আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬-এর বৈশ্বিক প্রচারণার মূল প্রতিপাদ্য ‘Give to Gain’—বাংলায় যার মর্মার্থ দাঁড়ায়, ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’। অর্থাৎ নারীদের অধিকার, সুযোগ ও নেতৃত্বে বিনিয়োগ করলে কেবল নারীরাই নয়, গোটা সমাজই লাভবান হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ বছরের নারী দিবসটি এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সময়ে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যার মাধ্যমে দেশে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তনের পর এ নির্বাচন দেশের গণতন্ত্রকে নতুনভাবে সাজানোর আশা জাগিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে নির্বাচনের ফলাফল আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাও তুলে ধরেছে—রাজনৈতিক আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নারীরা দৃশ্যমান ভূমিকা রাখলেও ক্ষমতার বণ্টনের সময় তারা প্রায় অনুপস্থিত থেকে যায়।
এ প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে—জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষ যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব না পায়, তবে সে গণতন্ত্র কতটা পূর্ণাঙ্গ হতে পারে?
বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ, যার মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ২৯ লাখ নারী ভোটার। অর্থাৎ ভোটারদের প্রায় অর্ধেকই নারী। নির্বাচনকালীন তারা সমান উৎসাহ নিয়ে ভোট দেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু প্রার্থী হওয়া কিংবা নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে সে উপস্থিতি আশ্চর্যজনকভাবে কম।
২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রায় দুই হাজার প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৭৮ জন ছিলেন নারী, যা মোট প্রার্থীর ৪ শতাংশেরও কম। ফলাফল আরো হতাশাজনক—৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে মাত্র সাতজন নারী সরাসরি নির্বাচিত হতে পেরেছেন। নতুন গঠিত মন্ত্রিসভায়ও নারীর উপস্থিতি সীমিত; মাত্র তিনজন নারী মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মিলিয়ে মোট সদস্যের খুবই সামান্য অংশ নারী।
বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে নারীরা জনসংখ্যার অর্ধেক—এ পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এখানেই একটি বৈপরীত্য চোখে পড়ে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে প্রায়ই নারীর ক্ষমতায়নের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। গত কয়েক দশকে নারীদের শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে। তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে লক্ষ নারী শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। একই সঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদেও নারী নেতৃত্ব দেখা গেছে, যা বিশ্বব্যাপী দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
কিন্তু এ প্রতীকী অগ্রগতির আড়ালে রয়েছে আরেকটি বাস্তবতা—সমাজের বিস্তৃত স্তরে নারীরা এখনো নানা কাঠামোগত বাধার মুখোমুখি।
নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। অনেক নারীই এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে কম মজুরির কাজে নিয়োজিত, যেখানে সামাজিক সুরক্ষা বা কর্মস্থলের নিরাপত্তা সীমিত। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন তাই নারীর অবস্থান এখনো অসম ও ভঙ্গুর।
নারীর প্রতি সহিংসতাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক বিবাহিত নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে পারিবারিক বা দাম্পত্য সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এ ধরনের সহিংসতা শুধু মানবাধিকারের লঙ্ঘনই নয়, বরং নারীদের আত্মবিশ্বাস, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বে আগ্রহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো বাল্যবিবাহ। দক্ষিণ এশিয়ায় বাল্যবিবাহের হার এখনো বাংলাদেশেই সর্বোচ্চ। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের অর্ধেকেরও বেশি ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়েছে। বাল্যবিবাহ মেয়েদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত করে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় এবং তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত করে দেয়।
এ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই যখন আমরা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দিকে তাকাই, তখন দেখা যায় নারীরা এখনো ক্ষমতার কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছেন। অথচ জাতীয় নীতিনির্ধারণ—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা ন্যায়বিচার—সবকিছুই নির্ভর করে সংসদ ও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ওপর। সেখানে নারীদের উপস্থিতি সীমিত থাকলে জনসংখ্যার অর্ধেকের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়।
বাংলাদেশে নারীদের জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যা নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রবর্তিত হয়েছিল। তবে এ আসনগুলোর সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না; বরং রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মনোনীত করে। ফলে অনেক সময় এ ব্যবস্থায় নারীদের স্বাধীন রাজনৈতিক ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র গড়ে তুলতে চায়, তবে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিবেচনা করা জরুরি। সংরক্ষিত আসনের নারীদের সরাসরি নির্বাচনের সুযোগ সৃষ্টি করা হলে তাদের গণতান্ত্রিক বৈধতা ও জবাবদিহিতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া। প্রয়োজন হলে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে এ বিষয়ে ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করা যেতে পারে।
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল নির্বাচনী সংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করা। নারীদের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল সক্ষমতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যতে আরো বেশি নারী নেতৃত্বের পথে এগিয়ে আসতে পারবেন। একই সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণও অত্যন্ত জরুরি।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬-এর মূল বার্তা—‘Give to Gain’—বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। নারীর ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি একটি দূরদর্শী জাতীয় বিনিয়োগ। যখন নারীরা নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করেন, তখন নীতিনির্ধারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবার কল্যাণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলো আরো গুরুত্ব পায়।
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়ার সময় এসেছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদের সদস্যদের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে, সেটি দেশের গণতন্ত্রের অন্যতম বড় ঘাটতি, অর্থাৎ নারীদের অপর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব, দূর করার উদ্যোগ নেয়ার।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রাম, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক উন্নয়নের প্রতিটি পর্যায়েই নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তারা ভোট দেন, কাজ করেন, পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে নেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে তাদের উপস্থিতি এখনো অপ্রতুল।
একটি জাতি তখনই পূর্ণ সম্ভাবনায় এগিয়ে যেতে পারে, যখন তার নারী ও পুরুষ উভয়েই সমানভাবে নেতৃত্বে অংশ নিতে পারে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে মনে রাখতে হবে—নারীদের ক্ষমতায়নের পথ খুলে দেয়া মানেই দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা এবং সমাজকে আরো ন্যায়সংগত করে তোলা।
কারণ সত্যটি খুবই সহজ—বাংলাদেশ যখন নারীদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়, তখন পুরো দেশই এগিয়ে যায়।









