বিশ্ব হার্ট দিবসে এবারের প্রতিপাদ্যের তাৎপর্য কী? 

এ বছর বিশ্ব হার্ট দিবসের প্রতিপাদ্য—‘ডোন্ট মিস আ বিট’। এর মূল উদ্দেশ্য হলো হৃদরোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং হৃদরোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডের যত্ন নেয়া। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় দুই কোটি মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। একইভাবে বাংলাদেশেও প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। মৃত্যুহার যেমন বেশি, তেমনি প্রতি বছর হৃদরোগ শনাক্তের হারও অনেক বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর প্রায় ৯ লাখ মানুষ নতুন করে হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে বা শনাক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ দৈনিক হিসাবে গড়ে প্রায় তিন হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং প্রতিদিন গড়ে সাত শতাধিক মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে।

হৃদরোগ প্রতিরোধে কী করা উচিত? 

হৃদরোগ প্রতিরোধের জন্য কী করা প্রয়োজন এবং প্রতিরোধ করলে কতটা সুবিধা পাওয়া সম্ভব এটি জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যেসব হৃদরোগের কথা বলি বা হৃদরোগের ঝুঁকির কথা বলি, সেগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ শুধু প্রতিরোধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আগে আমরা বলতাম, ৪০ বছরের পর কার্ডিয়াক স্ক্রিনিং করা উচিত। কিন্তু এখন যেহেতু কম বয়সীদের মধ্যেও হৃদরোগের ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে, তাই ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে সবাইকে অন্তত বছরে একবার হৃদরোগের ঝুঁকি পরীক্ষা করা উচিত। প্রথমেই দেখতে হবে রক্তচাপ কেমন। এরপর লিপিড প্রোফাইল বা কোলেস্টেরলের মাত্রা কেমন আছে, সেটি জানা প্রয়োজন। কোলেস্টেরল অস্বাভাবিক থাকলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ডায়াবেটিস আছে কিনা, সেটিও জানা উচিত এবং থাকলে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসের দিকেও নজর দিতে হবে। আমাদের খাদ্যতালিকায় যে খাবারগুলো হৃদযন্ত্রের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়, সেগুলো বর্জন করতে হবে।

হৃদরোগ শনাক্ত করতে প্রাথমিকভাবে কী কী পরীক্ষা করা হয়? 

হৃদরোগের সমস্যা মনে হলে প্রথমে এক্স-রে করা যেতে পারে। এক্স-রে করে হার্টের আকার স্বাভাবিক আছে কিনা, সেটি বোঝা যায়। দ্বিতীয়ত, ইসিজি করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে হার্টে বড় কোনো ঝুঁকি আছে কিনা, বর্তমানে হার্টের অবস্থা কেমন, কোনো হার্ট অ্যাটাক হয়েছে কিনা বা হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা আছে কিনা সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। আরেকটু এগিয়ে গেলে ইকো করা যায়। ইকোর মাধ্যমে হার্টের চেম্বারগুলো কেমন আছে, হার্টের ভালভগুলো কেমন আছে এবং হার্টের কার্যক্ষমতা কেমন এসব সহজেই নির্ণয় করা সম্ভব।

এরপর এক্সারসাইজ টলারেন্স বা ইটিটি করা যেতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো একজন মানুষ কতটুকু স্ট্রেস নিতে পারে এবং কতটুকু স্ট্রেসে তার কার্ডিয়াক ঝুঁকি হতে পারে—সেগুলো শনাক্ত করা।

12

ছবি: স্কয়ার হসপিটালস

আধুনিক প্রযুক্তির কথা বললে ক্যালসিয়াম স্কোর করা যায়। এটি খুব সহজ একটি পরীক্ষা। এতে কোনো ইনজেকশন বা ডাইয়ের প্রয়োজন হয় না। শুধু হার্টের রক্তনালিতে ক্যালসিয়ামের মাত্রা কেমন, সেটি জেনে হার্টের রক্তনালির রোগ আছে কিনা, তা শনাক্ত করা যায়। এরপর সিটি করোনারি এনজিওগ্রাম করা যায়। এর মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিশ্চিত হওয়া যায় হার্টের রক্তনালিতে কোনো ব্লক আছে কিনা বা ব্লক শুরু হচ্ছে কিনা। সবশেষে রয়েছে করোনারি এনজিওগ্রাম। বর্তমানে এটি প্রায় জেলা পর্যায়েও চলে গেছে। এটি নিরাপদ একটি পরীক্ষা এবং অল্প সময়ের মধ্যেই করা সম্ভব। এসব পরীক্ষা পর্যায়ক্রমে করলে খুব দ্রুত রোগ নির্ণয় করা সম্ভব এবং রোগটি কোন পর্যায়ে আছে, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।

হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে কোন লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে? 

হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাদের হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের বুকে ব্যথা হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। কার্ডিয়াক ব্যথা সাধারণত বুকের মাঝামাঝি অংশে হয়। এটি নির্দিষ্ট কোনো একটি পয়েন্টে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক সময় ব্যথাটি চাপ দেয়ার মতো বা কমপ্রেসিভ হয় এবং গলা, বাঁ হাত, ডান হাত, পিঠ কিংবা ঘাড়ের দিকে ছড়িয়ে যেতে পারে। ব্যথার সঙ্গে যদি অতিরিক্ত ঘাম হয়, বমি বমি ভাব বা বমি হয়, অথবা মনে হয় অজ্ঞান হয়ে যাবেন কিংবা অচেতন হয়ে যান—তাহলে কোনোভাবেই দেরি করা যাবে না। এ ধরনের ব্যথা হলে হাতের কাছে যদি ইকোস্পরিন জাতীয় ট্যাবলেট থাকে, তাহলে চারটি ট্যাবলেট চিবিয়ে খাওয়া যেতে পারে। তবে শুধু ওষুধ খেয়ে বসে থাকলে হবে না। পাশাপাশি দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হবে এবং ইসিজি করতে হবে। প্রয়োজনে কিছুক্ষণ পর আবার ইসিজি করা যেতে পারে। আরো বড় কোনো সেন্টারে যাওয়ার সুযোগ থাকলে সেখানে যেতে হবে। হৃদরোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কার হলো ট্রপোনিন। তবে ব্যথা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি পরীক্ষা করলে অনেক সময় পজিটিভ নাও আসতে পারে। সাধারণত কিছু সময় পর এটি রক্তে আসে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েক ঘণ্টা পর পরীক্ষা এবং পরবর্তী সময়ে আবার পরীক্ষা করা যেতে পারে।

যদি হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ থাকে এবং ট্রপোনিন বেশি থাকে, তাহলে যেখানে হৃদরোগের চিকিৎসার সুব্যবস্থা আছে, অর্থাৎ করোনারি কেয়ার ইউনিট বা সিসিইউ রয়েছে—এমন হাসপাতালে দ্রুত রোগীকে নিতে হবে। সেখানে কার্ডিওলজিস্ট বা জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসা শুরু করতে হবে।

হৃদরোগের চিকিৎসায় বাংলাদেশের সক্ষমতা এখন কোন পর্যায়ে? স্কয়ার হাসপাতালের সক্ষমতা কতটুকু ?

বর্তমানে হৃদরোগের চিকিৎসায় ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। আমি বাংলাদেশ সোসাইটি অব কার্ডিয়াক ইন্টারভেনশনের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। সে কারণে বিষয়টি আমার জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ। আগে শুধু রোগ শনাক্ত করার জন্য, বিশেষ করে এনজিওগ্রামের জন্য, আমাদের অনেক সময় পার্শ্ববর্তী দেশে যেতে হতো বা সহযোগিতা নিতে হতো। এখন সে পরিস্থিতি নেই। বাংলাদেশে বিভাগীয় পর্যায়ের পাশাপাশি জেলা পর্যায়েও অনেক জায়গায় ক্যাথল্যাবের সুবিধা চলে গেছে। বিভাগীয় শহরসহ প্রায় প্রতিটি মেডিকেল কলেজ, সরকারি ও বেসরকারি দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানেই ক্যাথল্যাবের সুবিধা রয়েছে। ফলে হৃদরোগ নির্ণয় বা এনজিওগ্রাম করার সক্ষমতা বাংলাদেশে অনেক বেড়েছে এবং তুলনামূলকভাবে অল্প খরচেই রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে।

স্কয়ার হাসপাতালের সক্ষমতার কথা যদি বলি, তাহলে গত তিন বা পাঁচ বছর আগের তুলনায় এখন হৃদরোগের চিকিৎসা ও ইন্টারভেনশনের সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। মানুষের আস্থার জায়গাটিও অনেক বেশি তৈরি হয়েছে।

স্কয়ার হাসপাতাল বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ করপোরেট হাসপাতাল এবং অন্যতম বড় কার্ডিয়াক সেন্টার হিসেবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। ইন্টারভেনশনের যতগুলো মডালিটি বিশ্বব্যাপী বা বাংলাদেশে বর্তমানে পাওয়া যায়, তার প্রায় ৯৫ শতাংশ সুবিধা এখন স্কয়ার হাসপাতালে রয়েছে। সক্ষমতার দিক থেকে আমরা অনেক এগিয়ে গেছি।

হৃদরোগ প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসকদের ভূমিকা যথেষ্ট কি? সামাজিক ও নীতিগত উদ্যোগ কী হতে পারে?

হৃদরোগের বিষয়টি শুধু একজন ব্যক্তির সমস্যা নয়। এটি পরিবার এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই হৃদরোগ প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু একজন ব্যক্তির নয়। প্রতিরোধের জন্য চিকিৎসকদের যেমন এগিয়ে আসতে হবে, তেমনি রাজনীতিবিদ, পলিসিমেকার, সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং গণমাধ্যমকেও এগিয়ে আসতে হবে। একজন মানুষের পক্ষে যে কাজটি কঠিন, ১০ জন মানুষ একসঙ্গে করলে সেটি আর কঠিন থাকে না।

ভবিষ্যতের কার্ডিয়াক চিকিৎসা সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী ?

আমরা এখন গ্লোবালাইজেশনের যুগে বসবাস করছি। পার্শ্ববর্তী দেশ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কী করছে, তাদের সঙ্গে আমাদের মতবিনিময় করতে হবে। প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সহযোগিতামূলকভাবে কাজ করতে হবে। দক্ষ জনবল তৈরি করতে দেশে যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে, সেটি আরো কার্যকর করতে হবে। আর যে প্রশিক্ষণ দেশে নেই, প্রয়োজন হলে সেই প্রশিক্ষণের জন্য চিকিৎসকদের দেশের বাইরে পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি পর্যায় থেকে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি দক্ষ জনবল তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা নেয়, তাহলে দেশের সব জায়গার মানুষ উপকৃত হবে।