জন রিডের লেখা ‘Ten Days That Shook The World’ বা ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ অনেকেই হয়তো পড়ে থাকবেন। বইটি ছিল ১৯১৭ সালে সংঘটিত সোভিয়েত বিপ্লবের ওপর। সত্যিকার অর্থে সোভিয়েত বিপ্লব ছিল দুনিয়া কাঁপানো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পরই তৎকালীন পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অন্তর্ভুক্ত হয়। সোভিয়েত বিপ্লব দুনিয়ার দেশে দেশে সমাজ পরিবর্তনকামী মানুষের মধ্যে বিশাল কৌতূহল সৃষ্টি করেছিল। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মাও জে দং লিখেছিলেন, সোভিয়েত বিপ্লবের কামানের গর্জন চীনে মার্ক্সবাদ নিয়ে এসেছিল। ১৯২১ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সময় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিও প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৯ সালে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর চীনের কমিউনিস্টরা চিয়াং কাইশেককে পরাজিত করে চীনের ক্ষমতা দখল করে। ১৯৪৯-এর অক্টোবরে চীনা নেতা মাও জে দং বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন, ‘China has stood up.’ এর পর একে একে উত্তর কোরিয়া, কিউবা, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাওসে কমিউনিস্ট পার্টিগুলো বিপ্লবী লড়াইয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়। এভাবে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ নতুন এক সমাজ ব্যবস্থার অধীনে চলে আসে।
কার্ল মার্ক্স সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দুটি বিষয়ের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন। এগুলো হলো উৎপাদিকা শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্ক। যেসব হাতিয়ার, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি দিয়ে উৎপাদন করা হয়, সেগুলোই হলো উৎপাদিকা শক্তি। সমাজ বিকাশের ধারায় উৎপাদিকা শক্তি ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়ে চলেছে। এই ধারা দাস সমাজ থেকে আজ পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। আদিতে পৃথিবীতে ছিল আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থা, সেই সময় মানুষের হাতে উৎপাদনের কোনো হাতিয়ার ছিল না। ফলমূল সংগ্রহ করে এবং প্রাণীর মাংস ভক্ষণ করে মানুষ জীবনধারণ করত। প্রকৃতি ও বন্য হিংস্র প্রাণীদের কাছে মানুষ ছিল অসহায়। অসহায়ত্বের কারণে এবং জীবনধারণের সামগ্রী খুবই অপ্রতুল হওয়ায় মানুষ যূথবদ্ধ হয়ে বাস করত এবং যা কিছু খাদ্যসামগ্রী জোগাড় করতে পারত, সেগুলো সমানভাবে ভাগ করে ভোগ করত। তার পর পাথরের হাতিয়ার এবং ধাতব হাতিয়ার উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে মানবসমাজে পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের ধারা দাস সমাজ থেকে সামন্ত সমাজে এবং সামন্ত সমাজ থেকে পুঁজিবাদী সমাজে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে। কার্ল মার্ক্স দেখিয়ে দিয়েছিলেন, একটি সমাজে উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কের এক ধরনের সাযুজ্য থাকে। উৎপাদন সম্পর্ক হলো, উৎপাদনের হাতিয়ার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মানুষে মানুষে যে সম্পর্কের সৃষ্টি হয়, সেটি। এই সম্পর্কে দেখা যায় কেউ উৎপাদন যন্ত্রের মালিক এবং অন্যদের এর ওপর কোনো মালিকানা থাকে না। একদল আয়েশী মানুষ, অন্য একদল মেহনতি মানুষের ওপর শোষণ চালায় এবং তাদের সৃষ্ট উদ্বৃত্ত আহরণ করে ধনসম্পদে স্ফীত হয়ে ওঠে।
পুঁজিবাদী সমাজে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি ঘটে। এর ফলে উৎপাদিকা শক্তিরও প্রভূত বিকাশ হয়। বস্তুত পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ‘Mass Production’-এ উত্তরণ ঘটে। যখন থেকে একশ্রেণীর মানুষ উৎপাদিকা শক্তির মালিক হয়ে গেল, তখন থেকেই সমাজে শ্রেণীভেদ সৃষ্টি হয় এবং শ্রেণীসমাজের সৃষ্টি হয়। শ্রেণীতে শ্রেণীতে দ্বন্দ্ব সমাজ বিকাশের চাকাকে সচল করে তোলে। সমাজে শ্রেণীবিরোধেরও জন্ম হয়। কার্ল মার্ক্স সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করলেও এসব সমাজ ব্যবস্থার গতিধারা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু লেখেননি। তিনি বহু সাধনা করে দেখিয়েছেন কীভাবে পুঁজিবাদী সমাজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এর পতনকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলবে। তিনি আরো বলেছিলেন, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হবে জার্মানির মতো উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশে। কিন্তু ঘটনা ঘটে গেল অন্য রকমভাবে। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হলো অনুন্নত পুঁজিবাদী রাশিয়ায়। জোসেফ স্টালিন এই অদ্ভুত পরিণতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘Weakest link in the chain of imperialism’-এর তত্ত্ব দিলেন। রুশ বলশেভিক নেতা ভি আই লেনিন বললেন, যেহেতু শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির নেতৃত্বে বিপ্লব হয়েছে, সেহেতু তারা পুঁজিবাদী স্তরকে এড়িয়ে সরাসরি সমাজতন্ত্র গড়ে তুলবে। শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে পুঁজিবাদী শোষণ প্রতিষ্ঠা করা কাম্য হতে পারে না।
সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা পুঁজিবাদী সমাজ থেকে অনেক উন্নত এক সমাজ ব্যবস্থা। সমাজতান্ত্রিক সমাজে উৎপাদন সম্পর্ক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে প্রভূতভাবে অগ্রসর। সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদী শোষণের অবসান ঘটাবে এবং অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত যৌথভাবে মানুষের জীবনযাত্রাকে সমৃদ্ধ করার জন্য ব্যবহার হবে। কিন্তু এ ধরনের একটি আর্থসামাজিক ব্যবস্থার জন্য উৎপাদিকা শক্তির ব্যাপক বিকাশ হওয়া প্রয়োজন। যেহেতু তাত্ত্বিকভাবে সমাজতন্ত্র ধনতন্ত্রের চেয়ে উন্নত ব্যবস্থা, সেহেতু এ ব্যবস্থার ধসে পড়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু আমরা লক্ষ করেছি আশির দশকের পর প্রথমে পূর্ব ইউরোপে এবং পরে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধসে পড়েছে। সমাজতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি আস্থাবান পণ্ডিতরা বলতে চেয়েছেন, এই সমাজতন্ত্র খাঁটি সমাজতন্ত্র ছিল না বলেই পরিণতি এমনটি হয়েছে। এ কারণে তারা এ সমাজতন্ত্রের নাম দিলেন ‘অস্তিমান সমাজতন্ত্র’। আবার কেউ কেউ বললেন, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিকতার ফলে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রাণ হারিয়ে ফেলেছিল। কারো কারো মতে, যেসব দেশে সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়েছে, সেসব দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো আদর্শচ্যুত হয়ে সংশোধনবাদী হয়ে গিয়েছিল বলে এ পরিণতি নেমে এসেছে। আবার কেউ কেউ বললেন, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যথাযথ প্রণোদনার ঘাটতি ছিল বলেই এমনটি হয়েছে।
Paul A Baran বলেছিলেন, অনুন্নত দেশের সমাজতন্ত্র ‘অনুন্নত সমাজতন্ত্র’। কারণ অনুন্নত দেশে সমাজতন্ত্রের উপযোগী উৎপাদিকা শক্তি বিকশিত হয় না। প্রশ্ন উঠতে পারে, সোভিয়েত ইউনিয়নে উৎপাদিকা শক্তির কি বিকাশ হয়নি? অবশ্যই সোভিয়েত ব্যবস্থায় উৎপাদিকা শক্তির যথেষ্ট বিকাশ হয়েছিল, তবে তা টেকসই হতে পারেনি। আমরা জানি, সোভিয়েত ইউনিয়নই প্রথম মহাকাশযান ‘স্পুটনিক’ পাঠায়। তাছাড়া জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় দেশটির অনেক উন্নয়ন ঘটে। কিন্তু এই উন্নয়ন অব্যাহত রাখার জন্য সঠিক ধরনের প্রণোদনা সোভিয়েত ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে পারেনি। ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পর লেনিনই বলেছিলেন, ‘Never was the condition of the proletariat so bad as under the dictatorship of the proletariat.’ শ্বেত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ এবং যুদ্ধসাম্যবাদের নীতি নতুন সোভিয়েতে খুবই দুরবস্থার সৃষ্টি করেছিল। এ কারণে লেনিন নয়া-অর্থনৈতিক নীতিরও প্রবর্তন করেছিলেন। ফলে কৃষকদের মধ্যে উৎপাদন বাড়াতে বেশ জোরালো প্রবণতার সৃষ্টি হয়। এছাড়া বিপ্লবের অব্যবহিত পর বিপ্লবী ক্যাডার এবং জনগণের মধ্যে দেশ গড়ার উত্সাহ দেশের অগ্রগতিকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যায়। স্টালিন বলপূর্বক কৃষিতে যৌথায়নের নীতি গ্রহণ করলে আবারো বিপর্যয় দেখা দেয়। কুলাক বা ধনী কৃষকবিরোধী অভিযান কৃষি উৎপাদনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। তারপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে দেশপ্রেমের প্রেরণায় সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আনলেও শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। সোভিয়েত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, কৃষি ব্যবস্থা কখনই সাবলীল হতে পারেনি। অতিকেন্দ্রায়িত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সহায়ক ছিল না। অন্যদিকে বৈপ্লবিক উচ্ছ্বাস ও যুদ্ধজনিত দেশপ্রেমের জোয়ার যতই থিতিয়ে আসতে থাকে, ততই উৎপাদনে প্রণোদনার বিষয়টি একটি সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। অর্থাৎ শেষ বিচারে নিকিতা ক্রুশ্চেভ যেমনটি ভেবেছিলেন যে, তার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা পশ্চিমের পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধির বিচারে শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পরাজিত করতে সক্ষম হবে, সেটি আসলে সম্ভব হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা উৎপাদিকা শক্তিকে উচ্চতর স্তরে নিয়ে যেতে পারেনি, এর মূল কারণ সঠিক প্রণোদনা ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে না পারা। অবশ্য প্রণোদনার সমস্যা সোভিয়েত ও পূর্ব ইউরোপীয় অনেক অর্থনীতিবিদই বুঝতে পেরেছিলেন। তাদের মধ্যে Eugen Varga, Ota Sik, Janos Kornai অন্যতম। তাহলে দেখা যাচ্ছে, সমস্যাটি ছিল মূলত সঠিক প্রণোদনা ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে না পারা এবং প্রণোদনার হাতিয়ারকে ব্যবহার করে উৎপাদিকা শক্তিকে বিকশিত করতে না পারা। অনগ্রসর উৎপাদিকা শক্তির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে অগ্রসর সমাজতন্ত্রের উৎপাদন সম্পর্কের কথা ভাবা যায় না। কারণ সমাজ পরিবর্তন সম্পর্কে মার্ক্সের ঐতিহাসিক বস্তুবাদী ব্যাখ্যাটি ছিল পুরনো উৎপাদন সম্পর্ক যখন উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের ফলে অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখনই প্রয়োজন হয় নতুন উৎপাদন সম্পর্কের। কাজেই দেখা যাচ্ছে, বস্তুগত বিকাশের ওপর নির্ভর করে উৎপাদন সম্পর্কের গুণগত বিকাশ ঘটে। এটাই মার্ক্সবাদের অমোঘ সত্য। একে অস্বীকার করে সামাজিক সম্পর্কে পরিবর্তনের কথা ভাবা যায় না।
সোভিয়েত শিবিরে কমিউনিস্ট পার্টির শাসনের অবসান হলেও একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়নি গণচীনে। চীনে কী করে সমাজতন্ত্র নির্মাণ করা যায়, তা নিয়ে বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে প্রাণবন্ত বিতর্ক হয়েছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নীতি-কৌশলে যে বিবর্তন ঘটেছে, সে সম্পর্কে দেং শিয়াও পিং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বাদশ কংগ্রেসে আলোকপাত করেছেন। এই কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ১ সেপ্টেম্বর ১৯৮২ সালে। এর আগে ১৯৭৮ সাল থেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি মুক্তদ্বার নীতি এবং সংস্কারের কর্মসূচি হাতে নেয়। দেং শিয়াও পিং তার ভাষণে বলেছেন, সপ্তম কংগ্রেসের পর এই কংগ্রেস হলো পার্টির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৫ সালে কমরেড মাও জে দংয়ের সভাপতিত্বে সপ্তম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। পার্টি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে এটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেং শিয়াও পিং-এর মতে, এ কংগ্রেসে সঠিক কর্মনীতি প্রণীত হয় এবং পার্টির অভ্যন্তরে যেসব ভ্রান্ত চিন্তা ছিল, সেগুলোকে অতিক্রম করা সম্ভব হয়। এর ফলে পার্টি উপলব্ধির দিক থেকে মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদ এবং মাও জে দংয়ের চিন্তাধারার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়। সপ্তম কংগ্রেসে জাতীয় পর্যায়ে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ের ভিত্তি রচিত হয়। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির অষ্টম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৬ সালে। এই কংগ্রেসে উৎপাদিকা শক্তির ব্যক্তিমালিকানার অবসান ঘটিয়ে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয় এবং জাতির সামনে সর্বাত্মক সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের কর্মপন্থা উপস্থাপিত হয়। দেং শিয়াও পিং পার্টির এ লাইনকে সঠিক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এ কথাও স্বীকার করেছেন যে, পার্টি সেই সময় আদর্শগতভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না। ফলে অনেক সঠিক কর্মনীতি এই কংগ্রেসে উত্থাপিত হওয়া সত্ত্বেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরো বলেছেন, সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণে অষ্টম কংগ্রেসের পর অনেক সাফল্য অর্জিত হওয়া সত্ত্বেও মারাত্মক ধরনের বিপর্যয়ের ঘটনাও ঘটেছে। এই মারাত্মক বিপর্যয় কী ছিল, এটি তিনি তার ভাষণে খোলাসা করেননি। পশ্চিমা বিশ্লেষকরা এই বিপর্যয়কে চেয়ারম্যান মাওয়ের Great leap forward policy-র সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখেন। তবে এ ব্যাপারে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি কখনই খোলাখুলি কিছু বলেনি। এর পর ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত পুরো দশক ধরে সাংস্কৃতিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। এ বিপ্লবে মূল উদ্যোক্তা ছিলেন, চেয়ারম্যান মাও নিজেই। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বর্শাফলক নিক্ষিপ্ত হয়েছিল পুঁজিবাদের পথগামীদের বিরুদ্ধে। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বড় রকমের তাত্ত্বিক আবেদন ছিল, বিশেষ করে ছাত্র তরুণদের মধ্যে। একপর্যায়ে চেয়ারম্যান মাও স্বয়ং হেড কোয়ার্টারের বিরুদ্ধে তোপ দাগার আহ্বান জানান। সেই দশ বছরে অনেক ট্র্যাজিক ঘটনাও ঘটেছে। পার্টির অনেক ত্যাগী কমরেডকে যথেষ্ট দুঃখ-দুর্দশা পোহাতে হয়েছে। নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, কমিউনিস্ট রাষ্ট্রটির ভিত কেঁপে উঠেছিল। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ডামাডোলে অর্থনৈতিকভাবে চীনের প্রভূত ক্ষতি হয়। এমনকি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অনেক ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। তবে চেয়ারম্যান মাও এসব বাড়াবাড়ির জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী ছিলেন না। তিনি দক্ষ প্রধানমন্ত্রী জৌ এন লাইয়ের সহযোগিতায় বাড়াবাড়ির রাস টেনে ধরতে প্রয়াস পেয়েছিলেন। একপর্যায়ে সাংস্কৃতিক রিপ্লবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পার্টির নেতাদের উদ্দেশে, যাদের মধ্যে তাঁর স্ত্রীও ছিলেন, বলেছিলেন— Unite, don’t split, don’t conspire, be open and above board. মাওয়ের মৃত্যুর পর বহুল আলোচিত চার কুচক্রীর পতন ঘটে। স্থিতিশীলতা ও অগ্রযাত্রার পথে চীন আবার ঘুরে দাঁড়ায়। চীনা জাতির এটি একটি গৌরবজনক বৈশিষ্ট্য যে, তারা বিপর্যয়ের পর ঘুরে দাঁড়াতে জানে এবং আবারো ঐক্যবদ্ধ হয়।
দেং শিয়াও পিং দ্বাদশ কংগ্রেসে দেয়া তার ভাষণে বলেছেন, আমাদের পার্টি চীনের সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ সম্পর্কে গভীরতর উপলব্ধিতে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। এর সূত্রগুলো স্পষ্ট হয়েছে। দ্বাদশ কংগ্রেসে সমাজতান্ত্রিক আধুনিকায়নের যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে সেগুলো পার্টি, সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য, দেশ এবং সব জাতি-গোষ্ঠীর জনগণের জন্য সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। তিনি আরো বলেন, আধুনিকায়নের কর্মসূচি বাস্তবায়নে চীনের বাস্তবতার পথ ধরে এগোতে হবে। চীন বিপ্লব ও বিনির্মাণে বিদেশী রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে। কিন্তু কখনই কোনো কিছু যান্ত্রিকভাবে নকল করবে না, অন্ধভাবে বিদেশী অভিজ্ঞতা ও মডেল অনুসরণ করলে চীন পথ হারিয়ে ফেলবে। চীনের পথ হলো, চীনা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সমাজতন্ত্র। দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সারসংকলন করে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।
চীনা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সমাজতন্ত্র আসলে কী? বিপ্লব-পূর্ব চীন ছিল একটি আধা ঔপনিবেশিক, আধা সামন্ততান্ত্রিক সমাজ। চীনে ব্যাপক গণদারিদ্র্য ও নিদারুণ শোষণ ছিল। চীনের উৎপাদিকা শক্তি ছিল অত্যন্ত অবিকশিত। এই উৎপাদিকা শক্তি একটি পুঁজিবাদী সমাজ গঠনেরও উপযোগী ছিল না। মার্ক্সবাদী বিজ্ঞান বলে, সমাজবিন্যাস সমাজের বস্তুগত ভিত্তিকে এড়িয়ে বাস্তবায়ন হতে পারে না। সুতরাং উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের জন্য চীনকে সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিতে হয়েছে। কমিউন ব্যবস্থায় চীনের কৃষি স্থবির হয়ে পড়েছিল। একটি ‘বিশাল লোহার হাঁড়িতে রান্না করে সবাই মিলে ভাগ করে খাওয়ার নীতি’ কৃষিতে প্রণোদনার অভাব সৃষ্টি করেছিল। কমিউন ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে উৎপাদন দায়িত্বপ্রথা প্রবর্তিত হলো। এই ব্যবস্থায় কৃষক জমিতে উৎপাদন করার পর রাষ্ট্রীয় কর পরিশোধ করে উদ্বৃত্ত অংশ বাজারজাত করতে পারে। ফলে কৃষকদের মধ্যে উৎপাদন বৃদ্ধির বিশাল প্রণোদনা সৃষ্টি হয়। কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন সূচিত হয়। কৃষকরা লাভের আশায় উচ্চমূল্য ফসল উৎপাদন করতে শুরু করে। ফলে কৃষকদের মধ্যে সমৃদ্ধি আসে। সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম ছিল, চীনের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশী বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া। ফলে বিদেশী বিনিয়োগ আসতে শুরু করে। বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে মার্ক্সবাদীদের মধ্যে নানা ধরনের আপত্তি লক্ষ করা যায়। সঠিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বিদেশী পুঁজিকে ব্যবহার করা গেলে প্রযুক্তি হস্তান্তর, বিনিয়োগ পুঁজির অভাব এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একটি দেশ চমৎকারভাবে লাভবান হতে পারে, এ ব্যাপারে অন্ধ আবেগের সুযোগ নেই। মূল কথা হচ্ছে, এর ওপর জাতির স্বার্থ প্রণোদিত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কতটা বজায় রাখা যাবে। চীন এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাবধানতার পরিচয় দিয়েছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রভূতভাবে বিদেশী পুঁজি ও প্রযুক্তি আসার ফলে চীনের উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের সুযোগ বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। তবে যেসব অঞ্চলে বিদেশী পুঁজি এসেছে, সেসব অঞ্চল বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত সমৃদ্ধি ঘটতে থাকে। সেই তুলনায় বিশাল চীনের সমুদ্র উপকূল থেকে দূরবর্তী এলাকাগুলো সেভাবে সমৃদ্ধ হতে পারেনি। তবে অনুন্নত এলাকা থেকে উন্নত এলাকাগুলোয় শ্রমিকদের অভিবাসন দরিদ্র পরিবারগুলোর মধ্যে আয় পৌঁছানোর সুযোগ করে দেয়।
দেং শিয়াও পিং ১২ জানুয়ারি ১৯৮৩ রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা কমিশন, রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কমিশন এবং কৃষি বিভাগের জ্যেষ্ঠ কমরেডদের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, গ্রামে এবং শহরে কিছু লোককে অন্যদের আগে ধনী হতে দিতে হবে। মানুষ কঠোর শ্রম করে যদি সমৃদ্ধিশালী হয়, তাহলে তার মধ্যে কোনো অন্যায় থাকতে পারে না। কিছু মানুষ, এমন কিছু অঞ্চল যদি সবার উন্নয়ন সমর্থনে প্রথমে সম্পদশালী হয়, তাহলে এটা একটা ভালো কাজ হবে। নতুন এই পথ পুরনো পথের চেয়ে শ্রেয়। কৃষিতে তিনি ব্যাপকভাবে উৎপাদন দায়িত্বপ্রথা বিস্তৃত করে দেয়ার ধারণা তুলে ধরেন। তার দৃষ্টিতে চীনা বৈশিষ্ট্য-পূর্ণ সমাজতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে হলে জাতীয় সমৃদ্ধি, জনগণের কল্যাণ ও সুখ নিশ্চিত করতে হবে এবং এটাই হলো সবক্ষেত্রে সঠিক কাজটি করা হচ্ছে কিনা তার মাপকাঠি। দেং শিয়াও পিং এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, (এপ্রিল ২৯, ১৯৮৩) In a socialist country, a genuinely Marxist ruling party must devote itself to developing the productive forces and, with this as the foundation, gradually raise the people’s living standards. This means building civilization with a high material standard. We ignored the development of the productive forces for a long time in the past, and so we are paying special attention to the building of a high standard of material civilization.
দেং শিয়াও পিং-এর বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, চীন উৎপাদিকা শক্তির দিক থেকে অনগ্রসর থেকে অনুন্নত সমাজতন্ত্র গড়তে চায়নি। এ প্রসঙ্গে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজফফর আহমদ-সম্পর্কিত একটি কাহিনী প্রণিধানযোগ্য। ১৯৩০-এর দশকে মুজফফর আহমদ পূর্ববঙ্গে এক কৃষক সম্মেলনে ধোপদুরস্ত প্যান্ট-শার্ট পরে উপস্থিত হয়েছিলেন।
এজন্য তাকে একজন প্রশ্ন করেছিলেন, কৃষকরা তো আপনার মতো পোশাক পরতে পারে না। তাহলে একজন কমিউনিস্ট হয়ে এ রকম পোশাক কেন আপনি পরেছেন? এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, আমরা কমিউনিস্টরা এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা চাই, যেখানে সব কৃষক ভালো পোশাক পরতে পারবেন। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে পুঁজিবাদপন্থীরা উপহাস করে বলেন, সমাজতন্ত্র হলো দারিদ্র্যের বণ্টন। কিন্তু চীনে এখন সমাজতন্ত্র নিয়ে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, তার লক্ষ্য একটি সমৃদ্ধ ও সুখী সমাজ গঠন। চীনা নেতারা চীনের দরজা খুলে দিয়েছেন। এর নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কেও তারা সচেতন। তাই তো তারা বলেছেন, জানালা খুলে দিলে তার মধ্য দিয়ে সুবাতাস যেমন আসে, তার সঙ্গে কিছু কীটপতঙ্গও আসে। বর্তমান চীনকে বেশকিছু সামাজিক বিচ্যুতির বিরুদ্ধেও লড়তে হচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুকঠিন লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। এ লড়াইয়ে ছোট দুর্নীতিবাজ বা বড় দুর্নীতিবাজ কাউকেই রেহাই দেয়া হচ্ছে না। ছোট দুর্নীতিবাজরা হলো মাছির মতো আর বড় দুর্নীতিবাজরা বাঘের মতো।
চীনে মাও জে দং, দেং শিয়াও পিং এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ সবাই জ্ঞানসাধকদের এবং বৃদ্ধি-বৃত্তির চর্চাকারীদের সামাজিক গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। মুক্তদ্বার নীতির পর হাজার হাজার চীনা ছাত্রছাত্রীকে পাশ্চাত্যের উন্নত দেশে জ্ঞানার্জনের জন্য পাঠানো হয়েছে। চীনা সরকার এ ধরনের স্কলারদের মধ্যে যারা দেশে ফিরে এসেছেন এবং যারা বিদেশে থেকে গেছেন, তাদের সবাইকে এক চোখেই দেখে। কারণ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হলে বিদেশে অবস্থান করে একজন স্কলার নিজ দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন। এ রকম বিদেশে অবস্থানকারী দেশপ্রেমিক স্কলারদের রাষ্ট্রীয় সমর্থন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শি জিনপিং। চীন অন্তত তিনটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ করছে; এগুলোকে হার্ভার্ড, ক্যামব্রিজের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় চীন। এরই মধ্যে চীনের ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বপরিসরে উচ্চস্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষার প্রতি চীনের যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, তার লক্ষ্য শেষ পর্যন্ত চীনের উৎপাদিকা শক্তির তথা Productive Force-এর বিকাশ। এর মাধ্যমে চীনে উন্নততর সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। চীন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃস্থানীয় ভূমিকার প্রশ্নে কখনই আপস করেনি। উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাজার প্রণোদনার ব্যবহার সমাজতন্ত্রের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি বলে বিবেচিত হতে পারে না। চীন বহুলাংশে দারিদ্র্যকে জয় করেছে। বিপুল অর্থনৈতিক অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। চীন এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি। চীনের এ অর্জনের পেছনে চীনা বৈশিষ্ট্যের সমাজতান্ত্রিক নীতির অবদান স্বীকার করতেই হবে।
লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের ছাত্রনেতা






