বাংলাদেশের ব্যাংক খাত ক্রমেই ডিজিটাল হয়ে উঠছে। লেনদেন, রেমিট্যান্স, মোবাইল ব্যাংকিং, কার্ড পেমেন্ট—সবই এখন প্রযুক্তিনির্ভর। এ প্রেক্ষাপটে সাইবার হামলার ঝুঁকিও বেড়েছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বড় কোন কোন সাইবার চ্যালেঞ্জের মুখে আছে?

সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে প্রয়োজন হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ইন্সটলেশন বা হালনাগাদ রাখা। সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি। সেজন্য অনেক ব্যাংক এ খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দেয় না। অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত সাইবার নিরাপত্তা পেশাদারের স্বল্পতা রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে গ্রাহকের পাশাপাশি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সচেতনতা ও গুরুত্বের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। অনেক ব্যাংক মাত্রাতিরিক্ত পুরনো হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ব্যবহার করছে, যেগুলোর হালনাগাদ ভার্সন মূল যন্ত্রাংশ বা পণ্যের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান (ওইএম) বন্ধ করে দিয়েছে। এখানে তৃতীয় পক্ষ বা ভেন্ডরের ঝুঁকি আছে। কারণ ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামোর দুর্বলতা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দক্ষতার কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা না করেই নতুন ডিজিটাল সেবা চালু করা হয়। এটিও একটি চ্যালেঞ্জ।

ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা দিতে রূপালী ব্যাংক ‘রূপালীক্যাশ’ নিয়ে এসেছে। এখানে কেমন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে?

‘রূপালীক্যাশ’ রূপালী ব্যাংক পিএলসির একটি আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে একমাত্র রূপালী ব্যাংক পিএলসিরই নিজস্ব ব্র্যান্ডের মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা রয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা সহজেই দ্রুত ও নিরাপদ লেনদেন করতে পারবেন। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি রূপালীক্যাশের লক্ষ্য মানুষের সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা। মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ‘রূপালীক্যাশ’র মাধ্যমে ইকেওয়াইসি-নির্ভর অ্যাকাউন্ট খোলা, নগদ অর্থ জমা ও উত্তোলন, মোবাইল ওয়ালেট স্থানান্তর, মোবাইল ওয়ালেট ব্যালান্স, লেনদেনের স্টেটমেন্ট পরীক্ষা করা, রেমিট্যান্স গ্রহণ, বেতন প্রদান ও গ্রহণ, মোবাইল রিচার্জ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, মার্চেন্ট বিল পরিশোধ, ওয়ালেট টু ব্যাংকে টাকা স্থানান্তরের মতো নানা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।

হ্যাকিং, ডাটা লিক বা অননুমোদিত লেনদেনের মতো ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রতিটি ব্যাংকেরই নিজস্ব সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা দরকার। এ ব্যবস্থায় মানবিক ত্রুটি বা প্রযুক্তিগত দুর্বলতা মোকাবেলায় কী ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে রূপালী ব্যাংক?

কারো পক্ষেই ডিজিটাল লেনদেন ও তথ্য সুরক্ষা শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব না। কারণ প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবন হচ্ছে। আমাদেরও সেগুলোর সঙ্গে অভিযোজিত হতে হয়। তবুও লেনদেন ও তথ্য সুরক্ষা বৃদ্ধিতে রূপালী ব্যাংক বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। নেটওয়ার্ক সিকিউরিটি জোরদারে ভিপিএন, ফায়ারওয়াল, প্রক্সি সার্ভার ইত্যাদি ব্যবহার হচ্ছে। আর্থিক লেনদেনে ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) ও বায়োমেট্রিক্স ব্যবহার করছি। ২৪/৭ ভিত্তিতে সাইবার সিকিউরিটি কার্যক্রম মনিটরিং করতে সাইবার অপারেশন সেন্টার (এসওসি) বাস্তবায়নকাজ চলমান। ট্রানজিট এবং রেস্ট অবস্থায় ডেটা এনক্রিপশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। সিকিউর কোডিং প্র্যাকটিস মেনে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং লাইভ অপারেশন যাওয়ার আগে সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়ন পদ্ধতি (ভিএপিটি) সম্পন্ন করা হয়। এছাড়া ব্যাংকের সাইবার সিকিউরিটি কার্যক্রম বাড়াতে কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।

দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা পেশাদারের অভাব শুধু ব্যাংকে নয়, সারা দেশেই একটি বড় সমস্যা। ব্যাংক খাতে এ ঘাটতি কতটা প্রকট?

বেশির ভাগ ব্যাংকে সাইবার নিরাপত্তার জন্য আলাদা টিম নেই। কোনো কোনো ব্যাংকে সাইবার নিরাপত্তার জন্য আলাদা টিম থাকলেও পর্যাপ্ত সার্টিফায়েড এবং সাইবার থ্রেট অ্যানালাইসিস বা দ্রুত দুর্ঘটনা মোকাবেলায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জনবলের ঘাটতি রয়েছে। অনেক ব্যাংকে সাইবার নিরাপত্তার জন্য নিয়মিতভাবে মনিটরিং ও দুর্বলতা পরীক্ষা হয় না। বিশেষায়িত সাইবার নিরাপত্তা ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও ব্যাংকিং সেক্টরভিত্তিক কোর্স সীমিত। এখানে সাইবার নিরাপত্তা সংস্কৃতির ঘাটতি আছে। ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরে সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাইবার সিকিউরিটি, থ্রেট ইন্টেলিজেন্স, ডিজিটাল ফরেনসিক বা এআই-ভিত্তিক নিরাপত্তা গবেষণা নেই বললেই চলে। সাইবার সিকিউরিটি স্ট্যান্ডার্ড সম্পর্কিত আইএসও, এনআইএসটি, পিসিআই-ডিএসএস ইত্যাদি পরিপালনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।

এখানে ব্যাংকগুলো কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। ব্যাংক খাতে দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা তৈরির ক্ষেত্রে সাইবার সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক সম্পর্কিত আইএসও-২৭০০১, এনআইএসটি, পিসিআই-ডিএসএস, সাইবার নিরাপত্তা আইন, বাংলাদেশ ব্যাংকের আইসিটি সিকিউরিটি গাইডলাইন ইত্যাদির বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলসহ (বিসিসি) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে ব্যাংকিং সাইবার সিকিউরিটি অ্যাকাডেমি স্থাপন করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন যেমন সিইএইচ, সিআইএসএম, সিআইএসএসপি করানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রির জন্য আলাদা ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা। প্রতিটি ব্যাংকে সাইবার সিকিউরিটি সিমুলেশন ল্যাব স্থাপন করতে হবে । নিয়মিত ফিশিং পরীক্ষা ও ইনসিডেন্ট রেসপন্স ড্রিল পরিচালনা করতে হবে। এছাড়া বাধ্যতামূলকভাবে ব্যাংকগুলোকে নিজেদের সাইবার সিকিউরিটি নিয়মিত অডিট করতে হবে।