গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের যে বিশাল পরিবর্তন এসেছে, তাতে প্রাণের ভূমিকা এবং অবদানকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
প্রাণ বাংলাদেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতের পথপ্রদর্শক। এক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রাণকে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে। প্রথমত, কাঁচামাল সোর্সিং। দেশে একসময় যে চাষাবাদ হতো সেটি শুধু দৈনন্দিন খাবারের চাহিদা মেটাত। বাণিজ্যিক চাষাবাদ সে সময় তেমন ছিল না বললেই চলে। প্রাণ তখন কৃষকদের সঙ্গে উৎপাদন বাড়ানোয় কাজ করেছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতে পণ্য উৎপাদনে প্রযুক্তি ও দক্ষ লোক ছিল না। আমাদের সেটি আনতে হয়েছে। তৃতীয়ত, আমাদের কাজ করতে হয়েছে ভোক্তাকে নিয়ে। কোনো কৃষিপণ্য নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে যে খাওয়া যায়, সেই ধারণা তাদের ছিল না। এ বিষয়টি প্রাণকে অতিক্রম করতে হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রাণ কঠিন চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখতে পেরেছে।
প্রাণ কৃষিপণ্য ও গ্রামের কৃষকদের নিয়ে কাজ করে। তাই প্রাণের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির বড় পরিবর্তন এসেছে। কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে সারা বছর ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে প্রাণ। একই সঙ্গে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে রফতানি ও বিশাল বাজার তৈরিতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। তাই কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতের উন্নয়নে সব খাতেই প্রাণ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
কৃষিতে প্রাণের বিশাল বিনিয়োগ দেশের কৃষকদের জীবনে কী ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে? বিশেষ করে চুক্তিভিত্তিক কৃষিতে আপনাদের মডেল সম্পর্কে জানতে চাই।
দেশে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ ব্যবস্থা প্রাণই প্রথম প্রচলন করে। এখানে কৃষকদের সংগঠিত করে তাদের কীভাবে ভালো ফসল উৎপাদন করা যায় সে বিষয়ে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পাশাপাশি তাদের সহায়তায় ভালো মানের বীজসহ বিভিন্ন সহায়তা দেয়া হয়। এ মুহূর্তে প্রাণের এক লাখের অধিক চুক্তিভিত্তিক কৃষক রয়েছেন, যারা বিভিন্ন খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। আমরা বিভিন্ন ধরনের সবজি ফলাতে কৃষকদের সঙ্গে কাজ করছি। আমাদের ১২ হাজারের অধিক চুক্তিভিত্তিক দুগ্ধ খামারি রয়েছেন, যারা দুগ্ধ খাতের উন্নয়নে কাজ করছেন। আমরা দেশের পোলট্রি ও ফিশারিজ শিল্প নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করছি। সবকিছুর সঙ্গে কৃষক ও সাধারণ মানুষ জড়িত থাকায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বৃহৎ অংশ আমাদের নেটওয়ার্কিংয়ের মধ্যে রয়েছে। আমাদের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে কৃষক একদিকে যেমন মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমিয়ে ফসলের সঠিক দাম পাচ্ছেন, তেমনি নানা পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ পেয়ে সহজে অধিক ফসল ফলাতে পারছেন। এতে বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কৃষকের পণ্য বিক্রির নিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশীদার হিসেবে কাজ করছে প্রাণ।
গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রাণের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাই। প্রত্যন্ত অঞ্চলে আপনাদের কার্যক্রম কীভাবে প্রভাব ফেলছে?
আমরা কৃষকদের নিয়ে কাজ করি এবং বিপুলসংখ্যক কৃষক আমাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সুতরাং আমাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি সারা দেশে ৪০টি জায়গায় আমাদের কারখানা রয়েছে। সব কারখানাই গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত। কোম্পানি হিসেবে আমরা সবসময় লোকজনকে শহরমুখী হতে নিরুৎসাহিত করি। আমরা চাই তারা যেন নিজ এলাকায় কাজের সুযোগ পান। এ ধারণা থেকে আমাদের কারখানাগুলো গ্রামীণ জনপদে প্রতিষ্ঠা করা। ফলে এসব কারখানায় প্রচুর লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। বর্তমানে আমাদের প্রতিষ্ঠানে দেড় লাখের অধিক কর্মী কাজ করছেন। আমরা ফার্মিং ও প্রসেসিং উভয় দিকেই গ্রামীণ কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দিয়ে আসছি।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া বিশেষ করে কৃষিপণ্য রফতানি, ভ্যাট-কর কাঠামো ও বাণিজ্যনীতি এসব প্রাণকে কতটা সহায়তা করছে? এসব সংস্কার বাস্তবায়নের সময় কি বেসরকারি খাতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়?
সরকার কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতকে গুরুত্ব দিয়ে নানা নীতিসহায়তা দিয়েছে, যা এ খাতের প্রসারে ভূমিকা রেখেছে। এটিকে আরো নির্দিষ্ট করার সুযোগ রয়েছে। সরকার রফতানি বৈচিত্র্যকরণের জন্য নীতিসহায়তা দিয়েছে। তবে খাত ধরে ধরে যদি সরকার নীতিসহায়তা দেয় তবে এ খাত আরো ভালো করবে। যেমন সরকার ডেইরি, ফিশারিজ, পোলট্রি খাতের উন্নয়নে বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা করে আলাদা নীতিসহায়তা দিতে পারে।
এছাড়া দেশ হিসেবে কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতে আমরা অনেক পিছিয়ে। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যারা কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাতকে কেন্দ্র করে তাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো চিন্তা করেছে এবং সফল হয়েছে। এক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের পরিকল্পনাগুলো এগিয়ে নিতে পারি।
কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতে কোন সংস্কার সবচেয়ে যুগান্তকারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আপনি মনে করেন? আর ভবিষ্যতের জন্য সরকারের কাছে প্রাণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা কী?
প্রথমত, ব্যবসা সহজ করার জন্য সংস্কার দরকার। বাংলাদেশে ব্যবসা চালু করতে অন্তত ১৭টি দপ্তর থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। তাই একাধিক লাইসেন্স এক জায়গা থেকে দেয়ার জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যেন ব্যবসা শুরুর জন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে না হয়।
দ্বিতীয়ত, অবকাঠামোগত কিছু কাজ করা প্রয়োজন। দেশে প্রক্রিয়াজাত খাতের জন্য ভালো মানের কাঁচামাল পেতে গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসের প্রচলন জরুরি। বিশ্বমানের ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা দরকার, যার মাধ্যমে রফতানি ত্বরান্বিত হবে।
তৃতীয়ত, করনীতি সহজ করা এবং করহার যৌক্তিক করা প্রয়োজন। কাস্টমসে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও পেপারলেস ডকুমেন্টেশন চালু করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, দেশীয় অর্থনীতির প্রসারে পার্শিয়াল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা চালু করা প্রয়োজন। দেশে এখন যে বন্ড সুবিধা দেয়া হয় সেটি শুধু রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের কারখানায় রফতানির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জন্যও পণ্য উৎপাদন করে। এক্ষেত্রে তারা যেটুকু রফতানির জন্য উৎপাদন করবে, তার জন্য বন্ড সুবিধা থাকা প্রয়োজন।
চতুর্থত, ব্যবসা-বাণিজ্যে উদারীকরণ প্রয়োজন। মুক্ত বাণিজ্য অর্থনীতিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করতে কাজ করতে হবে। ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ), প্রিফারেন্সিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (পিটিএ) কিংবা কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) করলে বাণিজ্য বাড়বে।
অর্থায়ন ও ব্যাংক খাতেও সংস্কার প্রয়োজন। এছাড়া আগামী দিনে আমাদের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর আমাদের নীতিসহায়তা কী হবে, সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে। সেক্ষেত্রে এটি আর কিছুদিন পরে করা যৌক্তিক হবে কিনা, সেটি ভাবা দরকার।
বর্তমানে প্রাণ ১৪০টিরও বেশি দেশে রফতানি করছে। বিদেশী বাজারে প্রবেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল? ভোক্তার আস্থা ধরে রাখতে প্রাণ কীভাবে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখে?
বিদেশে পণ্য রফতানিতে আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল বাংলাদেশ সম্পর্কে বহির্বিশ্বের মানুষের সেভাবে ইতিবাচক ধারণা না থাকা। এ চ্যালেঞ্জ আমাদের অতিক্রম করতে হয়েছে ভালো মানের পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে। আমরা বিভিন্ন দেশে গিয়ে সেখানকার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, বিশ্বের বিখ্যাত সব খাদ্য মেলায় অংশগ্রহণ করে পণ্য প্রদর্শন করেছি, আমাদের পণ্যের উৎপাদন প্রক্রিয়া ও গুণমান জানানোর জন্য কারখানা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করিয়েছি। এভাবে নানা উদ্যোগে আমরা বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের মধ্যে যে নেতিবাচক ধারণাগুলো ছিল সেগুলো অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছি। দ্বিতীয়ত, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চাহিদা। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিয়মকানুন ভিন্ন ভিন্ন। এগুলো না জেনে পণ্য রফতানির সুযোগ নেই, যা আমাদের অতিক্রম করতে হয়েছে। তৃতীয়ত, বিভিন্ন ধরনের সার্টিফিকেশন। খাদ্যের নিরাপত্তা ও মানের জন্য আমাদের নানান ধরনের সনদের প্রয়োজন হয়েছে। আমরা আইএসও, হালাল, বিআরসিসহ বিভিন্ন ধরনের সনদ অর্জন করে পণ্য রফতানির দ্বার উন্মোচন করেছি।
কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রাণ কী ধরনের প্রশিক্ষণ, সহায়তা বা প্রণোদনা দেয়? ভোক্তার কাছে নিরাপদ খাদ্য পৌঁছানোর বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত করা হয়?
কৃষকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে আমরা খামারিদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দিই, যাতে তারা আধুনিক চাষ পদ্ধতির মাধ্যমে চাষাবাদ করতে পারেন। চুক্তিভিত্তিক চাষীদের উচ্চফলনশীল বীজ দেয়া হয়। নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। এছাড়া সার, সেচ ও কীটনাশকের সুবিধা দেয়া হয়। এতে সহজে তারা চাষাবাদ করে অধিক ফলন পান।
এছাড়া খাদ্যনিরাপত্তার জন্য আমরা চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ করি। চুক্তিভিত্তিক চাষীদের সারা বছর প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সহায়তার মাধ্যমে ভালো মানের ফলন পেতে কাজ করি। আমরা খামার থেকে ভোক্তার দরজায় পণ্য আসা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে সেফটি মনিটরিং করি। খামারিরা কী ধরনের সার, কীটনাশক দিচ্ছেন বা পণ্য কীভাবে সংরক্ষণ করছেন, সেটি আমরা মনিটরিং করি। এছাড়া পণ্য উৎপাদন পর্যায়ে যেন ফুড সেফটি সঠিক থাকে সেটি আমরা নিশ্চিত করি।
বৈশ্বিক খাদ্য সংকট বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় চ্যালেঞ্জ প্রাণের ব্যবসায়িক কৌশলে কী ধরনের পরিবর্তন আনছে? পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং টেকসই উন্নয়নে প্রাণ কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে?
খাদ্য সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের চুক্তিভিত্তিক খামারিদের সহায়তায় ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট এগ্রিকালচার (জলবায়ু সহনশীল কৃষি) প্রচলনের চেষ্টা করছি। আমরা জলবায়ু সহনশীল বিভিন্ন ধরনের বীজ কৃষকদের মাঝে সরবরাহের চেষ্টা করছি। এখানে আমরা টেকসই হওয়ার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছি। আমরা অর্গ্যানিক সার উৎপাদন করে কৃষকদের সরবরাহ করছি। আমাদের প্রতিষ্ঠানে পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা অনেক সচেতন এবং কীভাবে পুনর্ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া কারখানায় যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়, সেটি নিয়ে আমরা কাজ করেছি।
টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে আমরা আটটি স্তম্ভ নিয়ে কাজ করেছি। এর মধ্যে রয়েছে টেকসই পণ্য, কৃষি, প্যাকেজিং, পানির ব্যবহার, জ্বালানি ইত্যাদি। আমরা টেকসই সমাজ বিনির্মাণে আগামী দিনের কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ করছি। সব মিলিয়ে প্রাণ একটি উন্নত বাংলাদেশের যে স্বপ্ন তা পূরণে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।










