নগর প্রশাসনে ‘সংস্কার’ শব্দটা এখন প্রায়ই শোনা যায়। আপনার কাছে ‘সংস্কার’ মানে কী?
সংস্কারের মধ্যে দুটো জিনিস যুক্ত করতে চাই। এর একটি হলো কাঠামোগত। আরেকটি হলো কার্যকরী দিক। প্রশ্ন হলো নগর প্রশাসনকে আমরা কতটুকু সক্ষম করতে পেরেছি? সাধারণত স্থানীয় সরকার এবং কেন্দ্র সরকারের মধ্যে যে পার্থক্য আমরা বুঝি—কেন্দ্র সরকার সার্বিকভাবে দেশ পরিচালনা করে। তারা আইন প্রণয়ন করবে। নীতিমালা প্রণয়ন করবেন। সে নীতিমালা অনুযায়ী তারা বণ্টন করবে এবং খাতসংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা সেগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবেন। আর স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়নগুলো করে স্থানীয় সরকার। একটি স্থানে কোথায় রাস্তাঘাট হবে, তাতে মানুষের কী উপকার হবে, শহরকেন্দ্রিক হলে সিটি করপোরেশন পর্যায়ে কী কী ধরনের কাজ করা উচিত, সে পরিকল্পনা যদি এমপি বা মন্ত্রীরা করেন, তাহলে তাতে ভুল হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। শহর পর্যায়ের স্থানীয় সরকার হচ্ছে সিটি করপোরেশন। এ সিটি করপোরেশনের সংস্কারের কথা যদি বলেন, তাহলে তাকে সব ধরনের সংস্কার করার ক্ষমতা দিতে হবে। প্রথমত, পুরো শহরের পরিকল্পনা করার কথা সিটি করপোরেশনের। কিন্তু এখন ঢাকায় কি সিটি করপোরেশন পরিকল্পনা করে? এখন পরিকল্পনা করে রাজাউক। যে কারণে সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনাগুলো হারিয়ে যায়। কোথায় উঁচু ভবন হবে, কোথায় নিচু ভবন হবে সেটা তদারকির ক্ষমতা সিটি করপোরেশনের থাকে না। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে শহরের আইন-শৃঙ্খলা, ট্রাফিক, পরিবহন ব্যবস্থা, ইউটিলিটি এগুলো সবগুলো তদারকি করবে স্থানীয় সরকার। কিন্তু বাংলাদেশে বা ঢাকায় কোথাও এসব জিনিস কি স্থানীয় সরকার করে? এগুলোর জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান আছে। তারা এসব বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কথাই বলে না। সুতরাং নগরকেন্দ্রিক যদি স্থানীয় সরকার সংস্কারের কথা আমরা বলি, তাহলে নগর প্রশাসনকে সব ক্ষমতা দিয়ে তার অধীনে সবকিছু রাখতে হবে। যখন প্রতিষ্ঠানগুলো তার অধীনে থাকবে, রাস্তা কে খুঁড়বে কে খুঁড়বে না এসব সে নির্ধারণ করতে পারবে।
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন নগর সরকারের কথা বলছে। কিন্তু সরকারের আলোচনায় বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ আলোচনা শোনা যায় না কেন?
এটা আসলে দরকার ছিল। কারণ বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ লোক ২০৫০ সালের মধ্যে শহরে বসবাস করবে। শুধু ঢাকা শহরেই দুই-আড়াই কোটি লোক বাস করে। ১৬ ভাগের দুই ভাগ লোক শুধু ঢাকায়ই বসবাস করে। আমরা যদি বাংলাদেশের পুরো নগরাঞ্চলের কথা চিন্তা করি, এখনই তো বাংলাদেশের অধিকাংশ লোক গ্রাম থেকে শহরে চলে এসেছে। তাহলে আমরা যদি নতুন বাংলাদেশের নতুন ব্যবস্থায় যে রাষ্ট্র কল্পনা করি, সে রাষ্ট্র তো আরবান স্টেট হচ্ছে। জুলাইয়ের আন্দোলনে লক্ষ করবেন এটিও ছিল নগরকেন্দ্রিক আন্দোলন। শহরের মধ্যবিত্ত ও শ্রমিকরা মৈত্রী করে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে লড়েছে। সুতরাং নগর ইস্যুটাকে বাদ দিয়ে আমরা যদি অন্য ইস্যু নিয়ে চিন্তা করি, এমনকি রাজনৈতিক অঙ্গনেও; সেটা হবে একপেশে চিন্তা।
আপনি তো প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন। নগর সরকার না হওয়ার কারণে আপনি কি কাজ করে স্বাচ্ছন্দ্য পাচ্ছেন?
স্বাচ্ছন্দ্য তো পাচ্ছি না। আমাদের ঢাকায় যত মেয়র এসেছেন, তার মধ্যে প্রয়াত আনিসুল হক সাহেব তো অনেক জনপ্রিয়। দুই বছর তিনি অনেক কাজ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি কোনো কাজই সফলভাবে শেষ করতে পারেননি। কারণ কাজগুলো অন্যান্য বিভাগের ওপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ বলি, ঢাকার এয়ারপোর্ট রোডে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য তিনি যে কাজ করেছিলেন, বনসাই গাছ লাগানো হয়েছিল; এসব নিয়ে তিনি কথা বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু গাছগুলো লাগিয়েছে সড়ক ও জনপদ বিভাগ। তার কোনো ক্ষমতাই ছিল না। তারপর ব্রিজের নিচে যে খোলা জায়গা এখনো পড়ে আছে পরিত্যক্ত হিসেবে, এগুলো তো সেতু কর্তৃপক্ষের জায়গা। এ জায়গাগুলো সিটি করপোরেশন ৩০-৪০ বছর ধরে চাচ্ছে। কিন্তু কেউ দেয়নি। এ শহরের ভেতরে রাজউকের জায়গা আছে, লেক আছে। সেগুলো থেকে মশা উৎপাদন হয় প্রচুর। কিন্তু রাজউকের তো মশা মারার কামান নেই। ওষুধ নেই। ওই বিভাগই নেই। তাহলে এটার রক্ষণাবেক্ষণ কীভাবে হবে? এটি একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন। এ কারণে আমরা বলি যে অতীতে যারা মেয়র হিসেবে এসেছেন, তাদের কাজের সীমাবদ্ধতা এত বেশি ছিল যে এ দিয়ে নগরের অর্থবহ কোনো রূপান্তর করা সম্ভব না।
পরিবেশসহ অন্যান্য ইস্যুতে করা আন্দোলন থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কীভাবে কাজে লাগাচ্ছেন?
আমি সারা জীবন কাজ করেছি পানি, শহর ও পরিবেশ নিয়ে। এ শহরের ৪০ শতাংশ মানুষ অপ্রচলিত সেটেলমেন্টে বাস করে। এ শহরের বড় একটা অংশ অভিবাসী। তারা অন্য জায়গা থেকে এসে এ শহরে বসবাস করছে। তারা অর্থনৈতিকভাবে নাজুক অবস্থানে আছে। অর্থনৈতিক একটি লক্ষ্য নিয়ে তারা এখানে আসে। এসেই তারা নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ে স্বাস্থ্য নিয়ে। কারণ এখানে আবাসন ব্যবস্থা খুব বাজে। ৪০ শতাংশ ইনফরমাল সেটেলমেন্ট আছে। শহরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য মানুষের অনেক টাকা স্বাস্থ্যের পেছনে ব্যয় হয়। অসুস্থ থাকার কারণে তার অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়ে না। বেশি অসুস্থ থাকায় তাদের সন্তান এবং পরবর্তী প্রজন্মের বিকাশে একটা বড় প্রভাব পড়ে। সুতরাং এ পুরো বিষয়ে একটা হাউজিং জাস্টিস তৈরি করা আমার দীর্ঘদিনের আন্দোলনের একটা অংশ ছিল। জনস্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য পরিবেশ ঠিক রাখাটা নগর প্রশাসনের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ বলে আমরা মনে করি।
আপনি প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর এ নগরের মৌলিক সমস্যা হিসেবে কী কী চিহ্নিত করেছেন?
নগরীর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দূষিত পরিবেশ। কারণ আমরা যেটা বললাম, ৪০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার প্রান্তরেখায় বাস করছে। একজন যদি মাসে তিন-চার দিন অসুস্থ থাকে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে আসছে। কারণ তিনদিন অসুস্থ হওয়া মানে তার তিনদিনের উৎপাদনশীলতা নেই। একই সঙ্গে সে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে আসছে। এখানে ময়লা আবহাওয়ার কারণে তার জ্বর হয়, ময়লা আবহাওয়ার জন্য তার হাঁপানি হচ্ছে। নারীদের-শিশুদের রোগ হচ্ছে। এটি তার অর্থনৈতিক অবস্থায় প্রভাব রাখে। শহরে যে নিম্নবিত্ত মানুষ অসুস্থ হয়, সে দ্রুত দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। সুতরাং নগরের পরিবেশ সেখানকার জনসাধারণের স্বাস্থ্য ও দারিদ্রের সঙ্গে জড়িত। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ আমি মনে করি। দুই নাম্বার চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অবকাঠামোগত সমস্যা। আমাদের রাস্তাগুলো ঠিকভাবে নির্মিত হয়নি। প্রত্যন্ত ওয়ার্ড এবং এগুলোর ভেতরের রাস্তাঘাট ও শহরের মূল সড়কগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ভুলভাবে হওয়ার পাশাপাশি বারবার কাটার কারণে যাত্রীদেরও বারবার ভোগান্তিতে পড়তে হয়।










