ইস্পাত বিশ্বের অন্যতম উদ্ভাবনী এবং আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ইস্পাত শিল্প কেবল অর্থনৈতিক বিকাশ গতিময় করে না, ভারী প্রকৌশল ও নির্মাণের মতো অন্যান্য প্রশংসামূলক শিল্পেও একটি সুনির্দিষ্ট মৌলিক ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্প পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ করে জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখছে। গত দশকের তুলনায় ইস্পাতের চাহিদা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গত দশকে মাত্র আড়াই মিলিয়ন টন চাহিদা থেকে বর্তমানে সাড়ে সাত থেকে আট মিলিয়ন টন চাহিদা দাঁড়িয়েছে এবং ২০১২ সালে ইস্পাতের মাথাপিছু ব্যবহার ছিল মাত্র ২৫ কেজি, যা ২০২২ সালের মধ্যে ৭৫ কেজি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আমাদের দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এখন ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যা গত দশকেও ছিল ৬ শতাংশ, যার মধ্যে এ শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। কয়েক দশক ধরে দ্রুত প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা সত্ত্বেও করোনাভাইরাস মহামারীজনিত কারণে বাংলাদেশের ইস্পাত খাতটি এখন মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি। এ কভিড প্রাদুর্ভাবের কারণে কাঁচামাল আমদানি ও কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় ইস্পাত শিল্পটি ৪ হাজার কোটি টাকা লোকসান করেছে। যেকোনো দেশে ইস্পাত শিল্পের চাহিদা মূলত দুটি কারণ দ্বারা পরিচালিত হয়। একটি হলো সরকারের এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) বাস্তবায়নের পাশাপাশি সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম এবং অন্যটি ব্যক্তিগত স্তরের চাহিদা। মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ ইস্পাত সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাস্তবায়নে ব্যবহূত হয়। আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে এ চাহিদা ২৫ শতাংশ ও বেসরকারি খাতে এ চাহিদা ১৫ শতাংশের মতো, কিন্তু আসন্ন বছরগুলোতে এ চাহিদা দ্রুত বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকার অনেক মেগা প্রকল্প নিয়ে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিল্পায়নে কাজ শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতে ইস্পাত শিল্পের প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। গোল্ডেন ইস্পাত লিমিটেড এবং এইচএম স্টিল অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড উভয়ই মোস্তফা হাকিম গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের অবকাঠমো উন্নয়নে ইস্পাত শিল্পে অবদানকারী হিসেবে এ দুই প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস করে যে দেশে যুগোপযোগী উন্নয়ন এবং আধুনিক নির্মাণের সর্বাধিক গুণগত মানের ইস্পাত প্রয়োজন। এ লক্ষ্য নিয়ে আমরা চার দশক ধরে এ শিল্পে কাজ করে যাচ্ছি। মোস্তফা হাকিম গ্রুপ কেবল সেরা মানের ইস্পাত উৎপাদন করছে না, সঙ্গে সর্বোচ্চ মানের সিমেন্ট ও ইট তৈরি করছে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে মোস্তফা হাকিম গ্রুপ দেশের টেকসই নির্মাণকে ত্বরান্বিত করছে। কর্ণফুলী টানেল, মেট্রোরেল, রূপপুরসহ বিভিন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং একাধিক অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের মতো সরকারের মেগা অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে ইস্পাত শিল্পের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। আসন্ন বছরগুলোতে বেসরকারি খাত ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ইস্পাত ব্যবহার হবে। সে লক্ষ্যে আগামী দশকে ভালো মানের ইস্পাতের চাহিদা পূরণে আমরা আমাদের সক্ষমতা বাড়িয়েছি। গোল্ডেন ইস্পাত লিমিটেডের ইস্পাত উৎপাদনে সক্ষমতা ছিল বার্ষিক আড়াই লাখ টন, কিন্তু সারা দেশে গ্রাহকদের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতার কারণে আমরা আল্লাহর অশেষ রহমতে এ বছর থেকে এইচএম স্টিলের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছি বার্ষিক সাত লাখ টন। টেকসই ও উন্নত অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য মানসম্পন্ন নির্মাণসামগ্রীর অবদান অপরিসীম। এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অর্থনৈতিক ও উন্নত জীবনকে ত্বরান্বিত করে। এ মূল্যবোধ থেকে আমরা সর্বোচ্চ মানের পণ্য উৎপাদন ও বিপণনে ক্রমাগত কাজ করছি। আমাদের উৎপাদিত দুটি ব্র্যান্ড এ দেশের মানুষের নিরবচ্ছিন্ন আস্থা অর্জন করতে ও বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। কারণ আমরা সর্বদা গুণগত মান, সঠিক ওজন ও সঠিক সময়ে মূল্যবান গ্রাহকের কাছে পণ্য সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখি। আমি মনে করি, এ শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত প্রাসঙ্গিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকার নির্দিষ্ট নীতিগুলো বিভিন্ন স্তরের সমন্বয় এ শিল্পের বিকাশকে ত্বরান্বিত করবে। এর মধ্যে রয়েছে কাঁচামাল সহজলভ্যতা। ইস্পাত তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো বেশির ভাগ আমদানীকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে। বর্তমানে আমাদের দেশে যে শিপইয়ার্ড শিল্পটি রয়েছে, তা দেশের চাহিদা অনুযায়ী পুরো কাঁচামাল সরবরাহ করতে পারে না। আমাদের দেশে কাঁচামালের অপর্যাপ্ততা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দামের অস্থিরতা আমাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। তদুপরি আমাদের উৎপাদনে ব্যবহূত বেশির ভাগ রাসায়নিক আমদানি করতে হয়। আমাদের দেশের বন্দরগুলোর সুবিধা অপর্যাপ্ত এবং এজন্য বড় জাহাজ বহনকারী স্ক্র্যাপ চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না। তবে নতুন বন্দর নির্মাণের সময় সরকারের বিদ্যমান বন্দরগুলো বিকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ প্রস্তাবিত মিরসরাই ওশান ফ্রন্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পায়রা বন্দর। প্রস্তাবিত এ বন্দরগুলো তৈরি হয়ে গেলে ইস্পাত নির্মাতারা সহজে স্ক্র্যাপ আনতে সক্ষম হবেন, যা আমাদের এখনকার চেয়ে আরো দ্রুত পণ্য উৎপাদন করতে সাহায্য করবে। ইস্পাত শিল্পগুলোতে বেশি পরিমাণ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। সরকারের বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সহায়ক ভূমিকা এ শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। কেননা এদের নিয়মনীতিতে যেকোনো প্রতিকূল পরিবর্তন এ শিল্পকে প্রভাবিত করে।

সরকারের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তৈরি নীতিমালার যেকোনো অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন (যেমন কাস্টমস আইন, আয়কর, মূল্য সংযোজন কর এবং অন্যান্য) আমাদের ব্যবসাকে বিরূপ প্রভাবিত করে। ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা না থাকায় অনেক সময় ইস্পাত বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়াতে সরকার বিভিন্ন উদ্দীপনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে এবং বাংলাদেশের স্টিল প্রস্তুতকারকদেরও এর আওতায় আনতে হবে। করোনা মহামারীতে বিক্রি হ্রাসের কারণে বেশির ভাগ ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের বেতন প্রদানের জন্য কার্যনির্বাহী মূলধনের চরম সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। আমি সর্বোপরি আশা করি, সরকারের প্রগতিশীল নীতি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সহায়ক ভূমিকা আমাদের দেশে ইস্পাত শিল্প বিকাশের বিষয়টি নিশ্চিত করবে।

 

মোহাম্মদ সরওয়ার আলম: পরিচালক, মোস্তফা হাকিম গ্রুপ