বর্তমানে বাংলাদেশে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর প্রবণতা বাড়ছে। দেশের সামগ্রিক হৃদরোগ পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?

বর্তমানে হৃদরোগে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, হৃদরোগ বৃদ্ধির পেছনে একক কোনো কারণ নেই; এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। পারিবারিক ও জেনেটিক কারণের পাশাপাশি ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, রেড মিট, ফাস্টফুড, কোমল পানীয় ও পরিবেশদূষণ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এসব কারণে শরীরের চর্বি বিপাকপ্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। ফলে রক্তনালিতে কোলেস্টেরল ও ক্যালসিয়াম জমে প্লাক তৈরি হয়। হৃৎপিণ্ডের রক্তনালিতে এমন জমাট তৈরি হলে তাকে করোনারি আর্টারি ডিজিজ বলা হয়। একই ধরনের পরিবর্তন মস্তিষ্কের রক্তনালিতে হলে স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হয়।

তবে আশার বিষয় হলো হৃদরোগের অনেক ঝুঁকিই প্রতিরোধযোগ্য।

বর্তমানে তরুণদের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক বাড়ছে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে কোন বিষয়গুলোতে নজর দেয়া প্রয়োজন?

তরুণদের ক্ষেত্রে প্রথমেই পারিবারিক ইতিহাস জানতে হবে। পিতৃ ও মাতৃ—উভয় দিকের পরিবারে করোনারি আর্টারি ডিজিজ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা ধূমপানের ইতিহাস আছে কিনা, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। এরপর নিজের জীবনযাপনের দিকে নজর দিতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে হৃৎপেশির দেয়াল মোটা হয়ে যেতে পারে। এতে হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক সংকোচন ও প্রসারণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই রক্তচাপ, হৃৎস্পন্দন, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

বাংলাদেশের আধুনিক কার্ডিয়াক সার্জারির অগ্রযাত্রা সম্পর্কে জানতে চাই। এক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতা কতটা বেড়েছে?

১৯৯৫ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে আমরা এক্ষেত্রে একটি ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছি। এরপর বাংলাদেশের কার্ডিয়াক সার্জারি ধারাবাহিকভাবে এগিয়েছে এবং আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে। প্রযুক্তিগতভাবেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে হার্ট-লাং মেশিন ব্যবহার করে ওপেন হার্ট সার্জারি করা হতো। পরে অফ-পাম্প বা বিটিং হার্ট সার্জারির প্রসার ঘটেছে। এ পদ্ধতিতে হৃৎপিণ্ড চালু রেখেই বাইপাস সার্জারি করা সম্ভব। আগে বাইপাসে প্রধানত পায়ের শিরা ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে বুকের অভ্যন্তরীণ স্তনধমনি বা ইন্টারনাল ম্যামারি আর্টারি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রয়োজনে দুই পাশের ইন্টারনাল ম্যামারি আর্টারি এবং হাতের রেডিয়াল আর্টারিও ব্যবহার করা যায়। উপযুক্ত রোগী নির্বাচন ও যথাযথভাবে অস্ত্রোপচার করা গেলে এসব গ্রাফটের মাধ্যমে টোটাল আর্টেরিয়াল করোনারি বাইপাসের ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।

কার্ডিয়াক সার্জারির সফলতা নিশ্চিত করতে অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি আর কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ?

কার্ডিয়াক সার্জারির সফলতা শুধু অস্ত্রোপচারের ওপর নির্ভর করে না। অপারেশনের আগে, চলাকালে ও পরে—তিন পর্যায়েই রোগীর যত্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হার্ট অ্যাটাকের পর কখন অস্ত্রোপচার করা হবে, রোগীর হার্ট ফেইলিউরের মাত্রা কত, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা, ফুসফুসে সংক্রমণ বা অ্যাজমা আছে কিনা কিংবা আগে স্ট্রোক হয়ে থাকলে কত দিন আগে হয়েছে—এসব বিবেচনা করে অস্ত্রোপচারের সময় নির্ধারণ করতে হয়। অপারেশন থিয়েটার ও আইসিইউতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুক খোলা ও বন্ধ করার সময় অপ্রয়োজনীয় টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। রক্তপাত যথাযথভাবে বন্ধ করে সতর্কতার সঙ্গে বুক বন্ধ করতে হবে। ভেতরে রক্ত জমে থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অস্ত্রোপচারের পর দ্রুত রোগীকে এক্সটিউবেট করা, ফিজিওথেরাপি দেয়া, হাঁটাচলা করানো এবং রক্তে শর্করা ও হেমোডায়নামিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। জটিল রোগীর ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী ইন্ট্রা-অ্যাওর্টিক বেলুন পাম্পের মতো সাপোর্ট ব্যবহার করা হয়।

এ ধরনের অস্ত্রোপচারে একজন সার্জন একা কাজ করেন না। অ্যানেসথেশিয়া টিম, পারফিউশনিস্ট, নার্সিং টিম ও আইসিইউ টিমের সমন্বয় অপরিহার্য। তাই দক্ষ জনবল তৈরি করা কার্ডিয়াক চিকিৎসার অন্যতম প্রধান শর্ত।

রোবোটিক সার্জারিসহ আধুনিক প্রযুক্তি কার্ডিয়াক সার্জারিতে কী ধরনের পরিবর্তন এনেছে? বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর প্রয়োগ কতটা সম্ভব?

রোবোটিক সার্জারির সুবিধা রয়েছে। ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করা যায় এবং কসমেটিক সুবিধাও পাওয়া যায়। তবে এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এর জন্য রোবট, বিশেষ যন্ত্রপাতি, সফটওয়্যার আপডেট ও নির্দিষ্ট অপারেশন থিয়েটার প্রয়োজন হয়।

একটি অস্ত্রোপচার প্রচলিত পদ্ধতিতে ৫-৬ লাখ টাকায় করা সম্ভব হলেও একই কাজ রোবোটিক পদ্ধতিতে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে করা সাধারণ রোগীর জন্য কতটা বাস্তবসম্মত, তা ভাবতে হবে।

বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬ উপলক্ষে সাধারণ মানুষের প্রতি আপনার বার্তা কী?

নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করতে হবে এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। শুধু ব্যায়াম করলেই হবে না, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ও উচ্চ ক্যালরির খাবার গ্রহণ করলে হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখা কঠিন। আমি স্বাস্থ্যশিক্ষার ওপরও জোর দিতে চাই। শুধু একাডেমিক শিক্ষা নয়, স্বাস্থ্য ও জীবনযাপন সম্পর্কেও শিক্ষা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারলে দেশও এগিয়ে যাবে।