বাংলাদেশের মানুষ প্রতিদিন ১ কোটি ৩০ লাখ কাপ চা পান করে। প্রতি দুই গ্রাম চা থেকে এক কাপ চা তৈরি হয়। বাংলাদেশে বছরে একজন মানুষ গড়ে ৫৮৮ গ্রাম চা ক্রয় করে। এ থেকেই প্রতিদিনের চা পানের হিসাব বের করেছে বাংলাদেশ চা বোর্ড (বিটিবি)। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানটি চা উৎপাদন ও বিপণন নিয়ন্ত্রণ করে।

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে সর্বত্র চা পান একটি নিয়মিত দৃশ্য। তবে বাংলাদেশ এখনো চা পানে শীর্ষ দেশগুলো থেকে অনেক পেছনে। আমরা এখনো দিনে গড়ে এক কাপের কম চা পান করি। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি চা পান করে তুরস্কের মানুষ, যেখানে মাথাপিছু বার্ষিক চা ভোগের পরিমাণ ৩ দশমিক ১৬ কিলোগ্রাম। অর্থাৎ তুরস্কের একজন মানুষ দিনে গড়ে তিন কাপ চা পান করে। তুরস্কের পর সবচেয়ে বেশি চা পান করে আয়ারল্যান্ডের মানুষ। এ দেশে একজন মানুষ গড়ে ২ দশমিক ৬৬ কাপ চা পান করে। এর পরই যুক্তরাজ্যের মানুষের স্থান, যারা ভারতীয় তথা বাঙালিকে চা পান শিখিয়েছে। যুক্তরাজ্যে একজন মানুষ গড়ে ২ দশমিক শূন্য ৫ কাপ চা পান করে। এরপর আরো ডজনখানেক দেশের পর চা পানে বাংলাদেশের স্থান। উইকিপিডিয়ার এ হিসাবে খানিকটা ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। কারণ ব্রিটিশ গবেষক ও লেখক জন গ্রিফিথসের ২০০৭ সালে প্রকাশিত তার টি: দ্য ড্রিং দ্যাট চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড গবেষণা গ্রন্থে বলেছেন, ব্রিটিশরা দিনে গড়ে সাড়ে তিন কাপ চা পান করে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশরা অবশ্য কফি পান করছে বেশি। কাজেই উইকিপিডিয়া ও বাংলাদেশ টি বোর্ডের হিসাব মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। এ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, বাংলাদেশের মানুষ যদি আরো বেশি বেশি চা পান করে তবে চা উৎপাদনকারীদের জন্য তা হবে বিরাট সুখবর। এখনই বাংলাদেশে উৎপাদিত চা আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ চা আমদানি করতে শুরু করেছে।

বলা হয়, পৃথিবীতে পানির পরই চা সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়। ধারণা করা হয়, চীনে প্রথম এটি জনপ্রিয়তা পায়। সম্ভবত বার্মার উত্তরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে চা গাছের উত্পত্তি এবং পরে সেখান থেকে এটি ছড়িয়ে পড়ে চীন, ইন্দো-চীন ও আসামে। চা গাছ ৫০-৬০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। তবে বাগানে যেসব চা গাছ চাষ করা হয় সেগুলোকে প্রতি বছরই কাটছাঁট করে কোমর থেকে বুক সমান উচ্চতায় রাখা হয়। গাছের কুঁড়ি ও কচি পাতা থেকে তৈরি হয় চা। এজন্য চায়ের ভুবনকে বলা হয় দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ির দেশ।

ভারতের আসামে চা চাষ শুরু হয়েছিল ১৮৩৯ সালে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোই এখানে চা শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, চা উৎপাদন ও ব্যবসার ক্ষেত্রে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করা। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে পরীক্ষামূলক চা বাগান স্থাপন করা হয় ১৮৪০ সালে। তবে এ দেশে ১৮৫৪ সালে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা বাগান প্রতিষ্ঠা করা হয় সিলেটের (মালনীছড়া) সুরমা উপত্যকায়। প্রয়াত ব্রিটিশ গবেষক ড্যান জোনসের মতে, আসাম ও সিলেটে চা শিল্প প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ৫০ বছর ধরে এ অঞ্চলগুলোতে উৎপাদন হয়েছে বিশ্বের অর্ধেক চা।

ভারতীয় চা ব্যবসায়ীরা অধিক হারে চা বাগান ক্রয় করতে শুরু করেন বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর এখনকার বাংলাদেশ ও সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে ১০৩টি চা বাগান ছিল। অনেক হিন্দু মালিক এ দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার সময় তাদের চা বাগানগুলো মুসলমানদের কাছে বিক্রি করে যায়। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় এ-দেশীয় হিন্দু চা বাগান মালিকদের ওপর নেমে আসে আরেক দফা দুর্ভোগ। তখনো যেসব চা বাগান হিন্দু মালিকদের মালিকানায় ছিল সেগুলো পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত করে। পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশে [তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান] উৎপাদিত অধিকাংশ চা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটাত। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেশের চা শিল্পের মারাত্মক ক্ষতি হয়; চা উৎপাদন ও এর ব্যবসা খুব সীমিত হয়ে যায়। বহু বাগান পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয় এবং চা প্রক্রিয়াকরণ কারখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাকিস্তানিদের মালিকানাধীন ৩৯টি চা বাগান পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সেগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চা বাগানগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার উদ্যোগ নেন এবং রাষ্ট্রের অধীনে থাকা অনেক চা বাগান ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেয়া হয়। চা বাগানের এ নতুন মালিকদের জন্য ব্যাংকঋণের ব্যবস্থাও করা হয়। ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্সের (ওডিএ) মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারও নতুন মালিকদের সাহায্য করে। তবে অভিযোগ আছে, সংশ্লিষ্ট মালিকরা এ সাহায্যের খুব কমই চা বাগানের উন্নয়ন ও শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করে।

বাংলাদেশ টি বোর্ডের ২০১৯ সালের হিসাব অনুসারে, সম্প্রতি গড়ে ওঠা পঞ্চগড়ের সাতটি ও ঠাকুরগাঁওয়ের একটি চা বাগানসহ বাংলাদেশে চা বাগানের সংখ্যা ১৬৬। এসব বাগান মালিকের মধ্যে চারটি ব্রিটিশ বা স্টার্লিং কোম্পানি এবং বাকিগুলো বাংলাদেশী।

ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর মধ্যে ডানকান ব্রাদার্স সবচেয়ে বড়। এর বাগানের সংখ্যা ১৬। বাকি তিনটি স্টার্লিং কোম্পানির (দেউন্দি টি কোং, নয়াপাড়া টি কোং ও দ্য নিউ সিলেট টি এস্টেট লিমিটিড) বাগানের সংখ্যা পাঁচ। বাংলাদেশী মালিকানাধীন চা বাগানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ টি বোর্ডের বাগান পাঁচটি, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল টি কোম্পানির বাগান ১২টি ও ফিনলেসহ অন্যান্য কোম্পানি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগান ১২৮টি। ফিনলে সাম্প্রতিক সময়ে স্টার্লিং কোম্পানি থেকে দেশী কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বড় বড় চা বাগানের বাইরে পাঁচ হাজারের অধিক ক্ষুদ্র চা বাগান গড়ে উঠেছে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বিশেষ করে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য জায়গায়ও অল্পবিস্তর চা চাষের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

বাংলাদেশে চা উৎপাদনের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো ভারত বিভাগের পর এখানে উৎপাদিত চায়ের অধিকাংশ চলে যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও পশ্চিম পাকিস্তানই বাংলাদেশী চায়ের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক। তবে এখন বাংলাদেশে উৎপাদিত চায়ের সবচেয়ে বড় ভোক্তা বাংলাদেশীরাই। ২০০৭ সালে ধারণা করা হয়েছিল, বাংলাদেশ খুব শিগগির চা আমদানি করবে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ প্রথম চা আমদানি করে সে অনুমানই সত্য প্রমাণ করে। মোদ্দাকথা, চা এখন আর বাংলাদেশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো রফতানি পণ্য নয়। বাংলাদেশ ২০১৮ সালেও চা উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বিশ্বে নবম স্থানের অধিকারী হলেও বিশ্ববাজারে চা রফতানিতে এর গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভূমিকা এখন আর নেই। কারণ বাংলাদেশে উৎপাদিত চায়ের প্রায় সবই দেশের মধ্যে বাজারজাত হচ্ছে। দেশে চায়ের বাজার যে ক্রমাগতভাবে বাড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

১৯৬১ সালে বাংলাদেশে চায়ের উৎপাদন ছিল ২৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন কিলোগ্রাম। তখন অভ্যন্তরীণ বাজার বড় ছিল এবং এর ২৩ দশমিক ৯ মিলিয়ন কিলোগ্রামই অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি হয়। ১৯৭০ সালে উৎপাদিত ৩১ দশমিক ৪ মিলয়ন কিলোগ্রামের সবই অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি হয়। বাংলাদেশ সৃষ্টির আগের বছর পাকিস্তান চায়ের বড় অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে চা উৎপাদন নেমে আসে ২৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন কিলোগ্রামে। এর মধ্য থেকে রফতানি হয় ১৩ দশমিক ২ মিলিয়ন কিলোগ্রাম। বাকিটা দেশের মধ্যেই বিক্রি হয়। এর পর থেকে চা উৎপাদন বাড়তে থাকে। সঙ্গে বাড়তে থাকে অভ্যন্তরীণ বাজার। ২০০৯ সালে উৎপাদিত ৫৯ দশমিক ১৫ মিলিয়ন কেজি চায়ের মাত্র ৬ দশমিক ১৫ মিলিয়ন কিলোগ্রাম রফতানি হয়। এর পর থেকে চা রফতানি একেবারেই কমে যায় ও অভ্যন্তরীণ বাজার আরো সম্প্রসারিত হতে থাকে। ২০১৯ সালে চায়ের উৎপাদন ৯৬ দশমিক শূন্য ৭ মিলিয়ন কিলোগ্রাম। এর থেকে মাত্র দশমিক ৬০ মিলিয়ন কিলোগ্রাম রফতানি হয়। আর অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি হয় ৯৫ দশমিক ২০ মিলিয়ন কিলোগ্রাম। এ হিসাব বাংলাদেশ টি বোর্ডের।

তৈরি চায়ের বেচাকেনা অন্যান্য পণ্য থেকে আলাদা। বাংলাদেশের ১৬৬টি চা বাগানে উৎপাদিত চায়ের ৯৫ শতাংশ বিক্রি হয় চট্টগ্রাম শহরে আগ্রাবাদ এলাকায় প্রগ্রেসিভ টাওয়ারে অবস্থিত অকশন হাউজ থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে চায়ের রাজধানী বলে খ্যাত শ্রীমঙ্গলে ছোট পরিসরে চায়ের অকশন বসে মাসে দুদিন। চা বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ চা বোর্ড লাইসেন্স প্রদান করে। চা বেচাকেনার সঙ্গে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ছয়টি ব্রোকার হাউজ ও ১৪০ জন ডিলার বা নিলাম ডাককারী জড়িত।

বাণিজ্যি মন্ত্রণালয়ের অধীন চা বোর্ড চা বাগানগুলোর কর্মকাণ্ড, উন্নয়ন ও উৎপাদন তত্ত্বাবধান করে। এ বোর্ডের অধীন গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ টি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) ও প্রজেক্ট ডেভেলপমেন্ট ইউনিট (পিডিইউ)। এ দুটি প্রতিষ্ঠানই শ্রীমঙ্গলে একই ক্যাম্পাসে অবস্থিত। বিটিআরআইয়ের কাজ চা শিল্পের প্রয়োজনে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা করা। আর পিডিইউর মূল কাজ চায়ের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে কাজ করা।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার দুটি বাগানসহ সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও চট্টগ্রাম জেলার ১৫৮টি বড় বড় বাগান সরকারের কাছ থেকে লিজ নেয়া ১ লাখ ১৩ হাজার ১১৬ দশমিক ৪৪ হেক্টর জমির ওপর (বাংলাদেশী চা সংসদের হিসাব)। তবে এ জমির মধ্যে চা চাষের এলাকা ৫৯ হাজার ৯৩৩ দশমিক ৪৮ হেক্টর বা মোট ইজারা নেয়া জমির ৫২ দশমিক ৯৮ শতাংশ। সরকারের লক্ষ্য, চা চাষের এলাকা বাড়ানো এবং চা উৎপাদন বাড়ানো। কারণ বাংলাদেশের চায়ের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। আর অভ্যন্তরীণ বাজারে চায়ের চাহিদা যত বাড়বে চায়ের ভবিষ্যৎও তত উজ্জ্বল হবে।

চা শিল্পে ব্যবসার পরিবর্তন

দুই দশকে ব্রিটিশ কোম্পানি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগান ইজারা নিয়ে বিনিয়োগ করেছে দেশীয় শিল্প গ্রুপগুলো। এ তালিকায় আছে ১৮টি শিল্প গ্রুপ। আভিজাত্য ও অবকাশযাপনের কেন্দ্র হিসেবে না দেখে তাদের সিংহভাগই বাগান সংস্কার ও যন্ত্রপাতি আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করেছে। তাতে কয়েক বছরে চা উৎপাদন প্রত্যাশা ছাড়িয়েছে।

চা বোর্ডও দুই দশকে নতুন নতুন প্রকল্প নিয়েছে। চা চাষের আওতা বাড়াতে তদারকি বাড়িয়েছে। ক্ষুদ্র চাষী ও নতুন উদ্যোক্তাদের চা চাষে উদ্বুদ্ধ করেছে। তাতে ১৫০ বছরের বেশি সময় ধরে চা উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু সিলেট টু চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে চা চাষের বিস্তার ঘটেছে উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য জেলায়।

চা উৎপাদনের এ সাফল্য জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার কয়েক বছর আগের অনুমানও ভেঙে দিয়েছে। সংস্থার একটি কমিটির আভাস ছিল, ২০২৭ সালে বাংলাদেশে চা উৎপাদন দাঁড়াবে ৯ কোটি ৬৮ লাখ কেজিতে। গত বছরই দেশে চা উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৬০ লাখ কেজিতে। এ সাফল্য এসেছে মূলত দেশীয় বড় গ্রুপের হাতে।

চা উৎপাদনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০০ সালে স্টার্লিং কোম্পানি হিসেবে পরিচিত ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলোর হাত ধরে উৎপাদন হয় মোট উৎপাদনের ৪৮ শতাংশ চা। গত বছর তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৯ শতাংশে। আর ধারাবাহিকভাবে বেড়ে দেশীয় কোম্পানিগুলোর হাতে এখন উৎপাদন হচ্ছে ৮১ শতাংশ চা।

দুই দশক আগে এ পরিবর্তন শুরু হলেও তাতে গতি পায় যুক্তরাজ্যের জেমস ফিনলে লিমিটেডের চা বাগান হস্তান্তরের ঘটনার পর। যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত সোয়ার গ্রুপ ফিনলে লিমিটেডকে অধিগ্রহণ করে। তারা বাংলাদেশের ব্যবসায় মুনাফা না দেখে ২০০৫ সালে বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করে। ২০০৬ সালের মার্চে ব্রিটিশ এ কোম্পানির হাতে থাকা ৩৯ হাজার ১১২ একর বাগানের সব শেয়ার আনুষ্ঠানিকভাবে কিনে নেয় ছয়টি গ্রুপ ও দুই ব্যক্তি। ছয়টি গ্রুপ হলো ইস্পাহানি, উত্তরা গ্রুপ (উত্তরা মোটরস), পেডরোলো, ইস্টকোস্ট, এবিসি গ্রুপ ও এমজিএইচ গ্রুপ। এর মধ্যে শেষ তিনটি প্রথমবার এ খাতে বিনিয়োগ করেছে।

ফিনলে ছাড়াও গত দুই দশকে চা বাগান ইজারা নিয়ে যুক্ত হয়েছে এ কে খান, আকিজ, স্কয়ার, সিটি, টিকে, ওরিয়ন, কাজী অ্যান্ড কাজী (জেমকন), ইউনাইটেড গ্রুপ, মোস্তফা গ্রুপ ও প্যারাগন গ্রুপের মতো শিল্প গ্রুপ। এছাড়া বৈশ্বিক পারফিউম ব্র্যান্ড আল হারামাইন পারফিউমস গ্রুপ, পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান হা-মীম ও ভিয়েলাটেক্স গ্রুপও আছে এ তালিকায়। এছাড়া বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ব্র্যাক’ও বিনিয়োগ করেছে চা খাতে।

বিশ্বব্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের এ বছর আয়ের দিক থেকে শীর্ষ ২৩ কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করেছে। এ তালিকার শীর্ষ ১০টি গ্রুপের সাতটিরই ব্যবসা রয়েছে চা খাতে, যারা গত দুই দশকে যুক্ত হয়েছে।

চা বাগান না থাকলেও লাইসেন্স নিয়ে চা বিপণনে যুক্ত হয়েছে আবুল খায়ের, মেঘনা, পারটেক্স স্টার ও এসিআই গ্রুপ। শুধু যুক্ত নয়, চা বিপণনে এখন আবুল খায়ের দ্বিতীয় ও মেঘনা তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে।

স্কটল্যান্ডে নিবন্ধিত কোম্পানি জেমস ফিনলে এ দেশ থেকে চা ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার সময় তাদের সাতটি বড় বাগানে (কোম্পানির হিসেবে ১৬টি বাগান) চায়ের উৎপাদন ছিল ৯৪ লাখ কেজি। দেশীয় উদ্যোক্তাদের হাতে আসার পর বেড়ে গত বছর তা দাঁড়ায় ১ কোটি ৬৮ লাখ কেজিতে।

ফিনলের উদ্যোক্তারা জানান, চা বাগানের মালিকানা তাদের হাতে আসার পর মুনাফার বড় অংশই বাগানে বিনিয়োগ করেছেন তারা। তাতে উৎপাদনও বেড়েছে।

চা চাষে সাফল্যের কাহিনী আছে পানির পাম্প বাজারজাতকারী গ্রুপ পেডরোলোর। ২০০৩ সালে চট্টগ্রামের হালদা ভ্যালি বাগানটি ইজারা নেয়ার সময় ছিল ঝোপঝাড়। উৎপাদন ছিল না এক কেজিও। পরিত্যক্ত বাগানটি ইজারা নেয়াসহ এ পর্যন্ত ১২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে গ্রুপটি। এখন বাগানটিতে উৎপাদন হচ্ছে বছরে ১০ লাখ কেজি চা। ২০১৭ সালে হেক্টরপ্রতি উৎপাদনে শীর্ষস্থানও দখল করে বাগানটি। হালদাসহ গ্রুপটির হাতে দুটি বাগান আছে।

জেমকন গ্রুপের সাফল্য আছে চা চাষে। ২০০০ সালে হিমালয়ের পাদদেশে দার্জিলিংয়ের অদূরে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় কাজী অ্যান্ড কাজী চা বাগানে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে গ্রুপটি। অর্গানিক চা বাগান হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতিও পায় বাগানটি। যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্যের বাজারে এ বাগানের চা শোভা পাচ্ছে। গত বছর বাগানটিতে প্রায় পাঁচ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়।

প্রায় ৯৬ বছর আগে নিবন্ধিত কেদারপুর টি কোম্পানি লিমিটেডের মালিকানায় ১৯৬০ সালে যুক্ত হন সংবাদ পত্রিকার প্রয়াত প্রধান সম্পাদক আহমদুল কবির। পর্যায়ক্রমে পরিত্যক্ত তিনটি বাগান কিনে ফলনে সাফল্য দেখায় দেশীয় কোম্পানিটি। পরে ব্রিটিশ অক্টাভিয়াস স্টিল কোম্পানি থেকে সাতগাঁও বাগানও যুক্ত হয় তাদের বহরে।

কোম্পানির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক লায়লা রহমান কবিরের হাত ধরে মধুপুর বাগান সর্বোচ্চ গুণগত মানের চা উৎপাদনের জন্য ২০১৮ সালে পুরস্কার পেয়েছে। এখনো নিলামে সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হয় এ বাগানের চা।

স্টার্লিং কোম্পানি হিসেবে পরিচিত ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলোর মধ্যে ব্যবসা ধরে রেখেছে ডানকান ব্রাদার্স বাংলাদেশ লিমিটেড। চা বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ডানকানের হাতে আছে ১৬টি বাগান। জমির মোট পরিমাণ ৪৫ হাজার ৭৬৮ একর। এছাড়া দ্য নিউ সিলেট টি কোম্পানি ও দেউন্দি টি কোম্পানির পাঁচটি বাগান আছে এ তালিকায়। এ তিন কোম্পানিই যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত।

চা বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, ২০০৬ সালে ফিনলের বাগান দেশীয় শিল্প গ্রুপের হাতে আসার পর থেকে এ পর্যন্ত উৎপাদন বেড়েছে ৭৯ শতাংশ। একই সময়ে ডানকানের বাগানের উৎপাদন বেড়েছে ১৮ শতাংশ। দেউন্দি টি কোম্পানির উৎপাদন বেড়েছে ৩৬ শতাংশ।

একই সময় দেশীয় শিল্প গ্রুপের উৎপাদন তুলনা করে দেখা যায়, ইস্পাহানির চা বাগানে ১১৪ শতাংশ, ট্রান্সকমের তিন বাগানে ৫২ শতাংশ ও কেদারপুর টি কোম্পানির চা বাগানে ৫০ শতাংশ উৎপাদন বেড়েছে, যা ব্রিটিশ কোম্পানির উৎপাদন হারের চেয়ে বেশি।

অবহেলিত চা শিল্পের প্রাণভোমরা

বাংলাদেশে চা শিল্পের ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করতে সরকারি মহল ও চা বাগানের মালিকরা উচ্চকণ্ঠ। কিন্তু চা শিল্পের জীবনী শক্তি বা প্রাণভোমরা যে চা শ্রমিক তারা কেমন আছে? তাদের পরিচয় কী? তারা কি শুধুই চা শ্রমিক? এসব প্রশ্ন আমাদের সামনে খুব কম আসে। মালিকপক্ষ ও সরকার চা নিয়ে নানা উৎসবে ও আলোচনায় এটুকুই শুধু বলে, চা শ্রমিকদের উন্নয়নে নানা কর্মসূচি নেয়া হচ্ছে। আসলেই কি দেশের উন্নয়নের যে যাত্রা তাতে চা শ্রমিকরা অংশীদার হতে পারছে?

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বড় বড় ১৫৮টি চা বাগানে (পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে আটি বাগান বাদে) কাজ করে ১ লাখ ৩৮ হাজারের অধিক শ্রমিক, যাদের ৫১ শতাংশ নারী। এদের আবার ৯৫ শতাংশের মতো অবাঙালি। তবে এরা শুধুই চা শ্রমিক নয়। এদের মধ্যে জাতীয় পরিচয় খুবই বৈচিত্র্যপূর্ণ। সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) ২০১৬ সালে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী চা বাগানে ৮০-এর মতো জাতিগোষ্ঠী আছে। ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিয়ে চা বাগানগুলো এসব জাতিগোষ্ঠীর এক আলাদা জগৎ। কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক জীবন অত্যন্ত দীনহীন। ১৯৩৯ সালে ভারতের আসামে যখন থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষ শুরু হয় তখন থেকে ‘কুলি-ধরা’ হিসেবে পরিচিত আড়কাঠি, মাইস্ত্রী ও সরদাররা এদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে বিভিন্ন জায়গা যেমন—বিহার, ওড়িশা, অন্ধ্র প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর প্রদেশ থেকে আদিবাসী, নিম্নবর্ণ ও দলিত শ্রেণীর হিন্দুদের নিয়ে আসে চা বাগানে কাজ করার জন্য। একই সময় তামিলভাষী মানুষদের ‘কাঙ্গানি’ বলে পরিচিত এজেন্টরা শ্রীলংকায় নিয়ে যায়। শ্রীলংকার শ্রমিকদের সঙ্গে তত্কালীন আসাম ও এখনকার বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের পার্থক্য হলো শ্রীলংকার শ্রমিকরা সবাই তামিল। এসব মানুষ বন-জঙ্গল ও ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে চা বাগান তৈরি করে।

শুরু থেকেই চা শ্রমিকের মজুরি কাঠামো এমন করে রাখা হয়েছে যাতে তারা চা বাগানেই আটকে থাকে। পাঁচ প্রজন্ম ধরে বর্তমান বাংলাদেশের চা বাগানগুলোয় যেসব শ্রমিক কাজ করছে তাদের বর্তমান দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা (মালিক-শ্রমিকের সর্বশেষ চুক্তি অনুযায়ী যা ২০১৯-২০ সালের জন্য কার্যকর)। এ মজুরি থেকেই কেটে রাখা হয় প্রভিডেন্ট ফান্ডে শ্রমিকের প্রদেয় অংশ, ধর্মীয় ফান্ড ও ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য চাঁদা। দৈনিক নগদ মজুরির সঙ্গে একজন শ্রমিক আরো যা পায়, তার মধ্যে অন্যতম সাত-আট কেজি চাল বা আটা (সাড়ে তিন কেজি নিজের জন্য এবং বাকিটুকু স্বামী/স্ত্রী ও ১২ বছরের কম বয়সী সন্তানদের জন্য)। ভর্তুকি মূল্যে প্রতি কেজি চাল বা আটার জন্য তাকে ২ টাকা ব্যয় করতে হয়। স্থায়ী বা নিবন্ধিত শ্রমিক হলে প্রতি বছর ৪৭ দিনের মজুরির সমান উৎসব ভাতা পায় যা দুটি প্রধান উৎসবে দেয়া হয়। তার বসবাস লেবার লাইন বা শ্রমিক কলোনিতে এবং সেখানে তাকে ঘর ভাড়া দিতে হয় না। তবে বসবাসের জন্য যে ঘর তাদের দেয়া হয় তার অধিকাংশ কাঁচা ও নিম্নমানের। চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা তারা যা পায় তাও নামমাত্র। নগদ মজুরি ও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে একজন শ্রমিকের বর্তমান দৈনিক আয় সর্বোচ্চ ২০০ টাকা বা মাসিক আয় ৬ হাজার টাকার বেশি নয়—এমন হিসাব দেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের অনেকে।

দৈনিক নগদ মজুরি ও অন্যান্য সুবিধা দেয়ার এই যে আয়োজন, এর সবই চা শ্রমিকদের চা বাগানে আটকে রাখার ব্যবস্থা। তারা বেঁচে থাকবে কিন্তু তাদের মর্যাদা থাকবে না। যে লেবার লাইন বা শ্রমিক বস্তির যে ঘরে ও জায়গায় বাস করে তার ওপর তাদের কোনো মালিকানা নেই। তারা চা বাগানের ফাঁকে ফাঁকে কিছু চাষের জমিতে ফসল ফলায়। কিন্তু এ জমিতেও তাদের কোনো মালিকানা নেই। চা শ্রমিকরা সম্পূর্ণ ভূমিহীন ও নিজস্ব বাসগৃহহীন এবং দরিদ্র একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এরাই চা শিল্পের প্রাণভোমরা! এরা কাজ বন্ধ করে দিলে বাগানও বন্ধ।

কভিড মহামারীর সময় তারা সবসময় নিয়মিত চা বাগানে কাজ করেছে। মালিকপক্ষ সরকারের সহযোগিতায় নানা কৌশলে চা শ্রমিকদের সবসময় কাজ করতে বাধ্য করেছে। এজন্য তারা বাড়তি কোনো সুবিধা দেয়নি চা শ্রমিকদের। এমনকি কভিড পরীক্ষার ব্যাপারেও মালিকদের বড় অনীহা দেখা গেছে।

চা শিল্প যেখানে দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং মালিকরা নানাভাবে লাভবান হচ্ছেন সেখানে চা শ্রমিকদের দুর্দশা লাঘবের জন্যও আন্তরিক চেষ্টা থাকতে হবে। মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশের চা শ্রমিক ও তাদের পরিবার-পরিজন শুধু দরিদ্র ও পশ্চাত্পদই নয় বিভিন্ন ভাষা, জাতি পরিচয়, ধর্ম, সংস্কৃতি ও একটি বিশেষ পেশা অবলম্বন করে বেঁচে থাকা মানুষ এরা। এরা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও পেছনে পড়ে থাকছে। যে মানুষ তার ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অনেক কিছু হারিয়েছে এবং চা বাগানে বাঁধা পড়ে আছে তাদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিছু সাহায্য-সহযোগিতা ও অনুকম্পা দেখানোই যথেষ্ট নয়। তাদের মুক্তির জন্য সমান সুযোগ-সুবিধাও যথেষ্ট নয়; দরকার আরো বেশি কিছু। কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্য, নানা জটলার মধ্যে রেখে তাদের সংবিধান ও শ্রম আইন যে অধিকার দিচ্ছে তা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। চা শ্রমিকদের প্রতি সুবিচার করতে হলে প্রথমেই শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা তাকে যেসব অধিকার দেয় সেসব নিশ্চিত করতে হবে। এরপর সামাজিক নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্র তাদের জন্য যে বরাদ্দ রেখেছে তা আরো বাড়াতে হবে। চা বাগানে ‘বাঁধা’ পড়া এসব মানুষের জন্য আরো অনেক কিছু করার আছে তাদের নিয়োগদাতা, রাষ্ট্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা এবং বৈচিত্র্যময় জাতি পরিচয় বাঁচিয়ে রাখতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যা যা করা সম্ভব তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে সেসব ব্যাপারে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া দরকার। সামাজিক ন্যায়বিচার, সামাজিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষাই পেছনে পড়ে থাকা চা শ্রমিক ও তাদের পরিবার-পরিজনকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে।

 

ফিলিপ গাইন: গবেষক ও সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট ও হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) পরিচালক