২০০৩ সাল থেকে আমরা এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিচালনা করে আসছি। এর ১০ বছর পর ২০১৩ সালে যখন রানা প্লাজা দুর্ঘটনা ঘটে তখন শত শত নয়, হাজার হাজার মানুষকে জরুরি চিকিৎসা সেবা দিয়েছি। সত্যিকার অর্থে, আমাদের সক্ষমতা ছিল বলেই দিতে পেরেছি। কারণ আমরা জানতাম না রানা প্লাজা ভাঙবে এবং মানুষকে জরুরি চিকিৎসা সেবা দিতে হবে। এরপর ২০২২ সাল পর্যন্ত এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সালে এনাম ক্লিনিকের মাধ্যমে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়েছিল।

আমাদের হাসপাতাল ঢাকার অদূরে এবং ঢাকা-আরিচা হাইওয়ের ওপর ও শিল্পাঞ্চলের মধ্যে অবস্থানের কারণে প্রচুর সড়ক দুর্ঘটনা এবং শিল্প দুর্ঘটনার রোগী এখানে আসেন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ২৪ ঘণ্টাই চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছি আমরা। আমাদের প্রত্যেকটি বিভাগ যেমন মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, অর্থোপেডিক সার্জারি, কার্ডিওলজি (হূদরোগ), নিউরোমেডিসিন (স্নায়ুরোগ), নিউরোসার্জারি ও স্পাইন সার্জারি, ইউরোলজি, নাক-কান ও গলা, নবজাতক ও শিশু, নবজাতক ও শিশু সার্জারি, বার্ন প্লাস্টিক অ্যান্ড রিকনস্ট্রাক্টিভ সার্জারি, চেস্ট/থোরাসিক সার্জারি, রক্তরোগ, লিভার-পরিপাকতন্ত্র ও অগ্ন্যাশয়, রিউম্যাটোলজি (বাত ব্যথা), নেফ্রোলজি (কিডনি রোগ), মানসিক রোগ ও মাদকাসক্তি, চর্ম/যৌন, মেক্সিলোফেসিয়াল ও ডেন্টাল সার্জারি, ডায়াবেটিস-থাইরয়েড ও হরমোন (এন্ডোক্রাইনোলজি), চক্ষু, বক্ষব্যাধি, হেপাটো-বিলিয়ারি ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জারি, রেডিওলজি ও ইমেজিং, নিউরো আইসিইউ, হিস্টোপ্যাথলজি, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন, অ্যানাসথেসিয়া অ্যান্ড আইসিইউ, কার্ডিওভাস্কুলার ও থোরাসিক সার্জারি, ভাস্কুলার সার্জারি, ফিজিওথেরাপি, ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন, আইভিএফ অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি সেন্টারসহ সব বিষয়ে ২৪ ঘণ্টা সেবা পাওয়া যায়। এছাড়া ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য রয়েছে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্যান্সার হাসপাতাল। সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে দামি দুটি রেডিওথেরাপি (লিনিয়ার এক্সিলেটর মেশিন) ও ২০ চ্যানেল ব্র্যাকিথেরাপি মেশিন আছে।


এখন এটি একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি, সুপার স্পেশালিটি ও টারশিয়ারি কেয়ার সার্ভিস নিয়ে ওয়ানস্টপ সার্ভিস (একই ছাতার নিচে সব সেবা) হাসপাতাল। কোনো পরীক্ষা, চিকিৎসা ও চিকিৎসকের জন্য ভিন্ন কোথাও যেতে হবে না। প্রত্যেকটা মেশিনের রোগ নিরীক্ষণ ও চিকিৎসা ২৪ ঘণ্টা পাওয়া যায়। এ কারণে আমাদের এখানে এসে হয়রানির শিকার হতে হয় না। একটা রোগী এখানে আসার পরে জরুরি বিভাগ থেকে যখন ভর্তি হয়, তখন থেকে ছাড়পত্র দেয়া পর্যন্ত সব ধরনের চিকিৎসা দেয়ার সক্ষমতা ও লোকবল আমাদের রয়েছে।

আমরা সম্প্রতি আধুনিক আইভিএফ অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি সেন্টার চালু করেছি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মেডিকেল ম্যানেজমেন্টের (কনজারভেটিভ) মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছি আমরা। সম্প্রতি মেডিকেল ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে একজন সন্তান ধারণ করেছেন এবং কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছেন এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। যে পাঁচজনের আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) করা হয়েছে তাদের মধ্যে একজনের প্রেগন্যান্সি পজিটিভ এসেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে বহু দম্পতি এ ইনফার্টিলিটিতে ভুগছেন। চিকিৎসার জন্য বেশির ভাগ রোগী দেশের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আমরা চেষ্টা করছি আন্তর্জাতিক মানের সেবা দিতে, যেন বন্ধ্যা রোগীদের কখনো দেশের বাইরে যেতে না হয়। সে লক্ষ্যে জাপান, জার্মান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আধুনিক চিকিৎসাযন্ত্র এনে আমরা সেন্টার চালু করেছি। যেটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আমাদের এখানকার ফিজিশিয়ানরা চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এক হাজার শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল। এখানে ২৪ ঘণ্টা জরুরি পরীক্ষা, চিকিৎসা ও সার্জারি হয়। খুব অল্প খরচে সেবা পাওয়ায় মানুষের আস্থা বাড়ছে। এখানে কোনো চিকিৎসার খরচ পূর্ব নির্ধারিত নয়। রোগী যদি গরিব হয়, তাহলে তাকে ছাড় দিয়ে চিকিৎসা দিই। এখানে অনেক সময় রোগীর অভিভাবক পাওয়া যায় না। পুলিশ বা পথচারীরা হাসপাতালে রোগীকে দিয়ে চলে যায়। আমরা সেসব রোগীকে বিনা খরচে চিকিৎসা দিয়ে পাঠিয়ে দিই। ওষুধপথ্য বা খাবার দিয়ে থাকি, সুস্থ হওয়ার পর সামর্থ্য অনুযায়ী সে খরচ দেয়, না দিতে পারলেও আমরা তাকে ভালোভাবেই বিদায় দিই। এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ডা. মো. এনামুর রহমান বর্তমানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী। তিনি আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, এটি কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল নয়। সবার আগে মানুষের সেবা।

 

ড. আনোয়ারুল কাদের নাজিম: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল