বাংলাদেশে মাস্টারকার্ডের বর্তমান ব্যবসায়িক অবস্থান ও প্রবৃদ্ধির হার কেমন?
বাংলাদেশে মাস্টারকার্ডের যাত্রা এক দীর্ঘ ও অনুপ্রেরণামূলক অগ্রযাত্রা। বিশ্বের পেমেন্ট ইকোসিস্টেমে মাস্টারকার্ড একটি শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান, যার মূল শক্তি টেকনোলজিক্যাল ইনোভেশন, ব্যাংকিংয়ে নয়। বর্তমানে বিশ্বের ২২০টিরও বেশি দেশে আমাদের কার্যক্রম রয়েছে। তবে মাস্টারকার্ড নিজে সরাসরি কোনো কার্ড ইস্যু করে না; বরং আমরা ব্যাংক, ফিনটেক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বে কাজ করি, তাদের লাইসেন্স প্রদান করি, যাতে তারা আমাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রাহকদের জন্য আধুনিক ও নিরাপদ পেমেন্ট সেবা চালু করতে পারে।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে আমরা এ দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছি। বর্তমানে দেশের ২৩টি ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা কাজ করছি, যাতে আর্থিক সেবাগুলো আরো দ্রুত, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়। এভাবেই মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গত এক দশকে আমরা ৩০০টিরও বেশি পেমেন্ট সলিউশন নিয়ে এসেছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—বাংলা কিউআর কোড, কনট্যাক্টলেস (স্পর্শবিহীন) পেমেন্ট ব্যবস্থা, ‘অ্যাড মানি’ সেবার মাধ্যমে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও কার্ডের মধ্যে ইন্টারঅপারেবিলিটি তৈরি, বিশ্বের প্রথম বায়োমেট্রিক মেটাল ক্রেডিট কার্ড চালু এবং বিভিন্ন ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব। এর ধারাবাহিকতায় পাঠাও পের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলাদেশের প্রথম ফিনটেক কম্প্যানিয়ন কার্ডও চালু করা হয়েছে। এছাড়া সেবা পের সঙ্গে বিশেষ এসএমই কার্ডসহ ২০১৬ থেকে অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে সেবা প্রদান করে আসছি। বর্তমানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পস (POS) টার্মিনালে মাস্টারকার্ডের কনট্যাক্টলেস প্রযুক্তি রয়েছে, যা লেনদেনকে দ্রুত ও নিরাপদ করেছে। শুধু তা-ই নয়, প্রিপেইড ও অনলাইন পেমেন্ট সেবায় আমরা বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছি। রেমিট্যান্স খাতেও আমাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশের মোট রেমিট্যান্সের এক-চতুর্থাংশ মাস্টারকার্ডের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আসে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে সরাসরি অবদান রাখছে মাস্টারকার্ড। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। আমাদের উদ্ভাবনী পেমেন্ট সমাধান শুধু শহর নয়, গ্রাম ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যেও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াচ্ছে।
কার্ড ছাড়াও আপনারা এ দেশে কী ধরনের ব্যবসা করছেন?
একটি প্রযুক্তিনির্ভর পেমেন্ট নেটওয়ার্ক হিসেবে আমরা কার্ডসেবার বাইরেও বিস্তৃত পরিসরে কাজ করছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো লেনদেনকে দ্রুত, নিরাপদ ও সবার নাগালে আনা। এর অংশ হিসেবে আমরা রেমিট্যান্স, ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা এবং ডিজিটাল ফাইন্যান্স সলিউশন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।
বিশেষভাবে বলতে গেলে ওয়েজ আর্নার রেমিট্যান্স ও মানি মুভমেন্ট আমাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। ২০১৯ সালে মাস্টারকার্ড যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রতিষ্ঠান ট্রান্সফাস্ট (Transfast) অধিগ্রহণ করে, যার ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরা এখন আরো দ্রুত, নিরাপদ ও সহজে টাকা পাঠাতে পারছেন। বর্তমানে দেশের মোট রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মাস্টারকার্ড ও ট্রান্সফাস্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আসে, যা আমাদের ডিজিটাল অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। পাশাপাশি আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করতে কাজ করছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ উদ্যোগের আওতায় মাস্টারকার্ড বিভিন্ন নীতিগত ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে, যেমন—ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট সিস্টেম উন্নয়ন, নিরাপত্তা বাস্তবায়ন এবং সরকারি পেমেন্ট চ্যানেলে ডিজিটাল সমাধান সংযোজন।
একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল পেমেন্টের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে আমরা অতিসম্প্রতি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাশলেস করার উদ্যোগ চালু করেছি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এরই মধ্যে মাস্টারকার্ডের সহযোগিতায় এ ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি, ক্যান্টিন ও অন্যান্য লেনদেন সম্পূর্ণ ডিজিটালভাবে সম্পন্ন করতে পারছেন। একই সঙ্গে আমরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সঙ্গে বিশেষ কে-ব্র্যান্ডেড ডেবিট কার্ড চালু করেছি; এর ফলে তরুণরা খুব অল্প বয়স থেকেই নিরাপদ, স্বচ্ছ ও আধুনিক পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের ক্যাশলেস অর্থনীতির একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের জন্য আমরা বিশেষ CMSME কার্ড ও ডিজিটাল লেনদেন প্লাটফর্ম চালু করেছি, যাতে তারা সহজে অনলাইন পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন। নারীদের জন্য চালু করা মাস্টারকার্ড Strive ও শপআপ-এর বিশেষ ‘পড়শি’ (Porshi) উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রামীণ ও উপশহর এলাকার নারী উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল ব্যবসায় যুক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তারা শুধু ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন না, বরং ব্যবসা পরিচালনায় প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ ও আর্থিক দক্ষতাও অর্জন করছেন।
সব মিলিয়ে মাস্টারকার্ড এখন শুধু কার্ড ইস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির পরিধি বাড়াতে একটি সম্পূর্ণ প্রযুক্তি সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাজারকে কতটা সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন?
দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশ এখন সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী, বাড়তে থাকা মধ্যবিত্ত শ্রেণী, দ্রুত প্রসারমান ই-কমার্স এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নতি—সব মিলিয়ে এ বাজার অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশে স্মার্টফোন ব্যবহার ও ইন্টারনেট সংযোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে ডিজিটাল পেমেন্টের গ্রহণযোগ্যতাও বেড়েছে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেনের প্রতি সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। তাই এ জনগোষ্ঠীই ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতির চালিকাশক্তি।
আমরা লক্ষ করছি, এখন শুধু বড় শহর নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও মানুষ ডিজিটাল লেনদেনে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী ব্যবসায়ী ও ফ্রিল্যান্সাররা এখন আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। এ অংশগ্রহণই বাংলাদেশের বাজারকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে দিচ্ছে। মাস্টারকার্ডের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় মার্কেট, যেখানে সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করলে আগামী পাঁচ বছরে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট বাজার কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত কতটা ডিজিটাল হতে পেরেছে? উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে?
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত গত এক দশকে ব্যাপকভাবে ডিজিটাল রূপান্তর ঘটিয়েছে। এখন প্রায় সব ব্যাংকই ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ, কার্ড, এটিএম, পস (POS) এবং অনলাইন বিল পেমেন্ট সেবা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ বছরে গড়ে ২৫-৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। কিন্তু এখনো প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি লেনদেন নগদ টাকায় পরিচালিত হয়।
তবে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমরা এখনো কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি।
যেমন—সাইবার নিরাপত্তা, ইন্টারনেট সংযোগের স্থায়িত্ব এবং ডিজিটাল লেনদেন সম্পর্কে সাধারণ জনগণের সচেতনতা এখনো সীমিত। অনেক গ্রাহক ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবহার করলেও এখনো নগদ টাকায় লেনদেনের অভ্যাস পুরোপুরি বদলায়নি। পাশাপাশি উন্নত দেশগুলো যেখানে ‘ওপেন ব্যাংকিং’ ও ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ নীতিমালার মাধ্যমে ব্যাংক, ফিনটেক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহজ ডাটা সংযোগ তৈরি করেছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো প্রাথমিক ধাপে আছে। ফলে এক ব্যাংকের গ্রাহক অন্য ব্যাংকের প্লাটফর্মে পুরোপুরি নির্বিঘ্নে লেনদেন করতে পারেন না।
মাস্টারকার্ডসহ দেশের ডিজিটাল ইকোসিস্টেম প্লেয়াররা যতই চেষ্টা করুক, জাতি হিসেবে আমাদের নগদের ওপর নির্ভরতা এখনো অনেক বেশি। এ নির্ভরতা কমাতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে নগদ টাকার ব্যবহারকে আরো নিরুৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল পেমেন্ট উৎসাহে প্রণোদনা (যেমন ৩-৫ শতাংশ ইনসেনটিভ) দেয়া হলে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়বে।
তবু আশার বিষয় হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ রোডম্যাপ এবং বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা ব্যাংকগুলোকে আরো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। মাস্টারকার্ডসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক খাতকে সহায়তা করছে যাতে নিরাপদ, দ্রুত ও স্বচ্ছ লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।
এ দেশের ব্যাংকগুলো সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে কতটা সক্ষম বলে মনে করেন?
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো সাইবার নিরাপত্তায় অনেক অগ্রগতি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে এখন প্রায় সব বাণিজ্যিক ব্যাংকেরই নিজস্ব সাইবার সিকিউরিটি সেল রয়েছে। তারা নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন, ফায়ারওয়াল আপডেট, এনক্রিপশন ও নেটওয়ার্ক মনিটরিং করছে।
তবে বাস্তবতা হলো হুমকিটাও ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। ডিজিটাল লেনদেন যত বাড়ছে, সাইবার অপরাধীরাও তত বেশি পরিশীলিত হয়ে উঠছে। এখন আর শুধু ‘হ্যাকিং’ নয়—ফিশিং, ম্যালওয়্যার, র্যানসমওয়্যার, এমনকি সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো আক্রমণও বেড়েছে। তাই সাইবার নিরাপত্তা কোনো একবারের কাজ নয়, এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া।
যখন একটি জাতি ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগোয়, তখন নিরাপত্তার দিকটিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়। সাইবার নিরাপত্তার জন্য মাস্টারকার্ড বৈশ্বিকভাবে বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে এবং আন্তর্জাতিক সেরা অনুশীলন বা গ্লোবাল প্র্যাকটিস অন্তর্ভুক্ত করে। আমরা যে প্রযুক্তি ব্যবহার করি, বিশেষ করে ইএমভিকো চিপের (EMVCo Chip) মাধ্যমে ইস্যু করা কার্ডগুলোয়, সেখানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি আমাদের ব্যাংক পার্টনারদের জন্য বিভিন্ন ফ্রড প্রোটেকশন টুল ও রিস্ক মনিটরিং সলিউশন প্রদান করা হয়, যাতে গ্রাহকের অর্থ ও তথ্য সর্বদা সুরক্ষিত থাকে।
আমার মতে, দেশের বড় ব্যাংকগুলো এখন অনেক বেশি প্রস্তুত, কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যাংক ও নন-ব্যাংক ফিনান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সক্ষমতার তারতম্য আছে। ভালো দিক হলো বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ‘Cyber Resilience Framework’ চালু করেছে, যেখানে ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত সাইবার অডিট ও ইনসিডেন্ট রিপোর্ট দিতে হচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অংশীদার যেমন মাস্টারকার্ড, ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে ফ্রড মনিটরিং সিস্টেম এবং রিয়েল-টাইম রিস্ক অ্যালার্ট সার্ভিস চালু করেছে, যা ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমরা বিশ্বাস করি, নীতিনির্ধারক ও ব্যাংক খাত একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশ আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সুরক্ষিত ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারবে।
গ্রাহকদের অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিতে মাস্টারকার্ডের নিরাপত্তা প্রটোকল কেমন?
গ্রাহকের অর্থের সুরক্ষা আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। মাস্টারকার্ড এমন একটি বৈশ্বিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক, যেখানে প্রতিটি লেনদেন একাধিক স্তরের নিরাপত্তা প্রটোকলের মাধ্যমে যাচাই করা হয়। পাশাপাশি টোকেনাইজেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রাহকের আসল কার্ড নম্বরকে একটি ‘সিকিউর টোকেন’-এ রূপান্তর করা হয়। এতে কার্ডের তথ্য চুরি হলেও তা দিয়ে কোনো লেনদেন করা যায় না। আমাদের প্রতিটি কার্ডেই EMV চিপ ও কনট্যাক্টলেস প্রযুক্তি আছে, যা স্কিমিং বা কার্ড-ক্লোনিংয়ের ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়। অনলাইন লেনদেনে ব্যবহৃত হয় মাস্টারকার্ড আইডেন্টিটি চেক, যা ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (OTP) বা বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের মাধ্যমে গ্রাহককে নিশ্চিত করে।
তাছাড়া আমরা ব্যাংক ও ফিনটেক পার্টনারদের সঙ্গে মিলে রিয়েল-টাইম ফ্রড মনিটরিং সিস্টেম পরিচালনা করি। এতে প্রতিটি সন্দেহজনক লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও ব্লক হয়। বাংলাদেশেও মাস্টারকার্ড নিয়মিতভাবে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কাজ করে সাইবার ঝুঁকি মূল্যায়ন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করতে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম ‘ক্যাশলেস’ অর্থনীতির জন্য কতটা প্রস্তুত? এক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে সেটি কেন?
বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। গত কয়েক বছরে দেশের ডিজিটাল লেনদেনের প্রবৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো। ব্যাংকিং চ্যানেল, কার্ড, ফিনটেক ও অনলাইন পেমেন্ট সেবা মিলিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বছরে গড়ে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পস (POS) টার্মিনালে কনট্যাক্টলেস প্রযুক্তি চালু হয়েছে, যা লেনদেনকে আরো দ্রুত ও নিরাপদ করছে। তবে এখনো আমরা পুরোপুরি ক্যাশলেস হতে পারিনি। নগদ টাকার প্রতি মানুষের অতিরিক্ত নির্ভরতা, পর্যাপ্ত ডিজিটাল অবকাঠামোর অভাব এবং কার্ড ব্যবহারে ভ্যাট বা অতিরিক্ত ফি—এসবই বড় বাধা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে এখনো মোট লেনদেনের প্রায় ৭২ শতাংশই নগদ অর্থে সম্পন্ন হয়, যা এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে।
আমার বিশ্বাস, ‘ক্যাশলেস’ না হোক, অন্তত ‘লেস ক্যাশ’ অর্থনীতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি অর্থাৎ নগদ টাকার ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
সচেতনতা বৃদ্ধি ও নীতিনির্ধারণী আলোচনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টসের (আইসিএমএবি) সঙ্গে যৌথভাবে আমরা সম্প্রতি আয়োজন করেছি ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ সামিট ২০২৫’। এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমকে আরো শক্তিশালী করা এবং নগদহীন অর্থনীতির যাত্রাকে ত্বরান্বিত করা।
ক্যাশলেস প্রক্রিয়াকে আরো এগিয়ে নিতে ডিজিটাল সচেতনতা ও শিক্ষা কার্যক্রম আরো জোরদার করা প্রয়োজন। গ্রাহকদের ডিজিটাল লেনদেন সম্পর্কে আস্থা ও বোঝাপড়া বাড়াতে মাস্টারকার্ড তার ফিনটেক পার্টনারদের সঙ্গে মিলে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার, আর্থিক খাত ও প্রযুক্তি অংশীদারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ দ্রুতই ‘লেস ক্যাশ’ থেকে ‘ক্যাশলেস’ অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাবে—যেখানে প্রতিটি লেনদেন হবে দ্রুত, নিরাপদ ও স্বচ্ছ, আর প্রতিটি নাগরিক হবে ডিজিটাল অগ্রযাত্রার অংশীদার।
ব্যাংক খাত ডিজিটাল রূপান্তরের দিকে এগোলেও বাংলাদেশের মানুষ এখনো নগদ লেনদেনের মানসিকতা থেকে বেরোতে পারছে না। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ছাপাকৃত অর্থের পরিমাণ বাড়াতে হচ্ছে। জনগণকে ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া দরকার?
এটা সত্যি যে প্রযুক্তিগতভাবে আমরা অনেক এগিয়েছি, কিন্তু মানুষের অভ্যাস পরিবর্তন সবসময় সময়সাপেক্ষ। বাংলাদেশ এখনো ‘ক্যাশ ইজ কিং’ মনোভাব থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। ডিজিটাল লেনদেনকে জনপ্রিয় করতে হলে একসঙ্গে কয়েকটি দিক নিয়ে কাজ করতে হবে।
প্রথমত, নীতিগত প্রণোদনা (Policy Incentive) দিতে হবে। যেমন—ডিজিটাল পেমেন্টে ২-৩ শতাংশ ইনসেনটিভ দেয়া হলে মানুষ ও ব্যবসায়ীরা নগদের বদলে কার্ড বা অনলাইন লেনদেনে আগ্রহী হবে। একইভাবে নগদ লেনদেনে অতিরিক্ত ফি বা ভ্যাট আরোপ করলে সেটি ধীরে ধীরে কমবে।
দ্বিতীয়ত, সচেতনতা ও শিক্ষা বাড়াতে হবে। অনেকেই এখনো মনে করেন ডিজিটাল লেনদেন মানে ঝুঁকি বা প্রতারণা। অথচ বাস্তবে কার্ড-ভিত্তিক লেনদেনই সবচেয়ে সুরক্ষিত, কারণ এতে টোকেনাইজেশন ও নিরাপদ নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হয়। তাই ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা, নিরাপত্তা ও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে গণমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত প্রচারণা চালানো জরুরি।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল অবকাঠামো ও সংযোগ উন্নত করতে হবে। দেশের অনেক এলাকাতেই এখনো স্থিতিশীল ইন্টারনেট বা পস টার্মিনালের অভাব রয়েছে। এগুলো সম্প্রসারণ করলে সাধারণ মানুষও সহজে ডিজিটাল পেমেন্টে যুক্ত হতে পারবেন।
যদি সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক খাত ও ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথভাবে প্রণোদনা, সচেতনতা ও অবকাঠামো—এ তিনটি বিষয়ে কাজ করে তাহলে খুব দ্রুতই মানুষ ‘নগদ’ থেকে ‘ডিজিটাল’-এ চলে আসবে। আমরা মাস্টারকার্ড থেকে ঠিক সেই পরিবর্তনটাকেই সহায়তা করছি।
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল পেমেন্ট নীতিতে আপনারা কী ধরনের নীতিগত সহায়তা প্রত্যাশা করেন?
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি, একটি ‘সহজ, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নীতি কাঠামো পুরো ইকোসিস্টেমকে আরো গতিশীল করতে পারে।
প্রথমত, ডিজিটাল লেনদেনে প্রণোদনা ও নিরাপত্তা আরো জোরদার করা প্রয়োজন। সরকার যদি গ্রাহকদের জন্য ২-৩ শতাংশ ইনসেনটিভ এবং ব্যবসায়ীদের জন্য লেনদেনে ২ শতাংশ ছাড় প্রদান করে, তাহলে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ বাস্তবায়ন অনেক দ্রুত সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নগদ অর্থের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে (ডিজইন্টেন্সিফাই ক্যাশ) হবে।
দ্বিতীয়ত, ইন্টারঅপারেবিলিটি বা একীভূত পেমেন্ট সিস্টেম নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ সব ব্যাংক ও ফিনটেকের লেনদেন এক প্লাটফর্মে যুক্ত থাকলে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা আরো সহজে ডিজিটাল লেনদেন করতে পারবেন। যেমন—টোল, পরিবহন বা ইউটিলিটি বিল যেকোনো ব্যাংকের কার্ড বা ডিজিটাল ওয়ালেট দিয়ে পরিশোধ করা যাবে।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল ইকুইপমেন্ট যেমন—কার্ড, পস মেশিন ইত্যাদির ওপর বিদ্যমান শুল্ক আরো কমাতে হবে, যাতে এগুলোর সহজলভ্যতা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি সাইবার সিকিউরিটি স্ট্যান্ডার্ড উন্নয়ন ও ফ্রড মনিটরিং ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। মাস্টারকার্ড সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক ও ফিনটেক পার্টনারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে, যেন ডিজিটাল অর্থনীতি দেশের সব মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি টেকসই ও আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।
এছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ও কাগজপত্রের ঝামেলা কমাতে ডিজিটাল ই-কে ওয়াইসি প্রক্রিয়া চালু করা। প্রতিটি CASA অ্যাকাউন্টের সঙ্গে ডেবিট বা ভার্চুয়াল কার্ড বাধ্যতামূলক করা, যাতে সব গ্রাহক ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা পান। তাছাড়া সব অপারেটরের জন্য একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।










