এটি কেবল একটি উদযাপনের দিন নয়; বরং নারীর অধিকার, সমতা এবং ক্ষমতায়নের প্রশ্নে বৈশ্বিক সচেতনতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপ ও আমেরিকায় নারী শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং ভোটাধিকারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। সে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯১০ সালে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেতা ক্লারা জেটকিন আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারী দিবসের আলোচনার পরিধি আরো বিস্তৃত হয়েছে। আজকের দিনটি শ্রম ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে শুরু করে নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, নিরাপত্তা এবং প্রজনন অধিকারের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে। নারীর স্বাস্থ্য ও শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রকৃত অর্থে তার ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।

এ বছর প্রতিপাদ্য হলো ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’—এ প্রতিপাদ্যের আলোকে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

স্বাস্থ্য ও পুষ্টি: ক্ষমতায়নের মূল চাবিকাঠি

নারীর স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও ক্ষমতায়ন সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানসহ পরিবার পরিকল্পনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা জরুরি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে গর্ভাবস্থা, প্রসবকাল ও প্রসবের পর ৪২ দিনের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ১৫৩ জন। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ হার কমেছে, তবু সহযোগিতা ও নজরদারি জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। বিডিএইচএসের (বাংলাদেশে ডেমোগ্রাফি অ্যান্ড হ্যালথ সারভি) ২০২২ তথ্যানুযায়ী, প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতার হার প্রায় ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এটি ৪৪-৪৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, যা প্রসবপূর্ব জটিলতা, নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি ও প্রিম্যাচিউর জন্ম বাড়ায়।

বাল্যবিবাহ ও কিশোরী মাতৃত্ব

নারীর উন্নয়নের অন্যতম প্রধান বাধা হলো বাল্যবিবাহ। ইউনিসেফ, ইউএন উইমেন ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাল্যবিবাহের হারে বাংলাদেশ এশিয়ার শীর্ষে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, ৫১ শতাংশ মেয়ের বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়। ফলে কিশোরী মাতৃত্ব, অপুষ্টি, উচ্চ মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি ও দারিদ্র্যের চক্র তৈরি হয়, যা তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বন্ধ করে দেয়।

পরিবার পরিকল্পনা: যৌথ দায়িত্ব

নারীর ক্ষমতায়ন ও পরিবার পরিকল্পনার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যখন একজন নারী তার শরীর, স্বাস্থ্য ও মাতৃত্বের সময় সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ পান, তখনই প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়ন সম্ভব। বাংলাদেশে দম্পতিদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের হার প্রায় ৬০ শতাংশ, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি এখনো নারীর একক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। প্রকৃতপক্ষে, পরিবার পরিকল্পনা একটি যৌথ সিদ্ধান্ত এবং এতে নারী-পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ অপরিহার্য। দম্পতি একসঙ্গে সন্তান সংখ্যা ও ব্যবধান নির্ধারণ করলে পরিবার আরো সুস্থ, স্থিতিশীল ও পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

নারীর স্বাস্থ্য ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে যে বিষয়ে জোর দেয়া জরুরি, তা হলো নারী স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ, পরিবার পরিকল্পনায় নারী-পুরুষের যৌথ অংশগ্রহণ, কিশোরী ও তরুণদের জন্য প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্তকরণ।

নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা অনতিলম্বে কমানো

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতি চারজন নারীর মধ্যে তিনজন (৭৬ শতাংশ) তাদের জীবনে অন্তত একবার কোনো না কোনোভাবে (শারীরিক, যৌন, মানসিক বা অর্থনৈতিক) সহিংসতার শিকার হন, বিবাহিত নারীদের প্রায় ৪৯ শতাংশ গত ১২ মাসে তাদের স্বামীর মাধ্যমে কোনো না কোনো নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, নির্যাতিত নারীদের মধ্যে প্রায় ৬৪ শতাংশ কখনই তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের কথা কাউকে জানান না। অর্ধেকের বেশি নারী (৫১ দশমিক ৫ শতাংশ) জানেন না কোথায় অভিযোগ করতে হয়। গত বছরের তুলনায় জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও ধর্ষণের অভিযোগের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেই অন্তত ২৭২ নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৭০ জন ধর্ষণের শিকার।

নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সুষ্ঠু আইনি প্রয়োগ বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে সহিংসতা প্রতিরোধ করতে হবে।

সত্যিকারের সমতা তখনই সম্ভব, যখন নারী ও পুরুষ উভয়ই একে অন্যের পাশে এগিয়ে আসবে। পরিবার পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সমানভাবে অংশগ্রহণ করবে। নারী-পুরুষ সমতার ভিত্তিতে আমাদের সমাজকে শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও টেকসই করতে হবে। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি ব‍্যক্তি পর্যায়ে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশ গঠনে নারীদের এগিয়ে যাওয়া হোক বিশ্ব নারী দিবসের চাওয়া।