আজ ঢাকায় আসছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ২০১৩ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এবারই প্রথম বাংলাদেশে আসছেন শি জিনপিং। এরই মধ্যে শি জিনপিং নিজেকে ও নিজ দেশকে বিশ্বরাজনীতিতে শীর্ষস্থানীয় জায়গায় অধিষ্ঠিত করেছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসেবে তিনি দেশে-বিদেশে সর্বজন শ্রদ্ধেয়। ক্ষমতায় উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে দল ও সরকারে থাকা তার ঘনিষ্ঠজনরা তাকে অনুসরণ শুরু করেন, যাকে বলা যেতে পারে ‘ক্লাট ফলোয়িং’। মাও জে দংকে ঘিরে যে ধরনের ‘ক্লাট’ তৈরি হয়েছে, তেমনটি করতে মানুষ তাকে ‘বিগ ড্যাডি’ নামে ডাকতে শুরু করে। কিন্তু তাকে ঘিরে এ ধরনের ‘ক্লাট’ সংস্কৃতি গড়ে উঠতে দেননি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি যে একজন পরিপক্ব বা পরিণত নেতা, এটি তারই নিদর্শন।

১৯৭৫ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন হয়। এর পর থেকে বাংলাদেশের একজন খুব ভালো বন্ধু হয়ে রয়েছে চীন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল চীন। অথচ দেশটি এখন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা প্রয়োজনীয়তার (ডিফেন্স রিকোয়্যারমেন্টস) ক্ষেত্রে প্রধান অংশীদার এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও প্রধান অংশীদার। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে আগ্রহী। ১৯৭১ সালে চীনের বাংলাদেশবিরোধী ভূমিকা এবং বাংলাদেশের জাতিসংঘের সদস্যপদ পাওয়ার পথে দেশটির ভেটো দেয়ার বিষয়ে কখনো প্রশ্ন তোলেনি কোনো রাজনৈতিক দল।

সবসময় একটা অনুমান ছিল যে, বিএনপির সঙ্গে চীনের বন্ধুত্ব একটু বেশি, কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক স্থাপন হয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়। এজন্য চীন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে বৈধতা দিলে এবং ২০১৪ সালের মে মাসের হাইপ্রোফাইল সফরে শেখ হাসিনাকে বেইজিংয়ে সাদরে গ্রহণ করলে বিএনপি বড় ধাক্কা খায়, কারণ ওই সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তখনো নরেন্দ্র মোদির নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেনি এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদাররা নতুন নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছিল।

এভাবে চীন প্রথমবারের মতো দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটিকে কিছুটা হলেও সাপোর্ট দেয়। এর মাধ্যমে এটা পরিষ্কার হয় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে চীন আগের পথ থেকে সরে এসেছে। শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে দেশটি ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনকে বৈধতা দেয় বলে ধরা হয়। চীনের এ পরিবর্তনকে ধরা যেতে পারে বিএনপির ‘এক চীন নীতি’র বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে। বিএনপি তাইওয়ানকে ঢাকায় বাণিজ্যিক কার্যালয় খোলার অনুমতি দিয়েছিল, যার মাধ্যমে পরবর্তীতে তাইওয়ান কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে। এজন্য জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন দেয়াকে নিজ কৌশলগত স্বার্থ হাসিলের সুযোগ মনে করে চীন।

বেইজিং সফরে যাওয়ার শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত চীনা কূটনীতির জয় বলা যায়। ২০১০ সালে শেখ হাসিনা বেইজিং সফর করেন। তবে কেবল নতুন দিল্লির আস্থা অর্জন করার পরই ওই সফরে যান তিনি এবং অনেক সূত্রের দাবি মোতাবেক ওই সফরের যৌথ ঘোষণাপত্রে এমন কিছু অনুচ্ছেদ ছিল, যেগুলোয় বাংলাদেশ সই করার আগে নতুন দিল্লির সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন পড়েছিল। ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের পর ঢাকার দুর্বল আন্তর্জাতিক অবস্থানের সুযোগ নেয় চীন এবং বিভিন্ন কৌশলগত প্রকল্প যেমন সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো জোরদার করাসহ বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ উন্নয়নে চীনের যুক্ত থাকা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়।

শেখ হাসিনার সফরের সময় যে কৌশলগত সুবিধা আদায় করা গেছে, তা দৃঢ় করতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে যত দ্রুত সম্ভব ঢাকা সফরে পাঠানোর চেষ্টা করছিল বেইজিং। পরিবর্তিত ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তা আর হয়নি। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী ঢাকা সফর করেন যথাক্রমে ২০১৪ সালের জুনে এবং ২০১৫ সালের জুনে এবং নিশ্চিত করেন যে, শেখ    হাসিনার চীন সফরে বাংলাদেশ যে কৌশলগত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা যেন অপূর্ণ থাকে। শেখ হাসিনার বেইজিং সফরে দেয়া যৌথ ঘোষণায় যেসব ইস্যু নিয়ে ভারতের আপত্তি ছিল, সেগুলো থেকে সরে আসে ঢাকা।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকা আসছে শুধু ভারতের প্রভাব কমাতে নয়, বরং চীনের কৌশলগত স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে এ অঞ্চলের মৌলিক পরিবর্তনের উদ্দেশ্যও রয়েছে। ২০১৪ সালের মে মাসে ভারতে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় চীনার আধিপত্য রোধে দুই দেশই কাজ করতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। কংগ্রেস সরকারের সময় দেশ দুটির মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই তিক্ত সম্পর্ক ছিল, কিন্তু চীনকে সামনে রেখে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মোড় নিয়েছে। ২০০২ সালে সংঘটিত গুজরাট দাঙ্গার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে। কিন্তু এ নরেন্দ্র মোদিকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও সম্মানিত নেতা হিসেবে উঠে আসতে পথ তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের এ পুনর্মিলন নিয়ে সচেতন রয়েছে চীন। এতে জাপান যোগ দিলে চীনবিরোধী পাল্লা আরো ভারী হবে। ২০০৭ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসেন জাপানের জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। তখনই তিনি বাংলাদেশে তৈরি হওয়া সুযোগকে দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের আধিপত্য বিস্তার রোধের কৌশল হিসেবে দেখেছিলেন। এজন্য তিনি তখন প্রবর্তিত করেন কুয়াডরিল্যাটরাল সিকিউরিটি ডায়ালগ (কিউএসডি)। দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রতিরোধে এ উদ্যোগ নেয়া হয়। কিউএসডির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছিল এবং ভারতও চীনের বিপরীতে নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষাকারী হিসেবে এটিকে গ্রহণ করে। অস্ট্রেলিয়া এতে যোগ দেয়, আবার কিছু সময়ের জন্য বের হয়ে যায়। এখন আবার কিউএসডিতে ফিরে এসেছে অস্ট্রেলিয়া।

প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ধরে নেন চীনবিরোধী কিউএসডির নৌবন্দরের জন্য বাংলাদেশ একটি আদর্শ জায়গা হতে পারে, কারণ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশটি আন্দামান সমুদ্রে চীনা প্রভাবের বিরুদ্ধে সামরিক বেজ ও চোরাগোপ্তা হামলার জন্য থার্ড পার্টি প্লাটফর্ম দিতে পারে এবং তা আঞ্চলিক ক্ষমতাধর দেশ ভারত, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের সরাসরি এবং প্রকাশ্য সম্পৃক্ততা ছাড়াই। এ দেশগুলো মার্কিন সামরিক অভিযানের সঙ্গে জোট হতে রাজি নয়। তিনি আরো ধারণা করেন, বাংলাদেশে কিউএসডি উদ্যোগের প্রভাব বৃদ্ধি পাবে, কারণ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভের জন্য মরিয়া হয়ে রয়েছে। শেখ হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর পরই ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন না করে শিনজো আবে তাকে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানান। শেখ হাসিনার এ সফরের চার মাসের মধ্যেই তিনি ঢাকা সফরে আসেন। এটি ছিল পারস্পরিক সফর। বাংলাদেশে জাপান যে নিজ নিরাপত্তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট সুযোগ দেখছে, এ সফর তা সামনে নিয়ে আসে। সর্বশেষ যে জাপানি প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছেন তিনি ইয়োশিরো মারি, ২০০০ সালে। জাপান জাইকার মাধ্যমে বাংলাদেশকে ৩ বিলিয়ন ডলার সফট লোন দেয়ার প্রস্তাব দেয় মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে। এটি ছিল সোনাদিয়ায় চীনা প্রস্তাবকে কাউন্টার দেয়ার জন্য। এ প্রস্তাবের মধ্যে ছিল ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ আরো অর্থনৈতিক সুযোগ।

২০১৪ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও শেখ হাসিনার মধ্যকার সর্বশেষ সামিট পর্যায়ের বৈঠকের তুলনায় এবার একটি ভিন্ন পরিবেশে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকা সফরে আসছেন। বাংলাদেশ পক্ষের সূত্র অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরকালে বাংলাদেশ ২০ বিলিয়ন ডলারের ২৫টি প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা ও অনুমোদনের জন্য ঠিক করে রেখেছে। এছাড়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এমন ১৩টি প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, যেগুলোর জন্য বাংলাদেশ এরই মধ্যে চীনের সহায়তা চেয়েছে; কিন্তু ওই পক্ষ থেকে কোনো জবাব পায়নি। বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য থাকবে কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে টানেল তৈরিতে চীনা সহযোগিতা নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী গণমাধ্যমের কাছে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তারা যে প্রকল্পগুলোর জন্য অনুরোধ করেছেন; সেগুলোয় অর্থায়নের ক্ষেত্রে চীন তেমন আগ্রহ দেখায়নি। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও একই ধরনের ইঙ্গিত এসেছে। বাংলাদেশ সরকারের সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ আশা করবে এবং সম্ভবত চীনা প্রতিনিধি দলের কাছে জোর প্রচেষ্টা চালাবে এ প্রকল্পগুলোর বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে।

বাংলাদেশ সমুদ্র মামলায় আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমার ও ভারতের বিরুদ্ধে জয় পেয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীন আগ্রহ দেখিয়েছিল। চীন একটি প্রস্তাব বাংলাদেশ সরকারকে দিয়েছে। এটি নিয়ে দেড় বছর ধরে আলোচনা চলছে। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে দেশটি ইঙ্গিত দিয়েছে যে, শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনায় চীনা প্রেসিডেন্ট এ প্রস্তাবটির প্রসঙ্গ আনতে পারেন। বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ উন্নয়নে দেশটির আগ্রহ একটি কৌশলগত ইস্যু, যেমনটা দেশটি সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। ভারতের উদ্বেগের কারণে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র প্রকল্পের মতো এটিও হিমঘরে চলে যেতে পারে।

চীনা প্রেসিডেন্টের এ সফরের মেয়াদ দুদিন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে তার অবস্থান হবে ২৩ ঘণ্টার। ঢাকা থেকে তিনি নতুন দিল্লিতে যাবেন গোয়ায় অনুষ্ঠিত ব্রিক সম্মেলনে যোগ দিতে।

বিপরীত দিকে, সরকারি পর্যায়ে নতুন দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক আগে কখনো এত ভালো ছিল না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাশ্মীরে উরি আক্রমণের জন্য পাকিস্তানের নিন্দা করে নরেন্দ্র মোদির কাছে চিঠি দিয়েছেন, যা এ সুসম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সার্ক সম্মেলনে যোগ না দেয়ার ভারতের ঘোষণার পর বাংলাদেশও এতে যোগ দেবে না বলে জানিয়ে দেয়। তবে সরকারি পর্যায়ে দারুণ সম্পর্ক থাকলেও বাংলাদেশের জনগণের কাছে এখন ভারতের গ্রহণযোগ্যতা যেকোনো সময়ের তুলনায় কম।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো, বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি কূটনৈতিক বার্তা প্রেরণ করা এবং তা হলো, ২০১৪ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেইজিং সফরে দেখানো উষ্ণতার পর সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো প্রকল্প বা বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ উন্নয়নে চীনকে অনুমতি দেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ যে শীতলতা দেখাচ্ছে, তাতে চীন হতাশ। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে শি জিনপিং সরেজমিন দেখতে চাইবেন কিউএসডি উদ্যোগের ব্যাপারে বাংলাদেশের সমর্থন কতটুকু।

কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর এবারই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক কিছু গুরুতর সমস্যায় পড়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈধতা ইস্যুকে কেন্দ্র করে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে তৈরি হওয়া দুর্বলতাকে এ অঞ্চলের ক্ষমতাধর দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যবহার করছে। সংশ্লিষ্ট বিষয় থেকে এ সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলেছে এটা মনে করে যে, তারা এ দেশগুলোকে নিজ সুবিধার জন্য ব্যবহার করতে পারবে। চীনকে বলেছে নতুন সরকারকে সমর্থন দিলে তারা চীনের কৌশলগত স্বার্থ দেখবে, অন্যদিকে ভারতকে বলেছে, আগের কংগ্রেস সরকারের মতো মোদি সরকার সমর্থন না দিলে তারা চীনের দিকে ঝুঁকবে। এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে, সে ব্যবস্থা নিয়েছে ভারত।

বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতের সমর্থনের প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান ইঙ্গিত দিয়েছে যে, বাংলাদেশে আগাম নির্বাচনের জন্য কী করতে হবে, তা ভারত সিদ্ধান্ত নেবে, আর আওয়ামী লীগ সরকার আগাম নির্বাচন চায় না। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দেখতে পাবেন শেখ হাসিনার বেইজিং সফরের পর অনেক পানি গড়িয়েছে। কৌশলগত স্বার্থের দিক থেকে চীনকে খুশি করার মতো কোনো অবস্থানে এখন আর বাংলাদেশ নেই।

সীমাবদ্ধতার কারণে কিউএসডি উদ্যোগে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ যোগ দিতে পারে, এ বিষয়টিকে চীন গুরুত্ব দিচ্ছে বলেই ঢাকা সফরে আসছেন শি জিনপিং। এ বিষয়ে চীন তাদের অবস্থান অর্থাৎ অসমর্থনের বিষয়টি পরিষ্কার করবে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য চীন যে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য খুবই প্রয়োজন, তা আগামীতে শ্লথ হয়ে যেতে পারে।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিএনপি নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন। সর্বশেষ চীনের হাইপ্রোফাইল সফরকারী ব্যক্তি দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল চ্যাং ওয়ানকুয়ান, যিনি জুনে সফরে এসেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারকে খুশি রাখতে বিএনপি নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। চীনের উদ্যোগে খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাক্ষাৎ আরেকটি বিষয়ে বার্তা দিচ্ছে, আর তা হলো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ও বেইজিংয়ের মধ্যকার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না।

 

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত