রুত দারিদ্র্যমুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার দেশকে খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে সারা দেশে সেচ কার্যক্রম বিস্তৃতিকরণের লক্ষ্যে প্রথম পর্যায়ে বিনা মূল্যে অগভীর নলকূপ স্থাপন করে কৃষকদের মাঝে সেচ প্রদান কার্যক্রম শুরু করে। একই সঙ্গে ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য ভর্তুকি/হ্রাসকৃত মূল্যে সেচযন্ত্র খুচরা যন্ত্রাংশ ও কারিগরি সহায়তার জন্য মেকানিক সেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে আমদানীকৃত সেচযন্ত্রগুলোর খুচরা যন্ত্রাংশ ও নলকূপের মালামাল তৈরি, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সহায়তায় জেলা পর্যায়ে জোনাল/রিজিয়নাল ওয়ার্কশপ স্থাপন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করা হয়। ওই ওয়ার্কশপে সেচযন্ত্রের বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ ও নলকূপের মালামাল তৈরি এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিএডিসির মেকানিক ও গ্রামীণ বেকার যুবকদের প্রশিক্ষিত করা হয়। এর মাধ্যমে কৃষি ক্ষেত্রে মাঠে সরবরাহকৃত সেচযন্ত্র পরিচালনা, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ কার্যক্রমে ব্যাপক প্রভাব এবং সেচ সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ফলে দেশে সেচযন্ত্র পরিচালনা, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণে কৃষকদের ভোগান্তির পরিসমাপ্তি ঘটে। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রতিটি নলকূপের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব, কমান্ড এরিয়া ও ভূগর্ভস্থ পানির প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে সেচযন্ত্র স্থাপন ও সরবরাহ করা হয়, যা কৃষকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এছাড়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিটি সেচযন্ত্র ও কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষক সমবায় সমিতির কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে সেচ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কার্যক্রম সুষ্ঠু ও সঠিকমাত্রায় পরিচালনার নিমিত্ত কৃষি সমবায়ের ওপর গুরুত্বারোপ এবং সমবায় আন্দোলনকে ‘সবুজ বিপ্লব, বাস্তবায়নের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন আমল অর্থাৎ ১৯৭১-৭২ হতে ১৯৭৪-৭৫ পর্যন্ত গভীর নলকূপ ৯০৬ হতে ২ হাজার ৬৯৯টি অর্থাৎ ১৯৮ শতাংশ, স্বাধীনতাপূর্ব কৃষি মন্ত্রণালয় তাকাবি ঋণের আওতায় ভর্তুকি মূল্যে অগভীর নলকূপ ৭৯৩ হতে ২ হাজার ৮২০টি অর্থাৎ ২৫৬ শতাংশ, শক্তিচালিত পাম্প ২৪ হাজার ২৪৩টি হতে ৩৫ হাজার ৫৩৪টি অর্থাৎ ৪৭ শতাংশ এবং সেচ এলাকা ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬১৯ হতে ৬ লাখ ২৭ হাজার ৪০৫ হেক্টর অর্থাৎ ৬৪ দশমিক ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ওই বর্ধিত সেচযন্ত্রগুলো মাঠ পর্যায়ে ক্ষেত্রায়ণের ফলে যেখানে ১৯৭১-৭২ সালে খাদ্য উৎপাদন ছিল ১ দশমিক শূন্য কোটি টন, যা মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে ১৯৭৪-৭৫ সালে ১ দশমিক ১৪ কোটি টনে উন্নীত হয়।

এক পরিসংখ্যান হতে দেখা যায়, ১৯৬৯-৭০ সেচ মৌসুমে মোট সেচকৃত এলাকা ২,৮৬ হাজার ২৩১ হেক্টর। এর মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির সেচ ৫ শতাংশ (১৩ হাজার ৪ হেক্টর) ও ভূ-উপরিস্থ পানির সেচ ৯৫ শতাংশ (২ লাখ ৭৩ হাজার ২২৭ হেক্টর)। আবার এক দশকের ব্যবধানে অর্থাৎ ১৯৭৯-৮০ সেচ মৌসুমে সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানির সেচ ২৫ শতাংশ এবং ভূ-উপরিস্থ পানির সেচ ৭৫ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে চার দশকের ব্যবধানে বিপরীত চিত্র অর্থাৎ ২০০৯-১০ সেচ মৌসুমে সেচকাজে ভূ-উপরিস্থ পানির সেচ ২০ শতাংশ ও ভূগর্ভস্থ পানির সেচ ৮০ শতাংশে পৌঁছায়। অন্যদিকে পাঁচ দশকের ব্যবধানে অর্থাৎ ২০১৯-২০ সেচ মৌসুমে মোট সেচকৃত এলাকা ৫৬ লাখ ২৭ হাজার ৫৯৮ হেক্টর। এর মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির সেচ ৭৩ শতাংশ (৪০ লাখ ৮৫ হাজার ৩৬৫ হেক্টর)ও ভূ-উপরিস্থ পানির সেচ ২৭ শতাংশ (১৫ লাখ ৪২ হাজার ২৩৩ হেক্টর), যা ১৯৬৯-৭০ সেচ মৌসুমের সেচকৃত এলাকার চেয়ে প্রায় ১ হাজার ৮৫০ শতাংশের বেশি। ১৯৬৯-৭০ সেচ মৌসুমে সেচকাজে ব্যবহূত ভূগর্ভস্থ উত্তোলিত পানির পরিমাণ ১৬০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার (এমসিএম) এবং ২০১৯-২০ সেচ মৌসুমে ভূগর্ভস্থ উত্তোলিত পানি ৪৯ হাজার ৫০০ এমসিএম, যা ১৯৬৯-৭০ সেচ মৌসুমের চেয়ে প্রায় ৩০৯ গুণের বেশি পানি ব্যবহার হয়েছে (সূত্র: সেচযন্ত্র জরিপ প্রতিবেদন-২০১৯-২০)। দেশে ভূ-উপরিস্থ পানিসম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৩৫০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার (বিসিএম) এবং ভূগর্ভস্থ প্রায় ৫৪ দশমিক ১০ বিসিএম (সূত্র: এফএও)। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে কৃষি ক্ষেত্রে খরা, অনাবৃষ্টি, বৃষ্টি ও বন্যার স্থায়িতকাল কম এবং পুকুর, ডোবা, নদী, খাল-নালা ইত্যাদির ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশব্যাপী ব্যাপক পলিথিন, কল-কারখানায় রাসায়নিক বর্জ্য ও সিমেন্ট কংক্রিটের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে মাটির ওপর অপ্রবেশ্য আবরণের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ সঠিকমাত্রা হচ্ছে না, যা পানিসম্পদের জন্য বিরাট হুমকিস্বরূপ। সেচকাজে অতিমাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে নর্থ ওয়েস্ট (এনডব্লিউ) এবং নর্থ সেন্ট্রাল (এনসি) হাইড্রোলজিক্যাল রিজিয়নের কিছু কিছু এলাকায় ভূগর্ভস্থ স্থিতিশীল স্তর দিন দিন নিম্নগামী হচ্ছে। এতে ফসল উৎপাদন বিঘ্নিত এবং উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে অন্য ছয়টি হাইড্রোলজিক্যাল রিজিয়নে প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ হচ্ছে। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের সমন্বিত ক্ষুদ্রসেচ নীতিমালা এবং কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা বাস্তবায়নে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সেচ ব্যবস্থাকে গতিশীল রাখার লক্ষ্যে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস সৃষ্টির লক্ষ্যে নদ-নদী, খাল-নালা, পুকুর ডোবা খনন/পুনর্খনন এবং বিভিন্ন প্রকার সেচ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে জলাধার সৃষ্টি, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং একই সঙ্গে সেচের পানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের ওপর ব্যাপক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তাছাড়া সেচের পানির পরিবহন অপচয় ৪০-৫০ শতাংশ ও প্রয়োগ অপচয় ২০-৩০ শতাংশ রোধকল্পে যথাক্রমে বারিড পাইপ সেচনালা, ড্রিপ ও স্প্রিংকলার সেচ পদ্ধতি এবং পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকনো (এডব্লিউডি) পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। তাই ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার ঠিক রেখে পানি উত্তোলনের হার কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। অন্যদিকে খাদ্যশস্য উৎপাদন ঠিক রাখার জন্য পানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণের নিমিত্ত আধুনিক সেচ প্রযুক্তির ব্যবহার, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও শস্য উৎপাদনে স্বল্প পানি গ্রহণকারী শস্য নির্বাচন করতে হবে।

আশির দশক হতে ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন বৃদ্ধি সঙ্গে সঙ্গে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার কমানো এবং পরিবীক্ষণের নিমিত্ত বিএডিসি ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছর হতে ভূগর্ভস্থ পানির লেভেল পরিমাপের নিমিত্ত ২০১টি অটোওয়াটার লেভেল রেকর্ডার স্থাপন করে। এর মাধ্যমে গ্রাফ আকারে প্রতি মুহূর্তে ভূগর্ভস্থ পানির লেভেল মনিটরিং করা হচ্ছে। ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়নে জরিপ ও পরিবীক্ষণ ডিজিটালাইজেশনকরণ প্রকল্পের (চতুর্থ পর্যায়) মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে অর্থাৎ ৪৬০টি ওয়াটার লেভেল ডাটা লগার স্থাপনপূর্বক ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পর্যবেক্ষণ করে ভূগর্ভস্থ পানির টেকসই ব্যবহার এবং পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য অ্যাকুইফার ম্যাপিং অর্থাৎ গ্রাউন্ড ওয়াটার জোনিং ম্যাপ তৈরি করা হয়েছে এবং সময়ে সময়ে তা হালনাগাদ করা হচ্ছে। দেশের মোট এলাকার ৩০ শতাংশ উপকূলীয়, যার ৫০ শতাংশ অধঃপতিত জমি ফলে সেখানে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অধঃপতিত জমিকে কৃষির আওতায় আনার লক্ষ্যে জলাধার সৃষ্টি নিমিত্ত নদ-নদী, খাল-নালা, পুকুর-ডোবা ব্যাপকভাবে খনন/পুনর্খনন করে সেচ ব্যবস্থা নিতে হবে। তাছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় লবণ পানির অনুপ্রবেশ পরিমাপের নিমিত্ত ৬০টি উপজেলায় স্যালাইনিটি ডাটা লগার স্থাপনের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ লবণ পানি পর্যবেক্ষণ এবং অনুপ্রবেশ মনিটরিংয়ের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ভূগর্ভস্থ লবণ পানির অনুপ্রবেশ এবং লবণ পানির ঘনত্ব মনিটরিংয়ের নিমিত্ত সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা নিরূপণের মাধ্যমে গ্রাউন্ড ওয়াটার স্যালাইনিটি কনসেনট্রেশন ম্যাপ প্রস্তুত এবং সময়ে সময়ে তা হালনাগাদ করা হচ্ছে, যা জাতীয় নীতিনির্ধারণী কাজে ক্ষুদ্রসেচ খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কর্মসূচি, প্রকল্প, নীতিমালা ও পরিকল্পনা প্রণয়নে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া ডাটা ব্যাংক ব্যবহার করে সেচসংক্রান্ত গবেষণা এবং দেশের ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে।

কৃষির মৌলিক উপকরণ তিনটি। যথা বীজ, সেচ ও সার। সেচ ব্যবস্থাপনা একটি সমন্বিত কার্যক্রম। সেচ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম মূলত তিন ভাগে বিভক্ত। যথা— ১. প্রকৌশল ও কারিগরি, ২. সেচ সম্পৃক্ত কৃষিতাত্ত্বিক কার্যক্রম ও ৩. প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো উন্নয়ন। সেচ ব্যবস্থাপনা সাধারণত জমি, ফসল ও ফসলের জাত নির্বাচন, জমি কর্ষণ, পানির উৎস, সেচযন্ত্র ও স্থান নির্বাচন, সেচের পানির পরিবহন ও যথাযথ প্রয়োগ, সঠিক সময় ও পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে থাকে। কিন্তু প্রকৌশলভিত্তিক সেচের পানির পরিবহন, বিতরণ ও প্রয়োগ ব্যবস্থা না হওয়ায় কৃষক প্রায় দ্বিগুণের বেশি পানি ব্যবহার করছে। বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত সেচ সম্প্রসারণের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার সেচ সম্প্রসারণের পাশাপাশি সেচের পানির অপচয় রোধকল্পে সেচ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। অপচয়কে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রেখে একই পরিমাণ পানি দিয়ে আরো অধিক জমিতে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করাই সেচ ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে সেচ ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে যথোপযুক্ত পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করে সেচ খরচ কমানোর জন্য দক্ষতার সঙ্গে লভ্য পানির সদ্ব্যবহার করতে হবে। কৃষিতে সেচ ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হলো, কত কম পানি ব্যবহার করে অধিক ফসল উৎপাদন করা। তাই ‘মোর ক্রপ পার ড্রপ’ স্লোগান নিয়ে সেচে এগিয়ে যেতে হবে।

বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের প্রধানমন্ত্রী জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা যাতে কোনো জমি অনাবাদি না থাকে সে লক্ষ্যে সারা দেশে নদ-নদী ড্রেজিং, খাল-নালা খনন/পুনর্খননের ওপর ব্যাপক গুরুত্বারোপ করে ভূ-উপরিস্থ পানি সেচের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার কার্যক্রম গ্রহণ এবং অসমাপ্ত কৃষিকাজ সম্পন্ন করার প্রত্যয়ে কৃষিতে নজর দিয়ে সেচে গুরুত্বারোপ করেন, যা গ্রামীণ উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও দুষ্প্রাপ্য সীমিত সম্পদের ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ১৬ দশমিক ৫০ কোটি হলেও খাদ্য উৎপাদন ৩ কোটি ৮৭ লাখ টন, যা খাদ্যে উদ্বৃত এবং বিশ্বে তৃতীয় শীর্ষ চাল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি দানাদার শস্য হিসেবে গম ১২ লাখ টন ও ভুট্টা ৫২ লাখ টন এবং আলু ১ কোটি ৫ লাখ টন উৎপাদন হচ্ছে। তাই ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে ক্রমহ্রাসমান আবাদি জমির ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সেচের ভূমিকা অপরিসীম এবং কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া সেচকাজে আধুনিক লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তির বারিড পাইপ, পানি সাশ্রয়ী ড্রিপ ও স্পিংকলার সেচ পদ্ধতি, রাবার/হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম এবং বিভিন্ন প্রকার সেচ অবকাঠামো নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তির ব্যবহার, পলিশেডে নিরাপদ ও রফতানিযোগ্য উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন সময়ের দাবি। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার-২০১৮, সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে রূপকল্প-২০২১ সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে মধ্যম আয়ের দেশ, ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়ন, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদা অর্জন এবং বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনার আলোকে সারা দেশে সেচ কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারের সব উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করা যায়।

 

মো. জিয়াউল হক: সদস্য পরিচালক (ক্ষুদ্র সেচ)

বিএডিসি, ঢাকা