বর্তমানে সাইবার ঝুঁকি অন্যতম মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ব্যাংকগুলোর অবস্থা কী? তারা কোন ধরনের সাইবার চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছে?

দেশে ক্রমবর্ধমান সাইবার হামলাগুলোর মধ্যে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ফিশিং, রÅvনসমওয়্যার এবং ডিওস বা ডিডিওএস উল্লেখযোগ্য। ব্যাংক খাতে এ ধরনের সাইবার হামলা প্রতিহত করতে সর্বস্তরে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া ব্যাংকগুলোয় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবলের স্বল্পতা, পুরনো সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং নির্দিষ্ট পরিষেবা দাতার ওপর নির্ভরশীল পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হতে না পারা ব্যাংক খাতের সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে মূলত দুর্বল করে তুলছে।

সাইবার নিরাপত্তা তো শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এর সঙ্গে মানবসম্পদ ও প্রশিক্ষণও জড়িত। ব্যাংক খাতে এ ধরনের দক্ষ জনবল তৈরির ক্ষেত্রে কী সীমাবদ্ধতা বা ঘাটতি রয়েছে?

মানসম্মত প্রশিক্ষণের ঘাটতিকে আমি দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা জনবল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচনা করি। যদিও বর্তমানে ইডিজিই প্রকল্পের আওতায় সরকার তরুণ প্রজন্মের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ উদ্যোগ নিয়েছে। তবুও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সুযোগ এখনো সীমিত। এ প্রেক্ষাপটে সরকারের উচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথভাবে সার্টিফাইড সিআইএসও ও সিআইআরটি বিশেষজ্ঞ তৈরির লক্ষ্যে বিশেষায়িত স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করা; যাতে দেশীয় মানবসম্পদকে আন্তর্জাতিক মানের সাইবার বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। পাশাপাশি, সাইবার নিরাপত্তা পেশায় দক্ষতা অর্জনে সময়, পরিশ্রম ও আর্থিক বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে এ খাতের পেশাজীবীদের প্রেরণা ও পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সক্রিয় ভূমিকা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংকের ডিজিটাল কার্যক্রমকে নিরাপদ রাখতে কী কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি?

বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসিএর সব শাখা অনলাইনের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্মার্ট অ্যাপ চালুসহ বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত বাংলা কিউআর স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করছে। ব্যাংকে ব্যবহৃত ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক লেনদেন মাধ্যমের তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সব লেনদেন নিরাপদ ও এনক্রিপ্টেড চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে। তদুপরি প্রতিটি লেনদেনের সময় ওটিপি যাচাইয়ের মাধ্যমে একাধিক স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়।

সাইবার ঝুঁকি ঠেকাতে নীতিনির্ধারক সংস্থাগুলোর ভূমিকা কতটা কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে মাঠপর্যায়ে?

বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি (এনসিএসএ) দেশের সাইবার স্পেস নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং সাইবার হামলার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা প্রদান করে সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশনা দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত প্রযুক্তিগত ঝুঁকি পরিদর্শন কর্মসূচি পরিচালনার মাধ্যমে তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং সাইবার আক্রমণ ঘটলে তা দ্রুত অবহিত করার নির্দেশনা প্রদান করে। এছাড়া এনসিএসএ ব্যাংক খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোর সুরক্ষায় রিয়েল-টাইম থ্রেট ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং প্লাটফর্ম (টিআইএসপি) গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে, যা সাইবার হুমকি শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধে সমন্বিতভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নীতিগত কাঠামো কতটা হালনাগাদ হয়েছে বলে মনে করেন?

২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে অপ্রীতিকর ঘটনার পর দেশের ব্যাংক খাতে সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালায় গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর আওতায় ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সি এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ পরিমার্জন ও হালনাগাদ করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। দেশে অবস্থিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও বিভিন্ন নির্দেশনা অনুসরণের জন্য সময়ে সময়ে চিঠি দেয়া হয়। এ পদক্ষেপগুলো আর্থিক খাতে সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরো শক্তিশালী করেছে।

অনেক সময় ব্যাংকের সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হলেও গ্রাহকের অসচেতনতা থেকেও নানা প্রতারণা ঘটে। গ্রাহক পর্যায়ে ঝুঁকি কমাতে কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?

গ্রাহকদের মধ্যে সাইবার সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এসএমএস, ই-মেইল এবং অ্যাপ নোটিফিকেশনের মাধ্যমে নিয়মিত সতর্কবার্তা প্রেরণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি সহজ ভাষায় সাইবার ঝুঁকি ও প্রতিরোধের উপায় তুলে ধরে ভিডিও, ইনফোগ্রাফিক ও পোস্টার তৈরি করে তা ব্যাংকের শাখা, টিভি চ্যানেল এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্লাটফর্মে প্রচারের মাধ্যমে গ্রাহকদের কার্যকরভাবে সচেতন করা সম্ভব। তবে ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকেও নাগরিকদের সার্বিক সাইবার সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে প্রচারণা চালানো অত্যন্ত প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

সাইবার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে বৈশ্বিক পর্যায়ের ব্যাংকগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর অবস্থান কী?

আন্তর্জাতিকভাবে উন্নত ব্যাংকগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো এখনো উন্নয়নের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলো আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদে বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের সাইবার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ক্রমাগত বৃদ্ধি করছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও ধীরে ধীরে আইসিটি কমপ্লায়েন্স জোরদার, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের সাইবার নিরাপত্তা মান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।