বাংলাদেশে ভিসার বর্তমান ব্যবসায়িক অবস্থান ও প্রবৃদ্ধি কেমন?

ভিসা বাংলাদেশের ডিজিটাল পেমেন্ট খাতে একটি শক্তিশালী ও ক্রমবর্ধমান অবস্থানে আছে। গত কয়েক বছরে ই-কমার্স, মোবাইল পেমেন্ট এবং কিউআর পেমেন্টের বিস্তারে আমাদের ট্রানজ্যাকশন ভলিউমে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। বর্তমানে আমরা ৬০টিরও বেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছি। গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ডিজিটাল পেমেন্টের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়ছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্মার্ট করে তুলছে।

কার্ড ছাড়াও আপনারা এ দেশে কী ধরনের ব্যবসা করছেন?

ভিসা এখন আর কেবল একটি কার্ড কোম্পানি নয়—আমরা একটি ডিজিটাল পেমেন্টস নেটওয়ার্ক ও টেকনোলজি কোম্পানি। বাংলাদেশে আমরা ব্যাংক ও ফিনটেক পার্টনারদের সঙ্গে একাধিক উদ্যোগে কাজ করছি, যেমন:

I ভিসা ডিরেক্ট (Visa Direct): তাৎক্ষণিক ব্যক্তি-টু-ব্যক্তি ও ব্যক্তি-টু-বিজনেস ফান্ড ট্রান্সফার।

I ভিসা টোকেন সার্ভিস: অনলাইন ও মোবাইল পেমেন্টে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

I কিউআর ও কনট্যাক্টলেস পেমেন্ট সলিউশন: ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য দ্রুত ও নিরাপদ লেনদেন সুবিধা।

I ডেটা অ্যানালিটিকস ও সাইবার ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস: ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের জন্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও প্রতারণা প্রতিরোধ।

  • এর বাইরেও আরো কিছু আকর্ষণীয় সলিউশন ও সার্ভিস নিয়ে আমরা কাজ করছি, যেমন: ট্যাপ টু ফোন, বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশনের সুবিধাসহ ‘ভিসা পেমেন্ট পাস কি’ সলিউশন, ভিসা ফ্লেক্সিবল ক্রেডেনশিয়াল—একটি মাত্র কার্ড ব্যবহার করে কয়েকটি ফান্ডিং সোর্স থেকে পেমেন্ট করার সুবিধা ইত্যাদি।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাজারকে কতটা সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন?

বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ডিজিটাল অর্থনীতিগুলোর একটি। তরুণ জনগোষ্ঠী, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তার, এবং সরকারের ডিজিটালাইজেশনের প্রতি বিশেষ মনোযোগ ও নীতিসহায়তা—সবকিছুই এ প্রবৃদ্ধির অনুঘটক। বর্তমানে মাত্র প্রায় ২৫ শতাংশ লেনদেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে হয়, তাই বাজারে এখনো বিশাল অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ ক্যাশলেস অর্থনীতি হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত কতটা ডিজিটাল হতে পেরেছে? উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কোন ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে?

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে—ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ, রিয়েল-টাইম পেমেন্ট গেটওয়ে ইত্যাদি এখন অনেক ব্যাংকের নিয়মিত সেবা। তবে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে ইন্টারঅপারেবিলিটি, ডাটা অ্যানালিটিকস ব্যবহারে দক্ষতা এবং কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স ডিজাইনের ক্ষেত্রে। উন্নত দেশগুলোয় ব্যাংক, ফিনটেক ও সরকার মিলে একটি সমন্বিত পেমেন্ট ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে—আমাদেরও সেই সমন্বয় বাড়াতে হবে।

এ দেশের ব্যাংকগুলো সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে কতটা সক্ষম বলে মনে করেন?

বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে এখন অনেক সচেতন এবং তাদের সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। অনেক ব্যাংক মাল্টিলেয়ার সিকিউরিটি আর্কিটেকচার, AI-ভিত্তিক ফ্রড ডিটেকশন ও ২৪/৭ মনিটরিং সেন্টার চালু করেছে। তবে সাইবার হুমকি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই নিয়মিত সিকিউরিটি আপগ্রেড, থ্রেট ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং এবং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন অপরিহার্য। ভিসা এক্ষেত্রে পার্টনার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে সাইবার সিকিউরিটি-সংক্রান্ত নতুন নতুন সলিউশন ও ফিচার নিয়ে আসছে।

গ্রাহকদের অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিতে ভিসার নিরাপত্তা প্রটোকল কেমন?

ভিসার সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক বিশ্বমানের—যার মধ্যে রয়েছে:

I চালিত ফ্রড মনিটরিং সিস্টেম, যা প্রতি সেকেন্ডে ৬৫ হাজারেরও বেশি ট্রানজ্যাকশন বিশ্লেষণ করে।

I টোকেনাইজেশন প্রযুক্তি, যা গ্রাহকের কার্ড নম্বরকে একটি নিরাপদ কোডে রূপান্তর করে।

I ভিসা অ্যাডভান্সড অথরাইজেশন (VAA) ও ভিসা রিস্ক ম্যানেজার (VRM)—ব্যাংকগুলোকে রিয়েল-টাইম ঝুঁকি মূল্যায়নে সহায়তা করে।

এ প্রটোকলগুলো মিলেই গ্রাহকের অর্থ ও তথ্যকে সুরক্ষিত রাখে।

বাংলাদেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম ‘ক্যাশলেস’ অর্থনীতির জন্য কতটা প্রস্তুত? এক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে সেটি কেন?

বাংলাদেশের ইকোসিস্টেম এখন ‘ক্যাশ-লাইট’ অর্থনীতির পথে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। ব্যাংক, ফিনটেক ও সরকার সবাই মিলে পেমেন্ট ইন্টারঅপারেবিলিটি ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার উন্নয়নে কাজ করছে।

তবে এখনো কিছু ঘাটতি আছে:

I ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে পয়েন্ট-অফ-সেল (POS) ও কিউআর অ্যাকসেপ্টেন্স কম।

I গ্রামীণ অঞ্চলে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন অ্যাকসেস সীমিত।

I গ্রাহকদের মধ্যে বিশ্বাস ও সচেতনতার অভাব রয়েছে।

  • এ ক্ষেত্রগুলো উন্নত হলে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে আরো দ্রুত এগোবে।

জনগণকে ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া দরকার?

I সচেতনতা প্রচারণা: নিরাপত্তা ও সুবিধা সম্পর্কে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা।

I উদ্দীপনা (Incentives): ডিজিটাল লেনদেনে ক্যাশব্যাক বা ডিসকাউন্ট সুবিধা।

I স্মার্ট মার্চেন্ট উদ্যোগ: ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহজ ডিজিটাল পেমেন্ট সলিউশন দেয়া।

I ডিজিটাল শিক্ষায় বিনিয়োগ: স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ডিজিটাল ফাইন্যান্স শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি।

ভিসা এসব উদ্যোগে ব্যাংক ও সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল পেমেন্ট নীতিতে আপনারা কী ধরনের নীতিগত সহায়তা প্রত্যাশা করেন?

আমরা চাই—

I প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্যাশ লেনদেনকে নিরুৎসাহিত করা

I ডিজিটাল পেমেন্টকে উৎসাহিত করা এবং যে যে ক্ষেত্রে সম্ভব বাধ্যতামূলক করা

I ফিনটেক ও ব্যাংকের অংশীদারত্বের সুযোগ আরো উন্মুক্ত করা

  • এবং ইনোভেশন-ফ্রেন্ডলি রেগুলেশন—যা নতুন পেমেন্ট প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রয়োগে সহায়তা করবে

এ নীতিগুলো একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্মার্ট ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে সহায়ক হবে।