‘সবার জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য’—এটা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের রূপকল্প বা ভিশন। এ কাজে আপনাকে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে?

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের রূপকল্প হলো ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য’। এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মধ্যে প্রথমেই আছে খাদ্য প্রাপ্তি। বিশেষ করে চাল ও গম দুটির ক্ষেত্রে আমরা অনেকাংশে আমদানিনির্ভর। যদিও আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণের কাছাকাছি, তা সত্ত্বেও আমাদের চাল আমদানি করতে হয়—সরকারি ও বেসরকারিভাবে, যা সংগ্রহ করা যথেষ্ট দুরূহ কাজ। আর গমের ক্ষেত্রে পুরোটাই আমদানিনির্ভর। ৭০ লাখ টন চাহিদার পুরোটাই আমদানিনির্ভর। উৎপাদন হয় মোটে ১০ লাখ টন।

আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ সরকারের রয়েছে?

আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার পদক্ষেপের বিষয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার দায়িত্ব শুধু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের না। এটা অনেকাংশে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিষয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে এ কাজগুলো হয়ে থাকে। চেষ্টা করা হচ্ছে উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বাড়াতে। জমি আমাদের সীমিত। যেগুলোতে গম হতো, এখন হচ্ছে ভুট্টা। ভুট্টারও দরকার আছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা কীভাবে করছেন?

আমরা মূলত আমদানি করছি। গমের ক্ষেত্রে পাবলিক ফুড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের মাধ্যমে গমের অংশটি কম, শুধু ওএমএসে দেয়া হয়, আর রেশনিংয়ে দেয়া হয়। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিসহ বড় বড় যে কর্মসূচি আছে সেগুলো চালের মাধ্যমেই চলে। পাবলিক ফুড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের মাধ্যমে গম খুব কমই দেয়া হয়। আমদানি কার্যক্রম যেন মসৃণ থাকে, ত্বরান্বিত হয় এবং সময়মতো যেন আমরা পাই, সেটা আমরা নিশ্চিত করেছি।

সমন্বিত খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের সব নাগরিকের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অভিলক্ষ্য। দায়িত্বকালে সমন্বিত খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কেমন?

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নামে আমরা একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করেছি কয়েক বছর আগে। কিন্তু বিদ্যমান অবকাঠামো এখন পর্যন্ত তেমনভাবে শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। এছাড়া লোকবল থেকে আরম্ভ করে প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন টেস্টিং ল্যাবরেটরির বিষয়ও রয়েছে। বিভিন্ন এজেন্সি এক্ষেত্রে একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল। যেমন প্যাকেটজাত পণ্যের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রদান করে বিএসটিআই। সবার কাজগুলোকে সমন্বয়ের একটা উদ্যোগ আমাদের রয়েছে। এরই মধ্যে আমরা একটা সভা করেছি। আরো করব। আমরা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে জোরদার করছি, যাতে সব ধরনের খাদ্য নিরাপদ করা যায়। খাদ্য বলতে শুধু চাল বা গম না, এর মধ্যে সবকিছু রয়েছে—দুধ, মাংস, ডিম থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন জিনিস।

দেশের খাদ্যনিরাপত্তার উন্নয়ন এবং দরিদ্র জনগণের জন্য খাদ্য সহায়তা প্রদান—এটি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য। খাদ্যসহায়তা প্রদান কর্মসূচিগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বলবেন?

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি বলতে যেটা বোঝায়, তার আওতায় গত অর্থবছর পর্যন্ত ৫০ লাখ পরিবারকে বছরে পাঁচ মাস ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হতো। বর্তমান অর্থবছরে এটিকে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পরিবারের সংখ্যা করা হয়েছে ৫৫ লাখ, আর পাঁচ মাস সময় বাড়িয়ে করা হয়েছে ছয় মাস, চাল দেয়া হচ্ছে ৩০ কেজি করে। আগস্টে শুরু হয়ে এখনো চলছে। সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বরেও চলবে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে বন্ধ থাকবে। এরপর ফেব্রুয়ারি ও মার্চে চলবে। এপ্রিল থেকে বন্ধ থাকবে। এক্ষেত্রে অনিয়মের কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে।

নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে বর্তমান সরকার কতটা অগ্রসর?

আগেই বলেছি আমাদের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় রয়েছে। এর জন্য তিনটি ল্যাবরেটরি করা হবে। এ লক্ষ্যে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। জাইকা অর্থায়নের নিশ্চয়তা দিয়েছে। অর্থায়ন চুক্তি হয়েছে। পরামর্শক নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এটা করতে একটু সময় লাগবে, চেষ্টা চলছে।

খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা ‌এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ—খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অন্যতম ও তাৎপর্যপূর্ণ উদ্দেশ্য। ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় কী করছে?

এটি ‘মাল্টিডিসিপ্লিনারি’ বিষয়। অর্থাৎ অনেকগুলো পক্ষ এ বিষয়ে জড়িত। এ কাজে অর্থ মন্ত্রণালয় জড়িত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড জড়িত, কৃষি মন্ত্রণালয় জড়িত আছে। আর খাদ্য বলতে গেলে মৎস্য, প্রাণিসম্পদও জড়িত আছে। সুতরাং এ প্রশ্নের যথাযথ জবাব পেতে জড়িত সবাইকে প্রশ্ন করতে হবে। আমাদের মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে বলা যায়, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। যতটুকু পারছি, আমরা স্থানীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করছি। আর যখন দরকার পড়ছে, তখন বিদেশ থেকে আনছি। সরবরাহ শৃঙ্খলে যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা আমরা করছি। এখন পর্যন্ত কোনো ব্যাঘাতের ঘটনা আল্লাহর রহমতে হয়নি।

দেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় বর্তমান সরকারের মেয়াদে উল্লেখযোগ্য বা তাৎপর্যপূর্ণ কোনো রূপান্তর বা পরিবর্তন হয়েছে?

আমি মনে করছি, এত বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে এত বড় পরিবর্তনের পরও খাদ্যশস্যের প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। এমন নয় যে, খাদ্যের কোনো কিছুর অভাব আছে। দামটা বেড়েছে যেহেতু ডলারের দাম ৮০ থেকে ১২৩ টাকা হয়েছে। ফলে দাম কিছুটা বেড়েছে। তার মধ্যেও দাম যেন স্থিতিশীল থাকে, তার জন্য আমরা সব প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সব কার্যক্রমের মধ্যে এমন কোন বিষয় রয়েছে যেটা বিশেষ করে বা গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করতে চান?

প্রতিদিন দেশে খাদ্যশস্যের মজুদ পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেয়া থাকে। আজকের দিন পর্যন্ত আমাদের চালের গতবারের চেয়ে চার লাখ টন বেশি মজুদ রয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে গম আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে। ঠিক তেমনি অন্যান্য ক্ষেত্রে যেখানে যেটা প্রয়োজন, সেটা করে যাওয়া হচ্ছে। কোথাও কোনো অভাব যেন না হয়, সেটা দেখা হচ্ছে।