করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সরকারের নীতিসহায়তা বেশি প্রয়োজন স্টিল তথা এমএস রড একটি দেশের অবকাঠামো নির্মাণের মেরুদণ্ড অর্থাৎ স্টিল ছাড়া ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। মাথাপিছু ব্যবহারের পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ করা হয় সে দেশ কতটা উন্নত। আমাদের দেশ স্বল্পোন্নত থেকে মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের সমপর্যায়ে পৌঁছবে। সেই লক্ষ্যে স্টিল শিল্পের সঠিক বিকাশ খুবই প্রয়োজন। অথচ স্টিল তৈরির মূল কাঁচামাল আয়রন ওর আমাদের দেশে নেই। এমনকি বিদেশ থেকে আয়রন ওর আমদানি করে এনেও উৎপাদন সম্ভব না। কারণ এ দেশে কোনো ব্লাস্ট ফার্নেস স্থাপিত হয়নি এবং সহসা বসানো সম্ভব নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্টিল উৎপাদন ও ব্যবহারকারী দেশ যেমন—চীন, ভারত, আমেরিকা, জাপান ও রাশিয়া এ টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রচুর স্টিল উৎপাদন করে। তাদের উৎপাদন খরচও কম পড়ে। আমাদের দেশে মূলত ইনডাকশন ও ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেসের মাধ্যমে স্টিল উৎপাদন হয়। এ প্রযুক্তিতে কোনো মিনারেল আয়রন ব্যবহার করা যায় না। তাই আমাদের মেল্টিং স্ক্র্যাপ আমদানি করে স্টিল তৈরি করতে হয়। বাংলাদেশে মূলত নব্বইয়ের দশক থেকে উন্নত প্রযুক্তি স্থাপনের মাধ্যমে অর্থাৎ বৃহৎ সাইজের ইনডাকশন ও ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস এবং অটোমেটিক রি-রোলিং মিল স্থাপন করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ উন্নত ও বিশ্বমানের স্টিল উৎপাদনের সক্ষমতার দিকে এগিয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রীর ভিশন-২০২১, মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পরিকল্পনা, ২০৪১-এর মধ্যে উন্নত বিশ্বে পদার্পণ করা, এমনকি ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১০-২০ সময়ে স্টিল ব্যবহার অনেক গুণ বেড়ে যায়। বর্তমানে লং প্রডাক্ট অর্থাৎ এমএস রডই দেশে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৫৫-৬০ লাখ টন। যার দ্বারা দেশে চাহিদা মিটিয়ে কিছু কিছু রফতানিও হচ্ছে। কিছুদিন আগেও বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর ও চীনে রড তৈরির ইন্টারমিডিয়েট প্রডাক্ট এমএস বিলেট রফতানি হয়েছে। অথচ ২০১৫-১৬তেও চীন ও ভারত থেকে এমএস বিলেট আমদানি করা হতো। বর্তমানে আমদানির পরিবর্তে রফতানি হচ্ছে। এতে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) সদস্যভুক্ত ৩৫ ফ্যাক্টরির সক্ষমতা কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।
২০২০ সালে বিশ্বে কভিড-১৯-এর প্রাদুভাবে এ শিল্পে একটি বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দুভাবে এ শিল্পকে ক্ষতিসাধন করেছে। অর্থাৎ আমরা সবাই জানি বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন (এসসিএম) ভেঙে পড়েছে, যার প্রভাব স্টিল শিল্পকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যেসব দেশ থেকে মেল্টিং স্ক্র্যাপ আমদানি করা হতো সেগুলো কভিড-১৯-এ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংগতকারণে আমাদের কাঁচামালের আমদানি কম হয়েছে। এতে আমাদের ৪০-৫০ শতাংশ ঘাটতিতে ফ্যাক্টরি রান করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সময় লকডাউন ও নির্মাণকাজে স্থবিরতার ফলে বিক্রিও কম হচ্ছে। তদুপরি যেসব আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দমি ছিল প্রতি টনে ২৮০-৩২০ মার্কিন ডলার তা বর্তমানে ৫৫০-৫৯০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে কনটেইনার ও জাহাজ ভাড়ার অতিরিক্ত চার্জ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ভাড়া দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ হয়ে যায়। শুধু উপরোক্ত কারণে বর্তমানে রডের বাজারমূল্য বেড়েছে। অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বাজারমূল্য এখনো অনেক কম। যেহেতু উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় বার্ষিক ৯০ লাখ টন, বিপরীতে ব্যবহার হয় মাত্র ৫৫-৬০ লাখ টন। সুতরাং সরবরাহ ঘাটতির জন্য দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। বিশ্বে করনাকালীন এবং কোনো কোনো দেশে করোনার প্রকোপ কমার কারণে প্রতিটি দেশের চাহিদা বেড়েছে। সে কারণে অনেক দেশ স্ক্র্যাপ রফতানিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছে। অন্যদিকে চীন ও ভারত তাদের স্ক্র্যাপ আমদানিতে ট্রেড ব্যারিয়ার বিধিনিষেধ ছিল, যা সাম্প্রতিককালে তুলে নিয়েছে। এতে দুটি জায়ান্ট দেশ প্রচুর স্ক্র্যাপ আমদানি করে যাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে চীন ২০৬০ সাল নাগাদ কার্বনের মাত্রা কমানোর করার লক্ষ্যে ব্লাস্ট ফার্নেজ উৎপাদন সীমিত করে যাচ্ছে এবং ইনডাকশন ও ইলেকট্রিক আর্ক উৎপাদন বাড়িয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা আয়রন ওর ক্ষেত্রে বাণিজ্য ব্যারিয়ারে বিঘ্ন ঘটার কারণে তাদের স্ক্র্যাপ আমদানি বাড়ছে। আমেরিকা থেকে আমাদের প্রচুর স্ক্যাপ আমদানি হতো। বর্তমানে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির কারণেও তাদের রফতানি সীমিত হয়ে আসছে।
উপরোক্ত সব দিক বিবেচনার ভিত্তিতে আমরা ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেট ও ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে আমাদের স্টিলের ওপর ট্যাক্স কমনোর জন্য এনবিআর চেয়ারম্যানের প্রতি দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো ইফেক্টিভ দাবিই পূরণ করা হয়নি। অথচ করোনাকালীন সারা বিশ্ব স্টিল শিল্পকে রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছে। কেন জানি অদৃশ্য কারণে আমাদের যৌক্তিক দাবিগুলো উপেক্ষা করা হচ্ছে। করোনার জন্য আমরা কোনো আর্থিক প্রণোদনা চাচ্ছি না। আমরা শুধু চাচ্ছি সিডি কমাতে এবং এআইটি কমাতে। বর্তমানে লস হলেও ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। এতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক গৃহীত সব মেগা প্রজেক্ট, বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামকে শহরের আদলে রূপান্তর, কৃষিভূমিকে সুরক্ষার জন্য পরিকল্পিত আবাসন নির্মাণ, সর্বোপরি সবার জন্য আবাসন নির্মাণ, মুসলিম বিশ্বে বিরল ঘটনা একসঙ্গে ৫৬০টি মসজিদ নির্মাণ এবং আপ-কামিং অনেক স্থাপনা নির্মাণে শুধু স্টিলের জন্য ব্যাহত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে এবং নির্মাণাধীন এসব স্থাপনার জন্য যে পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ সরকারের ব্যয় করতে হবে, তার সঙ্গে এ খাত থেকে আহরিত রাজস্ব অনেক অনেক কম হবে। সুতরাং উন্নয়ন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় কর্তৃক হিসাব-নিকাশ করার এখনই উপযুক্ত সময়। উচ্চমূল্যে স্টিল ক্রয়ে সরকারকে কত বেশি ব্যয় করতে হয় তার বিপরীতে রাজস্ব কতটা কম হয়। যখন বিশ্বে করোনা দুর্যোগ কমে যাবে এবং বিশ্ববাজারে স্ক্যাপের দাম কম হবে তখন রডের দামও কমে আসবে এবং প্রয়োজনে সরকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যে যৌক্তিক কর ধার্য করতে পারবে। আমরা সবসময় রাজস্ব দিতে আগ্রহী। কেননা আমরা বিশ্বাস করি, দেশ বিনির্মাণে রাজস্বের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আপত্কালে রাজস্ব কিছুটা কম হলেও সরকারের উন্নয়নকাজ ত্বরান্বিত হবে। পরবর্তী সময়ে সার্বিকভাবে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ অনেক বাড়বে।
সাউথইস্ট এশিয়ার অনেক দেশই নির্মাণসামগ্রীর ওপর ট্যাক্স বারডেন কমিয়ে রাখা হয়, যাতে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সহজ হয় এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠী স্বল্প দামে নির্মাণসামগ্রী কিনতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশে এক কোটির অধিক জনগোষ্ঠী বিদেশে অবস্থান করে দেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান। সর্বশেষ গত জুন পর্যন্ত এ খাত থেকে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসে আমাদের করোনাকালীন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে রেখেছে। তাদের একটি বড় স্বপ্ন থাকে একটি বাড়ি করা। আমরা স্টিল উৎপাদন করি। তাদের হাতে স্বল্প মূল্যে রড পৌঁছাতে পারলে আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা অনেকাংশে পালিত হয়। সুতরাং অর্থমন্ত্রী ও এনবিআর চেয়ারম্যান কর্তৃক ২০২১-২২ বাজেটের দাবিগুলো পুনর্বিবেচনা করা হলে আমরা অনেক কৃতার্থ হব।
মুহাম্মদ শহিদ উল্লাহ: মহাসচিব, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মেট্রোসেম ইস্পাত





