সিলেটের সাদাপাথর ও জাফলংয়ে ব্যাপকভাবে পাথর লুটপাট হয়েছে, এটি নজিরবিহীন ঘটনা। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে সিলেটের পর্যটন কেন্দ্র। বিশেষ করে ভোলাগঞ্জের সাদাপাথরে এক বছর আগে অনেকটা প্রকাশ্যে হরিলুট চলেছিল। এ বেপরোয়া লুটের কারণে সাদাপাথর অনেকটা পাথরশূন্য হয়ে পড়ে। সরকারের যখন টনক নড়ে, তখন সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্র অনেকটা ধু-ধু মরুভূমি। পরিবেশবিদরা মনে করেন, পাথর লুটপাটে যেমন পরিবেশ ও নদীভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। এরপর সরকারের উচ্চ মহলে বিষয়টি আলোচিত হলে সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো. সারওয়ার আলম। সিলেটে দায়িত্ব নিয়েই নবাগত জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘আর একটি পাথরও যদি সরানো হয়, জীবন ঝালাপালা করে দেব। বাংলাদেশ সীমানার যেখানেই পাথর সরানোর চেষ্টা হবে, সেখান থেকেই অপরাধীদের ধরে আনা হবে।’

প্রকৃতিকন্যা হিসেবে খ্যাত সিলেট জেলায় পর্যটন খাত অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অবকাঠামোগত ঘাটতি, নিরাপত্তাহীনতা, যাতায়াত অব্যবস্থাপনাসহ নানা বিষয় নিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম কথা বলেন বণিক বার্তার সঙ্গে।

সাদাপাথর উত্তোলন কার্যক্রম তদারকিতে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘সাদাপাথরে পাথর পুনঃস্থাপন ও লুট প্রতিরোধের কাজ এখনো চলমান। পুরোপুরি প্রাকৃতিকভাবে পাথরগুলো বিছানো যাবে না, তবে পাথর ফেলা হয়েছে। ঢল নামলে অনেকটা স্বাভাবিকতা আসতে পারে।’

সিলেটের পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা আছে কিনা জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর আর যাতে কোনো আঘাত না আসতে পারে, সে জন্য আমরা কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করেছি। সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্র নিয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে। সেই আলোকে পর্যটন কেন্দ্রকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলা হবে। ওখানে স্যানিটেশন অবস্থা নাজুক। পর্যটকদের জন্য এর ব্যবস্থা করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘শুধু সাদাপাথর নয়, জাফলং, বিছনাকান্দিসহ অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্র নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যটনের উন্নয়নে নেদারল্যান্ডসের সহায়তায় একটি প্রকল্প বাংলাদেশে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে, তাতে সিলেটের পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘কোয়ারি এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও মাথায় নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। পাথর ক্রাসিং জোন করে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে কেবল আমদানি করা পাথর ভাঙা হবে পরিবেশসম্মতভাবে। সেখানে কর্মস্থানের সুযোগ থাকবে।’

জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম আরো বলেন, ‘কোম্পানীগঞ্জে হাইটেক পার্ক পড়ে আছে। সেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কোম্পানীগঞ্জে প্রবাসীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হবে। আশা করা যায় তাতে সাড়া মিলবে।’

সিলেটে পাহাড় কেটে ও নদী খনন করে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, কিন্তু অতীতে কোনো বড় পদক্ষেপ দেখা যায়নি—এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘পাহাড় কাটা ও অবৈধ নদী খননে সিলেট জেলা প্রশাসন জিরো টলারেন্সে রয়েছে। প্রতিদিনই অভিযান চলছে।’

স্থানীয় জনগণের অভিযোগ, সিলেটে অবৈধ পাথর ও বালি উত্তোলনের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতারা সম্পৃক্তা রয়েছেন—এ বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান কী জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘পুরো বিষয়টি সরকারের বিভিন্ন দপ্তর পৃথকভাবে তদন্ত করছে। সেখানে কারো নাম ভুল হয়ে এলে তদন্তে বাদ পড়বেন। জেলা প্রশাসনের সেখানে কিছু করার নেই। তদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর জেলা প্রশাসনের করণীয় কিছু থাকলে তখন করবে।’

এমন একটা সময়ে আপনাকে সিলেটের ডিসি করে পাঠানো হয়েছে, যখন সাদাপাথর নিয়ে দেশ-বিদেশে তোলপাড় চলছে, প্রাকৃতিক এ সম্পদকে টিকিয়ে রাখতে আপনার চ্যালেঞ্জ বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী হবে—এমন প্রশ্নে মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘এখানে চ্যালেঞ্জের কিছু নেই। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে এবং আমাকে পদায়ন করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করব সাদাপাথর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার। তবে এতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয়দের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।’

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২১ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগদান করেন মো. সারওয়ার আলম। ১৮ আগস্ট তিনি সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান।

নূর আহমদ: বণিক বার্তা প্রতিনিধি, সিলেট