বাংলাদেশে কৃষি খাতের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে অকৃষি খাতেরও বিকাশ ঘটেছে। কৃষির উন্নয়ন হওয়া মানে প্রধানত উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া। আর উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া মানে কৃষিপ্রযুক্তি ও উপকরসংশ্লিষ্ট ব্যবসা এবং উৎপাদিত পণ্যের ব্যবসার প্রসার ঘটা। এটি পুরোটাই অকৃষি খাতের বিষয়, যার বিকাশ হয়েছে কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় হলো যোগাযোগ ব্যবস্থারও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। আগে মানুষ মাথায় করে বা ঘাড়ে বয়ে নিয়ে হাটে-বাজারে পণ্য বিক্রি করত। এখন ভ্যানে করে, রিকশায় করে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। এটিও হয়েছে অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রভাবে, যা অকৃষি খাতের অন্তর্ভুক্ত।
তৃতীয়ত বলব কৃষি সেবা খাত নিয়ে। কৃষির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিপ্রযুক্তির আধুনিকায়ন ও ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এখানে দুটি বিষয় আছে। একটি হলো উপকরণ যেমন উন্নত জাতের বীজ, সার ইত্যাদি। আরেকটি হলো কৃষি যন্ত্রপাতি। দিন যত যাচ্ছে, তত কৃষি যন্ত্রপাতির উন্নয়ন ঘটছে। বিষয়টি মেকানিক্যাল থেকে এখন ডিজিটাল অটোমেশন এবং রিমোট সেন্সরজাতীয় যন্ত্রপাতির দিকে যাচ্ছে। এ গোটা অংশটিই অকৃষি খাতের বিষয়। তাই আমরা বলতে পারি, কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে অকৃষি খাতেরও দ্রুত বিকাশ হচ্ছে। এটিই কৃষির রূপান্তরের মূলস্বরূপ।
অকৃষি খাতের বিকাশের প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদন ও এর বৈচিত্র্যায়ণে। সন্দেহ নেই কৃষি উৎপাদন প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে। অকৃষি খাতের বিকাশের ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি কৃষি খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান কমছে ঠিকই। কিন্তু কৃষিসেবা ও অগ্র-পশ্চাৎ সংযোগ বেড়ে যাওয়ায় প্রচুর কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের মানুষের আয় বাড়ছে। এটিই বাংলাদেশের কৃষির প্রধান স্বরূপ।
আমি বহু আগে এক লেখায় বলেছি, কৃষি খাতের উন্নয়ন ছাড়া অকৃষি খাত কখনো অগ্রসর হতে পারবে না। বাংলাদেশে এখন তাই ঘটছে। অকৃষি খাত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিতে চরম শ্রমিক সংকট ঘটার কথা। ঘটেছেও তাই। লুইস টু-সেক্টর মডেল তাই বলে। দেশে যখন উন্নয়ন হবে তখন প্রথম সংকট দেখা দেবে কৃষিতে। শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাবে। কৃষির শ্রমিক সব চলে যাবে শিল্প খাতে। বাংলাদেশেও কমবেশি সে ঘটনা ঘটছে। আমাদের এখানে বাড়তি যেটা ঘটেছে—কৃষি শ্রমিক যারা ছিল তারা কিন্তু সবাই গ্রাম ছেড়ে যায়নি। তারা গ্রামেই আছে। শুধু কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছেড়ে দিয়েছে। এর কারণ হলো এখন পর্যন্ত কৃষি এমন কোনো লাভজনক বা সম্মানজনক পেশায় দাঁড়ায়নি বা আমরা দাঁড় করাতে পারিনি। সামান্য কিছু জমিজমা আবাদ করে ঘর-সংসার-জীবিকায়ন করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয় বিষয় হলো কৃষি অত্যন্ত কায়িক পরিশ্রমের কাজ। যেটাকে পুষিয়ে নিতে গেলে অন্য যেকোনো ব্যবসা বা বিনিয়োগ থেকে কৃষিতে লাভ দ্বিগুণ-তিন গুণ হতে হবে। এছাড়া আবহাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখানে ঝুঁকি অনেক বড় একটা বিষয়। এসব কারণে কৃষিতে আজকের যারা তরুণ তাদের না থাকারই কথা। তারা থাকছে না। তাহলে কৃষিতে লাভটা কার হচ্ছে এটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমি মনে করি, সমগ্র বাংলাদেশের কৃষিটাই এখন ক্ষুদ্র আর প্রান্তিক চাষীদের হাতে। মাঝারি ও বড় কৃষকের সংখ্যা ১০ লাখেরও নিচে নেমেছে। পরিসংখ্যান এটাই বলছে। কাজেই তিন-চতুর্থাংশ আবাদি জমি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীদের আওতায়। কৃষি উন্নয়নের কথা বলতে হলে তাদের কথাই সবার আগে ভাবতে হবে। আজকের কৃষিতে উৎপাদন বাড়ার যে গল্প এবং এ থেকে যাই লাভ হচ্ছে প্রকারান্তরে এই ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও কিছু মাঝারি চাষীর কাছেই যাচ্ছে। এমনটিই হওয়ার কথা। কিন্তু খামারের আয়তন যেহেতু কম এবং আকারে ছোট লাভটাও তেমন ছোটই থেকে যাচ্ছে।
এখন আরেকটা প্রশ্ন আসে, কৃষিতে ভূমিহীনতা বাড়ছে কিনা? উত্তরে বলতে হয়, কিছুটা তো বাড়বেই। তাতে আশঙ্কার কোনো কারণ দেখি না। ভূমিহীনতা বাড়ছে এ কথা মানে কী? ভূমির মালিকানা তার থাকছে কি থাকছে না? প্রচুর লোকের তো মালিকানা আছে, কিন্তু তারা তো ভূমির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে পারছেন না। তাদের নিজেদের শ্রম নেই, ব্যবস্থাপনা নেই। অনেকে থাকতেও পারছেন না এলাকায়। প্রকারান্তরে তিনিও তো ভূমিহীনই। একটা সম্পত্তি আছে, ওটা ছাড়ছেনও না। মায়া। যেটা আমাদের গবেষণায় আমরা বলছি, প্রগাঢ় মায়া জমির প্রতি। আবার ওই জমি থেকে তেমন কিছু পাওয়াও যাচ্ছে না। এটা এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা। যারা কাজ করতে পারছে, যাদের অপেক্ষাকৃত বেশি পারিবারিক শ্রমের সংস্থান আছে, তারাই কৃষিতে টিকে থাকছে। থাকবেও তাই। কিন্তু সে টিকে থাকবে কি থাকবে না, তা নির্ভর করে কতদিন তার পারিবারিক শ্রমের সংস্থান অবশিষ্ট আছে এবং কৃষিপণ্যের লাভ কতটা তার ওপর। গড়পড়তা কৃষকের বয়স আমরা দেখছি ৪৫-৫০ বছর। তার বয়স হয়ে আসছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার সন্তান আর কৃষিতে থাকছে না। আশঙ্কার কারণ এটাই।
এমন পরিস্থিতিতে আমরা দেখছি করপোরেট কৃষির গুরুত্ব বাড়ছে। একই সঙ্গে করপোরেট কৃষির প্রতি একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো করপোরেটের ধারণা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়, পরিচ্ছন্ন নয়। আমরা মনে করি যারা বীজের ব্যবসা করেন, যন্ত্রপাতির ব্যবসা করেন; তারাই বুঝি করপোরেট কৃষির প্রতিনিধিত্ব করছেন। কিন্তু বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে, করপোরেট কৃষিতে যারা এসেছেন তারা নিজেরাই তো উন্নত প্রজাতির বীজ উৎপন্ন করেছেন। এমনকি যারা প্রাণিসম্পদ নিয়ে কাজ করছেন, তারা তো উন্নত জাতের গাভী, সিমেন ও বীজ তৈরি করছেন এবং কৃত্রিম প্রজনন ও প্রতিপালনের ব্যবস্থা করছেন। মৎস্য নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা নার্সারি এবং পোনা তৈরি করেছেন। এরা কিন্তু সবাই এক অর্থে করপোরেট। করপোরেট কৃষির একটি সুবিধা হলো তাদের হাতে পুঁজি ও উন্নত প্রযুক্তি আছে। একই সঙ্গে ঝুঁকি নেয়ার সক্ষমতাও আছে। তারা যদি চান তাহলে তাদের উৎপাদনের খামারের আয়তন বাড়িয়ে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক উচ্চপ্রযুক্তি নিয়ে আসতে পারেন। তাহলে অসুবিধা কোথায়? অসুবিধা হলো অনেকে মনে করেন এ প্রক্রিয়ায় তারা বোধ হয় জমিজিরেত সবই নিয়ে নেবেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমি এ আশঙ্কা করি না। করি না এই কারণে যে এ দেশের মানুষের জমির প্রতি প্রগাঢ় একটা মায়া আছে। এত সহজে তারা জমি হাতছাড়া করবে না। দুই কোটি কৃষক পরিবারের জমি কয়েকজন করপোরেট মালিক ইচ্ছে করবেন আর নিয়ে নেবেন, এমনটা সম্ভব নয়। তার কারণ জমি অধিগ্রহণ করা বা কিনে নেয়ারও একটা প্রক্রিয়া আছে, যা প্রচুর কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আমাদের জমিগুলো অসংখ্য খণ্ডে বিভক্ত। সব এক জায়গায় পাওয়াও যায় না। তাই জমি নিয়ে যাওয়ার ধারণাটা স্পষ্ট নয় বলেই বিতর্ক তৈরি হয়। আমি মনে করি, আগামী দিনের উন্নত লাভজনক কৃষির দিকে আমাদের যেতে হলে করপোরেট কৃষি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় মাধ্যম। আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে। এখানে অনেক বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। তারা যেন কৃষি ব্যবসার পাশাপাশি সরাসরি উৎপাদনে আসেন, এ বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রফেসরিয়াল ফেলো, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)










