বিশ্ব হৃদরোগ দিবস ২০২৬-এর এবারের প্রতিপাদ্য ‘ডোন্ট মিস এ বিট’। এ প্রতিপাদ্যের মূল বার্তাটি কী? ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিপাদ্য থেকে মানুষ কীভাবে সচেতন হতে পারেন?

‘ডোন্ট মিস এ বিট’-এর বাংলা অর্থ অনেকে অনেক রকমভাবে করেছেন, ‘প্রতিটি হৃৎস্পন্দনই গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘প্রতিটি হৃৎস্পন্দনের প্রতি নজর দিতে হবে’। বিষয়টি মূলত সচেতনতার। আমাদের প্রত্যেকটি হৃৎস্পন্দন মূল্যবান, কারণ হৃৎস্পন্দনই জীবন। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সচেতনভাবে নিজের হৃদযন্ত্রের যত্ন নিতে হবে।

এজন্য হৃদরোগের ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। কারো ডায়াবেটিস থাকলে সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কোলেস্টেরল বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে সেটিও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে হবে। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নজর দিতে হবে, যাতে হৃদযন্ত্র সুস্থ থাকে।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দেয়ার পর রোগীর কী করা উচিত বা কত দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেয়া জরুরি?

হৃদযন্ত্র মূলত একটি পেশিবহুল পাম্প। এ পাম্প সারাক্ষণ সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ করে। হৃদযন্ত্রের নিজস্ব পেশিতেও রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহের জন্য কয়েকটি ধমনি রয়েছে। কোনো কারণে এসব ধমনিতে চর্বি জমে ব্লক তৈরি হলে হৃদযন্ত্রে রক্ত ও অক্সিজেনের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্র দুর্বল হয়ে যেতে পারে। আবার হঠাৎ রক্তের জমাটের কারণে ধমনির রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে যত দ্রুত চিকিৎসা দেয়া যায়, হৃদযন্ত্রের পেশি তত বেশি রক্ষা করা সম্ভব। এ কারণেই বলা হয়, ‘টাইম ইজ মাসল’। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে হৃদযন্ত্রের পেশি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

বাংলাদেশে দেখা যায়, স্টেন্ট বসানোর পর অনেক রোগী মনে করেন তিনি সুস্থ হয়ে গেছেন। এরপর ওষুধ বন্ধ করে দেন বা নিয়মিত ফলোআপ করেন না। এ বিষয়ে কী বলবেন?

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমি রোগীদের সবসময় বলি একবেলা ভাত না খেলেও হয়তো কোনো সমস্যা হবে না, কিন্তু একবেলার ওষুধ বাদ দেয়াও অনেক সময় মারাত্মক সমস্যা তৈরি করতে পারে।

অনেক রোগী চিকিৎসার পর ভালো বোধ করেন এবং মনে করেন আর ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন নেই। কেউ কোথাও বেড়াতে গিয়ে ওষুধ নিতে ভুলে যান, আবার কেউ ওষুধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর এক-দুই দিন পরে কিনবেন ভেবে সময় পার করে দেন। এভাবে কয়েক দিন ওষুধ বন্ধ থাকলেও বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় দ্রুত ট্রিটমেন্ট নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার ও সংশ্লিষ্টদের কী করা উচিত?

প্রথম কাজটি আমাদের নিজেদের এবং পরিবারের কাছ থেকেই শুরু করতে হবে। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। অনেক সময় রাত ৩টায় কারও বুক ব্যথা হলো। তিনি মনে করলেন, রাতে দেরি করে খাওয়ার কারণে গ্যাস হয়েছে। পরিবারের সদস্যরাও ভাবলেন সকালে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন। এভাবে সময় চলে যায় এবং রোগী হাসপাতালে পৌঁছার আগেই অনেক ক্ষতি হয়ে যায়।

সরকারের পক্ষ থেকে হৃদরোগের চিকিৎসা সুবিধা আরো বাড়াতে হবে। জেলাভিত্তিক ক্যাথল্যাব ও প্রাইমারি পিসিআইয়ের সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। তবে শুধু মেশিন স্থাপন করলেই হবে না; দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য প্রশিক্ষিত জনবলও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার পেছনের লক্ষ্য ও এর বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে জানাবেন।

আমার বাবা ব্রিগেডিয়ার আব্দুল মালিক একজন স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। তিনি অনেক আগে থেকেই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তা করতে পারতেন। সত্তর দশকের শুরুতে তিনি যখন হৃদরোগ নিয়ে চিন্তা করছিলেন, তখন বাংলাদেশে হৃদরোগকে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হতো না। তখন সংক্রামক রোগ, কলেরা, ডায়রিয়া, যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন রোগ নিয়েই চিকিৎসকরা বেশি ব্যস্ত ছিলেন। হৃদরোগকে অনেকে ধনী মানুষের রোগ মনে করতেন। কিন্তু তিনি তখনই বলেছিলেন, ভবিষ্যতে হৃদরোগ একটি বড় মহামারী হয়ে উঠবে। পরবর্তী সময়ে বাস্তবতাও অনেকটা সেদিকেই গেছে। সে কারণেই তিনি হৃদরোগীদের সেবার জন্য বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার কথা চিন্তা করেছিলেন। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের মূল দর্শন হলো ‘সেবাই পরম ধর্ম’। মানুষকে সেবা করার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় এ ধারণাই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে কাজ করে। এটি একটি অলাভজনক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। যত কম খরচে সম্ভব হৃদরোগীদের চিকিৎসাসেবা দেয়ার চেষ্টা করা হয়।

বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমানো এবং জরুরি সময়ে দ্রুত চিকিৎসা নেয়ার বিষয়ে সাধারণ মানুষের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

প্রথমত হৃদরোগ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। শরীরে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব ঝুঁকি নিজের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যেমন ধূমপান বাদ দেয়া, লবণ কম খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা। এগুলো মেনে চললে যে কেউ এ জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে পারেন।