বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সাইবার হামলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী দেখছেন?

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যাংকিং ইনফ্রাস্ট্রাকচারকে আধুনিক ও সুরক্ষিত রাখা। নেটওয়ার্ক ডিভাইস, সার্ভার, ডাটাবেজ, অ্যাপ্লিকেশন, ফায়ারওয়াল ও সিকিউরিটি সলিউশনগুলো নিয়মিতভাবে সর্বশেষ সংস্করণে আপডেট করা বা প্যাচিং অনেক সময় ব্যয়সাপেক্ষ এবং প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। বিশেষ করে অ্যাপ্লিকেশন-নির্ভরতার কারণে অনেক সময় হালনাগাদ করা সম্ভব হয় না, যা হামলাকারীদের প্রবেশদ্বার খুলে দেয়। পাশাপাশি দেশে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে দক্ষ ও স্বীকৃত জনবলের ঘাটতি রয়েছে। অনেক সময় দুর্বলতা চিহ্নিত বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথাযথভাবে করা যায় না। ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যাংকিং সেবার সম্প্রসারণে ফিশিং, সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও রÅvনসমওয়্যারের ঝুঁকি বেড়েছে। ভেন্ডর বা সাপ্লায়ারদের দিক থেকেও ঝুঁকি তৈরি হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্রাহকের অসচেতনতা; তাদের অসতর্কতাই অনেক সময় বড় সাইবার ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

গত কয়েক বছরে সাইবার নিরাপত্তা নীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে?

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা, গাইডলাইন ও ফ্রেমওয়ার্ক হালনাগাদ করেছে। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে ন্যাশনাল সাইবার এজেন্সির (সিআইআরটি) সক্ষমতা বৃদ্ধি, থ্রেট অ্যালার্ট জারি ও তথ্যপ্রবাহ সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর মধ্যে সাইবার প্রস্তুতি ও সচেতনতা অনেক বেড়েছে।

দেশের ব্যাংকগুলো কি কার্যকর সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (সিআইআরটি) গঠন করেছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় এখন প্রায় সব ব্যাংকই সিআইআরটি বা অনুরূপ ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম গঠন করেছে। বড় ব্যাংকগুলোতে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং সেল, ফরেনসিক টুলিং ও প্রশিক্ষিত জনবল রয়েছে। তবে মাঝারি ও ছোট ব্যাংকগুলোতে দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ঘাটতি রয়ে গেছে।

ফিশিং, রÅvনসমওয়্যার ও সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিরোধে আপনার ব্যাংক কী করছে?

শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক সচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সন্দেহভাজন লিংক ক্লিক না করার পরামর্শসহ এসএমএস ও ই-মেইল সতর্কতা পাঠানো হয়, প্রতিটি ট্রানজেকশনে গ্রাহককে নোটিফিকেশন দেয়া হয়। প্রযুক্তিগত দিক থেকে আমরা ওয়্যাফ, নেক্সট জেনারেশন ফায়ারওয়াল, ইডিআর ও নেটওয়ার্ক সেগমেন্টেশন ব্যবহার করছি। নিয়মিত ব্যাকআপ ও রিকভারি টেস্ট করা হয়। ‘জিরো ট্রাস্ট’ নীতি অনুসরণ ও সীমিত অ্যাকসেস নীতিও কার্যকর আছে। এমনকি ভেন্ডর বা থার্ড পার্টির সিকিউরিটি মূল্যায়নও করা হয়।

ডিজিটাল লেনদেন ও তথ্য সুরক্ষায় শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের পদক্ষেপ কী?

গ্রাহকসেবায় আধুনিকতা আনতে আমরা ‘শাহজালাল টাচ পে’ অ্যাপ চালু করেছি, যেটি নিরাপদ, ব্যবহারবান্ধব ও রিয়েলটাইম লেনদেন সক্ষম। করপোরেট গ্রাহকরাও অনলাইন প্লাটফর্মে ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছেন। রেমিট্যান্স এখন রিয়েলটাইমে অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ওয়ালেটে পৌঁছে যাচ্ছে। তথ্য সুরক্ষায় মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, এনক্রিপশন (ইন-ট্রানজিট ও অ্যাট-রেস্ট), শক্তিশালী অ্যাকসেস কন্ট্রোল ও লেয়ার সেভেন সিকিউরিটি নিশ্চিত করা হয়েছে। আমাদের সিকিউরিটি টিম ২৪ ঘণ্টা সিকিউরিটি ইনসিডেন্ট অ্যান্ড ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট (SIEM) সিস্টেমের মাধ্যমে মনিটরিং করে। দুর্বলতা চিহ্নিত করতে নিয়মিত পেনিট্রেশন টেস্ট ও ভালনারেবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট করা হয়। এছাড়া ব্যাকআপ নীতিতে অফলাইন ও এয়ার-গ্যাপ কপি সংরক্ষণ করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকি কতটা কার্যকর?

বাংলাদেশ ব্যাংক এখন অনেক বেশি সক্রিয়ভাবে তদারক করছে। নিয়মিত সার্কুলার, থ্রেট অ্যালার্ট ও নির্দেশনা দেয়ার পাশাপাশি ২০২৩ সালের পর আইটি নিরাপত্তা, ক্লাউড গাইডলাইন ও কোর ব্যাংকিং কন্ট্রোলস চালু করেছে। তদারকির ফলে ব্যাংকগুলোতে সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট ও চিফ ইনফরমেশন সিকিউরিটি অফিসার (CISO) পদ সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত অন-সাইট অডিট করে এবং ব্যাংকগুলোকে পিসিআই-ডিএসএস, আইএসও ও সুইফট সিএসপি অডিটের আওতায় এনেছে।

দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা জনবল তৈরিতে কী ঘাটতি আছে এবং কীভাবে তা পূরণ করা যেতে পারে?

ফরেনসিক, ক্লাউড-নেটিভ সিকিউরিটি, থ্রেট ইন্টেল অ্যানালাইসিস ও সিকিউরিটি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দক্ষ জনবল এখনো অপ্রতুল। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে প্রশিক্ষণ, বুটক্যাম্প ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্র্যাকটিক্যাল সাইবার কারিকুলাম এবং ইন্ডাস্ট্রি ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা দরকার। ছোট ব্যাংকগুলোর জন্য Bank Industry Shared SOC (BIS-SOC) মডেল চালু করা যেতে পারে, যাতে তারা যৌথভাবে সাইবার পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর সাইবার নিরাপত্তা মান কেমন?

বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে সাইবার নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বড় ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (MFA, EDR, SIEM ইত্যাদি) অনুসরণ করছে। তবে পরিচালনাগত গভীরতা, ফরেনসিক সক্ষমতা, ইনহাউজ রিসোর্সিং এবং নিয়মিত পেন-টেস্টের ঘনত্বে এখনো কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে। পেশাগত প্রশিক্ষণ, থ্রেট-ইন্টেল শেয়ারিং ও বিনিয়োগ বাড়ালে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছা সম্ভব।

গ্রাহকদের মধ্যে সাইবার সচেতনতা বাড়াতে কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?

বাংলা ভাষায় সংক্ষিপ্ত বার্তা, ছোট ভিডিও, নিয়মিত ফিশিং সিমুলেশন, বড় লেনদেনের আগে সিকিউরিটি টিপস, এবং সন্দেহভাজন লিংক রিপোর্ট করার সহজ পদ্ধতি তৈরি করা দরকার। পাশাপাশি টিভি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এসএমএস-নির্ভর প্রচারণা চালানো উচিত। জাতীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যাংকগুলো যৌথ সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে পারে।

ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে কী ধরনের নীতি ও বিনিয়োগ প্রয়োজন?

ঝুঁকিভিত্তিক গভর্ন্যান্স মডেল, থার্ড পার্টি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট, নিয়মিত পেন-টেস্ট রিভিউ, ডাটা প্রটেকশন ও প্রাইভেসি নীতির বাস্তবায়ন অপরিহার্য। ইন্টারনেট-ফেসিং অ্যাপ্লিকেশনগুলোতে সর্বশেষ লাইসেন্সড সফটওয়্যার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এসওসি, ইডিআর, এসআইইএম, এক্সডিআর, ওয়্যাফ, ব্যাকআপ ও রিকভারি সক্ষমতা বাড়াতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সরকারিভাবে সাইবার ইন্টেল শেয়ারিং ফোরাম, সেক্টরওয়াইড টেবিল-টপ এক্সারসাইজ ও ডিজিটাল রেজিলিয়েন্স সূচক প্রবর্তন করা দরকার।