বাংলাদেশে আইভিএফের পথচলা কেমন?

একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজের কর্মক্ষেত্র এবং বক্তিগত চেম্বারে আমার অনেক রোগী দেখার সুযোগ হয়েছে। সঠিক রোগ নির্ণয় করে উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমরা রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তার মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছি। কিন্তু বন্ধ্যাত্বের শিকার রোগী দিন দিন বেড়েই চলছে। আমাদের দেশে বন্ধ্যাত্ব রোগের পূর্ণাঙ্গ ডায়াগনোসিস ও চিকিৎসা ব্যবস্থা তেমনভাবে কিছুদিন আগ পর্যন্তও গড়ে ওঠেনি। তদুপরি এ রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় সব রোগীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশে বা বিদেশে চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। আমি একজন নারী হিসেবে, একজন মা হিসেবে একজন বন্ধ্যাত্ব নারীর মনের অবস্থা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। আমি আমার অবস্থান থেকে বরাবরই তাদের জন্য স্বল্প খরচে সফল চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের মুখে হাসি ফোটানোর তাগিদ অনুভব করেছি। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারের উদ্যোগে ও সহযোগিতায় আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। ফলে আজ ঢাকা মেডিকেলে বিনা খরচে আইভিএফ চিকিৎসাপদ্ধতি শুরু হয়েছে। সেটা মূলত আমাদের অনেক স্বপ্নের জায়গা। যেখানে বন্ধ্যা দম্পতি আইভিএফের মাধ্যমে বাবা-মা হতে পারবেন।

দেশে দম্পতিদের সন্তান জন্ম দেয়ার জটিলতার হার কেমন?

২০১১ সালে বাংলাদেশ জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্য জরিপের (বিডিএইচএস) একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যারা সঠিক প্রসব-পরবর্তী সেবা (ন্যূনতম তিনটি) গ্রহণ করেছেন তাদের সন্তান জন্ম দেয়ার জটিলতা ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ আর যারা সেবা গ্রহণ করেননি তাদের ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ। আমাদের দেশে বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা বিশেষ করে মাতৃস্বাস্থ্যসেবার অনেক অগ্রগতি হয়েছে এবং মাতৃমৃত্যু হারও অনেক কমেছে। সেসব দিক বিবেচনা করে সামগ্রিক অর্থে বলা যায় সন্তান জন্ম দেয়ার জটিলতা অনেকাংশে কমেছে।

আইভিএফ নিয়ে রোগীদের মধ্যে কোনো কুসংস্কার আছে কিনা?

কিছু কিছু অজ্ঞতা রোগীদের মাঝে থাকে। যেহেতু এ পদ্ধতি আমাদের দেশের মানুষের কাছে একদমই নতুন একটি বিষয়। তবে আমাদের কাছে তারা যখন আসেন আমরা তাদের যথাযথ সময় দিয়ে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে পুরো পদ্ধতিটা সম্পর্কে বুঝিয়ে বলি, তখন তারা অনেক আস্থা পান এবং কুসংস্কারমুক্ত হয়ে সঠিক সেবাটা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে এসব কুসংস্কার থেকে বের হওয়া যাবে এবং আমরা সে মতোই কাজ করে যাচ্ছি।

আইভিএফ পদ্ধতিতে কাজ করতে গিয়ে দেশে কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা।

দেশে আইভিএফ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বড় পরিসরে তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। বর্তমান সরকার বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। তবে বন্ধ্যাত্বের অত্যাধুনিক চিকিৎসা ভ্রূণ ক্রায়োপ্রিজারভেশন এবং শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর স্বল্পতা থাকলে ডোনারের ওভাম ও স্পার্ম দিয়ে আইভিএফ পদ্ধতি করার ক্ষেত্রে কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে। ভ্রূণ ক্রায়োপ্রিজারভেশন এবং পুরুষ বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসার জন্য অ্যান্ড্রোলজিস্ট এবং ভ্রূণ উৎপাদনের জন্য এম্ব্রায়োলজিস্ট প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে এ কার্যক্রম আরো জোরদার করতে পারলে রোগীদের কষ্ট দূর হবে। যেহেতু এটি নিম্নবিত্তদের হাতের নাগালের বাইরে। তাই সরকারি ব্যবস্থাপনায় এটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলে ভালো।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে আইভিএফের যাত্রা শুরু হয় কবে থেকে?

স্বল্প ব্যয়ে বন্ধ্যাত্বের আধুনিক চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চালু হয়েছে একটি আইভিএফ সেন্টার। যা ২০১৯ সাল থেকে যাত্রা শুরু হয়। এ যাত্রার মধ্য দিয়ে আমাদের অনেক দিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তবে ২০২০ সালের মার্চ মাসে কভিড-১৯-এর মহামারী শুরু হওয়ার পর এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ হয়ে যায়। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমে এলে আবারো শুরু করি আমরা। বর্তমানে তা অব্যাহত রয়েছে।

আপনাদের সেন্টারে রোগীরা কেমন আসেন?

আমাদের এখানে শুধু বন্ধ্যাত্বের জন্য বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৫০-৬০ জন নারী চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। আর ১০-১৫ জন পুরুষ আসেন বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা নিতে। এর মধ্যে সপ্তাহে ১০-১২ জন রোগী অপারেশন চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। এ পর্যন্ত আমরা প্রায় ১১ হাজার ২৩৩ জন বন্ধ্যা রোগীকে সেবা দিতে পেরেছি।

ঢাকা মেডিকেল আইভিএফ সেন্টার নিয়ে আর কী কী পরিকল্পনা রয়েছে?

আমাদের সেন্টার নিয়ে আরো কিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। বিশেষ করে বছরে ২-৩টা ব্যাচ করে আইভিএফ চিকিৎসাসেবা দেয়া। পুরুষ বন্ধ্যাত্বের অত্যাধুনিক চিকিৎসা ইন্ট্রা সাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন (আইসিএসআই) চালু করা। এছাড়া সার্জিক্যাল স্পার্ম রেট্রিভালের অংশ হিসেবে মাইক্রোসার্জারি টিইএসএ, পিইএসএ, এমইএসএ চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছি। এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে সেন্টারটি আরো গতিশীল হবে বলে আশা করি।

 

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: ফখরুল ইসলাম