ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটাল প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় কী ধরনের পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে? বর্তমানে হাসপাতালের সবচেয়ে বড় অর্জন কী বলে মনে করেন?

বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রায় ৮০ শতাংশই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে ঢাকায়। সরকারি হাসপাতালগুলোর বহির্বিভাগ মূলত দুপুর পর্যন্ত পরিচালিত হওয়ায় এবং ঢাকাকেন্দ্রিক বিপুল জনসংখ্যার চাপের কারণে সঠিক সময়ে সুসংগঠিত সেবা পাওয়া চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। ইউনাইটেড গ্রুপ তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে চিকিৎসাসেবাকে মানুষের কাছে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করার লক্ষ্য নিয়ে রাজধানীর মাদানী এভিনিউতে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটাল প্রতিষ্ঠা করেছে।

সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে আমরা চিকিৎসাসেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছি। আমাদের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগে দেশের বরেণ্য অধ্যাপক একেএম মহসিনের নেতৃত্বে বিনা অস্ত্রোপচারে ইএসডব্লিউএল (এক্সট্রাকরপোরিয়াল শক ওয়েভ লিথোট্রিপসি) প্রযুক্তিতে কিডনি ও পিত্তনালির পাথর গুঁড়ো করে নিরাময়ের মতো বিশ্বমানের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া হৃদরোগ চিকিৎসায় তিনটি ক্যাথল্যাব, কিউএফআর ও বাইপ্লেন প্রযুক্তি, পূর্ণাঙ্গ নিউরোলজি বিভাগ এবং আধুনিক ইমার্জেন্সি ব্লকের পাশাপাশি সফলভাবে রোবোটিক সার্জারি শুরু করেছি। এ বছরই ইনশা আল্লাহ লিভার ও কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট চালু হতে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় সংযোজন হলো হাসপাতালে বিশ্বমানের অনকোলজি বা ক্যান্সার কেয়ার সেন্টার, যাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে বলি ‘ওয়ান্ডার ওয়ার্ল্ড’। এখানে সাইবারনাইফ, টোমোথেরাপি ও লিন্যাকের মতো সর্বাধুনিক রেডিওথেরাপি ও রেডিওসার্জারি যুক্ত করা হয়েছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিরল।

হাসপাতালের কোন বিভাগে বর্তমানে রোগীর চাপ বেশি এবং সেই চাপ সামলাতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে?

বর্তমানে দেশে ডেঙ্গু ও হামের বেশ প্রাদুর্ভাব রয়েছে। এ ধরনের সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছি। হামের সংক্রমণ ঝুঁকি এড়াতে আমরাই সম্ভবত প্রথম বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে একটি পৃথক আইসোলেটেড ব্লক তৈরি করেছি। এছাড়া ডেঙ্গু আক্রান্তদের জন্য আমাদের জরুরি বিভাগ ও ভর্তি শাখা ২৪/৭ খোলা রাখা হয়েছে এবং ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগ নিরবচ্ছিন্নভাবে রক্ত ও প্লাটিলেট সরবরাহ নিশ্চিত করছে। পাশাপাশি আমাদের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটগুলো—যেমন অ্যাডাল্ট মেডিকেল আইসিইউ, সার্জিক্যাল আইসিইউ, নিওনেটাল আইসিইউ এবং পেডিয়াট্রিক আইসিইউ—সবসময়ই পূর্ণ সক্ষমতায় রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতাল খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী বলে মনে করেন—দক্ষ জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ব্যয় নাকি রোগীর আস্থা?

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাধারণ মানুষের মাঝে প্রচলিত ‘বেসরকারি হাসপাতাল মানেই অত্যন্ত ব্যয়বহুল’—এ ধারণা দূর করা। আমরা সাশ্রয়ী মূল্যে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য মানসম্মত সেবা পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের হসপিটালে যেমন আছে স্বল্প দামের ওয়ার্ড, তেমনি আছে সুসজ্জিত কেবিন দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের সঠিক সমন্বয়। শুধু দামি ও আধুনিক সরঞ্জাম আনলেই চলে না, সেগুলোর সঠিক ব্যবহারের জন্য অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান প্রয়োজন। আমরা যেকোনো আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করছি এবং কর্মীদের প্রতিনিয়ত প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।

3

বিদেশমুখী রোগীদের দেশে চিকিৎসা দিতে হাসপাতালটি কী ধরনের বিশেষায়িত সেবা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে?

বর্তমানে পরিবেশ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। প্রতি বছর বাংলাদেশীরা বিদেশে চিকিৎসা বাবদ প্রায় ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) ডলারের বেশি ব্যয় করেন, যার বড় অংশই যায় ক্যান্সার চিকিৎসায়। বিদেশে যাতায়াত, ভিসা ও থাকার খরচের পাশাপাশি রোগীরা চরম মানসিক ও আর্থিক বিপর্যয়ে পড়েন।

আমরা ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালে আন্তর্জাতিক মানের ক্যান্সার ও ট্রান্সপ্লান্ট চিকিৎসা নিশ্চিত করে এ ট্রাভেল হ্যাসেল ও অর্থের অপচয় রোধ করতে কাজ করছি। এ সুসংগঠিত সেবা চালু হলে কেবল দেশীয় রোগীই নন, সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশ থেকেও রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে আসবেন বলে আমরা আশাবাদী। সবশেষে আমি দেশের মানুষের উদ্দেশে একটি কথাই বলতে চাই—স্বাস্থ্যসেবা কেবল একটি নির্দিষ্ট রোগ বা সাময়িক লক্ষণের চিকিৎসা করা নয়, এটি হলো একজন মানুষের সার্বিক শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার টোটাল কমপ্লিট ম্যানেজমেন্ট। ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালে আমাদের অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা শুধু প্রেসক্রিপশন লেখেন না, তারা মনোযোগ সহকারে রোগের ইতিহাস ও ব্যাকগ্রাউন্ড শোনেন। একটি নিখুঁত চিকিৎসার প্রথম শর্ত হলো সঠিক ডায়াগনোসিস বা রোগ নির্ণয়। সেজন্য আমাদের রয়েছে দেশের অন্যতম সেরা ও সম্পূর্ণ নিখুঁত প্যাথলজি ও ইমেজিং ল্যাব সাপোর্ট।