অর্থনীতিতে কেমন রূপান্তর আশা করা হয়?

উন্নয়নের স্তর-নির্বিশেষে সব দেশের জন্যই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার সঙ্গে দরকার ভালো আয়ের কর্মসংস্থান। কারণ সেভাবেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছতে পারে। এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য তাদের ক্ষেত্রে, যাদের আয়ের একমাত্র বা প্রধান মাধ্যম কাজ। সুতরাং উন্নয়নে সাফল্যের মাপকাঠিতে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানকে যোগ করতে হবে।

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে দ্বৈত অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য, যেমন অর্থনীতিতে গতানুগতিক খাতের প্রাধান্য ও ছোট আধুনিক খাতের পাশাপাশি অবস্থান, প্রকৃত মজুরি বেশি না বাড়িয়েই আধুনিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ ইত্যাদি বিরাজ করে সেখানে আশা করা হয়, প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক খাতে ভালো মানের কর্মসংস্থান বাড়বে এবং সেই প্রক্রিয়ায় গতানুগতিক খাতের উদ্বৃত্ত শ্রম একসময় শেষ হবে। সে পর্যায়ে কর্মসংস্থান আরো বাড়াতে হলে শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি বাড়াতে হবে। এভাবে প্রবৃদ্ধি হলে অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন হবে। ফলে মোট উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে কৃষির অংশ কমে আসবে আর আধুনিক শিল্প ও সেবার অংশ বাড়বে। এ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে শিল্পের অংশ বাড়ে, আর কোনো এক পর্যায়ে শিল্পের অংশও কমে এবং সেবা খাতের অংশ বাড়তে থাকে।

যে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার কথা ওপরে বলা হলো তা শুধু তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ নেই, বাস্তব ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, যেসব দেশ উন্নয়নে সফল হয়েছে (যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, চীন ও তাইওয়ান) তাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এ তত্ত্বের বেশ মিল রয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের সাফল্যের কথা এখন সবার জানা। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সে সাফল্যের সঙ্গে শ্রমবাজারে কতটা রূপান্তর ঘটেছে। আধুনিক খাতের প্রসারের মাধ্যমে কৃষি ও অন্যান্য গতানুগতিক খাতের উদ্বৃত্ত শ্রম শেষ করে শ্রমিকের মজুরি বাড়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে কতটা সফল হয়েছে দেশটির অর্থনীতি?

কী ধরনের রূপান্তর ঘটেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে?

এ প্রশ্নের সরাসরি জবাবে যাওয়ার আগে দেখা যাক প্রবৃদ্ধির কাহিনীটি কেমন। সত্তর ও আশির দশকজুড়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল নিচু স্তরে এবং তার হারেও উল্লেখযোগ্য ত্বরণ ঘটেনি। সে সময়টায় প্রবৃদ্ধি মূলত কৃষির ওপরই নির্ভরশীল ছিল। সত্তরের দশক ছিল কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের সময়। বাংলাদেশেও উচ্চফলনশীল বীজ, সার ও সেচের ওপর ভর করে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। আর এ প্রযুক্তি ব্যবহারে শ্রমের প্রয়োজন বেশি হতো বলে কৃষিতে শ্রমিক নিয়োজনের সুযোগ ছিল।

অন্যদিকে শিল্প খাত ছিল ছোট, যেখানে উল্লেখ করার মতো ছিল পাট, বস্ত্র, রাসায়নিক সার, সিমেন্ট ও কাগজের মতো কয়েকটি গতানুগতিক শিল্প। পাট ছাড়া অন্যগুলো ছিল মূলত অভ্যন্তরীণ বাজারভিত্তিক। সত্তরের দশকের তুলনায় আশির দশকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিতে পতন ঘটেছিল; অর্থাৎ কৃষিভিত্তিক দ্বৈত অর্থনীতিতে যে ধরনের উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল তা না হয়ে উল্টোটিই ঘটেছিল।

নব্বইয়ের দশক থেকে মোট জিডিপি এবং কৃষি ও শিল্প দুই খাতের প্রবৃদ্ধিতেই উল্লেখযোগ্য ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। বস্তুত নব্বইয়ের দশকের পরের সব দশকেই প্রবৃদ্ধির হারে ক্রমাগত ত্বরণ ঘটেছে। শিল্প ও জিডিপির প্রবৃদ্ধি একসঙ্গে করে দেখলে দেখা যায়, এ দুই চলকের মধ্যে সম্পর্ক বেশ নিবিড়। সংখ্যাতাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলেও বলা যায়, শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কর্মসংস্থানের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে উচ্চহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে উদ্বৃত্ত শ্রমের সদ্ব্যবহার করা।

আশির দশকের দ্বিতীয়ার্ধে নতুন শিল্প তৈরি পোশাকের যাত্রা হয় আর নব্বইয়ের দশকে তার বিকাশ ঘটে। দ্বৈত অর্থনীতিতে এ ধরনের শ্রমঘন রফতানিমুখী শিল্পের মাধ্যমেই উচ্চহারে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার এবং উদ্বৃত্ত শ্রমের সদ্ব্যবহার হওয়ার কথা। তবে লক্ষণীয়, বাংলাদেশে এ ধরনের একটি শিল্পই গড়ে উঠেছে। আরো কয়েকটি শিল্পের, যেমন ওষুধ, আসবাব, জাহাজ নির্মাণ ইত্যাদির বিকাশ ঘটলেও মোট উৎপাদন, রফতানি ও কর্মসংস্থানে তাদের অংশ খুবই কম।

এবার আশা যাক রূপান্তরের কথায়। স্বাধীনতার সময় দেশের জিডিপির প্রায় অর্ধেকই উৎপাদন হতো কৃষি খাতে। পরের দুই দশকে সে অংশটি কমে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে যায়। কিন্তু সে সময় শিল্প খাতের অংশে তেমন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি: ১৯৭৫-৭৬ সালের ১০ দশমিক ২ থেকে বেড়ে ১৯৯৪-৯৫ সালে ১১ দশমিক ৩ শতাংশে উঠেছিল। জিডিপির অংশে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছিল নির্মাণ ও জনপ্রশাসন খাতের।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে শিল্প খাতের অংশেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটে এবং সে পরিবর্তন বেশ দ্রুত হয় ২০০৯-১০ সালের পর। ২০১৯-২০ সাল নাগাদ কৃষির অংশ নেমে যায় ১০ শতাংশের নিচে আর শিল্পের অংশ উঠে যায় প্রায় ২৩ শতাংশে।

কর্মসংস্থানের খাতওয়ারি বিন্যাসেও পরিবর্তন ঘটেছে, যদিও তা উৎপাদনের মতো এতটা লক্ষণীয় নয়। ১৯৭৪ সালে মোট কর্মসংস্থানে কৃষির অংশ ছিল প্রায় ৭৯ শতাংশ, যা ১৯৮৩-৮৪ সালে ৫৯ শতাংশে নেমে যায়। কিন্তু তার পর এ ধারায় মন্থরতা দেখা যায়। ১৯৯৯-২০০০ সালে এ অংশ নামে ৫১ শতাংশে, আর ২০১০ সালে প্রায় ৪৮ শতাংশে। ২০১৬-১৭ সালে কৃষির অংশ ছিল ৪০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অন্যদিকে ১৯৮৩-৮৪ থেকে ১৯৯৯-২০০০ সালে শিল্পের অংশ ৮ দশমিক ৮ থেকে ৯ দশমিক ৫৫ শতাংশে ওঠে। এর অর্থ, এই প্রায় ১৬ বছরে মোট কর্মসংস্থানে শিল্পের অংশে সামান্যই পরিবর্তন হয়েছিল। পরের ১৬ বছরে এ অংশ বেড়ে ১৪ দশমিক ৪২ শতাংশে ওঠে।

কী উপসংহারে আসা যায় উল্লিখিত উপাত্তগুলো থেকে?

একদিকে দেখা যায়, জিডিপিতে কৃষির অংশ অনেক কমে গেলেও (অর্ধেক থেকে ১০ শতাংশের নিচে) কর্মসংস্থানে তার অংশ সে হারে কমেনি। যে খাত থেকে আসে মোট জিডিপির ১০ শতাংশেরও কম, সে খাতে ৪০ শতাংশের বেশি লোক নিয়োজিত। অন্যদিকে উৎপাদনে শিল্পের অংশ দ্বিগুণ হয়ে গেলেও কর্মসংস্থানে খাতটির অংশ বেড়েছে অনেক কম। এ দুটি ধারা থেকে বোঝা যায়, কৃষি ও শিল্প খাতের মধ্যে শ্রমের উৎপাদিকার পার্থক্য বেড়েছে।

কতটা সফল কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে?

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে এবং বাড়াতে সাফল্য অর্জিত হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। রেখাচিত্র ১ থেকে দেখা যায়, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ক্রমাগত বাড়লেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমেছে। আর এ দুই হারের দূরত্ব বাড়তে শুরু করেছে ২০০৫-০৬ সালের পর থেকে। অথচ সে সময় (২০২০ সালে কভিডের নেতিবাচক প্রভাবের আগ পর্যন্ত) জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছিল। ১৯৯৫-৯৬ থেকে ১৯৯৯-২০০০ সময়ে প্রতি ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিপরীতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ছিল দশমিক ৫৩৯২ শতাংশ। কিন্তু ২০১০ থেকে ২০১৬-১৭ সময়ে সংখ্যাটি নেমে যায় দশমিক ২৮৬১ শতাংশে। এর অর্থ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষমতা কমে গেছে। এ কারণে আমরা প্রশ্ন তুলেছিলাম, বাংলাদেশে কি কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে?

কেউ অবশ্য বলতে পারে, কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া সত্ত্বেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, এটা তো সুসংবাদ। কারণ এতে বোঝা যাচ্ছে, শ্রমের উৎপাদিকা বাড়ছে। বাংলাদেশে শ্রমের উৎপাদিকা কম বলে যাদের দুশ্চিন্তা, তাদের জন্য এটা অবশ্যই ভালো খবর (যদি সত্যি তা-ই হয়ে থাকে)। তবে যতদিন পর্যন্ত উদ্বৃত্ত শ্রম শেষ না হয় ততদিন পর্যন্ত উৎপাদিকা ও কর্মসংস্থান দুই-ই পাশাপাশি

   উৎস: বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের উপাত্ত ব্যবহার করে প্রস্তুত 

বাড়াতে হবে। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশ উচ্চপ্রবৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে উদ্বৃত্ত শ্রমের সদ্ব্যবহার করতে পেরেছে (যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, চীন, তাইওয়ান ইত্যাদি) তাদের অভিজ্ঞতা থেকে এমনটিই মনে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে উদ্বৃত্ত শ্রম শেষ হওয়ার আগেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমে গেল কেন? কয়েকটি কারণে এটি হয়ে থাকতে পারে। প্রথমত, কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের সময় শ্রমনিয়োজন বেড়েছিল কারণ উচ্চফলনশীল ফসল চাষে শ্রমের প্রয়োজন হয় বেশি। কিন্তু একটা পর্যায়ের পর কৃষির কোনো কোনো স্তরে (বিশেষ করে জমি তৈরিতে) যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়ে যায়। আর এখন তো ফসল কাটার জন্যও যন্ত্রের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

রফতানিমুখী শ্রমঘন শিল্প বলতে একমাত্র তৈরি পোশাক শিল্পই গড়ে উঠেছে। এ শিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেখানে বিভিন্ন কারণে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমে গিয়ে থাকতে পারে। একদিকে শিল্পটির ভেতরে কিছু পরিবর্তন হয়েছে, যেমন নিট পোশাকের অংশ বেড়েছে, যাতে শ্রমের প্রয়োজন ওভেন পোশাকের তুলনায় কম। অন্যদিকে শ্রমসাশ্রয়ী যন্ত্রের ব্যবহার বাড়তে শুরু করেছে বলে দুই শাখাতেই শ্রমের প্রয়োজন কমে যাচ্ছে।

অনেক সময় বলা হয়, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক বাদেও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। সে প্রসঙ্গে ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এ শিল্পগুলো শিল্প খাতের সার্বিক আয়তনের তুলনায় এখনো অনেক ছোটো রয়ে গেছে। তাছাড়া এর কোনোটিই শ্রমঘন নয়।

২০১৩-১৪ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত সময়ে দেশের জিডিপিতে ওষুধ শিল্পের অংশ ছিল ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৮৬ শতাংশের মধ্যে। শিল্প খাতের মোট উৎপাদনে এ শিল্পের অংশ ছিল ৩ শতাংশের কম। আর ২০১৬-১৭ সালে এতে কর্মসংস্থান ছিল ১ লাখ ৭৭ হাজার, যা শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের (প্রায় ৮৫ লাখ) ২ দশমিক ১ শতাংশে। ২০১৯-২০ সালে বাংলাদেশের মোট ওষুধ রফতানি ছিল ১৩৬ মিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট রফতানির ১ শতাংশের কম।

যানবাহন খাতের, বিশেষ করে জাহাজ নির্মাণ ও মোটরসাইকেল নির্মাণ শিল্পের কথা বেশ শোনা যায়। যদিও ২০০৯-১০ থেকে ২০১৮-১৯ সময়ে এ দুই শিল্পে উচ্চপ্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, ২০১৬-১৭ সালে এদের মোট কর্মসংস্থান ছিল ৫৪ হাজার।

পাঁচ দশকের শিল্পায়নের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, হাতেগোনা কয়েকটি শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আশি থেকে নব্বইয়ের দশকে তৈরি পোশাক ও ওষুধ শিল্পের যাত্রার মাধ্যমে যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল পরে সার্বিকভাবে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন হয়নি। যেসব নতুন শিল্পের কথা ওপরে বলা হলো, তাদের কোনো কোনটিতে উচ্চপ্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও মোট উৎপাদন বা কর্মসংস্থানে তাদের অংশ এখনো অনেক কম (আসবাব শিল্প বাদে, যেখানে ২০১৬-১৭ সালে নিয়োজিত ছিল ৭ লাখ ৭৭ হাজার)। শিল্প খাতের মোট উৎপাদন বা মূল্যসংযোজনে ও কর্মসংস্থানে বিভিন্ন খাতের অংশের দিকে তাকালে তা পরিষ্কার হয়। বর্তমান নিবন্ধের সীমিত পরিসরে সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার অবকাশ নেই।

সার্বিকভাবে শিল্প খাতের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে। ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০০৫-০৬ সময়ে এ হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, যা পরের পাঁচ বছরে নেমে যায় ৫ দশমিক ১৫ শতাংশে। আর ২০১০ থেকে ২০১৬-১৭ সময়ে তা আরো কমে গিয়ে হয় ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।

চতুর্থ শিল্প-বিপ্লব?

বিশ্বে এখন চলছে চতুর্থ শিল্প-বিপ্লব। প্রযুক্তির ওপর ভর করেই সংঘটিত হয় শিল্প-বিপ্লব। চতুর্থটিতে ব্যবহূত হচ্ছে রোবট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ন্যানো প্রযুক্তি ও বায়োটেকনোলজি। বিশ্বে এ নিয়ে কয়েক বছর ধরে চলছে আলোচনা। আর তাতে যে প্রশ্নটি উঠছে তা হলো, রোবটরা কি মানুষের চাকরি নিয়ে নেবে?

কয়েক বছর আগে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও সংগঠন এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। কী ধরনের পেশা এবং কর্মকাণ্ডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্রের ব্যবহার সম্ভব, কতদিনে তা বাস্তব রূপ নিতে পারে, আর তার ফলে কর্মজগতে কী প্রভাব পড়তে পারে, এ বিষয়গুলোর বিশ্লেষণ রয়েছে সেসব প্রতিবেদনে। যদিও তারা কেউ বলেনি, আগামীকাল বা আগামী বছরই রোবটরা সবার চাকরি নিয়ে নেবে, তবু বিষয়টি সারা বিশ্বে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে কয়েক বছর ধরেই। বিশেষ করে আমরা যেন পিছিয়ে না পড়ি সেটাই মনে হচ্ছে আলোচনার মূল কেন্দ্র।

যদি সত্যিই বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পে এবং সেবা খাতে রোবটের ব্যবহার শুরু হয়ে যায়, আর তা ঘটে বাংলাদেশের অসংখ্য বেকার ও প্রচ্ছন্নভাবে বেকার থাকা লোকের মানসম্মত ভালো আয়ের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হওয়ার আগেই, তবে বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিল গেটসের মতো মানুষও পরামর্শ দিয়েছেন রোবটের ব্যবহারের ওপর কর বসাতে।

নতুন এবং উন্নত প্রযুক্তি মানুষের কাজ নিয়ে নেবে কিনা এ প্রশ্ন কিন্তু মানবসভ্যতার ইতিহাসে বেশ পুরনো। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের কথা, যখন ব্রিটেনে তথাকথিত ‘লুডাইট’রা (পড়ুন: এক দল শ্রমিক) কাপড় বোনার যন্ত্র ভাংচুর শুরু করে, কারণ তারা মনে করছিল যে এসব যন্ত্র ব্যবহূত হলে তাঁতিরা বেকার হয়ে পড়বে। আর সাম্প্রতিক সময়ে গবেষণা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির ফলে শ্রমের ব্যবহারের ওপর কেমন প্রভাব পড়বে।

প্রথম শিল্প-বিপ্লবের সময় যান্ত্রিকীকরণের ফলে চাকরি কমেনি বরং বেড়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত ব্রিটেনের বস্ত্র শিল্পে কর্মসংস্থান বেড়েছিল। আর বিংশ শতাব্দীতে তা কমে যাওয়ার কারণ যন্ত্র নয়। শ্রমের মজুরি বেড়ে যাওয়ার ফলে শিল্পটি প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছিল, ফলে উন্নয়নশীল দেশে শিল্পটির স্থানান্তর ঘটে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান কমেনি বরং বেড়েছে। মন্দার সময়গুলো বাদে সে দেশে কিন্তু চাকরির সংখ্যা কমেনি।

এক ধরনের প্রযুক্তি মানুষের শ্রমের বিকল্প হিসেবে কাজ করে; আবার এমন প্রযুক্তি আছে যারা শ্রমের পরিপূরক বা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করে। যেকোনো সময় এ দুই ধরনের প্রযুক্তিই ব্যবহূত হতে পারে। আর কর্মসংস্থানে তার চূড়ান্ত ফল কী হবে তা নির্ভর করবে এ দুই শক্তির কোনটি বেশি প্রভাবশালী তার ওপর।

উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদিকা বাড়ে, উৎপাদনের খরচ কমে এবং তার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই পণ্যের দাম কমে। আর দাম কমলে চাহিদা বাড়ে এবং বাজার বড় হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারের তালিকায় যোগ হচ্ছে নতুন নতুন পণ্য ও সেবা; আর তাদের উৎপাদনের মাধ্যমে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থান।

তবে কোনো কোনো পণ্য ও সেবার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায় এবং সেগুলোর সঙ্গে চাকরিও আর থাকে না। এ প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবেই কেউ হারে আর কেউ লাভবান হয়। নতুন সৃষ্টি হওয়া চাকরিগুলোতে সাধারণভাবে উচ্চতর শিক্ষার প্রয়োজন হয় এবং দক্ষতাও লাগে অন্য রকম। চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে যারা শিক্ষিত হতে পারে এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে, তারাই এ পরিবর্তনের ফলে লাভবান হয়।

অর্থনৈতিকভাবে রোবটের ব্যবহার যদি যৌক্তিক হয় তাহলে বাংলাদেশের জন্য তা কিছু ইতিবাচক ফল দিতে পারে। তবে সঙ্গে সঙ্গে কিছু চিন্তার বিষয় এবং চ্যালেঞ্জও থাকবে, যেগুলো নীতিমালার মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হবে। নতুন প্রযুক্তির ফলে অশিক্ষিত এবং কম শিক্ষিতদেরই চাকরি হারানোর আশঙ্কা বেশি থাকবে। সুতরাং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ ব্যাপকভাবে সমাজের সব শ্রেণীর মধ্যে প্রসারিত না হলে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরো বেড়ে যেতে পারে।

চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ হলো নতুন প্রযুক্তিকে ইতিবাচক ফলের জন্য ব্যবহার এবং সে সুফল যেন মুষ্টিমেয় কিছু লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে লক্ষ্যে যথাযথ কর্মকৌশল অবলম্বন করা। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্ত্বপূর্ণ। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা সঠিকভাবে অবস্থা পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নীতিমালা অবলম্বন করে এ প্রক্রিয়াকে সঠিক পথে চালনায় সহায়তা করতে পারেন।

বাড়ছে সেবা খাতে কর্মসংস্থান

বর্তমান নিবন্ধের শুরুতেই বলেছি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের মোট উৎপাদনে কৃষির অংশ কমতে থাকে আর শিল্পের অংশ বাড়ে। কোনো এক পর্যায়ে আবার শিল্পের অংশও কমতে থাকে এবং সেবা খাতের অংশ বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি শিল্পের অংশ বেড়েছে। এখন দেখব সেবা খাতের অংশে কোনো পরিবর্তন হয়েছে কিনা এবং হয়ে থাকলে কী ধরনের পরিবর্তন হয়েছে।

প্রথমে প্রবৃদ্ধির দিকে তাকানো যাক। সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি সাধারণভাবে শিল্প খাতের চেয়ে কম ছিল, কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি অথবা কাছাকাছি ছিল। ২০০০ সালের পরের দুই দশকে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিতেও ত্বরণ ঘটে এবং সাধারণভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি ছিল। তার অর্থ সেই দুই দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সেবা খাত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মোট জিডিপিতে সেবা খাতের অংশ ৩৬ দশমিক ৫ থেকে প্রায় ৪৮ শতাংশে উঠে যায়। অথচ সেটা ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়, এবং সে পর্যায়ে সেবা খাতের অংশে এতটা বৃদ্ধি স্বাভাবিক ছিল না। তার চেয়ে বেশি স্বাভাবিক হতো শিল্প খাতের প্রসার। কিন্তু তা হয়নি বলেই হয়তো সেবা খাতকে সেই ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। তবে ১৯৯৪-৯৫ সালের পরের দশকে সেবা খাতের অংশে আর তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। ২০০৪-০৫ সালের পর যেসব খাতের অংশ বেড়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে পরিবহন, আর্থিক প্রাতিষ্ঠানিক সেবা, লোকপ্রশাসন এবং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও ব্যক্তিগত সেবা।

সেবা খাতের গঠনের পরিবর্তনে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে আধুনিক খাতগুলোর অংশ বাড়ছে কিনা, কারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সে ধরনের খাতের গুরুত্ব বাড়া স্বাভাবিক। যে ধরনের মোটা দাগের খাতিভিত্তিক উপাত্ত পাওয়া যায়, তা থেকে এ প্রশ্নের জবাব পুরোপুরি দেয়া সম্ভব নয়। তবে দুই ধরনের কর্মকাণ্ডের অংশই যে বেড়েছে তা পরিষ্কারই দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, একদিকে বেড়েছে পরিবহন খাতের মতো গতানুগতিক খাতের অংশ এবং অন্যদিকে বেড়েছে আর্থিক প্রাতিষ্ঠানিক সেবা, লোকপ্রশাসন, ব্যক্তিগত সেবা ইত্যাদির অংশও।

আরো একটি কথা এখানে উল্লেখ করা উচিত, সেবা খাতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের উৎপাদিকা ও আয়ের মধ্যে রয়েছে বিশাল পার্থক্য। কোনো কোনো কাজে আয় এতই কম যে তার মাধ্যমে দারিদ্র্যসীমার ওপর যাওয়াই দুষ্কর। সে ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটলে অর্থনীতির কাঠামোতে যে পরিবর্তন হয় তা সত্যিকার উন্নয়ন কিনা, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কভিড মহামারী, প্রবৃদ্ধি হ্রাস এবং কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব

২০২০ সালের গোড়ায় শুরু হওয়া কভিড মহামারীর কারণে যে বৈশ্বিক অর্থনীতি গভীর মন্দায় পড়েছিল এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে কথা এখন সবাই জানে। এ ক্ষতি হয়েছে দুই পর্যায়ে। প্রথমত, কভিড ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য লকডাউন ব্যবস্থা বলবৎ করে সব কর্মকাণ্ড বন্ধ এবং মানুষের চলাফেরা সীমিত করে দেয়ার ফলে কয়েক সপ্তাহ প্রায় সব ধরনের অর্থনৈতিক কার্যকলাপই বন্ধ ছিল। সে সময় শুধু শিল্প নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, ব্যক্তিগত সেবা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের খাতে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, লকডাউন ব্যবস্থা তুলে দেয়ার পরও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারেনি, কারণ কভিড সংক্রমণ এবং মহামারী অনেকদিন চলতে থাকে। সে সময় অভ্যন্তরীণ চাহিদায় যেমন ঘাটতি ছিল, তেমনি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা চলতে থাকায় রফতানির চাহিদাও কমে গিয়েছিল। বস্তুত ২০২০ সালের প্রায় পুরোটা সময়ই রফতানি, বিশেষ করে তৈরি পোশাকের প্রবৃদ্ধি মহামারীর আগের চেয়ে অনেক কম ছিল। অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী শিল্প ও সেবা খাতের কর্মকাণ্ডও স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে ছিল। ফলে ২০১৯-২০ সালে শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিতে বড় পতন ঘটে। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির হার ২০১৮-১৯ সালের ১৪ দশমিক ২ থেকে ২০১৯-২০ সালে ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশে নেমে যায়। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ১ থেকে নেমে যায় ৫ দশমিক ৩২ শতাংশে। পরিবহন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের প্রবৃদ্ধিও কমেছে।

কী ধরনের প্রবণতা দেখা যায় প্রকৃত মজুরির ধারায়?

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ আজিজুর রহমান খানের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭৩-৭৪ সালের জীবনযাত্রার ব্যয়কে ভিত্তি ধরে ১৯৭২-৭৩ সালে কৃষি শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি ছিল দৈনিক ৬ দশমিক ৭১ আর ১৯৭৯-৮০ সালে তা ছিল ৬ শতাংশ ৭৯ টাকা। অর্থাৎ পুরো সত্তরের দশকে প্রকৃত মজুরি একেবারেই বাড়েনি। দৈনিক মজুরিকে মোটা চালের দামে হিসাব করলেও এ একই উপসংহারে আসতে হয়: ১৯৭২-৭৩ সালে কৃষির দৈনিক মজুরি ছিল ২ দশমিক ৫৬ কিলোগ্রামের সমান, আর ১৯৭৯-৮০ ছিল ২ দশমিক ১৬ কিলোগ্রাম। এ হিসাবে দেখলে সে সময়ে প্রকৃত মজুরি কিছুটা কমেছিল বলেই মনে হয়।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে প্রকৃত মজুরি কিছুটা বাড়তে থাকে, যদিও বৃদ্ধির হার ছিল খুব কম। ২০০০-এর প্রথম দশকে অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটে। বিশেষ করে ২০০৬-০৭ সালের পর কয়েক বছর মজুরি বেশ উচ্চহারে বাড়ে। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০৮ সালে বিশ্ববাজারে (এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও) খাদ্যশস্যের মূল্য আকস্মিকভাবে বেড়ে যায়। ফলে সে সময় মজুরি বাড়ানোর জন্য একটু বাড়তি চাপ ছিল। কিন্তু সে সময়ের ধারা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। ২০১১-১২ সালের পর থেকে ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত প্রকৃত মজুরি কমে গিয়েছিল। সেটি ঘটেছিল সার্বিক এবং কৃষি ও শিল্প খাতে। সে সময় থেকে ২০১৯-২০ সাল পর্যন্ত কৃষি ও শিল্প খাতে প্রকৃত মজুরি কিছুটা বেড়েছিল, যদিও ২০০৮-০৯ সালের স্তরে পৌঁছতে পারেনি।

তবে কভিড মহামারী থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটের ফলে ২০২০ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে প্রকৃত মজুরি আবার কমতে থাকে। এ নিম্নগতি বিশেষভাবে দেখা যায় শিল্প, নির্মাণ ও মত্স্য খাতে।

মোটা দাগে কী বলা যায় মজুরির গতিধারা সম্পর্কে?

২০২০ সালের জন্য কৃষিতে দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা আর মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকা ধরে হিসাব করলে সে বছর চালের মাপে মজুরি হয় ১০ কেজি, যা ১৯৭২-৭৩ সালের ২ দশমিক ৫৬ কেজির প্রায় চার গুণ। স্মরণ করা যেতে পারে, সে সময়ে মাথাপিছু জিএনআই ১২০ থেকে বেড়ে ২ হাজার ১০ ডলারে উঠেছিল, অর্থাৎ প্রায় ১৭ গুণ বেড়েছিল। এর অর্থ পাঁচ দশকে মাথাপিছু আয় ১৭ গুণ বৃদ্ধির তুলনায় শ্রমিকের দৈনিক মজুরি বেড়েছে মাত্র চার গুণ। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে হিসাব করলেও দেখা যায়, সে সময় প্রকৃত মাথাপিছু আয় বেড়েছে চার গুণের অনেক বেশি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল শ্রমজীবী (এবং দরিদ্র) মানুষের কাছে যে তুলনামূলক অনেক কম পৌঁছেছে তা এ উপাত্তগুলো থেকে সহজেই অনুমান করা যায়।

কাহিনিটি তাহলে কী দাঁড়াল?

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অর্জন উল্লেখযোগ্য হলেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তা আশানুরূপ হয়নি। শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং উদ্বৃত্ত শ্রমের সদ্ব্যবহার হবে এমন আশা করা হলেও তা হয়েছে সীমিত পরিমাণে। একটি মাত্র শ্রমঘন রফতানিমুখী শিল্পের ওপর নির্ভরশীলতা এর প্রধান কারণ। নব্বইয়ের দশকের পর শিল্প খাতের কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য কোনো রূপান্তর ঘটেনি। আর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমতে শুরু করেছিল এমন সময়, যখন উৎপাদন বৃদ্ধির হার বাড়ছিল। অন্যদিকে শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি কোনো কোনো বছর বাড়লেও সেই বৃদ্ধির ধারা টেকসই হয়নি। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, ২০১১-১২ সালের পর প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া। কারণ সে সময় প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছিল। শুধু তা-ই নয়, সে সময় শ্রমের উৎপাদিকাও বেড়েছিল।

উচ্চপ্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া এবং শ্রমের উৎপাদিকা বৃদ্ধি সত্ত্বেও প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার টেকসই না হওয়া ছিল প্রাক-কভিড সময়ের উন্নয়ন অভিজ্ঞতায় হতাশার জায়গা। এ প্রবণতাগুলো থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, কেন সাধারণ মানুষ উচ্চপ্রবৃদ্ধির সুফল কম পেয়েছে এবং আয়ের বণ্টনে অসাম্য কেন বেড়েছে। কভিড মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিতে অবস্থার অবনতি হচ্ছে বলেই মনে হয়।

[বর্তমান লেখায় ব্যবহূত উপাত্তের তথ্যসূত্র লেখকের কাছ থেকে পাওয়া যাবে।]

 

লেখক: অর্থনীতিবিদ, সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা, এমপ্লয়মেন্ট সেক্টর, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, জেনেভা। তার সর্বশেষ গ্রন্থ ‘করোনাঘাতে অর্থনীতি ও শ্রমবাজার’ (বাতিঘর, ঢাকা)