আমরা থেমে থাকতে পারব না। আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তবে কোথা থেকে আমরা শুরু করেছি, সেটি কিছুটা বলা প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতি বা সমস্যা আসলে আগের শাসনামল থেকে পাওয়া একটি উত্তরাধিকার, অর্থাৎ সেই রেজিমের রেখে যাওয়া প্রভাব বা কাঠামোর ধারাবাহিকতা। এর সঙ্গে গত ১৮-২০ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিষয়গুলো আছে। এর বাইরে রয়েছে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি। সব মিলিয়ে এটি একটি ত্রিমুখী সংকট। এ সময়ে আমরা ক্ষমতায় এসেছি। এর মধ্যে আবার দুই-তিন মাসের ব্যবধানে বাজেটের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে, এটিও আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। কম সময়ের মধ্যে সীমিত সম্পদ নিয়ে আমাদের একটি বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে। বাস্তবতা হলো এখানে রিসোর্সের ঘাটতি অত্যন্ত তীব্র। একই সঙ্গে বাইরের চাপ, যেটা সবাই বলেছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে আগে যে রুল-বেজড অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিল, তা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। ট্যারিফ ও প্রটেকশনিজম সামনে চলে এসেছে। যারা মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বলেছিল, তারাই এখন সুরক্ষামূলক নীতির দিকে ঝুঁকছে। অর্থাৎ এক ধরনের ট্যারিফ ওয়াল আবার তৈরি হচ্ছে। যে ট্যারিফ ভাঙার জন্য আমরা বহু বছর চেষ্টা করেছি, বৈশ্বিক অর্থনীতিকে একীভূত করার চেষ্টা করেছি, সেই প্রক্রিয়া আবার পিছিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে আবার যুক্ত হয়েছে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
আমি আবারো বলছি, আমরা থেমে থাকতে পারব না। আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতেই হবে। একসময় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিশ্বে একটি ভালো অবস্থানে ছিল। যদিও সাময়িকভাবে কিছুটা পতন ঘটেছে, তবে আমি হতাশ নই। আমি বিশ্বাস করি, আমরা এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারব।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তা নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। অন্যদিকে বিএনপি সর্বশেষ যখন ক্ষমতায় ছিল তখন ছিল ৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। সেখান থেকে আজকে আমরা দাঁড়িয়েছি ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। এটা বড় পতন।
দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমছে, ঋণ গ্রহণ কমছে, মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমছে এবং কর্মসংস্থানও কমছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবণতা নিম্নমুখী। আমাদের চ্যালেঞ্জ এ নিম্নমুখী প্রবণতা আগে থামাতে হবে। তারপর ধীরে ধীরে তা পুনরুদ্ধার করে উন্নতির পথে ফিরিয়ে নিতে হবে। আমরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছি।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রিসোর্স মোবিলাইজেশন। একসময় ট্যাক্স-জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১০-১১ শতাংশ ছিল, এখন তা ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বিশ্বে এক্ষেত্রে আমরা নিম্নতম দেশের মধ্যে রয়েছি। আর দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা বর্তমানে সর্বনিম্ন অবস্থানে। যেখানে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত কম, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই রাজস্ব সক্ষমতা কমে যায়। ফলে উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণের সক্ষমতাও হ্রাস পায়। বর্তমানে এ আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে উন্নয়ন কার্যক্রম ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি—উভয়ই চাপে পড়েছে। ফলে শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, নাগরিক সেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আমাদের ট্যাক্স-জিডিপি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ যেটা আছে, এখান থেকে ওপরে যাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) যে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, বিশেষ করে পলিসি ও এক্সিকিউশন আলাদা করার উদ্যোগ, সেটি বাস্তবে কার্যকর রূপ পায়নি। বরং এটি অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় রয়েছে। এ ধরনের অসম্পূর্ণ সংস্কার নতুন সমস্যা তৈরি করে। প্রথমত, এটা আগে আনডু করতে হবে, তারপর আবার রিফর্ম করতে হবে। এ বিলটি আমরা সংসদে স্থগিত করেছি এবং এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আরো পর্যালোচনা করে দ্রুততম সময়ে উন্নয়নমূলক সুপারিশ দেবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী ট্যাক্স নীতিকে অবশ্যই পৃথক্করণ (বাইফারকেশন) করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এ ট্যাক্স নীতি কারা তৈরি করবে। যদি আবারো উচ্চ পর্যায়ের আমলারা একত্রে নীতিনির্ধারণ করেন, তাহলে এ সংস্কার উদ্যোগের কার্যকারিতা থাকে না। তাই নীতি পর্যায়ে যারা ট্যাক্স পলিসি প্রণয়ন করবেন, তাদের অবশ্যই বাংলাদেশের বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা থাকতে হবে। অর্থাৎ তারা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট গভীরভাবে বুঝবেন—বাংলাদেশের ডিএনএ বুঝবেন।
তাই নীতি নির্ধারণে কারা থাকবেন, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আমরা গুণগত পরিবর্তন আনতে চাই। এসব নীতি ও সুপারিশ সরাসরি অর্থ মন্ত্রণালয়ে যাবে, মাঝখানে কোনো স্তর থাকবে না। ট্যাক্স নীতিকে ব্যুরোক্র্যাটিক জটিলতার মধ্যে আটকে রাখতে চাই না।
অন্যদিকে জনগণের মধ্যে কর দেয়া নিয়ে অনীহা রয়েছে। ফলে করদাতা সীমিত, আর তাদের ওপরই বারবার চাপ বাড়ছে। এতে তারা বিনিয়োগ ও মূলধন বাড়াতে পারে না, উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় ট্যাক্স নীতিতে পরিবর্তন আসবে।
আরেকটি বিষয় হলো ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পেতে হলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে যথাযথ বিনিয়োগ দরকার। আমরা এ খাতগুলোতে বরাদ্দ বাড়াচ্ছি, যা আগামী চার-পাঁচ বছরে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাবে। নির্বাচনী ইশতাহারে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য রয়েছে, যা অর্জন না হলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল পাওয়া যাবে না। তাছাড়া দক্ষ জনশক্তি ছাড়া হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে স্কিল ডেভেলপমেন্টের পাশাপাশি রি-স্কিলিং ও আপ-স্কিলিং কার্যক্রমে বড় আকারের বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দেশজুড়ে এসব উদ্যোগের মাধ্যমে একটি দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তোলা হবে, যা দেশের শিল্প, অর্থনীতি এবং সামগ্রিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিকে আরো গতিশীল করবে।
বর্তমানে যে রেমিট্যান্স আসছে, তার বড় অংশই তুলনামূলকভাবে কম দক্ষ বা নিম্ন দক্ষ কাজে নিয়োজিত কর্মীদের মাধ্যমে অর্জিত। কিন্তু আমরা যদি মানবসম্পদ উন্নয়নে জোর দিই, তাহলে একই সংখ্যক কিংবা তার অর্ধেক কর্মী বিদেশে গেলেও রেমিট্যান্স দ্বিগুণ বা তারও বেশি বাড়ানো সম্ভব। তাই দক্ষতা উন্নয়ন শুধু কর্মসংস্থান নয়, রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
আমাদের লক্ষ্য হলো আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স ৪০-৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এ খাতে বিনিয়োগের একটি অংশ যথাযথ ফল দিচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হলো বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা ভোকেশনাল ও ট্রেনিং সেন্টারগুলোর অনেকগুলোরই কোনো মানসম্পন্ন অ্যাক্রেডিটেশন বা সার্টিফিকেশন নেই। অ্যাক্রেডিটেশন ও সার্টিফিকেশন ছাড়া এসব প্রশিক্ষণ দেশের শ্রমবাজারেও কার্যকরভাবে কাজে আসে না, আবার বিদেশেও গ্রহণযোগ্যতা পায় না।
এ কারণে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ভোকেশনাল ও স্কিলিং-সংক্রান্ত যেসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হবে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই অ্যাক্রেডিটেশন ও সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক থাকবে। এ মানদণ্ড পূরণ না করলে কোনো প্রকল্পেই বিনিয়োগ করা হবে না। আমাদের বিদেশী অংশীদারদেরও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, অ্যাক্রেডিটেশন ও সার্টিফিকেশন ছাড়া কোনো প্রশিক্ষণ বা স্কিলিং প্রকল্প গ্রহণযোগ্য হবে না। এতে করে প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত হবে এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এসব দক্ষতার স্বীকৃতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে আমরা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে একটি কঠিন ও গভীর পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। প্রায় ১ হাজার ৩০০টি প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে অনেক প্রকল্পই এমন, যেগুলো বাস্তব উন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ বা অনিয়মের কারণে নেয়া হয়েছে, যার ফলে দেশের জন্য কার্যকর কোনো উপকার বা কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না। এসব প্রকল্প এখন নতুনভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আমাদের নীতি খুব স্পষ্ট—প্রতিটি বিনিয়োগের অবশ্যই বাস্তব মূল্য থাকতে হবে এবং তার একটি স্পষ্ট রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট থাকতে হবে। একই সঙ্গে আমরা মূল্যায়ন করছি, কোন প্রকল্প থেকে কী পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং পরিবেশের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে। চারটি বিষয়—ভ্যালু ফর মানি, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট, জব ক্রিয়েশন এবং এনভায়রনমেন্টাল কনসিডারেশন, যে প্রকল্প পূরণ করতে পারবে না, সেটি গ্রহণ করা হবে না। আমরা উন্নয়ন অংশীদারদেরও এ নীতি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি। অনেক প্রকল্পে এরই মধ্যে ৩০, ৪০, ৫০ এমনকি ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হলেও সেগুলোও পুনর্মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে। যদিও সেগুলো পুরোপুরি বাতিল করার কোনো সুযোগ নেই। তবে নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে এ মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে।
আমাদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান। অতীতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেনি অর্থাৎ একটি জবলেস গ্রোথ হয়েছে। এখন আমাদের অগ্রাধিকার সম্পূর্ণভাবে বদলেছে। প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আগামী পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এর একটি বড় অংশই আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্জন করতে চেষ্টা করা হচ্ছে।
আইসিটি খাতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ খাতে বিগত দিনে ৬০-৭০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে, তবে তার সুফল সীমিত। তবুও কল সেন্টার, ডেটা সেন্টার, অনলাইন ট্রেডিংসহ এ খাতে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। পাশের অনেক দেশ এ খাতে সফলতা দেখিয়েছে। এ খাতকে শক্তিশালী করতে আইন করে ফেলেছি। এটার ভিত্তিতে জাতীয় উদ্যোগ শুরু হয়েছে। ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড, ওয়ান ওয়ালেট’—এ ধারণার মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল সিস্টেমে আনা হচ্ছে। এর ফলে সেবা সহজ হবে এবং ট্যাক্স জিডিপি বৃদ্ধিতেও সহায়তা করবে। বর্তমানে আমাদের ট্যাক্স সংগ্রহ ও ট্রেসিবিলিটিতে দুর্বলতা রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো রেজিস্টার্ড নয়, ফলে তাদের কার্যক্রম ট্র্যাক করা কঠিন। এ ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেন ও কার্যক্রম ট্রেসযোগ্য হবে, যা সেবা সহজ করার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগও কমাবে।
আমরা ধীরে ধীরে ক্যাশলেস সোসাইটির দিকে অগ্রসর হচ্ছি, যেখানে নগদ লেনদেন কমে যাবে। এতে সময় ও খরচ দুটোই কমবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারি সেবাগুলো অনলাইনে আনার মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ কমানো হবে, যাতে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন বা স্পিড মানির সুযোগ না থাকে। এটি একটি বৈশ্বিক প্রবণতা এবং উন্নত দেশগুলো এরই মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করেছে—আমরাও সেই পথেই এগোচ্ছি।
আমরা এখন একটি পূর্ণাঙ্গ অলআউট ডিরেগুলেশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এনবিআর, কাস্টমস, পোর্ট, লাইসেন্সিং—সব জায়গায় ধাপে ধাপে সংস্কার করা হচ্ছে। আমরা একের পর এক ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’-এর প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করছি—যেটি হয়েছে সেটি ঠিক করা হচ্ছে, যেটি বাকি আছে সেটি সম্পন্ন করা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—সবগুলো ধাপ সম্পন্ন করে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক ও আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। আমাদের স্লোগান হলো ‘বাংলাদেশ—কান্ট্রি ওপেন ফর বিজনেস।’ এ বার্তাই আমরা বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চাই। একই সঙ্গে বিভিন্ন বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গেও আমরা আলোচনা করছি। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—আমাদের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে তাদের সহায়তা ও নীতিমালার একটি যৌক্তিক সমন্বয় থাকতে হবে।
অবশ্যই কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকে এবং থাকবে। আইএমএফের সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে আমাদের মতপার্থক্য তৈরি হচ্ছে, কারণ তাদের কিছু শর্ত আমাদের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি উপযোগী নয়, আমরা একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। তাই সব সিদ্ধান্ত হুবহু অনুসরণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অবশ্যই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাল্টিল্যাটারাল সংস্থার সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতেই পারে এবং সেটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। তবে এর মধ্যেও আমরা বাস্তবসম্মত সমন্বয় করে এগোতে চাই। যেখানে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ইশতাহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকবে, সেখানে আমরা প্রয়োজনীয় কোর্স কারেকশন করব। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে দেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও সময়সীমা থেকে বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ আমাদের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে, একটি নির্দিষ্ট টাইম ফ্রেম রয়েছে, যেটি অর্জন করতেই হবে।
আমাদের ক্যাপিটাল মার্কেট কার্যত খুবই দুর্বল অবস্থায় আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো দেশে একের পর এক শিল্প গড়ে উঠছে, ব্যবসা সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে এ বিপুল পরিমাণ ফান্ডিং আসছে কোথা থেকে? বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এ অর্থায়নের বড় অংশই আসছে ব্যাংক খাত থেকে, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে। বড় বড় অংকের ঋণ—১ হাজার, ২ হাজার, ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণও ব্যাংকগুলো দিচ্ছে। কিন্তু এভাবে পুরো অর্থনীতিকে শুধু ব্যাংকনির্ভর করে চালানো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। ফলে একদিকে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্যও এটি ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। উচ্চসুদের কারণে ব্যবসার কস্ট অব ফান্ডও বেড়ে যাচ্ছে, যা টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে বাধা তৈরি করছে। এ বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের ক্যাপিটাল মার্কেটকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। ব্যবসায়ীদের জন্য অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরি করতে হবে—ইকুইটি মার্কেট, বন্ড ও ডিবেঞ্চার মার্কেটকে কার্যকর করতে হবে। আমাদের অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্য ক্যাপিটাল মার্কেটকে কার্যকর ও শক্তিশালী করা এখন একটি অপরিহার্য অগ্রাধিকার।
আমরা অবশ্যই ক্যাপিটাল মার্কেটকে পুনরুজ্জীবিত করব। তবে এজন্য একটি বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার বা ওভারহল প্রয়োজন, বিশেষ করে ক্যাপিটাল মার্কেটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাঠামোতে। আমি আগে থেকেই স্পষ্টভাবে বলেছি, এটি কোনো গোপন বিষয় নয়—আমরা পুরো কমিশনকে পুনর্গঠন করতে যাচ্ছি। এখানে মূলনীতি হবে পেশাদারত্ব। কমিশন পরিচালনায় কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ থাকবে না, সবকিছুই হবে সম্পূর্ণ পেশাদারত্বের ভিত্তিতে। এরই মধ্যে আমরা এমন একজনকে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছি, যিনি আগে গোল্ডম্যান স্যাকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে একটি বিলিয়ন ডলারের ফান্ড পরিচালনা করছেন। আমাদের উদ্দেশ্য হলো ক্যাপিটাল মার্কেটকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে এটি আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ, নিরাপদ ও কার্যকর একটি বাজারে পরিণত হয়; যেখানে বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনরুদ্ধার হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
এ ধরনের নিয়োগের ফলে ব্যবসায়িক ধারণা ও বাজারের দৃষ্টিভঙ্গিতে দ্রুত পরিবর্তন আসে। ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে হংকং পর্যন্ত ফান্ড ম্যানেজারদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এ ধরনের সংকেত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং বৈশ্বিক বাজারে দেশের অবস্থান সম্পর্কে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়।
আমরা আশা করছি, শিগগিরই এর ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে সরকারও চাইলে ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, কিন্তু আমাদের সেই সংস্কৃতি এখনো যথাযথভাবে গড়ে ওঠেনি। অনেক বড় সম্পদ—যেমন বিমানবন্দর বা অন্যান্য অবকাঠামো—যেগুলো তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে পরিচালিত হতে পারত, সেগুলো এখনো সরাসরি সরকারি অর্থে পরিচালিত হচ্ছে। অথচ যুক্তরাজ্যের হিথরো বিমানবন্দরও একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি। এ ধরনের মডেল আমাদের জন্যও অনুসরণযোগ্য।
সরকারের মূল কাজ হওয়া উচিত পাবলিক গুড, সামাজিক কর্মসূচি ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করা। আগের মতো কেবল রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক মডেল আর কার্যকর নয়। এছাড়া আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ হলো ক্রিয়েটিভ ইকোনমি, যা একটি জাতীয় পর্যায়ের প্রজেক্ট। বিদেশে এটি উপস্থাপন করলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।
গ্রামীণ বাংলাদেশের কামার, কুমার, তাঁতি ও কুটির শিল্পের কারিগররা দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার বাইরে রয়ে গেছেন। তাদের এখনো পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ, প্রশিক্ষণ, ডিজাইনিং সাপোর্ট, ব্র্যান্ডিং এবং বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগের ব্যবস্থা করা হবে। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে তারা চাইলে অ্যামাজন, আলীবাবা, ইবে এদের মতো প্লাটফর্মেও সরাসরি পণ্য বিক্রি করতে পারেন। থাইল্যান্ডের ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট মডেল আমাদের জন্য একটি ভালো উদাহরণ, যেখানে প্রতিটি গ্রামের বিশেষ পণ্যকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে।
সংস্কৃতি, থিয়েটার, সংগীত—সবই আজ বৈশ্বিক অর্থনীতির অংশ। এগুলো শুধু সাংস্কৃতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক খাতও। যুক্তরাজ্যে জিডিপির একটি বড় অংশ ক্রিয়েটিভ ইকোনমির অবদান। আমাদের দেশেও এ ক্রিয়েটিভ ইকোনমি খাতের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, যা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। এ খাতে সরকার কাজ শুরু করেছে, তবে একা সরকার নয়; বেসরকারি খাত, এনজিও ও উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
এনার্জি সেক্টরে আমরা বড় ধরনের দায়ভার পেয়েছি। প্রায় ৪০-৫০ হাজার কোটি টাকার বিল বাকি রেখে চলে গেছে। প্রথমে এসে দেখি ৪২ হাজার কোটি টাকা বিল পেমেন্ট হয়নি। এ কারণে এখন পুরো এনার্জি সেক্টরকে নতুনভাবে মূল্যায়ন ও পুনর্বিন্যাস করতে হচ্ছে। আমরা এরই মধ্যে নীতি পর্যায়ে দুটি আলাদা কাঠামো গ্রহণের দিকে এগোচ্ছি—একটি তেল ও গ্যাসের জন্য, আরেকটি বিদ্যুৎ খাতের জন্য। বিদ্যুৎ খাতে আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ঘাটতি পূরণ করা এবং একটি স্থিতিশীল সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতারও বড় সুযোগ রয়েছে। নেপালসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে গ্রিড সংযোগের মাধ্যমে প্রায় ৪-৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে, যা তুলনামূলকভাবে কম খরচে পাওয়া সম্ভব—বিশেষ করে হাইড্রোপাওয়ারের কারণে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকেও আগামী বছরের মধ্যে প্রায় দুই-আড়াই হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন উৎপাদন নয়; ট্রান্সমিশন ব্যবস্থা, যা এখনো আমাদের প্রধান দুর্বলতা। এ বাস্তবতাকে সামনে রেখে আমরা ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছি, যাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা যায়।
আমাদের সামগ্রিক লক্ষ্য তিনটি মৌলিক বিষয়ের নিশ্চয়তা দেয়া—অবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, অবিচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এবং শক্তিশালী ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ব্যবস্থা। এ তিনটি নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন কমে যাবে। তখন প্রাইভেট সেক্টর, উদ্যোক্তা ও তরুণরা স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে আসবে।

আমরা গ্যাস খাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিচ্ছি, যার অংশ হিসেবে মহেশখালীতে গ্যাস স্টোরেজ ও আমদানির সুবিধা তৈরি করা হবে, যাতে অন্তত তিন মাসের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে।
বর্তমানে আমরা একটি জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে অতিরিক্ত দায় ও সীমিত ফিসকাল স্পেস নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এ কারণে শুরুতেই বাস্তবতা স্বীকার করে নিতে হবে—প্রথম বছরটি তুলনামূলকভাবে কঠিন হবে, দ্বিতীয় বছরে স্থিতিশীলতা আসবে এবং তৃতীয় বছরে অর্থনীতি পুনরায় ঘুরে দাঁড়াবে।
আমরা প্রতিদিনই মনিটরিং করছি এবং একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড ব্যবস্থা চালু করছি, যাতে প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি স্বচ্ছভাবে দেখা যায়—কোনটি এগোচ্ছে, কোনটি পিছিয়ে পড়ছে এবং কোথায় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
এ সময়ে আমরা মূলত ফায়ার ফাইটিং মোডে কাজ করছি—দৈনন্দিন সংকট মোকাবেলা করেই নীতি বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। এতে আমাদের ফিসকাল স্পেসও সীমিত হয়ে গেছে। এ কারণে সামাজিক খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে—ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। কারণ স্থানীয় চাহিদা তৈরি না হলে অর্থনীতি সচল রাখা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য খাতে ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার, শিক্ষা খাতে দক্ষতা উন্নয়ন—এ দুটি খাতকে আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছি। কারণ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে উন্নয়ন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছি দক্ষ জনশক্তি ছাড়া অর্থনৈতিক রূপান্তর সম্ভব নয়।







