দুর্গা পূজার অর্থনীতি বলতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রতিমা নির্মাণ, বর্ণিল মণ্ডপ, আলোকসজ্জা ও নতুন পোশাকের কেনাকাটা। তবে সপ্তাহব্যাপী এ উৎসবের পেছনে রয়েছে আরো একটি অর্থনৈতিক জগৎ। গ্রাম কিংবা শহরের নির্দিষ্ট এলাকা, এমনকি মন্দির ও মণ্ডপকেন্দ্রিক অস্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও দুর্গা পূজাকে ঘিরে দীর্ঘদিনের মৌসুমি বাণিজ্যের অংশ।
আর্থিকভাবে অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর অনেক নারী-পুরুষ গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেলপাতা, দূর্বাঘাস, আমের পল্লব, ধানের ছড়া, কলাগাছের চারা, বিভিন্ন শস্যদানা, মাটির ঘট, পাটের সুতা ও যজ্ঞের উপকরণ সংগ্রহ করেন। এসব সামগ্রী ঘিরে তৈরি হয় মৌসুমি কর্মসংস্থান। পূজামণ্ডপের পাশাপাশি বাড়িতে পূজার উপকরণ হিসেবেও এগুলোর চাহিদা থাকে। স্থানীয় কৃষিজমি, বাগান ও গ্রামীণ পরিবেশ থেকে সংগ্রহ করা এসব পণ্য বিক্রি করে ক্ষুদ্র বিক্রেতা, গ্রামীণ সংগ্রাহক ও প্রবীণ নারী-পুরুষ বাড়তি আয়ের সুযোগ পান। অনেকে সারা বছর অন্য কাজ করলেও দুর্গা পূজাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর মৌসুমি ব্যবসায় যুক্ত হন।
দুর্গা পূজার মহাসপ্তমীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার নবপত্রিকা স্নান। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী কলাগাছ, কচুগাছ, হলুদগাছ, জয়ন্তী, বেলশাখা, ডালিমশাখা, অশোকশাখা, মানকচু ও ধানগাছ একত্র করে নবপত্রিকা তৈরি করা হয়। পরে তা স্নান করিয়ে পূজামণ্ডপে স্থাপন ও পূজা করা হয়। এ আয়োজনের জন্য কলাগাছের চারা, ধানগাছ, কচু, হলুদ ও বিভিন্ন গাছের শাখা সংগ্রহ করতে হয়। স্থানীয় কৃষক, বাগানমালিক ও সংগ্রাহকদের কাছ থেকে এসব উপকরণ কেনা হয়। উৎপাদন ব্যয় কম হওয়ায় সংগ্রহ ও বিক্রির মাধ্যমে একটি শ্রেণীর মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
দুর্গা পূজার বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে বেলপাতা, দূর্বা ঘাস, আমের পল্লব, তুলসী পাতা, পান পাতা ও নানা ধরনের ফুল ব্যবহার হয়। জবা, পদ্ম, গাঁদা, শিউলি ও অপরাজিতার মতো ফুলের চাহিদাও বাড়ে। এসব পণ্য সাধারণত বড় পাইকারি বাজারের পরিবর্তে স্থানীয় সংগ্রাহক ও সরবরাহকারীদের মাধ্যমে মন্দির, মণ্ডপ এবং খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পৌঁছায়। কেউ বাড়ির আঙিনা বা নিজস্ব জমি থেকে পাতা-ফুল সংগ্রহ করেন, কেউ কৃষক ও বাগানমালিকদের কাছ থেকে কিনে বিক্রি করেন। আবার কেউ গ্রাম থেকে এসব উপকরণ এনে শহরের মন্দির বা মণ্ডপের পাশে অস্থায়ী দোকান বসান।
পূজার উপকরণের তালিকায় আরো রয়েছে ধানের ছড়া, আতপ চাল, তিল, যব, সরিষাসহ বিভিন্ন ধরনের শস্যদানা। কোনো কোনো আচার ও যজ্ঞে আমকাঠ, নির্দিষ্ট শুকনো কাঠ, ঘি ও অন্যান্য উপকরণ প্রয়োজন হয়। গ্রামের নারীরাও শস্য সংগ্রহের সময় এসব উপকরণ জোগাড় করে পূজা মৌসুমে সরবরাহ ও বিক্রি করেন। কিছু অঞ্চলে পাটকাঠি, খড় ও পাটের সুতা পূজার উপকরণ হিসেবেও ব্যবহার হয়। এভাবে উৎসবকেন্দ্রিক মৌসুমি বাণিজ্যের সঙ্গে কৃষিসম্পদ ও গ্রামীণ কারুশিল্পের যোগ তৈরি হয়।
দুর্গা পূজাকে ঘিরে মাটির ঘট, সরা, প্রদীপ ও ছোট পাত্রের বাজারও গড়ে ওঠে। পূজার ঘট স্থাপন ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে মাটির পাশাপাশি পিতল বা তামার পাত্র ব্যবহার হয়। প্রতিমা নির্মাণের বাইরেও মৃৎশিল্পীদের তৈরি এসব ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী উৎসবকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে।
তবে দুর্গা পূজার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। কতটি মণ্ডপে কী পরিমাণ উপকরণ লাগে, বিভিন্ন অঞ্চলে এসব পণ্যের দাম কত, কতজন ক্ষুদ্র বিক্রেতা যুক্ত হন এবং তাদের প্রকৃত আয় কত—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান প্রয়োজন। দেশের প্রায় ৩৪ হাজার মণ্ডপকে ঘিরে বেলপাতা থেকে মাটির ঘট বিক্রির সঙ্গে অন্তত একজন মৌসুমি বিক্রেতাও যুক্ত থাকলে, এ বাণিজ্যের সম্মিলিত পরিসর কম নয়। গ্রামীণ সনাতনী সম্প্রদায়ের মানুষের নিজস্ব সংগ্রহ থাকলেও সবাই স্বয়ংসম্পূর্ণ নন। ফলে পূজার আচার ও বাড়ির পূজায় ব্যবহৃত কৃষিপণ্যের বেচাকেনা অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল মানুষকে কিছুদিনের জন্য হলেও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এনে দেয়।










