দেশের ব্যাংকগুলোর সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনার বর্তমান অবস্থা কেমন বলে মনে করেন?
দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো সফটওয়্যার ব্যবহারে যথেষ্ট অগ্রগামী। এ খাতে অটোমেশন শুরু হয়েছে অনেক আগেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—২০০৩ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার দেশীয় প্রকৌশলীদের দিয়ে তৈরি করেছিল, যা এখনো কার্যকরভাবে চলছে। এটি দেশীয় প্রকৌশলীদের একটি বড় সফলতা। বর্তমানে ১০-১৫টি বেসরকারি ব্যাংকও দেশীয় সফটওয়্যার ব্যবহার করছে। তবে গুণগত মান উন্নয়নে আরো মনোযোগ প্রয়োজন।
দেশে মানসম্পন্ন সফটওয়্যারের তৈরিই বড় চ্যালেঞ্জের জায়গা। দেশীয় সফটওয়্যারের মানোন্নয়নে যথেষ্ট বিনিয়োগ করা হচ্ছে না। বিদেশ থেকে ১০০-২০০ কোটি টাকায় সফটওয়্যার কেনার প্রবণতা থাকলেও অনেক ব্যাংক দেশীয় বিকল্পে মাত্র ৪-৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতেও দ্বিধা করে। এমনকি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হিসেবেও বছরে ১ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দিতে চায় না। বিনিয়োগের এ সীমাবদ্ধতা স্থানীয় সফটওয়্যারগুলোর গুণগত মান উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কয়েক বছর আগে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান চার ব্যাংকের অর্থায়নে একটি আইটি কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে কয়েক দফায় বৈঠক হলেও শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ কিছু হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোগটি এগিয়ে নিতে আন্তরিক বলে শুনেছি। কোম্পানিটি তৈরি হলে সেটি হবে ৫০০-১,০০০ জন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের কর্মক্ষেত্র, যা প্রথম পর্যায়ে সরকারি ব্যাংকগুলোর সফটওয়্যার সেবা দেবে। এটি হবে এক ধরনের কেন্দ্রীয় সাপোর্ট ইউনিট বা সার্ভিস হাব। এ উদ্যোগ সফল হলে সাইবার নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের ভেতরেই উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
স্বাধীনতার অর্ধশতবর্ষ পেরিয়েও বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো বিদেশী সফটওয়্যারের ওপর এতটা নির্ভরশীল কেন?
এটি এক অদ্ভুত বাস্তবতা। বাংলাদেশের বড় ব্যাংকগুলো এখনো বিদেশী সফটওয়্যার ব্যবহার করছে। যদিও বাংলাদেশের মেধাবী প্রকৌশলীরা বিশ্বের নামকরা আইটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। কিন্তু এ প্রকৌশলীরা দেশের ব্যাংক খাতের জন্য সফটওয়্যার তৈরি করছে না। এর ফলে একটি বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে—আমাদের ‘তৈরি করার’ সক্ষমতা আছে, কিন্তু ‘প্রয়োগের’ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার করতে হলে এ ফাঁক পূরণই এখন সবচেয়ে জরুরি। দেশীয় সফটওয়্যার ব্যবহারে আস্থা ও বিনিয়োগ বাড়ানোই হতে পারে নিরাপদ, স্বনির্ভর ও টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তি।
বিদেশী সফটওয়্যার ব্যবহারকারী অনেক ব্যাংকই সাম্প্রতিক সময়ে হ্যাকিং কিংবা তথ্য চুরির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু দেশীয় সফটওয়্যার ব্যবহারকারী ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে এমন ঘটনার খবর খুব একটা পাওয়া যায়নি। আপনি এ পার্থক্যটিকে কীভাবে দেখছেন?
আসলে নিরাপত্তা কেবল সফটওয়্যারনির্ভর নয়। হার্ডওয়্যার, ইনফ্রাস্ট্রাকচার, নেটওয়ার্ক, ব্যবহারকারীর সচেতনতা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ—সব মিলিয়েই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তার অবস্থা ও সমস্যা চিহ্নিতকরণ বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। এ উদ্যোগ সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংককেই নিতে হবে। কেননা বেসরকারিভাবে চেষ্টা করে সংবাদ মাধ্যমগুলো থেকে তথ্য পেলেও ব্যাংকগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি জানায় না। নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে সফটওয়্যার দেশী না বিদেশী সেটি বড় বিষয় নয়। এক্ষেত্রে মানসম্মত সফটওয়্যারের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবল ও নিয়মিত মনিটরিং বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ তিনটি উপাদান সমন্বিতভাবে কাজ করলে হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। আমার মতে, দেশীয় সফটওয়্যার ব্যবহার বাড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি এর মান, এনক্রিপশন পদ্ধতি, সিকিউরিটি অডিট ও পেনিট্রেশন টেস্টিংয়ের ওপর আরো জোর দিতে হবে। তাহলেই আমরা শুধু নিরাপদই নয়, স্বনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকেও এগোতে পারব।
নিরাপদ ও মানসম্মত সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কেমন?
বাংলাদেশের দুই-তিন হাজার প্রকৌশলী কাজ করছেন। তাদের বড় অংশই কাজ করছেন বিদেশী কোম্পানির জন্য। দেশের বড় ১০টি সফটওয়্যার কোম্পানির মধ্যে সাত-আটটি কেবলই বিদেশী ক্লায়েন্টের জন্য কাজ করছে। একজন প্রকৌশলী সফটওয়্যার নির্মাণে যে পরিমাণ সম্মানী পান, তার কিয়দংশও সাইবার নিরাপত্তা টেস্টিংয়ে পান না। এ কারণে সফটওয়্যারে দক্ষ জনবল থাকলেও দেশে সাইবার নিরাপত্তায় তেমনটি নেই। ব্যাংকগুলো দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে নিরাপত্তা টেস্ট করাতে অনীহা দেখায়। এতে মেধাবী প্রকৌশলীরা এ খাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিকিউরিটি অডিট নীতিমালা বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে?
নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি ছয় মাস বা এক বছর পর নিরাপত্তা টেস্ট করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে অনেক ব্যাংক তা করে না। বিদেশী সফটওয়্যারে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও রক্ষণাবেক্ষণে খরচ কমানো হয়। এতে দক্ষ প্রকৌশলী ধরে রাখা ও সিকিউরিটি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকির সক্ষমতা কতটুকু?
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল নীতিমালা তৈরি করে দেয়। এ ধরনের অডিট বা টেস্টিং না হয় বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান করে দিল। কিন্তু নীতির বাস্তবায়ন নিশ্চিতে একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা তো থাকা উচিত। কারণ সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি নিরীক্ষা করার সক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের আছে কিনা; বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে যথাযথ অডিট হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। আমি যতদূর জানি বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এটি করা হয়ও না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই পর্যায়ের দক্ষ জনবলও এখনো নেই।
আপনি যে নতুন আইটি কোম্পানি গঠনের প্রস্তাবের কথা বলছেন, তার কাঠামো কেমন হতে পারে?
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব ছিল, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অর্থায়নে এটি গঠিত হবে। সেই প্রতিষ্ঠানটি সবক’টি সরকারি ব্যাংকের জন্য প্রথমে সিবিএস তৈরি করবে। ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের সফটওয়্যার তৈরির মাধ্যমে দেশীয় প্রকৌশলীদের যে জ্ঞান তৈরি হয়েছে, এর মাধ্যমে বিশ্বমানের সিবিএস তৈরি সম্ভব।
আবার ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশী সফটওয়্যার দু-একটি প্রতিষ্ঠানে আছে। আমাদের অধিকাংশ ব্যাংকে মালয়েশিয়ার তৈরি সুইচিং সফটওয়্যার ব্যবহৃত হয়; যা এমন নয় যে আমাদের প্রকৌশলীরা তৈরি করতে পারবেন না। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হলে আমাদের প্রকৌশলীরা এরচেয়ে উন্নত সফটওয়্যার তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু আমাদের দেশে কখনো বিনিয়োগ হয়নি। এ লক্ষ্যেই আমাদের প্রস্তাব যেন ভালো প্রকৌশলীরা দেশের অভ্যন্তরে কাজের সুযোগ পায় এবং বিদেশের প্রতি আমাদের নির্ভরতা কমে।
নিরাপত্তা হুমকি নিয়ে আপনি বলেছিলেন বাংলাদেশে এখনো দক্ষ জনবল পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের হ্যাকিংয়ের অভিজ্ঞতাগুলো বিশ্লেষণ করলে সামগ্রিকভাবে আপনি কোন কোন নিরাপত্তা ঝুঁকি লক্ষ করছেন?
এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন, কারণ বিষয়টি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে বেশকিছু প্রতিবেদন রয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। কোন কোন স্তরে সিকিউরিটি ভালনারেবিলিটি আছে এবং সেগুলো মোকাবেলায় কী ধরনের নীতি ও প্রস্তুতি প্রয়োজন সেটিও নির্ধারণ করা যাবে। তবে সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে ব্যাংক খাতের নিরাপত্তা একটি হলিস্টিক বা সামগ্রিক বিষয়—এখানে সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার, নেটওয়ার্ক, ব্যবহারকারী, এমনকি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার সব দিক বিবেচনায় নিতে হয়। আমাদের দেশে নিত্যনতুন পদ্ধতিতে হ্যাকিংয়ের চেষ্টা চলছে। অনেক ক্ষেত্রে ইনসাইডার বা অভ্যন্তরীণ কর্মীরাও জড়িত থাকেন—কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে, কখনো অনিচ্ছাকৃতভাবে। এগুলো সবই সিকিউরিটি অডিটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই শুধু বাইরের হ্যাকারদের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার দিক থেকেও বিষয়টি গভীরভাবে দেখা জরুরি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যাংকিং নিরাপত্তায় কেমন ভূমিকা রাখতে পারে?
বাংলাদেশে এআইয়ের ব্যবহার এখনো সীমিত, মূলত ক্রেডিট স্কোরিংয়ে। তবে এআই ব্যবহারে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। ব্যাংকগুলো ইন্টেলেকচুয়াল কাজে বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। ফলে বিদেশী সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা দেশের ডাটা পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই এআই ব্যবহারে আমরা এখনো পিছিয়ে রয়েছি।
বৈশ্বিক সাইবার যুদ্ধের যুগে বাংলাদেশের দুর্বলতা কোথায়?
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বিনিয়োগ ও স্থানীয় সক্ষমতার অভাব। হ্যাকারদের মতোই ‘ইথিক্যাল হ্যাকার’ বা হোয়াইট হ্যাট হ্যাকাররা অনুমোদিতভাবে সিস্টেম পরীক্ষা করে দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পারে। ব্যাংকগুলো যদি নিয়মিতভাবে ইথিক্যাল হ্যাকারদের সঙ্গে কাজ করে, অনেক সাইবার হামলা রোধ সম্ভব। কিন্তু দেশে এ পেশা গড়ে ওঠেনি, কারণ বিনিয়োগ নেই। ফলে তরুণ প্রকৌশলীরা এ পেশায় আগ্রহী হচ্ছে না। তাছাড়া বিদেশী সিকিউরিটি প্রডাক্ট ও সার্ভিসের ওপর অতিনির্ভরতা রয়েছে। এতে ভূরাজনৈতিক সংকটে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। উদাহরণ হিসেবে কভিড সময়ে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমস্যার কথা বলা যায়। এছাড়া দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রকৌশলী বিদেশী প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, যা দেশের প্রযুক্তিগত স্বাতন্ত্র্য ও দক্ষতা বৃদ্ধির পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।










